| 5 মার্চ 2024
Categories
গল্প ধারাবাহিক সাহিত্য

চোরাকাঁটা (পর্ব-১০)

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

আনিসুল হক সিগারেটে লম্বা একটা টান দিয়ে বললেন,

‘তাহলে যাবতীয় ক্যাঁচাল থেকে মুখ ঘুরাতে পেরেছেন বলছেন?’

ফজলুল আহমেদ আবারও সতর্ক। আজ কী আলাপ করতে এসেছে আনিসুল হক? তবু নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলেন তিনি। বললেন,

‘না, তা কি আর পুরোপুরি পারা যায়? জমিজমার ক্যাঁচাল খুব খারাপ জিনিস। একবার শুরু হলে সহজে পিছ ছাড়ে না। তবে দূরে এসে অনেকটা আরামেই তো আছি এখন!’

‘জমাজমির এই ঝামেলাটা আপনার সময়ে এসেই এতটা তীব্র হলো কেন? আপনার বাবার সময়ে শুরু হলেও তখন তো এতটা মারাত্মক ছিল না নিশ্চয়ই। আর আপনার ভাগে জমির পরিমাণও যথেষ্ট ছিল। কিন্তু আপনার ছেলের ভাগে কি আর বেশিকিছু রাখতে পারবেন? ফজলুল ভাই কিছু মনে করবেন না। আসলে মূল ব্যাপারটা না জানলে আমি ঠিক আপনাকে সেভাবে হেল্প করতে পারবো না। যদি সত্যিই চান আমি এসবের ভেতরে ঢুকি, তাহলে আমাকে সবকিছু খুলে বলুন।’

‘আমার যা বলার ছিল সবকিছুই তোমাকে বলেছি আনিস। স্পেসিফিক্যালি আর কিছু বলার নাই।’

‘বাসার সব লোকজনকে তো সঙ্গে আনতে পারেননি সম্ভবত। আপনার সেই বাড়িতে শুনেছিলাম প্রচুর ভৃত্য ছিল।’

‘হুম…সবাইকে কি আর আনা যায়? তারাও বা নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে এই ঢাকায় এসে থাকতে চাইবে কেন বলো?’

‘যারা কাজ করতো তারা সবাই কি স্থানীয়?’

‘হুম, প্রায় সবাই। কেন বলো তো? এসব কেন জানতে চাইছো?’ একটু উদ্বিগ্ন হয়েই প্রশ্নটা করলেন ফজলুল আহমেদ। ঘরে এসি চলছে। এর মাঝেও তিনি যেন একটু উষ্ণতা অনুভর করতে শুরু করেছেন।

আনিসুল হক হাত নেড়ে পাত্তা না দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন,

‘আরে এমনি জিজ্ঞেস করছি। রুটিন জিজ্ঞাসাবাদ বলতে পারেন।’

‘জিজ্ঞাসাবাদ? কেন কী হয়েছে বলো তো দেখি! তুমি যদি কিছু না মনে করো, তাহলে আমি একটু জানতে চাই… কিছু কি ঘটেছে?’

‘উম…মম…হুম। না তেমন কিছু ঘটেনি। তবে আপনার মামলা মোকদ্দমা নিয়েই এবারে আরেকটু ডিটেলে অনুসন্ধান চালাতে চাইছি। এভাবে সবকিছু ছেড়েছুড়ে চলে এলেন। আমাদেরও তো কিছু দায়িত্ব থাকে, তাই না? পরিচিত পুলিশ থাকাতে তাহলে আর কী সুবিধা হলো বলুন?’

আসল কথা চেপে গেলেন আনিসুল হক। একবার ইচ্ছে হয়েছিল বলার। কিন্তু পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়েছেন। এখনো সময় আসেনি। সময় এলে বলতে হতেও পারে। আপাতত নিজের যা কিছু জিজ্ঞাস্য আছে, জেনে নেওয়া যাক।

গল্প এরপরে কিছুক্ষণ অন্য ট্র্যাকে চললো। আনিসুল হকের বড়ভাই কায়েসুল হককে নিয়ে কিছুক্ষণ স্মৃতিচারণ করলেন দুজন। তার আমেরিকান ছেলেমেয়েদের ইংরেজী ভার্সনের বাংলা নিয়ে ঠাট্টা তামাশা চললো। তারপরে যেন ভুলে গিয়েছেন, এমন ভঙ্গিতে আনিসুল হক বললেন,

‘আপনার ছেলের শ্বশুর মানে আপনার বেয়াইমশাই তো ঢাকাতেই থাকেন, তাই না? আপনার কি যাওয়া আসা আছে উনার বাসায়? উনি আসেন?’

এই প্রসঙ্গে একটু বুঝি তেতো হয়ে গেল ফজলুল হকের মুখভাব। অসন্তুষ্ট গলায় বললেন,

‘উনি তো বেঁচে নেই! গত বছর মারা গিয়েছেন!’

‘অ্যাঃ বলেন কী! আহা! তাহলে তো আপনার ছেলের বউ একা হয়ে গেল! মেয়েটার মাও তো অনেক আগেই মারা গিয়েছে শুনেছিলাম। মানে আপনিই বলেছিলেন।’ বেয়াইয়ের মৃত্যুর খবরটা যেন এইমাত্র শুনলেন, এমন ভঙ্গিতে বললেন আনিসুল হক। অভিনয়টা নিখুঁত হলো কী না, বুঝতে পারলেন না। মনের মধ্যে সেটা নিয়ে একটু খুঁতখুঁতও করতে লাগলো। পুলিশের চাকরি করতে এসে শেষমেষ অভিনয়ও রপ্ত করতে হলো!

ফজলুল আহমেদ মানুষটা বোকা নন। তিনি একজন গ্রাজুয়েট। তাছাড়া শরীরে জমিদারীর রক্ত। গল্প প্রবাহ কোনদিকে যাচ্ছে তা তিনি বেশ বুঝতে পারছিলেন। মনে মনে দীর্ঘশ্বাস গোপন করলেন। ছেলের এই বিয়ে নিয়ে তার মনে কিছুটা অনুশোচনা আছে। লতিফুর রহমান, মানে সুমনার নানা মানুষটা অতি কুটিল শ্রেণীর ধুরন্ধর। তিনি এমন আবঝাপ বুঝিয়ে এই সন্মন্ধটা করে দিয়েছিলেন যে, প্যাঁচে পড়ে ফজলুল আহমেদ আর না করতে পারেননি। আর তাছাড়া তার ছেলে অনিকও এমন গোঁ ধরে বসলো যে সে সুমনা ছাড়া আর কাউকেই বিয়ে করবে না। 

মেয়ে হিসেবে সুমনা বেশ ভালো, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু অনিকের শ্বশুরের সামাজিক স্ট্যাটাস নিয়ে তার মনে একটা দ্বিধা আছে। সমাজে বাস করতে হলে সব ব্যাপারে এত বেপরোয়া হলে চলে না। নানা শ্বশুরের কথাতে অনিকের অত্যধিক আহ্লাদটাও তার কাছে ভালো লাগেনি। সুমনাকে নিয়ে প্রতিমাসে এসে ঘুরে যায় অনিক। সাথে তার মানসিক প্রতিবন্ধী শ্যালিকাও আসে। নুরজাহান বানু চেয়েছিলেন, ওরা এখানেই থাকুক। কিন্তু ফজলুল আহমেদের তীব্র অনিচ্ছাতে সেটা আর হয়নি। একমাত্র ছেলেকে আলাদা বাসা ভাড়া করে থাকতে হচ্ছে। ছেলেও এখানে থাকার ব্যাপারে তেমন আগ্রহ দেখায়নি। তিনি তো আগাগোড়াই গররাজি ছিলেন। তার স্ত্রী আর মাঝখানে বাগড়া দিতে আসেনি। যার যার জীবন সে নিজের মতো করেই গড়ে নিক। কেউ কারো জীবন গড়ে দিতে পারে না।

আনিসুল হক তার মুখের দিকে সাগ্রহে তাকিয়েছিলেন। ফজলুল আহমেদ বাস্তবে ফিরে এলেন। বললেন,

‘সুমনার নানা এখনো বেঁচে আছেন। গ্রামের বাড়িতে থাকেন। আর সুমনার একটি বোন আছে। তবে সে মানসিক ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। সুমনাই তাকে ছোটবেলা থেকে মানুষ করেছে। সেও সুমনার সাথেই থাকে

আনিসুল হক ধীরে ধীরে জাল গুটাতে লাগলেন।

‘সেই মেয়েটি আপনার ছেলে ছেলে’বউমার সাথেই থাকে? তা ওরা এখানে কেন থাকে না? মানে আপনারা তো একাই থাকছেন! নিজের ছেলে কাছে থাকলে কত সুবিধা! আর তাছাড়া ছেলে দূরেই বা থাকবে কেন?’

‘আমার ছেলে একা থাকতেই বেশি পছন্দ করেছে। ছোটবেলা থেকে ক্যাডেট কলেজে লেখাপড়া করেছে। নিজের মতো করে থাকতে ভালোবাসে। আমরা তো আর ওদের সেই খুপরী ফ্ল্যাটে গিয়ে উঠতাম না। ওদেরকেই এখানে থাকতে বলেছিলাম। সুমনার আপত্তি ছিল না। মেয়েটা মানিয়ে নিতে পারে। কিন্তু আমার ছেলেই এতদূরে আসতে চায়নি। ওর নাকি কাজে যেতে সমস্যা হবে।’

‘ওহ্‌…তাই? কিন্তু তাই বলে বাবা-মাকে এভাবে একা রেখে যাওয়া এই বয়সে…’ আনিসুল হক একটু চিন্তা করছিলেন। মনে মনে হিসাবটা মিলিয়ে নিচ্ছিলেন। অনিক আর তার বাবার বক্তব্য কিন্তু মিললো না! 

ফজলুল আহমেদ বেশ জোরের সাথেই বললেন,

‘এই বয়সে মানে কী? আমরা আল্লাহ্‌র রহমতে এখনো ভালো আছি। যখন থাকবো না, চাকর বাকরেরা আছে, ওরা দেখবে। তা না হলে বৃদ্ধাশ্রম। সেখানে কি মানুষ থাকে না? ছেলের আশাতেই সারাজীবন পড়ে থাকতে হবে, তা কেন?’

আনিসুল হক ফজলুল আহমেদের মন বোঝার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এখানে কি বাপ-ছেলের ইগো কাজ করছে নাকি? তিনি আবার প্রসঙ্গ পালটালেন।

‘আপনার ছেলে তো ক্যাডেট কলেজে পড়তো, তাই না? একবার গল্প করেছিলেন, ওর বন্ধু বান্ধবেরা আপনাদের দেশের বাড়িতে গিয়ে বেশ অনেকদিন করে থাকতো।’

ফজলুল আহমেদের কপালের রেখাগুলো আবার মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে। পুরনো সেই দিনগুলোতে ফিরে গেলেন তিনি। স্মিত মুখে বললেন,

‘হ্যাঁ, ওর বন্ধুরা অনেকেই আসতো আমার বাড়িতে। দল বেঁধে। বেশ হৈ হুল্লোড় করতো ছেলেগুলো। কয়েকটা দিন বেশ আনন্দে কেটে যেত। আমিও প্রতি সন্ধায় ওদের সৌজন্যে গানের আয়োজন করতাম। বিভিন্ন গ্রাম থেকে বাদক আর গায়েনদের দল এসে আমার বাড়িতে কয়েকদিনের অতিথি হতো। বেশ আনন্দ পেত ছেলেগুলো।’

আনিসুল হক যেন কল্পনার চোখে পুরো বিষয়টা দেখে নিলেন। ফজলুল আহ্‌মেদের চোখমুখের আনন্দটুকু তাকেও কিছুটা স্পর্শ করলো। কোমল গলাতে বললেন,

‘আপনি সেই বাড়িটাকে খুব মিস করছেন ফজলুল ভাই!’

ফজলুল আহমেদ অস্বীকার করলেন না। হাসিমুখেই বললেন,

‘মিস তো করছিই! সেই ছায়াঢাকা গাছগাছালি, পাখির ডাক, পুকুরের স্বচ্ছ পানি, গাছের টাটকা শাকসব্জি, ফলমূল…এসব এখন কোথায় পাচ্ছি বলো? দেখেশুনে উত্তরার বেশ ভেতরের দিকেই জায়গা কিনেছিলাম। কিন্তু বাসাটা হতে হতেই দেখো, কেমন জনবহুল হয়ে গেল এই জায়গাটাও! শহর আর টানে না আমাকে আনিস! কে জানে, এসব হয়ত বয়সেরই লক্ষণ!’

আনিসুল হক চট করে আবার ফিরে গেলেন অনিকের বন্ধু-বান্ধবদের গল্পে।

‘অনিকের বন্ধুদের একজন কিন্তু ওর নানা শ্বশুরের গ্রামেরই। এটা কি আপনি জানেন?’

এই কথাতে একটু যেন অবাক হলেন ফজলুল আহমেদ। নিখাঁদ বিস্ময়ের গলাতেই বললেন,

‘তাই নাকি? এটা কে বললো তোমাকে? এটা তো আমি জানতাম না!’

আনিসুল হক এবারে একটু যেন ঝাঁপি সরালেন রহস্যের ডালার। মৃদু গলায় বললেন,

‘অনিকের এক বন্ধুর ব্যাপারে একটা ইনভেস্টিগেশন করছি ফজলুল ভাই।’

ফজলুল আহমেদ একেবারে আকাশ থেকে পড়লেন এবার। 

‘কোন বন্ধু? কীসের ইনভেস্টিগেশন? খুলে বলো আমাকে!’

আবার রহস্যের চাদরে সবকিছু মুড়িয়ে নিতে হলো। আনিসুল হক আর মুখ খুললেন না। হাসিমুখে বললেন,

‘প্লিজ এর চেয়ে বেশি কিছু জিজ্ঞেস করবেন না ফজলুল ভাই। কিছুই বলতে পারবো না আমি। তবু আজ গল্পচ্ছলে এটুকু বলে ফেললাম। অনেকদূর এগিয়েও নিয়েছি। এই তো আর কয়েকটা দিন। অবশ্যই জানাবো আপনাকে। কথা দিলাম।’

‘আহা! তা না হয় বুঝলাম। কিন্তু এভাবে একটুখানি বলে থেমে গেলে কি হয়? তাহলে একেবারেই বলতে না! সেও ভালো ছিল! অনিকের বন্ধু-বান্ধবেরা সবাই বেশ ভালো ছেলে। আমার কাছে কাউকেও তেমন খারাপ মনে হয়নি। তবু যুবা বয়স…এই বয়সে কী করতে কী করে ফেলে সবাই…এই যেমন…’

বলতে বলতেই থেমে গেলেন ফজলুল আহমেদ। কেউ যেন জামার আস্তিন ধরে থামিয়ে দিলো তাকে। আনিসুল হক কিন্তু কান পেতেই রেখেছিলেন। কথার সূত্র ধরেই বললেন,

‘এই যেমন মানে? কোনো উদাহরণ দিতে চাচ্ছিলেন কি ফজলুল ভাই? বলুন বলুন। হয়ত আমার কাজে লেগে যেতে পারে।’

‘না তেমন কিছু নয়। তোমার কাজে আসার মতো কিছু নয়। বলছিলাম… যুবক বয়সে কতরকম বদখেয়াল মাথাচাড়া দেয়! বলতে বলতেই আমার পরিচিত একজনের একটা বিষয় মনে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেটা সলভড কেস। কাজেই এতদিন পরে আর ওসব কথা না বলাই ভালো!’

‘হুউম…তা তো বটেই!’ আনিসুল হক বুঝলেন তার মতো ফজলুল আহমেদও খুব বেশি মুখ খুলতে চাচ্ছেন না। যেটুকু বললে বিপদসীমার অনেক ওপরে থাকা যায়, সেটুকুতেই ঘোরাফেরা করছেন। 

ফজলুল আহমেদ স্বগতোক্তির মতো করে বললেন,

‘কিন্তু তুমি অনিকের বন্ধুর ব্যাপারে ইনভেস্টিগেশনের কথা বলে মনের মধ্যে একটা খচখচানি জুড়ে দিলে। আর অনিকের কোনো বন্ধু যে ওর নানা শ্বশুরের গ্রামের, সেই খবরটাও জানা ছিল না আমার। অনিক কি জানে বিষয়টা?’

‘সম্ভবত নয়। আপাতত এর বেশি আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন না ফজলুল ভাই, প্লিজঅনেক বেলা হয়ে গেল। আপনার কাছে আমার কাজ মোটামুটি শেষ। আবার কখনো প্রয়োজন পড়তে পারে। চলে আসবো কিন্তু হুট করে।’

‘সে তুমি এসো যখন ইচ্ছা তখন। কে বাধা দিচ্ছে তোমাকে?’

আনিসুল হক চলে যাওয়ার পরে ফজলুল আহ্‌মেদ একা একা বসে রইলেন কিছুক্ষণ। মনের মধ্যে অজস্র জিজ্ঞাসা খলবল করতে লাগলো। কোনো জিজ্ঞাসাকেই মুঠোহাতে ধরতে পারছিলেন না তিনি। মনে হচ্ছিলো ধরে ফেলেছেন, কিন্তু তা যেন কেমন পালিয়ে যাচ্ছিলো। আজ আনিসুল হকের তার এই বাসাতে আসা মোটেও কোনো খোশগল্প করার জন্য নয়। কী জানি একটা জানতে এসেছিল আনিস। কিন্তু কী জানতে এসেছিল সেটাই ঠিকমত বুঝতে দিলো না।

দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজ শুনতে পেয়েই নুরজাহান বানু কাজের মেয়েকে ডাকাডাকি শুরু করে দিলেন।

‘ঐ কুলসুম…কই গেলি রে ছেড়ি! এদিকে শুন! মেহমান চলে গেছে? সাহেব কই? এই ঘরে আসতে বল। কই গেলি? মরলি নাকি রে?’

প্রতিটি কথাই ফজলুল আহমেদের কানে গেল। তার ধ্যানে যেন হাতুড়ির আওয়াজ পড়লো। পুলিশ কেন এসেছে, এটা সবিস্তারে না শোনা পর্যন্ত নুরজাহান বানু শান্ত হবে না। তিনি সেটা জানেন। কিন্তু স্ত্রীকে কিছু জানানোর আগে নিজের কাছেই সবকিছু খোলাশা হয়ে নিতে চাচ্ছিলেন ফজলুল আহমেদ। এখন এই ডাকাডাকির তোড়জোড়ে বোঝা যাচ্ছে, সেটি আর হওয়ার জো নেই!

ইদানিং নুরজাহান বানুর গলার আওয়াজ বেশ বেড়েছে। সবসময় কেমন যেন উঁচু গলাতে কথা বলেন। অকারণেই একে ওকে ধমকা-ধমকি করেন। অথচ আগে এমনটা ছিলেন না তিনি। চেহারার মতোই কথাবার্তাতেও একটা মিহিসুর বাজতো সবসময়। এখন অল্পতেই অধৈর্য হয়ে পড়েন। কাজের লোকদের সাথে হম্বিতম্বি করেন। ফজলুল আহমেদ বহুদিন বলেছেন, এমনটা না করতে। সামনের দিনগুলোতে ভাগ্যে কী লেখা আছে কে বলতে পারে! এই কাজের লোকদের হাতেই যদি বার্ধক্যের দিনগুলো কাটাতে হয়, তাহলে এদের সাথে এত বদমেজাজ দেখানো মোটেও ঠিক কাজ হবে না।

কুলসুম নামের মেয়েটা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ভয়ে ভয়ে তাকাচ্ছে তার মুখের দিকে। ফজলুল আহমেদ শান্ত গলায় বললেন, 

‘বিবিসাহেবকে গিয়ে বল আসছি। একটু কিছুক্ষণ পরে আসছি!’ 

মেয়েটা ভয়ার্ত চোখমুখে সেখান থেকে একরকম যেন পালিয়ে বাঁচলো। ফজলুল আহমেদ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। এরা তাকে কেন যে এত ভয় পায়! কাজের লোকদের বকাঝকা করা একেবারেই তার নীতিবিরুদ্ধ। তিনি এই কাজটা কখনোই করতে চান না। এরা তারপরেও তাকেই ভয় পায়। ছেলে ভৃত্যরা তবুও ডাকলে স্বাভাবিক মুখে এসে সামনে দাঁড়ায়। কিন্তু মেয়ে তিনটির একজনও তার ছায়া মাড়াতে চায় না। সবসময় লুকিয়ে লুকিয়েই থাকে।

অথচ নুরজাহান দিনরাত এদের সাথে খ্যাঁচ খ্যাঁচ করে। তাকে এরা বেশ পছন্দই করে বলে মনে হয়। তিনি অনেক সময় বাইরে থেকে ঘুরে এসে দেখতে পেয়েছেন, নুরজাহানের মাথায় তেল ঘষতে ঘষতে মেয়েগুলো বক বক করে গল্প করছে। আর নুরজাহান আরামে চোখ বুজে তাদের গল্প শুনছে। তিনি এসে দাঁড়ানো মাত্রই মেয়েগুলো যে যেদিকে পারে ছুটে চলে যায়। যেন তিনি মানুষ নন, সাক্ষাত যমদূত। ফজলুল হক উঠতে উঠতে ভাবলেন, নুরজাহানকে এর কারণটা জিজ্ঞেস করতে হবে। তিনি মানুষটা কি সত্যিই এত ভীতিকর?

ফজলুল হকের বাসা থেকে বের হয়ে আনিসুল হক এদিক ওদিকে চাইলেন। একটু পরে একটা ভিক্ষুক এসে তার কাছে হাত পেতে দাঁড়ালো। তিনি পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করলেন। ভিক্ষুক একটা কাগজ বাড়িয়ে দিলো তার হাতে। কাগজটা মুঠো পাকিয়ে পকেটে রেখে দিলেন। তারপর মানিব্যাগ থেকে আরেক টুকরা কাগজ বাড়িয়ে দিলেন ভিক্ষুকের হাতে। কাগজটাতে লেখা আছে, ‘সব খবর আমার চাই! না পেলে এখান থেকে নড়বে না!’

গাড়িতে উঠে মুঠো পাকানো কাগজটা চোখের সামনে মেলে ধরলেন আনিসুল হক। তাতে লেখা,

‘ছোটঘরে অনেক সমস্যা। সেই ঘর বাঁচাতেই সব শেষ!’

বার দুয়েক পড়ে আনিসুল হক কাগজটা বাইরে ফেলে দিলেন। ঠিক দুদিন আগেই ফজলুল আহমেদের দেশের বাড়ি থেকে ঘুরে এসেছেন তিনি। আজ ফজলুল ভাইকে এত এত কথার ভিড়ে এই কথাটাই বলতে ভুলে গিয়েছেন। অথবা ইচ্ছে করেই ভুলটা করেছেন। সব কথা শুরুতেই বলে দিলে কি চলে?

তিনি না হয় পুলিশের চাকরি করছেন, তাই ভুল করে ভুলে গিয়েছেন। ফজলুল ভাই গোয়েন্দাবিভাগে চাকরি নিলেন কবে যে, তাকে এত গোপনীয়তা বজায় রাখতে হচ্ছে?

(ক্রমশ)

 

 

আগের পর্ব ও লেখকের অন্যসব লেখা পড়তে ক্লিক করুন।

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত