| 28 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
গল্প ধারাবাহিক সাহিত্য

চোরাকাঁটা (পর্ব-৯)

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

‘হ্যালো, ফজলুল ভাই…কেমন আছেন? ম্যালাদিন ধরে ফোন টোন কিছু করেন না? ভুলে গেলেন নাকি আমার কথা?’

বেশ লম্বা সময় বাদে পুলিশ ইন্সপেক্টর আনিসুল হকের ফোন পেয়ে অনিকের বাবা ফজলুল আহমেদ একটু চমকালেন। সাধারণত তিনিই আনিসুল হককে স্মরণ করেন। বেকার মানুষ হলে যা হয়। আনিসুল হক কাজের মানুষ। কাজের চাপে সম্পর্কের চাপ হয়ত তেমন একটা বোধ করেন না। আর তাছাড়া কীই বা এমন সম্পর্ক! যার সূত্রে তাদের মধ্যে এই সম্পর্ক, সেই বন্ধুটি… মানে আনিসুল হকের বড় ভাই তো কবেই দেশের পাট চুকিয়ে আমেরিকায় সেটল করেছে! তার ছোটভাইয়ের এখন ভাইয়ের বন্ধুর সাথে কথা বলার আর তেমন কী গরজ থাকতে পারে? কিন্তু ফজলুল আহমেদের তো গরজ পিছু ছাড়ে না। নিত্য নতুন গরজে তাকেই যোগাযোগ রাখতে হয় প্রশাসনের লোকজনের সাথে।

মর্নিং ওয়াক শেষ করে এসে একটু ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করার কথা ভাবছিলেন ফজলুল আহমেদ প্রতিদিনই করেন। শরীরের বাড়তি মেদটা ঝরে গিয়ে বেশ টোনড থাকে শরীরটা। সাতষট্টি চলছে তার। অথচ দেখলে কে বলবে! রাজকীয় চেহারা তো পিতৃপুরুষদের কাছ থেকেই নিয়ে এসেছিলেন। ওটাতে তার তেমন একটা ক্রেডিট নেই। কিন্তু শরীরটা মেইনটেইন করার ব্যাপারে তার ক্রেডিট ষোলআনা। 

এক্সারসাইজ সেরে একটা হট শাওয়ার নিয়ে ঝরঝরে হয়ে নাস্তার টেবিলে বসবেন। খবরের কাগজে চোখ বুলাতে বুলাতে টোস্ট অমলেটে কামড় বসাবেন। জমিদারের বংশধর হয়েও তার মধ্যে বিশেষ একটা জমিদারীপনা নেই। অন্তুত তার চলাফেরাতে সেটা নজরে আসে না। শুধু কিছু কিছু ব্যাপারে এখনো একটু বিলাসিতা করতে ভালো লাগে, এই যা। জিনিসপত্র কেনার ব্যাপারে তার জমিদারী মেজাজটা একেবারে খাপখোলা তলোয়ারের মতো বেরিয়ে আসে। কম কিনবেন, কিন্তু জিনিস হওয়া চাই একদম খাঁটি। একেবারে এক নাম্বার। আর কমই বা কিনতে পারেন কই? সুপারশপে গেলে তো দুটো বিশাল ট্রলি নিয়েও কুলাতে পারেন না! আর মেজাজেও মাঝে সাঝে অন্যরকম একটা আভিজাত্য টের পাওয়া যায়। সহজে রাগ করেন না কারো ওপরে, কিন্তু আশেপাশের লোকজন এমনিতেই তটস্থ থাকে। তার কাছ থেকে কোনো নির্দেশ পেলে নিখুঁতভাবে করে ফেলতে চেষ্টা করে। ভুল করার চেষ্টা ভুলেও করে না কেউ।

সাত সকালে আনিসুল হকের ফোন পেয়ে ফজলুল আহ্‌মেদ একটু চিন্তিত হলেন। কেমন একটা অজানা ভয়ও এসে দোলা লাগালো মনে। এতদিন পরে আবারও কি ওসব…? তাই যদি না হবে তাহলে আনিসুল হক নিজে থেকে ফোন করছে কেন? ও তো কখনো এভাবে আগ বাড়িয়ে ফোন করে না!

ফজলুল হকের গলাটা কেঁপে গেল নিজের অজান্তেই।

‘আরে আনিস! তুমি এত সকালে! কী মনে করে এতদিন পরে আমার কথা মনে হলো, সেটা আগে বল দেখিপুলিশের ফোন পেলে তো সাধারণ মানুষজনের হার্ট এ্যাটাক হয়ে যায়। এটা কি জানো না?’

আনিসুল হক বেশ যেন মজা পেলেন এমনভাবে হাসলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন,

‘প্লিজ, আমাকে এই বুড়ো বয়সে জেলের ভাত খাওয়াবেন না ফজলুল ভাই। জমিদারের বংশধরের হার্ট এ্যাটাকের কারণ হলে পুলিশ কমিশনারের পদবীও আমাকে বাঁচাতে পারবে না! হা হা হা…’

‘হা হা… তা বেশ! এখন বল কী কারণে হঠাৎ মনে করলে? এমনি এমনি তো নিশ্চয়ই মনে করোনি! তাহলে এত সকালে ফোন দিতে না!’

‘ঠিকই ধরেছেন ফজলুল ভাই। মাথাটা আপনার এখনো একেবারে ফ্রেশ আছে বুঝলাম। ধরেই যখন ফেলেছেন তখন আর ভনিতা না করি। আপনি কি আজ ফ্রি আছেন? একটু দেখা করতে পারবেন? আপনার অসুবিধা থাকলে আমিও আসতে পারি আপনার বাসায়। যদি দাওয়াত দিতে রাজি থাকেন আর কী! হে হে। আজ একটু ফ্রি আছি বলে ধারণা করছি। অন্তত এখন পর্যন্ত। তাই আগ বাড়িয়ে দাওয়াত চেয়ে নিচ্ছি।’

ফজলুল আহমেদের বিস্ময়ের সীমা রইলো না। আনিসুল হক নিজে আসতে চাচ্ছে তার বাসায়! তার মানে কিছু একটা নিশ্চয়ই ঘটেছে! যেরকম রহস্যপ্রেমী মানুষ সে! নিজে থেকে প্রথমেই কিছু বলবে না। আসার পরেই তার পেটের রহস্য জানা যাবে। অবশ্য যদি সেটা জানতে দেওয়ার আদৌ কোনো ইচ্ছে তার থেকে থাকে!

ফজলুল আহমেদ অকৃত্রিম আন্তরিকতার সাথেই বললেন,

‘নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই! তুমি আমার বাসায় আসতে চেয়েছো, এটা তো দারুণ সৌভাগ্য। রোজ রোজ তো আর এমন বিশেষ আতিথেয়তা করার সুযোগ পাই না! কী খাবে জানাও। ব্যবস্থা করতে তো কিছু সময় লাগবে। গ্রামের বাড়ি হলে নিমেষেই সব ব্যবস্থা হয়ে যেত। হাতের তুড়ি বাজাতাম, আর সবকিছু হাতের কাছে চলে আসতো। এখানে তো কেউওই তেমন…’

শেষের কথাগুলোতে গলাটা একটু যেন বিষণ্ন শোনালো ফজলুল আহমেদ। আনিসুল হক তাড়াতাড়ি বললেন,

‘আহা হা! আপনি প্লিজ ব্যস্ত হবেন না ফজলুল ভাই। খুব বেশিকিছু আয়োজনের দরকার নাই। পুলিশের চাকরি কী যে জঘণ্য চাকরি তা যদি জানতেন! হয়ত আপনার বাসায় জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছি…এরই এক ফাঁকে চলে আসবে জরুরি ফোনকল। তক্ষুণি চলে আসতে হবে। কোথাও প্রটোকল দিতে যেতে হবে কিংবা কোনো পলিটিক্যাল ইমার্জেন্সি। এসব তো লেগেই আছে। আজ সকালবেলাতে মনে হলো, এখনো কিছু ঝামেলা কাঁধে এসে জোটেনি। তাই একটা চান্স নিয়ে ফেলি। কাজেই অযথা বেশি ব্যস্ত হতে যাবেন না ভাই। আপনারা বাসায় যা খাবেন আমিও তাই খাবো।’

‘উঁহু, তা বললে হয় নাকি? আচ্ছা থাক এসব কথা। তুমি রওয়ানা দিয়ে দাও। রাস্তায় যে যানজট! বেশি দেরি করলে আসতে আসতেই তোমার সেই ফোনকল এসে যাবে। হাহ হা…’

ফোন রেখে ফজলুল আহমেদ গেলেন স্ত্রীকে বিষয়টা জানাতে। তার এই ঢাকার বাসায় সব মিলিয়ে ছ’জন হেল্পিং হ্যান্ড আছে বটে, কিন্তু তবুও তার কাছে সেটা যথেষ্ট বলে মনে হয় না। ইচ্ছে করে বাড়িভর্তি চাকরবাকর থাকবে। একজন এটা করবে, আরেকজন সেটা। যাকে যখন যে কাজে চাইবেন সে তৎক্ষণাৎ হাজির হয়ে যাবে। তিনি এখনো এই বিষয়ের বিলাসিতা কাটাতে পারছেন না। ইচ্ছে ছিল তার গ্রামের বাড়ির সাহায্যকারী সবাইকেই সঙ্গে করে নিয়ে আসবেন। কিন্তু…সেটা তো আর হলো না! কেউ নিজে থেকেই আসতে রাজি হলো না। কারো বা পরিবার থেকে বাধা এলো। ঢাকায় এলে নিজের নিজের পরিবার থেকে সবাই আলাদা হয়ে পড়বে। সেজন্যও কারো কারো পরিবার আসতে দিতে রাজি হলো না। তাছাড়া অন্য ফাঁড়া তো লেগেই আছে এই পরিবারের সাথে!

ফজলুল আহমেদের স্ত্রী নুরজাহান বানুর বয়স পঞ্চান্ন বছর। গৌরবর্ণা সুন্দরী একজন মানুষ ছিলেন একসময়। সেই সৌন্দর্য এখনো স্বমহিমায় নিজের অতীত ঐতিহ্যের গুণগান গেয়ে চলে। মুখের দিকে তাকালে কিছুক্ষণ চোখ ফেরানো যায় না। তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। কিন্তু শরীরটা তার অস্বাভাবিক স্থূল হয়ে গেছে। বাড়িভর্তি গুচ্ছের চাকরবাকর থাকার কুফলটা তিনিই ভোগ করছেন সবচেয়ে বেশি। আগে থেকেই হাঁটাচলা কম করতে করতে এখন আর চাইলেও তেমন হাঁটতে পারেন না। অল্পতেই হাঁপিয়ে পড়েন। জগ থেকে পানি ঢেলে খেতেও তার হাঁফ ধরে যায়।

নুরজাহান বানু বেশি ভোরে উঠতে পারেন না। ফজলুল আহমেদ তাকে ভোরবেলা মর্নিং ওয়াকে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করেছেন। ফল হয়নি। এখন একরকম হাল ছেড়ে দিয়েছেন। পঞ্চান্নতেই গেঁটে বাত, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ…সব অসুখ বিসুখ নাচতে নাচতে বাড়ি এসেছে।

স্বামীকে এক্সারসাইজ না করেই শোয়ার ঘরে ঢুকতে দেখে নুরজাহান বানু জিজ্ঞাসু চোখে চাইলেন। ফজলুল আহমেদ বললেন,

‘আরে পুলিশ কমিশনার আনিসুল হক…ঐ যে তোমাকে বলেছিলাম না ওর কথা? আমার বন্ধু কায়েসের ছোটভাই। ও হঠাৎ আজ এখানে আসতে চাইছে। মানে আমাদের বাসায়। দেখ দেখি, এখন হুট করে এত কিছুর আয়োজন কীভাবে করা যায়! তোমার লটবহর পারবে তো ভালো একটা মেহমানদারী করতে?’

ফজলুল আহমেদের  উচ্ছ্বাস নুরজাহান বানুকে তেমন স্পর্শ করলো না। তিনি পুলিশ বাসায় আসার খবরে কেমন একটু ঘাবড়ে গেলেন। ফিস ফিস করে বললেন,

‘হঠাৎ তার কী দরকার পড়লো তোমার কাছে?’

ফজলু্ল আহমেদ নিজের উদ্বেগ স্ত্রীর ভেতরে ঢোকাতে চাইলেন না। একটু আগে তার অবস্থাও একইরকম হয়েছিল। সেই ভাব গোপন রেখে স্ত্রীকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বললেন,

‘আরে! এমনি আসতে পারে না বুঝি? হয়ত এদিকে কোথাও কাজ আছে কোনো। জমিজমার মামলা নিয়ে কোনো কোয়ারিও থাকতে পারে। আমি তো ওকে একটু দেখভাল করতে বলেছিলামঘোড়েল লোকদের সাথে ওঠাবসা এদের। একটু কড়কে দিলেই কেউ মাস্তানী করার সুযোগ পাবে না। সেসব নিয়েই হয়ত কথা বলবে। আজ ফ্রি আছে তাই আসতে চাইছে। তুমি অযথা টেনশন করো না তো সবকিছুতে!’

নুরজাহান বানু স্বামীর আশ্বাসবাণীতে বিশেষ একটা আশ্বস্ত হলেন বলে মনে হলো না। তার মুখটা চিমসেই রইলো। বিড়বিড় করে শুধু বললেন,

‘আবার কী নতুন ঝামেলা পাকলো কে জানে! আর হুজ্জোত ভালো লাগে না। নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে এতদূর এসে বসে আছি। তবুও কি একটু শান্তি পাবো না?’

বিড়বিড় করে বলা কথায় ফজলুল আহ্‌মেদ তেমন কান দিলেন না। তিনি রান্নাবান্নার কথাটা আরেকবার মনে করিয়ে দিলেন।

‘নুর, দেখো দেখি সবকিছু আছে নাকি ফ্রিজে? মাছ মাংশ কিছু আনাতে হলে বলো। শহীদুলকে বাজারে পাঠাও।’

নুরজাহান বানু শান্ত অথচ অমনোযোগী গলায় বললেন,

‘ওসব নিয়ে তুমি ভাবতে যেও না। দুপুরের মধ্যেই সব আয়োজন হয়ে যাবে। তুমি দেখো হঠাৎ পুলিশের কী দরকার পড়লো আবার!’

ডাইনিং রুমের দিকে যেতে যেতে ফজলুল আহ্‌মেদের মনটা একটু খারাপ হলো। কোথা থেকে কোথায় নেমে এসেছেন এখন! একজনকে খাওয়ানোর আয়োজন নিয়েই কত ভাবনাচিন্তা তাকে করতে হচ্ছে আজ! এসব কি তার করার কথা? একটা তুড়ি বাজালেই দশজন দশদিক থেকে হাজির হয়ে যেত একসময়। আর আজ এ কী দুর্দশা! এখন যে খারাপ আছেন, তা নয়। মনের শান্তির ওপরে আর কিছুই নেই। কিন্তু এটাও ঠিক, বংশগতির ধারার কারণেই কী না কে জানে…সৌখিনতাটাকে মন থেকে কিছুতেই পুরোপুরি সরাতে পারেন না। যেখানেই হাত দেন, সেটাকেই কেন যেন হাল্কা মনে হয়। কোথাও বনেদীপনার ছোঁয়া খুঁজে পান নানিজের মধ্যে এই জিনিসের এত তীব্র উপস্থিতি এই বাসাটাতে আসার আগে তিনি বুঝতে পারেননি। এখানে আসার পর থেকে এই একটা জিনিসেই ঘাটতি খুঁজে পান সবসময়। 

ছোটখাট ডাইনিং টেবিলটাকে দেখেই মনে পড়ে যায় তার ফেলে আসা সেই বাড়িটার কথা। আবলুস কাঠের তৈরি বিশাল সেই ডাইনিং টেবিলকে ঘিরে কুড়িটার মতো চেয়ার ফেলা যেত। অনিকের বন্ধুরা যখন আসতো, সরগরম হয়ে উঠতো ডাইনিং হলটা। ওরা হৈ হৈ করে গল্প করতো, আর ভৃত্যরা একটার পর একটা ডিশ এনে টেবিলে রাখতো। ওদের বিস্ময়ভরা আনন্দিত মুখটা তিনি দূর থেকে সানন্দে দেখতেন। বড় ভালো লাগতো। ওদের ঝলমলে কৈশোরের উদ্দাম আনন্দ তাকেও বার বার ছুঁয়ে যেত।

ছেলে কাছে থেকেও আজ দূরে। মাঝে মাঝে দেখতে ইচ্ছে করে। তবু দূরত্বটাকে মেপে রাখছেন প্রতিমুহূর্তে। কিছু দূরত্ব সবকিছুর জন্যই নিরাপদ

তার ফেলে আসা বাড়িটার দেওয়াল জোড়া বিশাল বিশাল ওয়েল পেইন্টিংগুলোকে আজো খুব মিস করেন ফজলুল আহমেদ। ইচ্ছে ছিল অন্তত দু’তিনটা সঙ্গে করে নিয়ে আসবেন। 

কিন্তু…কিছুই আনতে পারেননি। সবই চলে গেছে উকিলের পকেটে। কিছু কিছু বন্ধকীর খাতায়। মামলার ফাঁক ফোকড় দিয়ে বেরিয়ে গেছে অনেককিছু। তার মতো দাপুটে অবস্থাপন্ন মানুষকেও এই দোতলা বাসাটা বানাতে ব্যাংক লোন নিতে হয়েছে। কে জানে, সেই লোন আদৌ তিনি শোধ করে যেতে পারবেন কী না! অবশিষ্ট সম্পত্তি বলতে যতখানি জমি এখনো নিজের কব্জায় আছে, সেগুলোও না জানি কোনদিন পাওনাদারের হাতের ছোবলে শেষ হয়ে যায়! মাঝে মাঝে মনে হয়, কীসের এত দায় তার? কেন তার এত গরজ পড়েছে নিজের সবকিছু এভাবে বিকিয়ে দেওয়ার? তার পিতৃপুরুষেরা তো এভাবে সবকিছু বিকিয়ে দেওয়ার জন্য এসব দিয়ে যায়নি তাকে!

নুরজাহান বানু তার কথামতোই সবকিছু চমৎকার সামলে নিলেন। 

তিনজন ভৃত্যাকে নির্দেশনা দিয়ে দুপুরের মধ্যেই প্রায় দশ বারোটা ডিশ টেবিলে এনে জড়ো করলেন। মেয়েগুলোই সব রান্নাবান্না করলো। শুধু পোলাও আর রোস্টটা তিনি নিজের হাতে করলেন। এই দুটো জিনিস তার হাতেই নাকি ভালো হয়। এটা তার স্বামীর দেওয়া বিশেষ সার্টিফিকেট। তাই এই দুটোতে আর কাউকে তিনি হাত লাগাতে দেন না।

আনিসুল হকের আসতে আসতে আড়াইটা বেজে গেল। ফজলুল আহমেদের  বাসায় পা দিয়েই সহাস্যে বলে উঠলেন,

‘আরিব্বাস! ফজলুল ভাই! করেছেন কী! আমি তো ঘ্রাণেই পাগল হয়ে গেলাম!’

ফজলুল আহমেদ সস্নেহে বললেন,

‘আসতেই এত দেরি করে ফেললে! এসো আগে খাওয়া দাওয়া সেরে নেওয়া যাক। যে কাজে এসেছো সেটা কিছুক্ষণ মুলতবী রাখো।’ 

আনিসুল হকও এই প্রস্তাবে আপত্তি করলেন না। ‘হ্যাঁ সেই ভালো’ বলে ফজলুল আহমেদকে অনুসরণ করলেন। সিভিল ড্রেসে এসেছেন তিনি। নিজের গাড়ি নিয়ে একাই ড্রাইভ করে এসেছেন। আগের দিন অনিকের কাছ থেকে কৌশলে তার বাবার নতুন বাসার ঠিকানাটা জেনে নিয়েছিলেন আনিসুল হক।

হরেক রকম আয়োজন দেখে ফজলুল আহমেদকে হাসতে হাসতে বললেন,

‘কার বাসায় এসেছি দেখতে হবে তো! এত অল্প সময়েই এতকিছু!’

ফজলুল আহমেদ মৃদু হাসলেন। মুখে কিছু আর বললেন না। আনিসুল হক বাসনপত্রের দিকে চেয়ে বললেন,

‘শুনেছি, জমিদারের বংশধররা নাকি কাঁসার বাসনপত্র ব্যবহার করে। আপনারা তো…’

ফজলুল আহমেদ অবাক গলায় বললেন,

‘কী বললে? কাঁসার বাসনপত্র? ওহ তা আমার দাদীকে ব্যবহার করতে দেখেছি বই কী! মা ও কিছু কিছু করেছে। কিন্তু আমরা আর ওসব ব্যবহার করিনি কখনো। এখন কাঁচের কত সুন্দর সুন্দর বাসনপত্র বিক্রি হয়! ওগুলো রেখে গিন্নি কি আর মান্ধাতা আমলের কাঁসা ব্যবহার করবে?’

‘হুউম…তা ঠিক!’ আনিসুল হক আর কিছু না বলে খাওয়াতে মন দিলেন।

তৃপ্তি সহযোগে খাওয়াদাওয়া শেষ করে ড্রইং রুমে গিয়ে বসলেন দুজন। নুরজাহান বানু বাইরের পুরুষ মানুষের সামনে বের হন না। তার শাশুড়িও কখনো বের হতেন না। ছেলের বউকেও একই নির্দেশনা দিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। খাবারদাবার বেড়ে দেওয়ার কাজ ভৃত্যরাই করলো।

ড্রইংরুমে বসে আনিসুল হক দু’এক কথার পরেই মূল প্রসঙ্গে চলে গেলেন। ইতিমধ্যেই অনেকটা সময় নষ্ট হয়ে গেছে। আর বেশি সময় নিলে হয়ত আসল কাজটা না করেই ফিরে যেতে হবে। আরেকদিন যে আসতে পারবেন, তারও নিশ্চয়তা নেই। প্রতিদিন এমন সুবর্ণ সুযোগ নাও মিলতে পারে। আনিসুল হক ভনিতা না করেই বললেন,

‘তারপর ফজলুল ভাই, সবকিছু ছেড়েছুড়ে এভাবে ঢাকায় চলে এলেন কেন বলুন তো?’

ফজলুল আহমেদ পানমশলা চিবুতে চিবুতে সন্দিগ্ধ চোখে আনিসুল হকের দিকে চাইলেন। সামনে বসা এই মানুষটাকে তিনি ধীরে ধীরে আরো ভালোভাবে চিনছেন। কথার মারপ্যাঁচে এমন চমৎকারভাবে আসল কথাটা বের করে ফেলে যে, কেউ তা ধরতেই পারে না। টোপ গেলার পরেই মাছ টের পেয়ে যায় যে, ওটা আসলে টোপ ছিল। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে।

ফজলুল আহমেদ সতর্কভাবে বললেন,

‘কেন আনিস, এই গল্প তো আগেই শুনেছো! নতুন করে আর কিছু বলার নেই তো! জমাজমি নিয়ে আগের কিছু মামলা মোকদ্দমা ছিল। সেই আমার বাবার সময় থেকেই এসব ঝুট ঝামেলা শুরু হয়েছে। আমার সময়ে এসেও পুরোপুরি মেটেনি। দিনকে দিন মামলা লড়তে লড়তে জায়গাজমি সব ভূতের পেটে চলে যাচ্ছিলো। তাই সময় থাকতেই তল্পিতল্পা গুটিয়ে এখানে এসে আস্তানা গেঁড়ে ফেললাম। বয়স হয়ে গেছে! আর কদিনই বা বাঁচবো! ওসব ক্যাঁচাল থেকে তাই মুখ ঘুরিয়ে নিলাম, বলতে পারো।’

আনিসুল হক অনুমতি নিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়েছিলেন। ফজলুল আহমেদ সিগারেটের গন্ধ নিতে পারেন না। তবু হাসিমুখেই সম্মতি দিয়েছেন।

 

 

 

 

(ক্রমশ)

 

 

আগের পর্ব ও লেখকের অন্যসব লেখা পড়তে ক্লিক করুন।

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত