শিকাগো ডায়েরি (পর্ব-২)

গত পর্বের পরে

(২) পালংশাক ও টিউলিপ

এখানে এখন শীতের প্রাবল্য কেটে বসন্ত এসেছে।কখনো গরম, কখনো ঠান্ডা। মাঝেমধ্যে বৃষ্টি অথবা তুষারপাতের আশঙ্কা। রাস্তায় হাঁটতে গেলে হাল্কা শীতের আমেজ। তার মধ্যে পথের ধারে রূপসী টিউলিপ উদ্ধত গ্রীবা উঁচিয়ে ইতিউতি বলে উঠছে আমাকে দেখ।বরফের চাদর সরে গেছে। ডেইজি ফুটি ফুটি। দিন কয়েকের মধ্যেই চেরী ব্লসম বলে উঠবে, যেমন তেমন মেয়ে বিয়োব, বয়েস কালে রূপ দেখাব। আপাততঃ এদের সঙ্গেই আমার দিন গুজরান, রাহুল-নীলাঞ্জনার ছোট্ট সংসারে। নতুন বিয়ের পরে দুজনের একসাথে থাকা।

সারাদিন কাজের মাঝে মাঝে, শুক্তোঘন্ট, ভাপা চিংড়ি, সিঙাড়া কচুরির ফাঁকে ফাঁকে লিখে চলি শিকাগো ডায়েরী। এতবার আসা হয়েছে কাজে, অকাজে তবুও প্রতিবার নতুন করে আবিষ্কার করা আমেরিকা কে। প্রতি শহর এক রকম তবুও তার নিজস্ব বৈচিত্র‍্যে ভরপুর। সেই একই কফির আড্ডা, ওয়াফলের ওপর একই মেপল সিরাপের উদ্বায়ী গন্ধ, সেভেন ইলেভেন, ডানকিন ডোনাটস, তবুও যেন নব নব রূপে এসে ধরা দেয়। পঞ্চ ইন্দ্রিয় সাড়া দেয় সেই রঙে, রূপে, ঘ্রাণে, ছোঁয়ায়।

লুচি, মাছ সব ডিপফ্রায়েড ভাজলেই তাদের রান্নাঘরে স্মোক এলার্ম বাজার কথা। বেজেও উঠল। আবার থামিয়েও দেওয়া গেল। মনে পড়ল এক আত্মীয় মাসীমার কথা। তাঁর মেমসাহেব পুত্রবধুর নজরদারিতে দিন কাটত বিদেশে। সাধ করে লুচি বা বেসনের পকোড়া ভাজা যাবেনা সেখানে। মেমসাহেবি ফতোয়া জারি।  বেঁচে থাক বঙ্গ বধূ আমার! সে টুক করে গিয়ে ম্যানিপুলেট করে দিল সেই স্মোক এলার্মে। ব্যাক ইয়ার্ডের দরজা জানলা একটুকু ফাঁক হল। লুচির ধোঁয়ার সমূলে পলায়ন সেখান দিয়ে।

জেটল্যাগ আর কাটেই না। অসময়ে ঘুমের দৌরাত্ম্যি আর ঘুমের সময়ে দাপটে জাগরণ। তবুও ভোর হয় আমার শিকাগোতে। সৌজন্যরক্ষায় চোখ খুলে রাখতে হয়। টেবিলে সাজানো ব্রেকফাস্ট। হাত না ঘুরিয়ে মুখের সামনে চা আর এগস বেনেডিক্ট। দুটি ইংলিশ মাফিনের মাথায় বসে ওয়াটার পোচ আর হল্যান্ডাইস স্যসের মাখোমাখো কেমিস্ট্রি। খেয়ে উঠে দুপুরের জন্য রান্নাঘর আমার দখলে। পালংশাক কুচিয়ে জলে ফেলার পর্ব। সঙ্গে ডুমো ডুমো কাটা আলু, মূলো, বেগুণ।  আবার ডাক “মা, মা দেখবে এসো”

ব্যাক ইয়ার্ডে ওয়াশিং করতে গিয়ে একটি ম্যাওপুষি আর চিপমাঙ্কের দেখা পেয়েই উত্তেজনা।  জানলা দিয়ে মুখ বাড়াই। পালংশাকের জল ঝরাই। গ্যাস আভেনে কড়া বসাই। সর্ষের তেল। জিরে, তেজপাতা, কাঁচালঙ্কা ফোড়ন। চড়বড় করতেই মূলো, আলু ছেড়ে দি‌ই। ঢাকাচাপা দিয়ে নাড়তে থাকি। স্টারফ্রাই। ও মা দেখ, দেখ, আজ গুগ্‌ল ওয়েদার প্রেডিকশানে স্নো-ফল হবে। হাওয়া দিচ্ছে। হালকা বৃষ্টি পড়ছে। সেই সঙ্গে দুধসাদা রসুনের খোসার মত বরফ উড়ে এসে পড়ছে তো পড়ছেই।  মেঘ রঙা শিফন শাড়িতে ইম্প্রেশানিস্ট পেন্টিং কিচেনের জানলার বাইরে।

বরফের পাতলা চাদরের কুচি কেউ কেটে ছড়িয়ে দিয়েছে আকাশের গায়ে। সেগুলো উড়ছে মনের সুখে হাওয়ায়। নীচে পড়তেই জল। উষ্ণতা নামছেই। ১ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড।   গ্যাসে বসানো কড়াইয়ের ঢাকা খুলতেই, মা দেখবে এসো। বরফ জমছে আসতে আসতে। গ্যাস সিম থেকে একধাপ বাড়াই। পালংশাক ছড়াই। নুন, হলুদ দি‌ই। এবার বেগুণ গুলো। জানলা দিয়ে মুখ বাড়াই। ঠান্ডা হাওয়ায় ধার। এবার গ্যাস হায়েষ্ট পয়েন্টে। জল মারতে হবে। সেই জলে সব সেদ্ধ হবে। ও মা, দেখবে এসো। জল থৈ থৈ বৃষ্টি নেই। ঠান্ডা হাওয়ায় হালকা ধার। শীত এসেছে, বর্ষা নেই। বসন্ত উড়ে গেছে অচিরেই। এবার চিনি ছড়িয়ে দিলাম পালংশাকের ন্যায়দম খাওয়া ঘন্টে। সামান্য আটা ছড়িয়ে দিবি? আরেকটু শুকোবে। এবার ঘি। গ্যাস বন্ধ। ওপর থেকে ভাজা বড়ি। দেখলে মা? তোমার জন্য বসন্তে অকাল তুষারপাত? অসময়ে বরফের চাদরে ঢেকেছে মাটি। জানলার কাঁচে বরফের আছড়ে পড়া। বললাম, এমন ঋতুবৈচিত্র অভাবনীয়। আজ যে রাজা কাল  সে এ ফকির, জলবায়ুর কি খেল!

বাকী অংশ আগামী পর্বে…

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত