| 18 এপ্রিল 2024
Categories
গল্প ধারাবাহিক সাহিত্য

চোরাকাঁটা (পর্ব-১৪)

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

অনিক হয়ত এড়িয়ে গেছে সত্যটাকিন্তু অনেক সম্ভাবনার কথাই সুমনার মনে হয়েছে। 

সুমনা সাধারণ পরিবারের মেয়ে, সেজন্যই কি উনারা তাকে মেনে নিতে পারছেন না? 

বনেদিয়ানা রক্তে মিশে থাকে আজীবনসেই বনেদিয়ানাই হয়ত তাদেরকে সহজ হতে দেয় না। নিজেদের আভিজাত্যের গৌরব এসে যখন তখন বাগড়া দেয়। যদিও তার শ্বশুরসাহেব শহরের হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা করেছেন। সুমনার ধারণা হয়েছিল, তিনি অন্তত মন মানসিকতায় আধুনিক। বংশধারার এসব ফালতু মূল্যবোধ নিয়ে তিনি মাথা ঘামান না। আর শাশুড়ির ব্যাপারে আলাদা কিছু মনে হয়নি সুমনার। চিরাচরিত শাশুড়িরা যেমন হয়ে থাকে উনিও অনেকটা তেমনই। বউকে আড়ে আড়ে লক্ষ করছিলেন। কথা বলার ফাঁকে ফাঁকেই তার চোখ চলে যাচ্ছিলো সুমনার হাত পা মুখ, গয়নাগাঁটি… এসবের দিকে। তবে একটা জিনিস ঠিকই এঁটে ছিল দুজনের চোখেমুখে। তা হলো গাম্ভীর্য। আশ্চর্য রকমের একটা শীতলতা। অনিকের সাথেও খুব একটা বেশি কথা বলেননি তারা।

রুমানার কথাও মাঝে সাঝে মনে হয়েছে সুমনার।

রুমানার কারণেই কি তাদের এই অসন্তুষ্টি? হয়ত তারা রুমানাকে এই বাসায় দেখতে চান না। মুখ ফুটে বলতে পারছেন না… হয়ত…হয়ত অনিকের কারণেই! অনিক আগ্রহ দেখিয়ে রুমানাকে নিয়ে এসেছে। তারা ছেলের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কীভাবে কথা বলেন? নইলে হয়ত বলেই ফেলতেন, রুমানাকে কোনো কেয়ারিং সেন্টারে রেখে আসার জন্য। একথা ভাবতেই বুকের ভেতরটা কেমন হিম হয়ে আসে সুমনার। যদি তারা সত্যি সত্যিই এমন কোনো প্রস্তাব দিয়ে বসেন, তাহলে কি করবে সুমনা? রুমানাকে কি সরিয়ে দিতে পারবে নিজের কাছ থেকে? নিজের অজান্তেই দু’চোখ ভিজে আসে সুমনার। বাবা-মা হারানো এই এতিম বোনটার আর কে আছে সুমনা ছাড়া? সেই সুমনাও যদি ওকে দূরে ঠেলে দেয়…তাহলে কোথায় যাবে অসহায় বাচ্চা মেয়েটা? পৃথিবীর জটিলতার এক কানাকড়ির সাথেও তো তার দেখা হয়নি আজো!

রুমানার ঘর থেকে মৃদু আওয়াজ ভেসে আসছে। দুদিন ধরে নিয়মিত বিরতিতে হয়ে চলা এই আওয়াজ এখন প্রায় গা সওয়া হয়ে গেছে। 

সবদিক বিবেচনা করে রুমানার এ্যাবরশনের ব্যাপারে অনেক কষ্টে সম্মত হতে পেরেছিল ওরা। দু’মাসের প্রেগন্যান্সি। আর কিছুদিন গেলেই রিস্কি হয়ে যাবে। অন্যকিছু করার আর সময় থাকবে না। যা করার এখনই করে ফেলতে হবে। এই শিশুটির তো কোনো ভবিষ্যত নেই। ঠিক যেমন রুমানারও কোনো ভবিষ্যত নেইকিন্তু একটা তাজা ভ্রুণকে হত্যা করার ব্যাপারে সুমনার মন কিছুতেই সায় দিচ্ছিলো নাএকসময় এই সিদ্ধান্তেও এসেছিল, বাচ্চাটাকে সে নিজে মানুষ করবেতাকে নিজেদের নাম দেবে। বোনেরই তো সন্তান! তাকে কেন নিজের মতো করে মানুষ করতে পারবে না? নিজের নামে বড় করতে পারবে না? 

অনিকের দিক থেকে কোনো আশঙ্কা ছিল না মনে। সুমনার ইচ্ছেতে কি অনিক অখুশি হবে?

কিন্তু সেই জায়গাটাতেই বাধা পেল সুমনা। এই ব্যাপারটাতে অনিক নিমরাজী ছিল। হয়ত মন থেকে সম্মতি ছিল না, কিন্তু সুমনার মুখের দিকে চেয়ে সরাসরি নাও করতে পারছিল না। সুমনা সেটা বুঝতে পেরেছিল। অনিককে কিছু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করেনি। তবু নিজে থেকেই অনিক বলেছিল,

‘আজ হয়ত তুমি তাকে নিজের মতো করে বড় করে তুলবে। কিন্তু এই বাচ্চাটা বড় হয়ে নিজের আসল পরিচয় জানতে পারলে কী হবে, ভেবে দেখেছো? তার জন্মটা যে কারো জন্য আনন্দের ঘটনা ছিল না। এটা বুঝতে পারার পর তার কেমন লাগবে? সে কি পারবে তখন সুখী হতে? আর তাছাড়া যে মানুষজনের অহেতুক কৌতুহলকে এত এড়িয়ে চলো তুমি, সেই কৌতুহল কি তখন সবকিছু ছাপিয়ে উঠে আসবে না?’ 

ঠিকই তো বলছে অনিক। সুমনাও সেই সত্যকে অস্বীকার করতে পারেনি। তবু আশা করেছিল, অনিক হয়ত এবারেও তার পাশে থাকবে। একসাথে অনেক বাধাকেই জয় করা যায়। ওরাও এটাকে ঠিকই জয় করে ফেলবে। কিন্তু সেটি যখন হচ্ছেই না, তখন বাধ্য হয়েই সুমনাও ঐ পাপের কাজে সম্মতি দিয়েছিল শেষমেষ। অনিক না রাখতে চাইলে বাচ্চাটাকে কি ও একা রাখতে পারবে? পরে যদি অন্য কোনো সমস্যা হয়? বাচ্চার পিতৃ পরিচয়টাই যেখানে জানা যায়নি এখনো!

সুমনার মনের এই দ্বিধা আর পাপবোধের দ্বন্দ্ব থেকে বিধাতাই বুঝি শেষমেষ ওকে বাঁচিয়ে দিলএ্যাবরশন করাতে হলো না। পিছল বাথরুমে পা হড়কে পড়ে গিয়ে রুমানার মিসক্যারেজ হয়ে গেল। সবসময় পরিষ্কার পরিপাটি সুমনা কীভাবে সেদিন বাথরুমের মেঝেতে আস্ত একটা সাবান ফেলে রেখেছিল, এটা কিছুতেই তার মাথায় আসেনি কিছুদিনের ব্যবহার করা নরম গলে যাওয়া সাবানটা একেবারে সেপ্টে গিয়েছিল বাথরুমের মেঝেতে। অন্যদিন সুমনা বাথরুমে ঢুকে সবকিছু ঠিকঠাক করে দেওয়ার পরেই রুমানাকে গোছলে ঢোকায়। গোছলটা গত প্রায় একবছর ধরে একাই করতে পারে রুমানা। সেদিন কী যে ভুলো হাওয়া এসে এলোমেলো করে দিয়েছিল সুমনাকে! কাজের চাপে এই কাজটাই বেমালুম ভুলে গিয়েছিল। তবু ভুল তো ভুলই! আর ভুলের মাশুল গুনতে হলো ঐ অবলা আর তার পেটে বড় হতে থাকা আপদটাকেই!

এরপর এ্যাম্বুলেন্স, হাসপাতাল, চিৎকার, কান্না…সব অনুভূতি গাদাগাদি করে চেপে বসলো মাথায়। ওদের সবাইকে দায় থেকে মুক্ত করে দিয়ে আপদ নিজেই ওদের সকলের পথ থেকে সরে গেল। আর সরে গিয়ে বাঁচিয়ে দিয়ে গেল সবাইকে।

সেদিনের সেই ব্যথাটা সয়ে আসার পর থেকেই নিজের ঘরে গুনগুন করে গানের সুরে কাঁদে রুমানা। অবলা প্রাণে কিছু কী খেলা করে কি না কে জানে! হয়ত নিজের সাথে জুড়ে থাকা অস্তিত্বটাকে আর অনুভব করতে পারছে না বলেই এই অদ্ভুত তন্ময়তাসেই অনুভূতির শূন্যতাটাকে হয়ত একেবারে নিজের মতো করেই উদযাপন করছে রুমানা।

রুমানার ঘরের দিকে একবার পা বাড়াতে গিয়েও নিজেকে নিবৃত্ত করলো সুমনা। সব শোকগ্রস্তেরই অধিকার আছে নিজের মতো করে শোক পালন করার। রুমানার কেন সেই অধিকার থাকবে না?

অনিক কিন্তু সেদিনের পর থেকেই একেবারে চুপচাপ। বাথরুমে রুমানার এক্সিডেন্টটা হওয়ার পর সুমনা সবচেয়ে বেশি ভয় পেয়েছিল অনিককে নিয়েই। কেন যেন অসতর্কতা ব্যাপারটা একেবারেই বরদাস্ত করতে পারে না অনিক। একবার সুমনা মোছামুছি করতে গিয়ে অসাবধানে ওর ল্যাপটপের মনিটরের গায়ে আঁচড় ফেলে দিয়েছিল। মনিটর অন করা ছিল। সেজন্য বুঝতে পারেনি সুমনা। ঘষাঘষি করতে গিয়ে অসাবধানে বেশ মোটা দাগ পড়ে গিয়েছিল মনিটরেঅনিক কেন যেন খুব রাগ দেখিয়েছিল সেদিন। সম্ভবত সেই প্রথমবার সুমনাকে ওমন কঠিন গলায় বকাঝকা করেছিল অনিক। অবশ্য রাগ পড়ে যেতেও সময় লাগেনি। সুমনা আড়ালে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। অনিক পাশে এসে আলতো হাতে ওর কাঁধ স্পর্শ করেছিল। তারপর মোলায়েম স্বরে বলেছিল,

‘কত ইম্পর্টেন্ট ফাইল থাকে ল্যাপটপে! ল্যাপটপের কিছু যদি ক্ষতি হয়ে যায়, সেই জন্যই একটু রিয়াক্ট করে ফেলেছি। প্লিজ রাগ করো না! প্রমিজ করছি আর কখনো এমন ব্যবহার করবো না তোমার সাথে।’

সুমনার ফোঁপানি তবু বন্ধ হচ্ছিলো না। সবসময় ভালোবাসা দেখানো শান্তশিষ্ট মানুষটা কেন ওমন রুক্ষ্ণ ভাষায় গর্জে উঠলো ওর ওপর? এমন কী ভয়াবহ দোষ করে ফেলেছে সুমনা।

এবারেও তাই বাথরুমে সাবান ফেলে দেওয়ার ঘটনায় সুমনার মনে ভয় দানা বেঁধেছিল। অনিক যদি আবারও সেদিনের মতো বকাবকি শুরু করে? নিজেকে নিয়ে ভয় আছে সুমনার। কারো খারাপ ব্যবহার সে বেশিদিন সইতে পারে না। রাগারাগি হয়ত করবে না ঠিকই, কিন্তু অন্যায় বকাঝকা চুপ করে হজমও করতে পারবে না। একেবারে চিরদিনের মতো মনকে শক্ত বানিয়ে বসে থাকবে। কিছুতেই সেই জমে যাওয়া শক্ত বরফ আর গলানো যাবে না! অন্যায়ভাবে করা অবহেলার কারণে নিজে কখনো নত হতে পারবে না সুমনা। সম্ভবত নানাজানের শরীরের বয়ে চলা রক্তের ভাগ তার ভেতরে মাঝে মাঝে এই ঝামেলাটা পাকায়!

অলস ভাবনাচিন্তা শেষে রান্নাঘরে ঢোকার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো সুমনা। তখনই ফোনটা এলো, অপরিচিত একটা নাম্বার থেকে। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে গমগমে গলায় এক ভদ্রলোক বললেন,

‘আপনি কি সুমনা বলছেন? কিছু ব্যাপার জানার ছিল আপনার কাছে। কিছুক্ষণ সময় হবে কি?’

সেদিন আনিসুল হকের সাথে কথাবার্তা বলে আসার পর থেকে শান্তর মাথাটা আগের থেকে অনেক ঠান্ডা হয়ে গেছে। এখন সবকিছু পরিষ্কারভাবে দেখতে পাচ্ছে সে। যদিও তার এই দৃষ্টিভঙ্গি তাকে সঠিক দিশা দেখাচ্ছে কী না, সেই ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারছে না। একবার মনে হচ্ছে ঠিক পথেই চলছে সে। আরেকবার কিছুটা থমকে যে যাচ্ছে না তাও নয়। কিছু কিছু হিসাব কেন যেন মিলতে চাইছে না। সেগুলোকে একটু জুড়ে দিতে পারলেই কিছু একটা সমাধানে আসা যেতে পারে

সারা রাত, আগামীকালকের পুরোদিন পড়ে আছে ভাবনাচিন্তা করার। আগামিকাল শুক্রবার। অফিস ছুটিএকবার শোভনের সাথে শলা পরামর্শ করে নিলে ভালো হয়। কিন্তু পরমুহূর্তেই চিন্তাটা বাতিল করে দিল। আপাতত শোভনকে এর মধ্যে না জড়ালেই ভালো হয়। অনিকই তাকে বিশ্বাস করছে না এখন। শোভনও যদি অবিশ্বাস করে বসে। তার মনেও তো প্রশ্ন জাগতে পারে, ‘কেন সেদিন শান্ত ওদের সাথে বাজারে গেল না? টিভি দেখাটা কি ফাঁকা অযুহাত ছিল তবে?’ প্রশ্ন জাগাটা অস্বাভাবিক কিছু নয় মোটেও।

কাজেই কাউকেই আর ওর সমস্যার মধ্যে জড়িয়ে কাজ নেই। বরং খটকার জায়গাগুলো আনিসুল হককে একবার বলতে পারলে ভালো হতো। কেন যেন মনে হচ্ছে, উনিও ঠিক পথেই এগুচ্ছেন। পুরো ব্যাপারটাকে খুব বেশি না প্যাঁচিয়ে আসল কালপ্রিটকে বের করতে চাইছেন। শান্ত যেসব ব্যাপার চিন্তা করে বের করেছে, সেসব উনাকে বললে হয়ত উনার কাজেই লাগবে। কিন্তু…আগ বাড়িয়ে বেশি আগ্রহ দেখাতে গেলে যদি হিতে বিপরীত হয়? আনিসুল হক তো তাকে সন্দেহও করে বসতে পারেন। নিজে থেকে এত বিভিন্ন জনকে ইনভলভড করলে কাজের কাজটাই হয়ত হবে না!

শান্ত আকাশের দিকে তাকালো। বিকাল সাড়ে পাঁচটা বাজে। সন্ধ্যে হতে এখনো ঢের দেরী। অথচ এরই মধ্যে চারপাশ অন্ধকারে ডুবে আছে। আকাশের রঙ মিশমিশে কালো। মিহি মোলায়েম স্নিগ্ধ বাতাস বইছে। ভেজা দিনের উষ্ণ উদাত্ত আহবান। মনের ভেতরটাও কেন যেন ভিজে যাচ্ছে অকারণে। 

এই বাসাটা নেওয়ার আগেও শান্তর মনের মধ্যে অজস্র সম্ভাবনার পাঁপড়ি একটা একটা করে অবগুন্ঠন খুলছিল। দুই বছর হতে চললো বাসাটা নিয়েছে। বাবা একবার এসেছিল গ্রাম থেকে। ওর বোন সুপ্তি তো মাঝে মাঝেই আসে। এসে সারাদিন ধরে রান্নাবান্না করে। ভাইকে ভালোমন্দ রান্না করে খাওয়ায়। অগোছালো এলোমেলো বাসাটাকে গুছিয়ে গাছিয়ে একটু দেখার মতো অবস্থায় নিয়ে আসে। তারপরে ফুরুত করে চলে যায়। থাকতে বললে মোটেও রাজি হয় না। শান্ত অনেক অনুরোধ করেছে।

‘তুই এখানে থাকলে তো তোর হোস্টেলে থাকার খরচটাও বেঁচে যায়! চলে যাওয়ার জন্য এমন মুখিয়ে থাকিস কেন?’

সুপ্তি ইঁচড়েপাকার মতো হেসে বলে,

‘কেন থাকতে বলিস সেটা কি আমি বুঝি না? আমি এলে তোর প্রতিদিনের মেন্যু ঐ ডাল ডিমভাজি আর আলুভর্তা থেকে নিস্তার মেলে। কাপড়ের ঝুড়িতে ডাঁই করে রাখা নোংরা গন্ধআলা কাপড়গুলো একটু পরিষ্কার ধাতস্থ হতে পারে। এজন্যই এত আবদার আমাকে রাখার। সেটা কি আমি বুঝি না? কিন্তু উঁহু! ওটি হচ্ছে না। এসব কাজ দিনের পর দিন বোনরা করে দেয় না। ভাইয়া… এত করে বলছি। কানেও ঢুকাচ্ছিস না। তুই তো বুড়া হতে চললি! আর কবে বিয়ে করবি? তুই বললে আমিও কিন্তু পাত্রী দেখার কাজটা করতে পারি। খালি বল তুই রাজি আছিস কী না?’

শান্ত বোনকে উল্টা গরম দেখায়পাত্রী দেখার প্রস্তাবটা সুচতুর ভাবে এড়িয়ে যায়। কেন এড়িয়ে যায় নিজেও জানে না। বয়স যে ত্রিশের কোঠা স্পর্শ করেছে দু’বছর হলো, এই খবরটা মনে করতে না চাইলেও মনে হয়ে যায়। বাবাও মাঝে মাঝে ফোনে কথাটা পাড়েনশান্ত চুপ করে থাকে। বিয়ে করার ব্যাপারে এখনো সে প্রস্তুত করতে পারছে না নিজেকে।

মোবাইলটা তারস্বরে বেজে উঠে শান্তর ভাবনার জাল কেটে দেয়। কাছে এসে নাম্বারটা দেখেই অবাক হয়ে যায় শান্ত। এখনই আনিসুল হক সাহেবের কথা ভাবছিল সে। আর ভাবতে ভাবতেই তার ফোন এসে হাজির! ভদ্রলোকের সাথে বেশ আত্মিক যোগাযোগ স্থাপন হয়ে গেল দেখা যাচ্ছে! ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে আনিসুল হকের ভারী কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,

‘শান্ত, আপনি কি এখনই একবার পুলিশস্টেশনে আসতে পারবেন?’

শান্ত আবার আকাশের দিকে তাকালো। ইতিমধ্যে আকাশ ছাপিয়ে বৃষ্টি নেমেছে। এই দুর্যোগে এখনই কীভাবে ওতটা দূর যাবে, বুঝতে পারছে না শান্ত। তবু পুলিশের ডাক বলে কথা! না গেলে তো সন্দেহ করে বসবে। শান্তর ইতঃস্তত ভাব বুঝি বুঝতে পারলেন আনিসুল হক। বললেন,

‘আপনি চাইলে একটা গাড়ি পাঠাতে পারি!’

শান্ত ভয় পেয়ে বললো,

‘ওরে বাবা! পুলিশের গাড়ি! স্যার এমনিতেই ব্যাচেলর মানুষ আমি। বাসা ভাড়া নিয়ে বিপদে আছি। আশেপাশের প্রতিবেশিরা কড়া নজর লাগিয়ে রাখে সবসময়। বাড়িওয়ালা দু’দিন পর পরই এটা সেটা অযুহাতে বাসায় উঁকি মেরে যায়। এখন পুলিশের গাড়িতে চড়তে দেখলে বাড়িওয়ালা আগামীকালই নোটিশ পাঠিয়ে দেবে! আমি আসছি স্যার। যত তাড়াতাড়ি পারা যায়, কিছু একটা নিয়ে আসার চেষ্টা করছি!’

আনিসুল হক হাসলেন। হাসতে হাসতেই বললেন,

‘হাহ হা…এটা অবশ্য ভুল বলোনি। আচ্ছা এসো…আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।’

তাড়াতাড়ির কথা বললেও দেড় ঘণ্টার আগে পুলিশ স্টেশনে পৌঁছাতে পারলো না শান্ত। রাস্তায় এক হাঁটু পানি জমে গেছে। ঢাকা শহরের ড্রেনেজ সিস্টেমের কথা না বলাই ভালো! ইঞ্জিনিয়াররা কি কাজকর্ম কিছু করে না? রাস্তা বানানোর সময়ে প্ল্যান পরিকল্পনা করে নিতে পারে না? একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তায় নৌকা নামানো যায়। বহুকষ্টে একটা সিএনজি ভাড়া করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আসতে পেরেছে শান্ত। 

আনিসুল হক সত্যি সত্যিই শুধু শান্তর জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। নইলে এই বৃষ্টিবাদলার দিনে তারও মন চাইছে বাসায় গিয়ে গরম গরম তেলেভাজা খেতে। 

শান্তকে দেখে তিনি সহাস্যে বললেন,

‘গাড়িটা পাঠিয়ে দিলেই ভালো হতো। কিছুদূর হেঁটে গিয়ে গাড়িতে উঠতেন। তবে এটা ঠিক। পুলিশের গাড়ি দেখলে মানুষ অযথাই নানারকম সন্দেহ করে বসে!’

শান্ত বসতে বসতে বললো,

‘স্যার জরুরি কিছুর কি সন্ধান পেলেন?’

‘হুউউউম…তা পেয়েছি। না বলতে পারছি না। এখন একটা প্রশ্ন ছিল আপনার কাছে।’

‘জি স্যার বলুন। আমার জানা থাকলে নিশ্চয়ই বলবো!’

‘ফরিদুর রেজা কে?’

শান্ত চমকে তাকালো আনিসুল হকের দিকে। আনিসুল হকও একদৃষ্টিতে ওর দিকেই চেয়ে আছেন। মুখে মিটি মিটি হাসি। 

শান্ত মাথা নিচু করে বললো,

‘স্যার আমার নামই ফরিদুর রেজা। ফরিদুর রেজা শান্ত। বাবার নাম শরাফত রেজা। দেশের বাড়ি মতলবপুর গ্রাম, জেলা ফরিদপুর

 

ক্রমশ

 

 

আগের পর্ব ও লেখকের অন্যসব লেখা পড়তে ক্লিক করুন।

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত