| 5 মার্চ 2024
Categories
গল্প ধারাবাহিক সাহিত্য

চোরাকাঁটা (পর্ব-১২)

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

শান্তর মুখে এখনো কোনো অস্থিরতা নেই। সে একবারও অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করেনি, আমাকে এসব প্রশ্ন কেন করছেন? হয়ত এটা জিজ্ঞাসা করাটা উচিত ছিল। কিন্তু শান্তর সেটা মাথাতে এলো না। সে তো জানেই যে কেন আজ তাকে এখানে আসতে হয়েছে। তাই সেভাবেই সবকিছুর উত্তর দিয়ে যাচ্ছে সে। অভিনয় করাটা একেবারেই তার ধাতে পোষায় না।

আনিসুল হক শান্তকে আবার করলেন প্রশ্নটা। ‘সুমনা কথা বলে আপনাদের সাথে?’

‘হ্যাঁ, সুমনা আমাদের সাথে বেশ ফ্রি। আমাদের বন্ধুদের সাথে ওরও বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছে।’

‘আর সুমনার বোন, মানে অনিকের শ্যালিকার সাথে আপনাদের সম্পর্কটা কেমন?’

শান্ত একটু একটু উত্তেজনা বোধ করতে শুরু করলো। গল্পের মোড় ঘুরতে শুরু করেছে। এই তো, এখনই আসল প্রশ্নের অবতারণা হবে।

‘সুমনার বোন রুমানা মানসিক প্রতিবন্ধী। ও সুস্থ নয়। সুমনাই ছোটবেলা থেকে ওকে দেখাশুনা করেছে। রুমানা তেমন কথা বলতে পারে না। চুপ করে থাকে সব সময়। মাঝে মাঝে নিজের মনে অর্থহীন কথাবার্তা বলে।’

শান্ত অপেক্ষা করছিল পরবর্তী প্রশ্নের জন্য। একেকটা মুহূর্ত যেন কাটতে চাইছিল না। কিন্তু আনিসুল হক আচমকাই প্রসঙ্গটা ঘুরিয়ে ফেললেন।

‘আচ্ছা অনিক আপনার বা আপনার অন্য বন্ধুদের মধ্যে কখনো কোনো ব্যাপারে মন কষাকষি হয়েছে? দেখুন… আমার কাছে কিছু লুকাবেন না। যা জানেন সব খুলে বলুন। কোনো কারণে কি নিজেদের মধ্যে কিছু নিয়ে রাগারাগি হয়েছে আপনাদের?’

শান্ত সামনে বসে থাকা এই মানুষটার দূরদর্শীতার গন্ধ পাচ্ছে। এতক্ষণ লোকটাকে ক্রুর মনে হচ্ছিলো। ঠান্ডা মাথার কুট ভয়ানক একজন মানুষ। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ভদ্রলোক যথেষ্ট বুদ্ধি রাখেন মাথায়। উনি যেভাবে ভাবছেন, আজ অনিকের সাথে দেখা হওয়ার পর থেকে শান্তও তো এভাবেই ভেবেছে! অনিক কোনো কারণে শান্তর ওপরে প্রতিশোধ নিতে চাইছে। হাতের কাছে যুতসই একটা ঘটনা পেয়ে এখানেই তাকে লেলিয়ে দিতে চাইছে। আসলে প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে বের করার ব্যাপারে তেমন কোনো আগ্রহ নেই অনিকের। থাকলে রিয়াজের ব্যাপারটা সে ওভাবে উড়িয়ে দিতে পারতো না।

শান্ত ঠিক করলো, ইনার কাছে কিছুই লুকাবে না সে। যা জানে সব আদ্যোপান্ত খুলে বলবে। সেদিন ট্রেনে দেখা সেই বিশেষ ঘটনাটাও বাদ দিবে না। যদিও তা আজ থেকে বেশ অনেক বছর আগের কথা। কিন্তু সেই ঘটনার স্মৃতি কেন যেন এখনো শান্তকে তাড়িয়ে বেড়ায়। সেদিন কী কথাবার্তা হচ্ছিলো অনিক আর রিয়াজের মধ্যে? আর সেদিনের পর থেকে অনিকের আচরণ কেন ওমন বদলে গিয়েছিল? যে রিয়াজকে অনিক সব সময় শাসন করতো, সেই রিয়াজকেই কেন পরবর্তীতে ভয় পেতে শুরু করলো অনিক? ভয়, হ্যাঁ ভয়ই তো। রিয়াজ কিছু বললে অনিক সেটার প্রতিবাদ পর্যন্ত করতো না। অন্যরা যে যাই মত দিক, রিয়াজের কথাকেই নীরবে সমর্থন করে যেত অনিক। এতটা আনুগত্য সে কেন করতো রিয়াজকে?

শান্তর সাথে বিস্তারিত কথাবার্তা হলো আনিসুল হকের। ছেলেটাকে তার খারাপ লাগলো না। যদিও চট করে কোনো ধারণাতে চলে আসার মানুষ তিনি নন। তবু পুলিশী চাকরির অভিজ্ঞতা থেকে মানুষের চোখ দেখেও অনেককিছু বুঝে ফেলতে পারেন।

শান্তর সাথে কথা বলে তিনি বুঝতে পারলেন, হয়ত নিছক একটা রেপ কেসের মামলা নয় এটি। ভেতরে অন্যকিছুও থেকে থাকতে পারে। সেই অন্যকিছু বের করাটা তার অফিসিয়াল দায়বদ্ধতার মধ্যে পড়ে না। কিন্তু ফজলুল আহমেদ ভাইয়ের নাম জড়িত আছে দেখেই বিষয়টাকে তিনি খানিকটা পারসোনালি নিলেন। কেন যেন, এই ঘটনার গভীরে ঢুকতে মন চাইছে। এমন কিছু কি আছে, যা তিনি বুঝতে পারছেন না এখনও?

ফজলুল ভাইয়ের সাথে বিভিন্ন সময়ে অনেকরকম গল্প-গুজব হয় তার। কেন হুট করে জমিদারী ছেড়ে পাকাপোক্তভাবে ঢাকায় চলে এলেন। এই প্রশ্নের সঠিক উত্তরটা ফজলুল ভাই দেননি কখনো। যা দিয়েছেন তা এড়িয়ে যাওয়া ছুঁতো মাত্র। আসল ঘটনার জট অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। এটা তার পুলিশী মন বেশ অনেকদিন আগেই টের পেয়েছিল। ফজলুল ভাইয়ের ছেলে অনিক তার শ্যালিকার একটা সমস্যা নিয়ে এসেছে। কেন যেন মনে হচ্ছে, এই সমস্যাটা মূল ঘটনার গৌণ মুখবন্ধ বা ভূমিকা। আসল অংশ এখনো অপ্রকাশিত। এমনকি সমস্যা হিসেবেও সামনে আসেনি।

আনিসুল হক ভাবতে বসলেন কী করা যায়। চাকরির প্রায় শেষ সীমায় এসে পৌঁছে গেছেন। এখন দায়িত্ব বেড়েছে কয়েকগুণ। মাঝে মাঝেই এখানে ওখানে হুটহাট যেতে হচ্ছে। সারাজীবনই তো অফিশিয়াল দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথেই পালন করলেন! এবারে একটু ফাঁকতালে ফাঁকি মারলে কেমন হয়? অফিসকে বলবেন কাজে যাচ্ছেন। কাজেই যাবেন, কিন্তু সম্ভবত সরাসরি অফিশিয়াল কাজে নয়!

কোথা থেকে শুরু করা যায় মনে মনে ভাবতে বসলেন। অনিক বলেছিল, সুমনা ছোটবেলায় ওর নানা বাড়িতে থেকেছে। সেখানে একবার যাওয়া যেতে পারে। সুমনার নানার সাথে একবার কথা বলা যেতে পারে। তার নাতনীকে বিয়ে করতে অনিকের আগ্রহের সত্যিকারের হেতুটা জানা দরকার। আর অনিকের বাবার জমিজমাগুলো এখন কী অবস্থায় আছে, জমিদারবাড়িটাও বা কী কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে এখন…এসবও জানা প্রয়োজন। হয়ত এসবের মাঝে কিছু লুকিয়ে থাকলেও থাকতে পারে।

উত্তরায় ফজলুল আহমেদের বাসায় গিয়ে তার সাথে দেখা করে আসার দু’দিন আগেই আনিসুল হক এসব ঘোরাঘুরি সেরে এলেন।

বিস্তর জ্ঞান অর্জন করলেন এসব ঘোরাঘুরি মারফত। সুমনার নানাবাড়ি আর অনিকদের প্রাক্তন বাড়ি, দুই জায়গাতেই গেলেন তিনি। চমকপ্রদ অনেককিছুই জানলেন দু’জায়গা থেকেই। সুমনার নানাবাড়ি থেকে যা জেনেছেন, তা তিনি অনেকটা আগেই আন্দাজ করে নিয়েছিলেন। কিন্তু আসল চমক অপেক্ষা করছিল অনিকদের সেই জমিদার বাড়িতে। যা জেনেছেন তা সিনেমাকেও হার মানায়। কিছুটা মিলিয়ে নেওয়ার জন্যই দু’দিন পরে ফজলুল আহমেদের উত্তরার বাড়িতে গিয়েছিলেন তিনি। আগে থেকেই একজন টিকটিকি লাগিয়ে রেখেছিলেন সেই বাড়ির সাথে। ফজলুল আহমেদের বাসার চাকর-বাকরদের সাথে গল্প গুজব করে সে তার আসল কাজ করে ফেলেছে। কিন্তু ফজলুল আহমেদ তেমন সহযোগিতা করেননি। দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, সৌহার্দ্য, আন্তরিকতা ইত্যাদি তেমন কোনো কাজে আসেনি। ফজলুল আহমেদের তার পরিবারের ওপরে সাপ্টে থাকা কালো কাপড়ের পর্দা এক মুহূর্তের জন্যও তোলেননি। কাজেই সেই পর্দা আনিসুল হককেই উন্মোচন করতে হয়েছে।

অনিকদের বিশাল জমিদারবাড়ি এখন দর্শনার্থীদের জন্য তৈরি করা মিউজিয়ামে পরিণত হয়েছে। জমিদারবাড়ির মালিক এখন বাংলাদেশ সরকার। বিশাল বাড়ির আশেপাশে থাকা অসংখ্য গাছ-গাছালি, পুকুর সবকিছুই এখন সরকারী সম্পত্তি। জমিজমার বেশিরভাগই স্থানীয় অবস্থাপন্ন ব্যক্তিদের দখলে চলে গেছে। যে কয়েকটি এখনো যেতে পারেনি, সেগুলোও যাই যাই করছে। কোর্টে মামলা ঝুলছে। আর মামলার রায় ফজলুল আহমেদের পক্ষে যাওয়ার সম্ভাবনা অতি নগণ্য।

ঠিক কীভাবে তার এই অবস্থা হলো এটা জানতে গ্রামের মানুষজনকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন আনিসুল হক। সিভিল ড্রেসে ছিলেন বলে কেউ তো প্রথমে মুখই খুলতে চাচ্ছিলো না। জমিদার বাড়ির কেচ্ছাগাঁথা… এসব তাদের মাধ্যমে জানাজানি হলে পরে যদি তাদের কোনো ক্ষতি হয়? এই ভয়েই মুখ খুলছিল না কেউ। পরে আনিসুল হক নিজের পরিচয় দিতেই কেউ কেউ ভয়ে ভয়ে সামনে এগিয়ে এলো। নাম পরিচয় গোপন থাকবে এই গ্যারান্টি পেয়ে মুখ খুললো তাদের কয়েকজন। জানা গেল চমকপ্রদ কিছু তথ্য।

জমিদারবাড়িতে দীর্ঘদিন ধরেই নানারকম অনাচার হয়ে আসছিল। সেই বাড়িতে যেসব মেয়েরা কাজ করতো, তাদের মধ্যে অনেকেই পালিয়ে গিয়েছিল। নিজেদের বাবা-মার কাছেও যায়নি তারা। একেবারে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল। দু’একজন আত্মহত্যাও করেছে। পরে তাদের লাশ পাওয়া গিয়েছে গ্রামের ঝোপঝাড় জঙ্গলে। কেন তারা নিরুদ্দেশ হয়েছে, কী হয়েছে তাদের সাথে… কেউ কিছু জানতে পারেনি বহুদিন। কিন্তু একবার এদের মধ্যে একজন গ্রামের কিছু মানুষজনের কাছে জানিয়ে দিয়েছিল, কী হয়েছে তাদের সাথে। সেই মেয়েটাকে পরে আর কেউ খুঁজে পায়নি। কিন্তু ততদিনে ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। গ্রামের লোকজন বিদ্রোহ করেছে জমিদার বাড়ির বিরুদ্ধে। চাকর-বাকরদের অনেকেই কাজ ছেড়ে চলে গিয়েছে একে একে। যারা যায়নি, তারাও নেহায়েত পেটের দায়েই কাজ করছিল। কিন্তু কোনো মেয়েই আর স্বেচ্ছায় কাজ করতে রাজি হয়নি।

গ্রামের ফুঁসে ওঠা মানুষজনকে শান্ত করতে ফজলুল আহমেদকে মোটা অংকের ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে। সেই ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নেহায়েত কম নয়। এদিকে জমিজমার দেখভাল করা মানুষজনদের মাঝেও একসময় সততার অভাব দেখা দিয়েছে। জমির ফসলের পরিমাণ ক্রমাগত কমে যেতে শুরু করেছে। একে একে বেহালও হয়ে গেছে বেশ কিছু সম্পদ। বিশ্বাস আর আস্থার অভাবে ধীরে ধীরে তলানিতে ঠেকতে থাকে অঢেল ঐশ্বর্য। শেষমেষ বেগতিক অবস্থা দেখেই অবশিষ্ট সম্পদ আর অল্প কয়েকজন চাকর বাকরকে নিয়েই ঢাকায় চলে যান ফজলুল আহমেদ।

কী হয়েছিল মেয়েগুলোর সাথে, এই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করেছে একেকজন। এত বড় সাংঘাতিক কথা বলতে তাদের মুখে যেন কুলুপ এঁটে বসছিল বার বার। শেষে বারংবার করা প্রশ্নবাণে আহত হয়েই একজন সাহস করে বলে ফেলে,

‘ওগো কেউ নষ্ট করতো!’

আনিসুল হক যেন বজ্রাহত হলেন।

‘কী! নষ্ট করতো মানে? মেয়েগুলোর সাথে খারাপ কাজ করতো? কে করতো এই খারাপ কাজ?’

‘জানি না হুজুর। এইডা আমাগো জিগাইয়েন না। আপনে মা-বাপ। আমরা গরীব চাষাভূষা। আমাগো প্রাণে মাইরেন না। এই কথা বাইরে চাউর হইছে শুনলে জমিদারবাবু আমাগো ওপরে অত্যাচার করবো।’

‘ফজলুল আহমেদ অত্যাচার করবেন তোমাদের ওপরে? উনি কেন অত্যাচার করবেন? উনি তো আমার জানামতে ভালো মানুষ! এরকম নন মোটেও!’

‘তিনি আগে মানুষ খারাপ আছিলেন না। আমাগো সুখ দুঃখে খবর লইতেন বেবাক সময়। চুলায় হাঁড়ি না বসলে বাজার করনের লাইগা ট্যাকা দিতেন। গাছের ফল পাকুড় গেরামের মানুষরে বিলি বাটোয়ারা করতেন। কিন্তু কী যে হইলো পরে…!

আরেকজন তার হয়ে কথা শেষ করে দিলো,

‘কী আর হইবো? এ হইতাছে দায়! নিজে গো গায়ের কলঙ্ক ঢাকোনের লাইগা সম্পত্তি দিয়া খেসারত দিত। চরিত্র ভালা না হইলে কালাই কী আর ধলাই কী! পাপ বাপেরেও ছাড়ে না। ওহন আস্তে আস্তে বুঝবো যত দিন যাইবো। সম্পত্তি গ্যাছে…সম্মান গ্যাছে…তাও শ্যাষ হয়নি ওহনো! পাপের বীজ বেবাক কিছুরে ছাপাইয়া বাইর হইবো!’

আনিসুল হক বিমুঢ় হয়ে গেলেন এসব শুনে। গ্রামের মানুষজন নিজেদের মতো করে যুক্তির সৌধ বানিয়ে নিয়েছে। ফজলুল আহমেদ ভাইয়ের মুখটা ভেসে উঠলো চোখের সামনে। তিনি করতেন এমন জঘণ্য কাজ? এটা কি সত্যিই ভাবা যায়? কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আনিসুল হক বললেন,

‘কিন্তু অত্যাচারের কথা কী যেন বলছিলে তোমরা? আর যে মেয়েটা সব কথা বলে দিয়েছিল, তার কি আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি?’

গ্রামের লোকজন এই প্রশ্নের জবাবে একটু যেন বিভক্ত হয়ে গেল। কেউ কেউ বিড়বিড় করে কী যেন বললো। একজন একটা বলছে, আরেকজন সেটাকে খণ্ডাচ্ছে। বোঝা গেল, এই ব্যাপারটা তারা স্পষ্টভাবে জানে না। কেউ একজন বললো, মেয়েটা বেঁচে আছে। সে নাকি তার বাবা-মাকে টাকা পাঠায়। আর অনিকের বাবা আগে নরম মানুষই ছিলেন। কিন্তু ভেতরের কুকীর্তি ধামাচাপা দিতে মানুষজনকে শাসানো শুরু হয়েছিল। লোকজন বুঝতে পেরেছিল তাদের জমিদারবাবু আর আগের মতো নেই। পাল্টে গেছে।

আনিসুল হক শুনে বললেন,

‘সেই মেয়েটার বাবা-মা কি এই গ্রামেই থাকে? আমাকে নিয়ে চলো তো সেখানে!’

এই কথায় গ্রামের লোকজন সমস্বরে বলে উঠলো,

‘না না তারা গেরাম ছাইড়া চইলা গ্যাছে। এই গেরামে কি তাগো আর টিকোনের উপায় আছে? লোকে ছি ছিক্কার করতো। তারাও ভয়ে ভয়ে থাকতো। অন্য গেরামে গিয়া জানটুকু লইয়া বাঁইচা আছে।’

এই কথাটা আনিসুল হকের কাছে কেন যেন সত্যি বলে মনে হলো না। সম্ভবত এরা সত্যিটাকে আড়াল করছে। কিন্তু কেন? কীসের এত ভয় তাদের?

একরাশ প্রশ্ন আর কৌতুহল নিয়েই অনিকদের গ্রাম ছাড়লেন আনিসুল হক। মনের মধ্যে হাজারো জিজ্ঞাসা উঁকিঝুকি মারছে। এসবের উত্তর তার জানতে হবে। অবশ্যই জানতে হবে। তা না হলে কোনো রহস্যেরই কূলকিনারা করা সম্ভব হবে না।

অনিকদের গ্রাম থেকে বের হয়ে বেলা থাকতে থাকতেই সুমনার নানা বাড়িতে গিয়ে হাজির হলেন আনিসুল হক। লতিফুর রহমান মানুষটা যে মহা ছিঁচেল এটা এক দেখাতেই বুঝে গেলেন তিনি। পুলিশের চোখ, ধুরন্ধরীপনা দেখেই তার দিন কাটে এখনো।

লোকটা একেবারে কথার শাহেনশাহ। কাজেকর্মেও যে যথেষ্ট সক্ষম, আর প্রমাণও কিছু কম দেননি জীবনে। বিরাট সম্পত্তি বানিয়েছেন। নিজের নাতনীকে জমিদারের বংশধরের সাথে বিয়ে দিয়েছেন সেই গল্প বার বার শোনালেন। নাতনিটা তার কাছে থাকলে নির্ঘাৎ ডাক্তার বানাতে পারতেন। কিন্তু লতিফুর রহমানের কপালে জুটেছিল এক অকর্মার ঢেঁকি জামাই। ঐ জামাইয়ের জন্যই তার অনেক সাধ অপূর্ণ থেকে গেল! সেই আক্ষেপ ঘুরে ফিরে গল্পে উঠে এলো।

আনিসুল হক নিজের আসল পরিচয় দিলেন না। জানালেন, অনিকের বাবার বন্ধু। এই গ্রামে কৃষকদের জীবনের মানোন্নয়ন সংক্রান্ত সরকারের একটা প্রকল্প নিয়ে এসেছেন। অনিকের বাবার পরামর্শেই এই গ্রামে তার আগমন। গ্রামের মুরুব্বীদের সাথে কথাবার্তা বলে তাদের কাছ থেকে বুদ্ধি পরামর্শ নিচ্ছেন। অনিকের বাবার নাম শুনেই বৃদ্ধ খুব উৎসাহিত হলেন। খাতিরদারীর অভাব হলো না। আর বুদ্ধি দিতে পারার প্রস্তাবে তো উৎসাহের মাত্রা কয়েকগুণ বেড়ে গেল। মুফতে অনেক বুদ্ধি পরামর্শ বাতলে দিলেন।

গল্পগুজব শেষ করে ফেরার পথে গ্রামের আরো কয়েকজনের সাথে কথাবার্তা বললেন আনিসুল হক। এতে বেশ লাভ হলো। দারুণ একটা বিষয় জানতে পারলেন তিনি।

 

এই গ্রামের এক প্রাক্তন স্কুল মাস্টারের ছেলের সাথে নাকি অনিকের স্ত্রী সুমনার ভাব বিনিময় হয়েছিল। ছেলেটা তখন ইউনিভার্সিটিতে পড়তো, আর সুমনা ছিল হাইস্কুলের বড় ক্লাসে। সেই প্রেম অঙ্কুরেই ঝরে গিয়েছিল সুমনার নানা জানের হস্তক্ষেপে।

ছেলেটির নাম ফরিদুর রেজা। নামটা টুকে নিলেন আনিসুল হক। কে এই ফরিদুর রেজা তার খোঁজ বের করতে হবে। দেখা যাক, সুমনার সাথে তার এখনো যোগাযোগ আছে কী নেই।

তখনো তার মাথাতে আসেনি, পুরো ঘটনাটার মধ্যেই একটা সরল যোগসূত্র থাকলেও থাকতে পারে। সামনে একটা একটা করে ছেঁড়া দড়ির টুকরা খুঁজে পাচ্ছিলেন আর আনমনেই সেগুলো কুড়িয়ে নিচ্ছিলেন আনিসুল হক। এই টুকরোগুলোকে জোড়া দিয়ে দিয়ে যে কোনো সেতু বানানো সম্ভব… যা দিয়ে কী না রহস্যের একেবারে দোরগোড়ায় গিয়ে পৌঁছুতে পারবেন এটা তার ঘুণাক্ষরেও মনে হয়নি!

(ক্রমশ)

 

 

আগের পর্ব ও লেখকের অন্যসব লেখা পড়তে ক্লিক করুন।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত