| 28 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
গল্প ধারাবাহিক সাহিত্য

চোরাকাঁটা (পর্ব-১৩)

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট

বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল সুমনা।

আজ দুপুর থেকে অঝোর ধারায় বয়ে চলেছে। সারা আকাশ কুচকুচে কালো রঙ গায়ে মেখে ভূত সেজেছে। মাঝে মাঝে কালো তুলার মতো কিছু ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ সেই ভূতের ভয়কে উপেক্ষা করেই ইতিউতি এবাড়ি ওবাড়ি যাচ্ছে। দেখে মনে হয়, যেন তারা একজন আরেকজনের সাথে কুশলাদি বিনিময় করছে। বহুদিন বাদে আজ এই মন খারাপের দিনে দেখা হয়েছে তাদের। কাঁদতে কাঁদতে গল্প করছে নিজেদের মধ্যে। পুরো প্রকৃতি জুড়ে শুনশান নিস্তব্ধতা। সেই নিস্তব্ধতাকে ভেদ করে শুধু একটানা বর্ষণের একঘেয়ে সুর। সোঁদা মাটির গন্ধে উন্মাতাল বাতাসে অজানা রহস্যভেদী আহ্বান।

সুমনা মন দিয়ে এই প্রবল বর্ষণের মাতম দেখছে। ওদের তিনতলা ফ্ল্যাটের কার্নিশ ঘেঁষে একটা কাক চুপচুপে ভেজা হয়ে জবুথবু বসে আছে। সুমনার কেমন যেন মায়া লাগলো দেখে। আহারে! বেচারা কোথাও আশ্রয় পায়নি। তাই তো এমন বেহাল অবস্থা!

নানা বাড়িতে এরকম বাদলার দিনে ভারী মজা হতো। সেই দিনগুলো মাঝে মাঝে স্বপ্নে ফিরে আসে। সুমনার এই এত বছরের জীবনে সম্ভবত সেই দিনগুলোই ছিল একটু অন্যরকম। মাঝে মাঝে মনে হয়, মুক্ত পাখীর মতো বেঁচে থাকা কাকে বলে তা সেই দিনগুলো না থাকলে কোনোদিন জানা হতো না সুমনার। বাড়ির পাশেই বিশাল বাঁশঝাড়। সেখানে সন্ধ্যে পেরুলেই শিয়ালের ডাক! পেছনে অবারিত মাঠ, ক্ষেতের পরে ক্ষেত। স্বচ্ছল গৃহস্থবাড়ির নিত্যকার ব্যস্ততা, উঠোনজোড়া চেনা শান্তি। ঘরের মতো করে বানিয়ে রাখা খড়ের গাদা ছিল ওদের চুরিচামারির গোপন সাক্ষী। আশেপাশের বাড়ির ফলপাকুড় চুরি করে পেড়ে এনে ওখানে লুকিয়ে রাখতো সুমনা আর ওর কয়েকজন সখী। পরে সুবিধামতো সেগুলো বের করে এনে মজা করে ঝাল লবণ দিয়ে মাখিয়ে খেতো। সেই স্বাদ যেন অমৃত, আজো মুখে লেগে আছে। একদিন সেই খড়ের গাদা থেকে ফলের বদলে বেরিয়ে এসেছিল সাপের ডিম। ওদের আত্মা উড়ে গিয়েছিল দেখে। এত ভয় পেয়েছিল যে, লাফ দিয়ে নামতে গিয়ে পা ভেঙে ফেলেছিল একজন। পরে আসল ঘটনা জানাজানি হতেই সে কী গালি বর্ষণ! নানাজান ওকে ওর সখীদের সাথে মিশতে দিতে চাইতেন না।বলতেন,

‘এই বদ ছেমড়িগুলানের লগে মিইশা মিইশা তুই যাবি ভাইসা। তরে নিয়া কত স্বপ্ন দেখি আমি, জানিস সেই কথা?’

সুমনা জানতো সেই কথা। কিন্তু সেই বয়সে নিজেকে কারো স্বপ্ন সওয়ারী ভাবতে ভালো লাগতো না। এক ছুটে হারিয়ে যাওয়ার সেই বয়সটাতে কোথাও দাঁড়িয়ে কারো দু’দণ্ড কথা শোনার মতো কি এত অবসর থাকে?

ঘন বর্ষার দিনে সুমনা আর ওর সখীরা মিলে চলে যেত নানা বাড়ির পেছনের বিস্তীর্ণ খোলা মাঠে। ক্ষেতের আল ধরে চলতে চলতে পৌঁছে যেত নীলরঙ্গা ডীপ মেশিনটার কাছে। দিনের মধ্যে অন্তত একবার এই ডীপ মেশিনের কাছে এসে ওদের বসা চাইই চাই। ঠিক সেই সময়টাতে ওরা যেত, যখন ডীপ মেশিন ছাড়বার সময় হতো। মেশিনের পেছনে কংক্রিটের লম্বা নালাটার ওপরে ওরা পা ঝুলিয়ে বসতো।তারপর প্রহর গুনতো মেশিন ছাড়ার সেই মাহেন্দ্রক্ষণের। উদ্দাম জলধারা আচমকাই এক বুনো ষাঁড়ের মতো শিং উঁচিয়ে ধেয়ে আসতো তাদের দিকে। তার ঐ শিং এর গুঁতো খেতে মরিয়া সেই কিশোরীর দলের যেন আর একদণ্ডও তর সইতো না! মেশিন অন করতে এসে কাকু ওদের দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হেসে বলতো,

‘তোমরা আইসা পড়ছো? একদিনও লেট হয় না তুমাগো! টাইট হইয়া বইয়া থাগো। এই ছাড়লাম মেশিন…এক দুই তিন…ইস্টার্ট!’

প্রবল জলধারা এসে ধুয়ে দিয়ে যেত ওদের কিশোরী শরীর। কাকু চলে গেলে ওরা খিল খিল করতে করতে সেই তুমুল স্রোতধারায় নাচতো। একজন আরেকজনের সাথে জলকেলিতে মেতে উঠতো। আর বাদলার দিনে তো কথাই নেই। তখন ডীপ মেশিনের লম্বা নালা ধরে চলতে চলতে ওরা পৌঁছে যেত অনেক দূর। বৃষ্টির অবিরাম ধারা যেন ধাঁই ধাঁই করে ধেয়ে নিয়ে চলতো ওদের।

ক্ষেতের আলঘেঁষে লাগিয়ে রাখা কদম গাছগুলোতে থোকায় থোকায় ঝুলে থাকতো তাজা কদম। সেই ফুল ছিঁড়তে অনেক কায়দা কসরত করতে হতো। হাতভর্তি কদম নিয়ে ঝকঝকে হাসিতে আলো করে পথ চলতো ওরা কয়েকজন উদ্দাম কিশোরী। উচ্ছল আনন্দে এলিয়ে পড়তো এ ওর গায়ে।

একদিন এমনই এক বর্ষার দিনে দেখা হয়ে গিয়েছিল তার সঙ্গে। সেদিন সুমনা একটাও কদমফুল ছিঁড়তে পারেনি। ফুলগুলো যেন শত্রুতা করেই ঐদিন একেবারে গাছের মগডালে উঠে বসেছিল। অথচ এই ভর বর্ষায় হাতে কদমফুল না থাকলে কি চলে? সখীরা হাঁটতে হাঁটতে তখন বাড়ির দিকে রওয়ানা দিয়েছিল। সুমনা একাই নাছোড়বান্দার মতো গাছের ডাল ধরে টানাটানি করছিল। বেশি না, একটা কদম ওর চাইই চাই! হঠাৎ পেছন থেকে এক যুবক কণ্ঠের আওয়াজ শুনে চমকে পেছনে ঘুরে তাকিয়েছিল।

‘পারছো না তো! আমি পেড়ে দিই?’

ঝকঝকে চেহারার সুদর্শন এক তরুণ দাঁড়িয়ে আছে ঠিক তার পেছনে। মুখে মিটিমিটি হাসি, যেন দুষ্ট কিশোরীর কাণ্ডকারখানায় সে দারুণ মজা পেয়েছে। একে তো ঝুম বাদলার দিনে খা খা করছে বিশাল প্রান্তর। আশেপাশে কোথাও একটা জনপ্রাণী নেই, বন্ধুরাও চলে গেছে বেশ অনেকটা দূরে। তার ওপরে এই ছেলে সুমনার কাছে একদম অপরিচিত। একে গ্রামে কোনোদিন দেখেছে বলেও মনে করতে পারছে না। কী মতলবে এখানে এসে দাঁড়িয়েছে কে বলতে পারে!

সুমনা ভয় পেয়ে সঙ্গীদের ডাকতে যাচ্ছিলো। যুবক তাড়াতাড়ি কাছে এসে আচমকা এক কাণ্ড করে বসলো। এক হাত দিয়ে বন্ধ করে দিলো সুমনার মুখ। এত আচম্বিতে ঘটেছিল ঘটনাটা যে, সুমনা তার মুখ থেকে হাত ছাড়িয়ে নেওয়ারও সময় পায়নি। মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজ করারও চেষ্টা করেনি। শুধু বেহায়ার মতোন একদৃষ্টে তাকিয়েছিল সেই অপরিচিত অতি সৌম্যদর্শন যুবকের দিকে। ছেলেটি কিন্তু নিজেও তখন ভয় পেয়েছে। হাত দিয়ে মুখ ধরে রাখা অবস্থাতেই সে ক্রমাগত মিনতি করে চলেছে,

‘প্লিজ প্লিজ শব্দ করো না… এখন একদম জোরে শব্দ করো না। কেউ এদিকে এলে মহা কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। সবাই মিলে আমার ঘাড়ে দোষ চাপাবে। আমি মোটেও তোমাকে ভয় দেখাতে চাইনি। ভয় পাবে এমনটা বুঝলে আমি কিছু বলতামই না! এতক্ষণ খিলখিল করে হাসছিলে। তোমাকে দেখে তো এত ভীতু মনে হচ্ছিলো না! তুমি ফুল ছিঁড়তে পারছিলে না, আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেটাই দেখছিলাম শুধু। বিশ্বাস করো, আমার কোনো বদ মতলব নেই!’

 

যুবকের কাকুতি মিনতিতে তখন আরেকবার খিলখিল করে উঠতে ইচ্ছে করেছিল সুমনার। এমন ভয় পেয়েছে ছেলেটা! কেঁদেটেদে না ফেলে! তার ভয় দেখে সুমনার নিজের ভয় ততক্ষণে উধাও!

সে বিশ্বাস করেছিল যুবকের প্রতিটি কথা। সম্ভবত, জীবনে এই প্রথম এত কম গ্যারান্টিতেও একজনকে বিশ্বাস করেছিল সুমনা। আশৈশব বুদ্ধিমতী বলে পরিচিত সুমনা কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিল একেবারে। আরো ছোট বয়স থেকেই ও গল্পের বই পড়তে ভালোবাসতো। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র… হাতের কাছে যখন যা পেত, সব পড়ে একেবারে ঝাঁঝরা বানিয়ে ফেলতো। ওর মনে হয়েছিল, শেষের কবিতায় অমিতও বুঝি এমন ঘটনার সূত্রপাতে লিখেছিল,

‘পথ… আজ হঠাৎ এ কী পাগলামি করলে!

দুজনকে দু’জায়গা থেকে তুলে এনে আজ থেকে হয়ত একই রাস্তায় চালান করে দিলে।

মনের ভেতরটা বলছে…শুরু হলো আমাদের যুগল চলা,

আমার চলার পথে বাঁধবো ক্ষণে ক্ষণে

পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থী…আমরা দুজন চলতি হাওয়ার পন্থী…’

পরিণতমনষ্কা সুমনা ডায়েরী লিখতো সেই কিশোরী বয়স থেকেই। রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে লুকিয়ে লুকিয়ে সেই ডায়েরী বের করে পড়তো। একদিন ঐ ডায়েরীর ভাঁজে লুকিয়ে রেখেছিল বৃষ্টিস্নাত একটি তাজা কদম। একেবারে পাতা সমেত। নিজের গুপ্ত ডায়েরীর ততোধিক গুপ্ত পাতায় চুপিসারে লুকিয়ে রাখা সেই ডায়েরীর ভাঁজ খুলেছিল পাক্কা সাতদিন পরে। দ্রাম দ্রাম হাতুড়ি বাজছিল বুকের ভেতরে। যদি কেউ দেখে ফেলে? নানাজান দেখে ফেললে তো লঙ্কাকাণ্ডই বাঁধিয়ে বসবে! কাল থেকে হয়ত স্কুলে যাওয়া আসাই বন্ধ করে দিবে!

সেদিনের পর থেকে মাঝে মাঝেই দেখা হয়ে যেত। ঠিক সেইরকমই হুটহাট। কেউ দেখলে ভাবতো, বুঝি কাকতালীয় ভাবে দেখা হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সুমনার মনের ভেতরটা বলতো, কাকতালীয় নয়…কাকতালীয় নয়। এ হলো ষড়যন্ত্র! হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের ঘটে চলা অতি পুরাতন ষড়যন্ত্র!

ছেলেটা খুব বেশি কথা বলতো না। নিজের সম্পর্কে তো বিশেষ কিছু বলতেই চাইতো না। কিছু জিজ্ঞেস করলেই গালভরা হাসি দিয়ে শুধু বলতো,

‘পাগল, বেশি কিছু বলে গণধোলাই খাবো নাকি? এখনো আরো ম্যালাদিন বাঁচতে চাই বাবা! এমনিতেই গ্রামের মাতব্বরের নাতনীর সাথে ভাব করেছি। কে জানে কী আছে ভাগ্যে! নামধাম গোপন করে চললে তবু এই যাত্রায় বেঁচে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা থাকলেও থাকতে পারে।’

সুমনা জানতো এসব ছলচাতুরী। আসলে সে সুমনার কাছে ভাব নিচ্ছে। এসব লুকোচুরি আসলে অতি প্রকাশেরই নামান্তর। নিজের ভাও যাচাই করে নিচ্ছে সে সুমনার কাছে।  কিন্তু সুমনাও তো ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নয়। সেই বা যাকে তাকে ভাও দিতে যাবে কোন দুঃখে? শেষমেষ অনেক জোরাজুরিতে নিজের নাম-ধাম বলেছিল একেবারে পোষাকী কায়দায়।

‘আমার নাম ফরিদুর রেজা। পিতা শরাফত রেজা। বাড়ি মতলবপুর গ্রাম। লেখাপড়া, অনার্স সেকেণ্ড ইয়ার… ডিপার্টমেন্ট অফ সোসিওলোজী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। থাকি শহীদুল্লাহ হলে। একদা প্রখ্যাত লেখক হুমায়ুন আহমেদ যে হলের প্রভোস্ট ছিলেন। তিনি থাকতেনও এই হলের এক প্রান্তেরই ইটরঙ্গা একটি বাসায়। সেই বাসাটির সামনে দাঁড়িয়ে বহুদিন অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থেকেছি ওপরের দিকে। ওমন একজন মানুষ এই বাসায় থেকে গিয়েছেন, এটা ভেবেও রোমাঞ্চিত হয়েছি।’

বলার ভঙ্গি দেখে সুমনা মজা পেয়ে গিয়েছিল। মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে বলেছিল,

‘ব্যস ব্যস আর বলার দরকার নেই! আপনার নামধাম বাসস্থান জানতে চেয়েছি। জনাব হুমায়ুন আহ্‌মেদের নয়। উনি কোথায় থাকতেন তা দিয়ে আমার কী কাজ?’

ফরিদুর রেজা মুখে কাঁচুমাচু ভাব এনে বলেছিল,

‘না, আমার মনে হলো তুমি গল্পের বইয়ের পোকা। পড়ার বইয়ের এক ফাঁকে সেদিন একটা গল্পের বইও দেখেছিলাম কী না! নহন্যতে… বাপরে! এত শক্তপোক্ত বই পড়ো ক্যামনে? আমি তো এক লাইন পড়ে দুই লাইন ভ্যাবলা হয়ে বসে থাকি। বাংলাতে আজীবন টেনেটুনে পঞ্চাশ পেয়েই হাঁপিয়ে গিয়েছি। যাকগে, সেজন্যই ভেবেছিলাম বড় বিখ্যাত লেখকের অতীত বাসস্থানের আশেপাশে থাকি শুনলে হয়ত কিছুটা আলাদা দাম পাবো… মানে তোমার কাছ থেকে!’

সুমনা হাসতে হাসতে বলেছিল,

‘নিজের যোগ্যতাতেই দাম আদায় করে নিতে হয়, বুঝলেন? তা… আপনার নাম এত বড় কেন? ছোটখাট নাম নেই কোনো’

‘হুম, আছে তো! কিন্তু সেই নাম বললে যদি ধরা পড়ে যাই!’

‘এত ধরা পড়ার ভয় কেন আপনার? চুরি করেছেন নাকি খুন?’

‘দুটোই! প্রথমে চুরি অতঃপর খুন। কে জানে…কবে হয় বুঝি আমার মুখচুন!’

‘বাহ, ছন্দ তো ভালোই মিলালেন! আবার বলছেন বাংলা নাকি শক্ত লাগে!

‘ঐ মুখ ফস্কে এসে গেল ছন্দ… সামনে যেথা দাঁড়িয়ে আছে এমন আনন্দ!’

‘দূর!’

 

এত লুকোচুরি ধরতে পারতো না সুমনা। শুধু এটুকু বুঝতে পারতো, ছেলেটা তার নানাজানকে সমঝে চলে। সুমনা বড়বাড়ির নাতনী, এই ব্যাপারটাকে সে যথেষ্ট আমল দেয়। তাই কাছাকাছি এসেও নিজেকে একেবারে খুলেমেলে ধরতে পারতো না। দূরত্বটাকে একেবারে ঘুঁচিয়ে দিতে চাইতো না কখনো। তবু সুমনার ওকে ভালো লাগতো। গল্প করতে ভালো লাগতো। পাশাপাশি বহুদূর পথ একসাথে হাঁটতে ইচ্ছে করতো।

অবশেষে সুমনার আশঙ্কা একদিন বাস্তবে রূপ নিলো। ওর এই গোপন ভালো লাগার কথা কীভাবে কীভাবে যেন নানাজানের কান অব্দি চলে গেল। অতঃপর নেমে এলো বিশাল খড়গ! অল্প বয়সের ছোট্ট একটুখানি ভুলের জন্য বেশ বড়সড় মাশুল গুনতে হলো সুমনাকে। নানাজান সত্যি সত্যিই ওর স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিলেন। বাইরে বেরুনোর ওপরও জোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ হলো।

নানাজান এতটা বাড়াবাড়ি কেন করেছিলেন, সেটা তখন বুঝতে না পারলেও এখন ভালোভাবেই বোঝে সুমনা। নানাজান হয়ত সত্যি সত্যিই ওর ভালো করতে চেয়েছিলেন। আরেকটা সম্ভাবনাও উঁকি মেরেছিল মনে। নিজের মাথাটাকে আরেকবার হেঁট হতে দিতে চাননি তিনি। সুমনার মায়ের জীবনে যে পরিণতি ঘটেছিল, নানাজান সেই একই পরিণতি বরণ করতে দিতে চাননি তাকে। তিনি চেয়েছিলেন সুমনা একটা নিশ্চিন্ত জীবন পাক। অঢেল শান শওকত তার পায়ের তলায় লুটোপুটি খাক। সাফল্য আর গৌরব তাকে ঘিরে থাকুক সবসময়। আর সেই গৌরবে তিনিও হয়ে উঠবেন গৌরবান্বিত। তাই তো সাধারণ কোনো ছেলের সাথে গাঁটছড়া বাঁধার অতি নগণ্য সম্ভাবনাটুকুও নানাজান চিরদিনের মতো ঘুঁচিয়ে দিয়েছিলেন।

অঢেল শান শওকত না পেলেও নিশ্চিন্ত জীবন হয়ত পেয়েছে সুমনা।

অনিক বেশ ভালো বেতন পায়। স্বামী হিসেবে যথেষ্ট ভালো। অনেক আগেই এই পরীক্ষায় সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হয়ে গেছে অনিক। সুমনার প্রতিটি ব্যাপারে তার নিখুঁত মনোযোগ। সুমনার কখন মন খারাপ, কখন ভালো…সবকিছুই সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ করে। তার প্রতিটি পছন্দ অপছন্দের খোঁজ রাখে অনিক। এমনকি তার অবলা প্রতিবন্ধী বোনটার সমস্ত দায় দায়িত্বও নির্দিধায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। এমন একজন মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ না হয়ে পারা যায় না। সুমনাও কৃতজ্ঞ। অপ্রাপ্তবয়সের অপরিণত ভালোলাগা কবেই ডানা কেটে বেরিয়ে গেছে! এক জীবনে দুজনকে ভালোবাসা যায় না, এসব শুধু কেতাবী কথাবার্তা। সুমনা অনিককে ভালো তো বেসেইছে!

এমনকি যেদিন হুট করে আবার অনেক অনেকদিন পর সেই মানুষটাকে দেখতে পেয়েছিল সুমনা, তখনো স্বামীর প্রতি ওর ভালোবাসা নিঃশেষিত হয়নি। কিংবা প্রশ্নবিদ্ধও হয়নি। পুরনো ভালোবাসাকে দেখতে পেয়েই মরা নদীতে নবীন জোয়ার ওঠেনি। বরং নতুন করে মনে হয়েছে, জীবন প্রতি মুহূর্তে তার রঙ বদলায়। স্রোতস্বিনী জীবনের গতিপথ পাল্টে যায় প্রতিটি বাঁকে বাঁকে। ওর জীবনেরও গতিরেখা বদলে গেছে। এই বদলে যাওয়া গতিরেখায় সেই খামখেয়লিভরা ছেলেমানুষীর কথা আর মনে রাখাটা তেমন জরুরি নয়। যদিও অনেকদিন পরে আচমকা এভাবে আবার দেখা পেয়ে চমকে উঠেছিল সুমনা, এ’কথা অস্বীকার করার জো নেই। কিন্তু চোখের চমক কাটতে যতটুকু সময় লাগে, মনের চমকের স্থায়িত্ব তার চেয়ে বেশি ছিল না। অতীতকে জোর হস্তক্ষেপে দূরে ঠেলে দিয়েছে সুমনা। সেটাকে কিছুতেই ভিড়তে দেয়নি বর্তমানের আঙিনায়।

কিন্তু এতকিছুর পরেও শান্তি কি সত্যিই পেয়েছে সুমনা?

এই সংসারের চার দেওয়ালের কোথায় যেন একটা চাপা অস্বস্তি আর কান্না লুকিয়ে আছে। সেই কান্না সুমনাকে তিষ্টাতে দেয় না। বার বার মনে করিয়ে দেয়, সে সব পায়নি। অনেক অপ্রাপ্তি রয়ে গেছে জীবনে।

অনিকের বাবা-মা কেন যেন সুমনাকে আপন করে নিতে পারেননি। ভালো মেয়ে বলতে যা বোঝায়, সুমনা কোনো অংশেই তার চেয়ে কম কিছু নয়। সে দেখতে খুব সুন্দর, কথাবার্তায় স্মার্ট অথচ পরিমিত, আচার আচরণে অতি ভদ্র। প্রথম দিনের সাক্ষাতে শ্বশুর শাশুড়ির পা ছুঁয়ে সালাম করেছিল। তবু তাদের দুজনের মুখেই শক্ত হয়ে জমে থাকা আষাঢ়ের মেঘ চিনতে ভুল হয়নি সুমনার। কেন যে সেদিন থেকেই মনের কোণে জমতে শুরু করেছিল অস্বস্তিটা, সেটা নিজেও জানে না সুমনা! অনিকের বাবা-মা কি তাকে মন থেকে মেনে নেয়নি? শুধু অনিকের আগ্রহকেই নীরব সম্মতি জানিয়েছেন মাত্র?

বাবা-মা হারানো মেয়ে সে। মাকে হারিয়েছে সেই কবে! ছায়া হয়ে জুড়ে থাকা বাবারও চলে যাওয়ার বড্ড তাড়া পড়ে গিয়েছিল। মনের মধ্যে আশা ছিল, হয়ত শ্বশুর শাশুড়ির মাঝেই তাদের দুজনের ছায়াকে খুঁজে পাবে সে। পুরোপুরি ভুলে না গেলেও ভুলে থাকতে পারবে অনেকখানি। কিন্তু সেসবের কিছুই হয়নি। অকারণ অযুহাত দেখিয়ে ওদের বাসায় আসতে চাননি তারা দুজন। অবশ্য জমিদারের বিশাল বাড়িতে তাদের বাস ছিল একসময়। এই ছোট ফ্ল্যাট বাসাতে এসে না থাকতে চাইতেই পারেন! কিন্তু সুমনাদেরকে তো তাদের উত্তরার বাসায় রাখার ব্যাপারে আপত্তি জানানোর কোনো কারণ ছিল না। অনিকের বাবা-মা, সুমনা আর অনিককে তাদের উত্তরার বাসায় নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তেমন আগ্রহ দেখাননি। কেমন যেন ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে গিয়েছেন। এটা নিয়ে অনিককে বেশ কয়েকদিন জিজ্ঞাসা করেছে সুমনা,

‘উনারা কি আমাকে পছন্দ করেননি?’

অনিক বলেছে,

‘খামাখা যা নয় তাই ভাবছো! পছন্দ করেননি একথা কে বললো? উনারা কি এমন কিছু বলেছেন?’

‘না বলেননি…কিন্তু উনাদের মুখ দেখে আমার তো সেটাই মনে হলো।’

‘মুখ দেখে এত কিছু ভেবে নিলে? কই আমি তো তাদের মুখে অন্য কোনো ভাব দেখলাম না। খামোখা মনের ওপরে এত চাপ নিও না। নিজে ভালো থাকো, তাহলেই দেখবে সবাই ভালো। আর তাছাড়া মা’র যতরকম নিয়মকানুন! ওসবের সাথে মানিয়ে নিতে নিজেই ক্লান্ত হয়ে পড়তে। নিজে থেকে থাকতে বলেননি। এটাকে সৌভাগ্য হিসেবেই দেখ। আর মেয়েরা তো শ্বশুরবাড়িতে না থাকতে পারলেই খুশি হয়। তোমার বেলাতে এত উল্টা ইচ্ছে কেন?’

 

ক্রমশ

 

 

আগের পর্ব ও লেখকের অন্যসব লেখা পড়তে ক্লিক করুন।

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত