হারিয়ে যাওয়া ছাদ পেটানোর গান

Reading Time: 3 minutes

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গুটিকয়েক জমিদার আর ধনাঢ্য ব্যবসায়ীরা নিজেদের থাকার জন্য পাকা ইমারত তৈরি করতেন। ইমারত নির্মাণে তখনো সিমেন্ট, ইট ও স্টোন চিপসের প্রচলন শুরু হয়নি। ইট-সুরকির গুঁড়া ও চুনের মিশ্রণে আস্তরণ তৈরি করে সেটা ছাদের ওপর মুগুর দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে বসানো হতো। তৈরি হতো জলছাদ। চলতি ভাষায় বলা হত ‘কোবাকাম’।

ছাদ পেটাতে অনেক শ্রমিকের প্রয়োজন হতো। তাই ঢাকায় ছাদ পেটানোর এক শ্রেণির পেশাজীবী গড়ে ওঠে। কবি আসাদ চৌধুরীর স্মৃতিচারণায় ছাদ পেটানো গানের উল্লেখ যতটুকু পাওয়া যায় তা হলো ‘ছাদ পেটানো গান আমার ভীষণ ভালো লাগত, পঞ্চাশের গোড়ার দিকেও দেখেছি ছাদ পেটানো গান হচ্ছে। বেহালা নিয়ে গায়ক দুলে দুলে গান গাইতেন, আর ছাদ পেটানো চলত। ’ নির্মীয়মাণ ইমারতে ছাদ পেটানোর ছন্দে অনুরণিত ধুপ ধুপ শব্দ ঢাকাবাসীর কাছে ছিল খুবই পরিচিত। একজন ‘সর্দারে’র তত্ত্বাবধানে দল বেঁধে এই শ্রমিকরা ছাদ পেটানোর কাজ করত।

তাদের সঙ্গে সমানতালে কাজ করত নারী শ্রমিকরাও। আসলে শারীরিক অবসাদ ও ক্লান্তি দূর করতে তারা এ ধরনের গান গাওয়াকে মোক্ষম দাওয়াই হিসেবে ব্যবহার করত। গানগুলোতে সাজানো-গোছানো পরিপাটি কোনো আয়োজন থাকত না। এটি ছিল মেহনতি মানুষের গান। ‘চৌরঙ্গী’ ছবির জন্য কবি নজরুল বেশ কিছু গান রচনা করেছিলেন। তার মধ্যে একটি ছিল— ‘সারাদিন পিটি কার দালানের ছাদ গো

সারাদিন পিটি কার দালানের ছাদ।

পাত ভরে ভাত পাই না, ধরে আসে হাত গো।

সারাদিন পিটি কার দালানের ছাদ…। ’

যা পরবর্তী সময়ে ছাদ পেটানো গান হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। অধ্যাপক অলকানন্দা দাশগুপ্ত প্যাটেলের (২০১১) স্মৃতিচারণায় যার উল্লেখ রয়েছে। এসব গানের না ছিল কোনো স্বরলিপি, না ছিল কোনো লিপিবদ্ধ রূপ। কিন্তু এসব গানে ছিল ছন্দ-তাল-লয়ের অপূর্ব মেলবন্ধন। গায়ক সর্দার গানের প্রথম কলিটি গাইত, এর পর শ্রমিকের দল কাঠের তৈরি মুগুর দিয়ে ছাদ পেটাতে থাকত। আর যখনই সর্দারের কণ্ঠ থেমে যেত, তখনই শ্রমিকরা ছাদ পেটানি থামিয়ে সমস্বরে গানের কলিটি একই সুরে প্রতিধ্বনিত করত। এভাবে সম্পূর্ণ গানটি গাওয়া হতো। এ গান অবস্থাভেদে কখনো দ্রুত আবার কখনো ধীর লয়ে গাওয়া হতো। ছাদ পেটানোর তালে তালে সমান্তরালভাবে ধেয়ে যেত গানের তাল। বিষয়বৈচিত্র্য ছিল ছাদ পেটানো গানে। ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ, হাসি-ঠাট্টা, তামাশা স্থান পেত গানের কথায়। প্রখ্যাত লোকবিজ্ঞানী আশরাফ সিদ্দিকীর মতে, অনেক সময় এতে ইতিহাসের টুকরো খবরেরও সন্ধান মিলত। কোনো কোনো সময় শ্রমিকরা সংক্ষিপ্ত ছাদ পেটানোর গানও গাইত। গানের তালে তালে বেহালা বাজানোরও রেওয়াজ ছিল। বঙ্গেশ্বর রায়ের বর্ণনায়, আঁস্তাকুড় থেকে কুড়িয়ে আনা বেহালাখানি হাতের জাদুতে এমন অবিশ্বাস্য ধ্বনি সৃষ্টি করতে পারে, তা স্বচক্ষে না দেখলে কিংবা স্বকর্ণে না শুনলে বিশ্বাস করা কঠিন। সংগীত, বেহালা ও ছাদ পেটানোর ত্রয়ীস্পর্শে অপূর্ব শব্দ ও সুর লহরির সৃষ্টি হতো। বেহালাবাদক সর্দারের কণ্ঠে শোনা যেত—

‘জজ সাহেবের টেরি মাইয়া

পেখম মেইলাছে,

মহব্বতের রশির টানে

উধাও হইয়াছে।

কেলাস নাইনের ছাত্রী আছিল,

গতর-শোভা ভালাই আছিল,

কেম্বে কমু হগল কথা

সরম অইতাছে,

জজ সাহেবের টেরি মাইয়া

পেখম মেইলাছে…। ’

সঙ্গে সঙ্গে ছাদ পেটানোর দলেও খুশির হিল্লোল বয়ে যেত। সম্মিলিত কাঠের মুগুরের আওয়াজ ঠাস ঠাস শব্দে ছন্দের এক মহোৎসব তৈরি করত। গৃহনির্মাণের সময়কাল ছিল বর্ষাশেষে হেমন্তকাল থেকে শুরু করে জ্যৈষ্ঠ মাস অবধি। তাই শীতকাল ছাড়া বাকি মাসগুলোতে প্রচণ্ড উত্তাপে এই ছাদ পেটানোর পরিশ্রম ছিল খুবই ক্লান্তিকর। দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে ছাদ পেটানির দল কাজ করত। অপরাহ্নের শেষ ভাগে সারা দিনের কাজের শেষে নগদ প্রাপ্তির আশায় চাপা খুশিতে উদ্বেলিত হয়ে উঠত। সর্দারের সঙ্গে তখন সবাই মিলে সমস্বরে গেয়ে উঠত—

‘যে-জন আমারে ভালোবাইসাছে—

কলকাত্তায় নিয়া আমায় হাইকোর্ট দেখাইছে;

যে-জন আমারে ভালোবাইসাছে—

গোয়ালন্দ নিয়া আমায় হিলশা খাওয়াইছে…। ’

এ রকম আরো কিছু ভালোবাসার নিদর্শন দেখিয়ে সেই দিনের মতো গানের পরিসমাপ্তি ঘটত। নির্মাণশিল্পে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকতা যুক্ত হয়ে ফুরিয়েছে ছাদ পেটানোর প্রয়োজনীয়তা; সেই সঙ্গে হারিয়ে গেছে ছাদ পেটানো গানও! গানের সেই কথা ও সুর হয়তো হারিয়ে গেছে; কিন্তু সেই যে তালে তালে শ্রমিকদের ধুপ ধুপ বাড়ির ধ্বনি-প্রতিধ্বনি, পুরনো ঢাকার ভগ্নপ্রায় দালানকোঠার ছাদে কান পাতলে এখনো হয়তো শোনা যাবে নিশ্চয়!

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>