| 5 মার্চ 2024
Categories
গল্প ধারাবাহিক সাহিত্য

চোরাকাঁটা (পর্ব-১৫)

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

আনিসুল হকের মুখের হাসিতে খুব ধীরে ধীরে রঙ লাগছে। আস্তে আস্তে তা ছড়িয়ে পড়ছে পুরো মুখময়। সকৌতুকে তিনি চেয়ে আছেন শান্তর দিকে। সেই দৃষ্টিতে কেমন একটা ছেলেমানুষী ভাব ফুটে উঠেছে। যেন সামনে বসে থাকা মানুষটাকে বলতে চাইছেন… ‘কী! করে ফেললাম তো পাকড়াও?’

শান্তর কপালে এরই মধ্যে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠেছে। যেন খুব বড় একটা অন্যায় ধরা পড়ে গেছে কেন যেন সামনে তাকাতে ভীষণ সঙ্কোচ হচ্ছে। আনিসুল হক তাকে এই অস্বস্তি থেকে মুক্তি দিলেন। বললেন,

‘তুমি কি লজ্জা পাচ্ছো, নাকি ভয়… কোনটা? এই দেখো তুমি করে বলে ফেললাম দেখছি!’

‘না না স্যার। তুমি করেই বলুন। আপনার এই ‘আপনি’ সম্বোধনটাতেই অস্বস্তি হচ্ছিলো!’

‘আচ্ছা… ঠিক আছে তবে তুমি করেই বলি। পরিণত বয়সের একজন মানুষকে চট করে তুমি বলা যায় না। তা কী হলো? আমার প্রশ্নের উত্তরটা দিলে না যে!’

শান্ত ভীষণ সঙ্কোচের সঙ্গে বললো,

‘ভয় পাচ্ছি না স্যার, এটুকু অবশ্যই বলতে পারি। কিন্তু কেমন একটা অস্বস্তি লাগছে। আপনি যে কারণে আমার এই পোশাকী নামটা জিজ্ঞেস করলেন, সেই কারণটা অন্য কেউ জানে না। এটা এখন পর্যন্ত শুধু আমি আর সুমনাই জানি!’

‘তুমি কি শিওর এই ব্যাপারে? আমার তো কেন যেন মনে হচ্ছে, তোমার এই ‘বিশেষ’ কারণটা আরো একজন মানুষ জানে। আর সে হচ্ছে অনিক!’

‘অনিক? না না অনিক কীভাবে জানবে? আমি তো কখনো এমন কিছু বলিনি বা করিনি যাতে অনিকের মনে কোনো রকম সন্দেহ হতে পারে! আর সুমনাও তো আমাকে দেখে সন্দেহ করার মতো কিছু করেনি।’

‘ওহ্‌ হ্যাঁ! সুমনা! জিজ্ঞেস করতেই ভুলে গিয়েছি। আচ্ছা, ও কেমন চমকে উঠেছিল? মানে… তোমাকে প্রথমদিন তাদের বাসাতে দেখে সুমনার প্রতিক্রিয়াটা কেমন হয়েছিল?’

শান্ত একটু আনমনা হয়ে গেল এই প্রশ্নে। কী জানি ভাবলো কিছুক্ষণ। তারপর বললো,

‘সুমনা খুব অবাক হয়ে গিয়েছিল। অনিক আমার সাথে ওকে যখন পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলো, কাঁচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। মুখটা একটু ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিল। আমাকে যে ওখানে আশা করেনি, সেটা ওর মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো। হয়ত ভয়ও পাচ্ছিলো। আমি আবার বেফাঁস কিছু বলে ফেলি কী না! অথচ অন্যদের সাথে বেশ ফ্রিলি কথা বলেছিল, এটা মনে আছে ভাগ্য ভালো, অনিক এতকিছু খেয়াল করেনি সেই সময়অন্য বন্ধুরা ছিল। ওদের নিয়েই তখন মেতে ছিল।’

‘সুমনা তোমাকে কিছু বলেনি? বা তুমি কিছু জিজ্ঞেস করোনি ওকে?’

লম্বা করে একটা শ্বাস নিলো শান্ত। তারপর বললো,

‘নাহ্‌! ও আর কী বলবে? আমি তো ইচ্ছে করে ওর কাছ থেকে দূরে সরে থাকিনি। যা করেছি সুমনার নানাজানের নির্দেশ আর ইচ্ছেমাফিকই করেছি। উনার ইচ্ছে ছিল, অবস্থাপন্ন বড় অভিজাত ঘরে সুমনার বিয়ে হোক। যাতে তার মাথা উঁচু থাকে সবসময়। সেটা তিনি চাইতেই পারেন। আমার বাবা তো ছিল গ্রামের সামান্য একজন স্কুল শিক্ষক মাত্র। তাই আমার সাথে সুমনা যাতে কোনোভাবেই যোগাযোগ করতে না পারে, সেই ব্যাপারে উনার কড়া নির্দেশ আর নজরদারী ছিল। আমার বাবাকে উনি হুমকি দিয়েছিলেন। বাবা ভয় পেয়ে গিয়েছিল। জলে বাস করে কুমিরের সাথে বিবাদ করা যায় না। সুমনার নানা গ্রামের প্রচণ্ড অবস্থাপন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি। তার ‘না’ মানে না। সেটাকে হ্যাঁ করতে পারার ক্ষমতা আমার কিংবা আমার ছাপোষা স্কুলশিক্ষক বাবার ছিল না। বাবা তাই আমাকে অনুনয় করে বলেছিল, যাতে আর কখনোই সুমনার সাথে যোগাযোগ না করিআমি আর কী করতে পারি বলুন?’

‘সুমনা পরেও কখনো তোমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেনি এই ব্যাপারে?’

‘আমাদের একবার শুধু সেভাবে কথা হয়েছিল। সব সময় অন্য বন্ধু-বান্ধবরা থাকতো। আমরা কখনো নিজেদের মতো কথা বলতে পারতাম না। একদিন শুধু একটা সুযোগ পেয়ে গিয়েছিলাম। সেই সুযোগটাকেই কাজে লাগিয়েছিলাম। সেদিনই কিছু কথা হয়েছিল আমাদের। কিন্তু কে জানতো, সেটাই আমার কাল হবে।’

শেষের বাক্যটা মুখ ফসকেই বেরিয়ে গিয়েছিল। আর বের হতেই মনে মনে জিভে কামড় দিয়েছে শান্ত। ইদানিং নিজের মুখের ওপরে নিয়ন্ত্রণ থাকছে না। এটা ভালো কথা নয়!

এই গত দু’বারের রুটিন জিজ্ঞাসাবাদে আনিসুল হক একবারের জন্যও রুমানার প্রসঙ্গ সামনে আনেননি। আর শান্তও সুকৌশলে সেদিকের পথ মাড়ায়নি। শান্ত জানতো, কিছু বলার হলে আনিসুল হকই বলবেন। ওর বলার দরকার কী! কিন্তু আজকে সে নিজেই সেই পথটাকে সামনে নিয়ে এলো। এখনই শুরু হয়ে যাবে প্রশ্নের পর প্রশ্ন! কে জানে সন্দেহও করে বসে কী না!

আনিসুল হক সামনে ঝুঁকে পড়ে চোখদুটোকে কুঁচকে শান্তর প্রত্যাশা মোতাবেকই প্রশ্নটা করলেন,

‘কাল হবে মানে? কীসের কথা বলছো? কোনো ঝামেলা হয়েছে নাকি?’

শান্ত ফ্যাসাদে পড়লো। ইনিয়ে বিনিয়ে প্রসঙ্গ ঘুরাতে চেষ্টা করলো। লাভ হলো না। পুলিশ ছুঁলে ছত্রিশ ঘা এই কথার মানে যে কী, আজ সে বুঝতে পারলো। আনিসুল হক গম্ভীরভাবে বললেন,

‘আমাকে সবকিছু খুলে বলো শান্ত। কোনো কথা গোপন রাখলে কিন্তু তোমাকেই ভুগতে হবে। আর আরেকটা কথা। এই যে তোমাকে এতসব জিজ্ঞাসাবাদ করছি, তোমার জানতে ইচ্ছে করছে না কেন করছি এসব? এমনি এমনি পুলিশ কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে ডেকে আনে নাকি? তোমার কী ধারণা বলো দেখি! তুমি কিন্তু এই দুইবারের কথাবার্তায় একবারের জন্যও কিছু জানতে চাওনি! ব্যাপারটা কি আমার চোখ এড়ায়নি মনে করেছো?’

আনিসুল হক আবার কৌতুকভরা চোখে তাকালেন শান্তর দিকে। বোঝা যাচ্ছে, ছেলেটা শান্ত গোছেরই। একে নাড়াচাড়া করতে বেশ আমোদ লাগছে কেন যেন! ঘোড়েল লোকজন দেখতে দেখতে চোখে ছানি পড়ার যোগাড় হয়েছে। দু’একটা নীরিহ মানুষের সাথে মাঝে সাঝে সাক্ষাৎ হলে বেশ একটা প্রফুল্লতা আসে মনে। 

এদিকে শান্তর অবস্থা শোচনীয়। সে আরেকটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করলো। বিষণ্ন মুখে বললো,

‘আপনি তো নিশ্চয়ই সবকিছুই জানেন স্যার। আর আমিও ঘটনাচক্রে ব্যাপারটা জানতে পেরেছি। তাই আপনি যে আমাকে ডেকে পাঠাবেন সেটাও আন্দাজ করেছিলাম। রুমানা… মানে সুমনার ছোটবোনটা নাকি প্রেগন্যাণ্ট, এই খবরটা আমাকে দিয়েছিল আমাদের আরেক বন্ধু শোভন। শোভন কীভাবে কার কাছ থেকে জেনেছে, সেই ব্যাপারে আমি কিছু জানতাম না। অনিক বললো সম্ভবত রিয়াজের মাধ্যমে শোভন জেনেছে। আর রিয়াজকে জানিয়েছে অনিক।

তবে সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, অনিক এই ঘটনাতে আমাকে সন্দেহ করছে। আমি নাকি এর সাথে জড়িত। স্যার, সত্যি বলছি এমন জঘন্য কথা আমি ভাবতেও পারি না। আমি কখনো কোনো মেয়ের সম্পর্কে এমন কিছু কল্পনাতেও আনিনি। অথচ অনিক আমাকেই এমন সন্দেহ করে বসলো! আর সেটাও করলো সেই সেদিনের ঘটনার কারণে। যেদিন আমি আর শোভন সন্ধ্যের সময় ওদের বাসাতে গিয়েছিলাম। শোভন আর অনিক বাইরে গিয়েছিল। আমি বাসাতে থেকে গিয়েছিলাম। সুমনা আর রুমানাও বাসাতে ছিল। আমি টিভিতে একটা প্রোগ্রাম দেখার জন্য থেকে গিয়েছিলাম। সেটা দেখছিলামও। সুমনাই হঠাৎ ঘরে এসে আমার সাথে কথা বলতে শুরু করলো…।’

আনিসুল হক এই পর্যায়ে শান্তকে থামালেন। বললেন,

‘অনিক কি তোমাকে কিছু বলেছে? কবে বললো?’

আর পালানোর উপায় নেই। শান্ত বুঝতে পারছে, সে আর সবসময় শান্ত থাকতে পারছে না। মাঝেমাঝেই অশান্ত হয়ে যাচ্ছে। এই কথা তার আগ বাড়িয়ে বলাটা একেবারেই ঠিক হলো না।

‘স্যার, অনিকের সাথে আমার কথা হয়েছে, যেদিন আপনার সাথে আমার প্রথম কথা হয়েছে সেই দিনই। আসলে দোষটা আমারই। আমিই একজনের ব্যাপারে…ইয়ে মানে…সন্দেহ করছিলাম। সেই কথাই অনিককে বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু অনিক আমার কোনো কথাই মন দিয়ে শুনলো না। উল্টা আমার ঘাড়েই সব দোষ চাপিয়ে দিলো। সবকিছু নাকি আমিই ঘটিয়েছি আর সেটাও সেইদিনই। আচ্ছা এটা কীভাবে সম্ভব বলুন তো? অনিকের মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে? সুমনার উপস্থিতিতে আমি ওর বোনের সাথে…ছিঃ ছিঃ!’

আনিসুল হক কিছু বললেন না। ‘হুউম’ বলে একটা শব্দ করলেন শুধু। তারপর কী মনে পড়তেই আবার জিজ্ঞেস করলেন,

‘কাকে সন্দেহ করেছো তুমি? কার কথা বলতে চেয়েছিলে?’

শান্ত মাথা নিচু করে বললো,

‘আমাদের এক বন্ধু আছে রিয়াজ। বড়লোক বাবার বিগড়ে যাওয়া ছেলে। রিয়াজকে আমার সন্দেহ হয়। ওর মুখ খুব খারাপ। মেয়েদের নোংরা চোখে দেখে। আজেবাজে কথা বলে। প্রথমদিন রুমানাকে দেখেও খুব নোংরা কথা বলেছিল। ওর পক্ষে অনেক কিছুই করা সম্ভব। আমি ভেবেছিলাম, রিয়াজের কথা বললে অনিক মন দিয়ে শুনবে। বিষয়টা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করবে। সেটা তো করলোই না…উল্টা আমাকেই দোষী বানিয়ে দিলো।’ 

এরপর গেট টুগেদারের দিন রিয়াজের সেই নীচে নামার ব্যাপারটা আদ্যোপান্ত খুলে বললো শান্ত। আনিসুল হক চুপ করে শুনলেন। তারপর বললেন,

‘অনিক রিয়াজের চেয়ে তোমাকে কেন বেশি সন্দেহ করছে? ও কি সুমনার সাথে তোমার অতীত সম্পর্কের বিষয়টা জেনে গেছে? সেটারই কোনো পাল্টা রিভেঞ্জ বা এই জাতীয় কিছু?’

শান্ত কাঁধ নাড়ালো। বললো,

‘এটা যে আমারও মনে আসছে না তা নয়। আর একটা জিনিস মনে হয়ে বেশি খারাপ লাগছে। অনিক যেন প্রকৃত অপরাধীকে ধরতে তেমন আগ্রহী নয়বরং আমাকে ফাঁসানোর দিকেই ওর মনোযোগটা বেশি। কিন্তু আমি যদ্দুর জানি, আমার আর সুমনার ব্যাপারটা অনিক সম্ভবত জানে নাসুমনা বেশ বুদ্ধিমত্তার সাথে ব্যাপারটা সামলে নিয়েছেও কিছু বুঝতে দিবে বলে আমার মনে হয় না। আর তাছাড়া… সেই কতদিন আগের কথা! সুমনা তখন একেবারেই ইমম্যাচুউরড ছিল। বন্ধুত্বের মতো কিছু একটা তৈরি হয়েছিল আমাদের মধ্যে। খুব বেশি কিছু তো নয়! এতদিন বাদে সেসব আবেগ টাবেগ কোথায় হারিয়ে গেছে।’

‘তাই? তাহলে সেদিন সুমনা কী বলেছিল তোমাকে? চিনতে পারছে না এমন কিছু কি বলেছিল?’

শান্ত হেসে ফেললো। বললো,

‘নাহ্‌ ঠিক তা বলেনি। এই কেমন আছি, কী করছি এখন… এসবই জিজ্ঞেস করেছিল। প্রথমদিন আমাকে অনিকের সাথে দেখে খুব অবাক হয়েছিল সেকথাও বলছিল।’

‘অবাক তো হওয়ারই কথা। তুমি অবাক হওনি, সুমনাকে অনিকের স্ত্রী হিসেবে দেখে?’

‘সত্যি কথা বলতে কী, আমি জানতাম সুমনার সাথে অনিকের বিয়ে হয়েছে। অনিকই তার হবু স্ত্রীর ছবি আমাদের বন্ধুদেরকে দেখিয়েছিল। মেয়ে কোথাকার…সবকিছুই বলেছিল। তখন থেকেই আমি জানি।’

‘ছবি দেখে জানবে কেন শুধু? বিয়েতে যাওনি?’

‘নাহ্‌। এটা ভারী অবাক হওয়ার মতো একটা ব্যাপার। অনিকের বিয়ের কোনো অনুষ্ঠান হয়নি। ওর রেজিস্ট্রি ম্যারেজ হয়েছে।’

‘বল কী! কিন্তু কেন? এত বড় পরিবারের ছেলের বিয়েতে কোনো অনুষ্ঠান হয়নি? তা কী করে হয়? সুমনার নানারও তো এটা মেনে নেওয়ার কথা নয়!’

‘এত কিছু জানি না। তবে অনিকের বাবার সাথে অনিকের একটা গণ্ডগোল আছে সম্ভবত। এই গণ্ডগোল ঠিক কবে থেকে আমরা জানি না। আগে তো সবকিছু ঠিকই ছিল। আমরা ওদের বাসাতে যেতাম। আংকেল আন্টি খুব খুশি হতেন আমাদের দেখে। কিন্তু…এখন অনিক ঢাকায় থেকেও ওর বাবা-মার সাথে থাকে না। বিষয়টা একটু কেমন কেমন যেন লাগে।’

বিষয়টা নিয়ে আনিসুল হকের মনেও কম দ্বন্দ্ব নেই। এখন বুঝতে পারলেন, অনিকের বন্ধু বান্ধবদের কাছেও এটা স্বাভাবিক মনে হয়নি। তিনি মনে মনে অবাক হলেন এই ভেবে, ফজলুল আহমেদ ভুলেও এসব বিষয়ে কিছু বলেননি। অবশ্য বাইরের কারো কাছে বাসার সমস্যার কথা বলারও কারণ নেই। কিন্তু বাবা-ছেলের এই বিভেদের কারণটা কী?

আনিসুল হক জিজ্ঞেস করলেন,

‘অনিক ওর বাবা-মার কথা কি কখনো গল্প করে না তোমাদের কাছে?’

‘নাহ্‌! সেভাবে কখনো বলেনিঅবশ্য আমরাও অযাচিত ভাবে জিজ্ঞেস করিনি কখনো।’ 

আনিসুল হক প্রসঙ্গ পাল্টালেন।

‘রিয়াজের সাথে অনিকের সম্পর্ক কেমন? বেশি ভালো? ও রিয়াজকে সন্দেহ করছে না কেন? রিয়াজের কথাবার্তা আর গেট টুগেদারের দিনের যে ঘটনার কথা বললে সেটা শোনার পরেও কেন…?’

‘রিয়াজের সাথে আমাদের বন্ধুদের কারো সম্পর্কই তেমন ভালো না। আমরা বন্ধুরা কেউ-ই আসলে রিয়াজকে পছন্দ করি না। ও অনেকটা গায়ের জোরে আমাদের গ্রুপে এসে জুড়েছে। নিজের বাবার প্রভাব খাঁটিয়ে আমাদের ওপরে মাস্তানী ফলায়। অনিকও ওকে তেমন একটা পাত্তা দিত না। মাঝে মাঝে তো কড়া ভাষায় কড়কেও দিত। কিন্তু ট্রেনের ঐ দিনটার পর থেকে আমি অনিককে কোনোদিন আর রিয়াজকে কড়া ভাষায় কিছু বলতে শুনিনি। অনিক যেন রিয়াজকে কিছুটা ভয় পেত এর পর থেকে!’

আনিসুল হক আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। শান্তকে হাসিমুখে বললেন,

‘আচ্ছা এবার তাহলে আসতে পারো। আমি দুঃখিত বার বার তোমাকে বিরক্ত করছি। পুলিশের কাজই হচ্ছে বিরক্ত করা। ওহ্‌…ভালো কথা…তুমি কি সুমনাকে কখনো কোনো চিঠি লিখেছিলে? কিংবা কোনো ছবি তুলেছিলে দুজন? অথবা তোমার কোনো ছবি কি আছে সুমনার কাছে? মানে, এমন কিছু কি আছে যাতে তোমাদের দুজনের আগের সম্পর্কের কথাটা অনিক বুঝতে পারে?

শান্ত কিছুক্ষণ সময় নিল উত্তর দিতে। তারপর বললো,

‘চিঠির কথাটা মনে নেই। ওহ না না … মনে পড়েছে। একবার সম্ভবত একটা চিঠি লিখেছিলাম। গ্রামের ওর এক ক্লাসমেটের ঠিকানায়। ওর সেই বান্ধবীর বাড়ি আমাদের বাড়ির পাশেই। চিঠিটা ওকে সুমনার কাছে পৌঁছে দিতে বলেছিলাম।’

‘হুম। আর ছবি? ছবি তোলোনি কখনো?’

‘হাতে মোবাইল ফোন ছিল। কিছু তো তুলেইছি। কিন্তু সুমনার কাছে তো নিশ্চয়ই সেই ফোন এখন আর নেই।’

‘তা না থাকুক। কিন্তু মেয়েরা এসব প্রথম প্রেমের স্মৃতি অনেক যত্নে আগলে রাখে। হয়ত পুরনো কোনো ডায়েরির ভাঁজে কিংবা নিজের মেকআপ বক্সের সুরক্ষিত কোনো জায়গায়। যেখানেই রাখুক না কেন, এ হচ্ছে চাপা আগুন। ধোঁয়া ছাড়বেই! কাজেই অনিকের চোখে সেই ধোঁয়ার দমক আসাটা অসম্ভব বলে ভাবছি না আমি। 

হুউম…তাহলে এই হচ্ছে মাজেজা! তোমার সাথে সুমনার সম্পর্ক ছিল এই খবরটা অনিক জানে। এই কারণেই সে তোমার ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে সুমনার চোখে তোমাকে খারাপ প্রমাণ করতে চাইছেঅন্য কোনো কারণে নয়। এখন বাসায় গিয়ে ঘুম দাও। আমি তোমাকে আপাতত সন্দেহ করছি না।’

শান্ত কৃতজ্ঞতার হাসি হাসলো। বিরাট বড় একটা বোঝা যেন নেমে গেল নিজের ঘাড় থেকে। সেই সাথে নিজের গোয়েন্দা বুদ্ধির জন্য নিজের পিঠকেই কয়েকবার চাপড়ে দিল। ঠিক পথেই তাহলে সেও এগুচ্ছিল। 

আনিসুল হক অনিকের দেওয়া কাগজের টুকরোটা বের করলেন। তিনটি নামের একটা কেটে দিলেন। ফরিদুর রেজা শান্তকে আপাতত সন্দেহের আওতায় রাখছেন না তিনি। বাকি দুটো নামে টিক চিহ্ন দিয়ে রাখলেন। শোভন আর রিয়াজ। মনে মনে হাসলেন আনিসুল হক। শান্তকে উলটাপালটা ভুজুংভাজুং শুনিয়ে ঘাবড়ে দিলেও রিয়াজকেও কিন্তু তালিকা থেকে বাদ রাখেনি অনিক। তাকে রেখেছে তালিকার দুই নাম্বারে। শোভন তো অনিকের সাথে বাইরেই চলে গিয়েছিল সেদিন। কাজেই শোভন কিছুটা কম সন্দেহের আওতায়। তবু এমনি একবার ডাকা যেতে পারে। তার বক্তব্যে আলাদা কিছু আছে কী না সেটাও জানা দরকার। এখন বাদ থাকলো রিয়াজ। জরুরি ভিত্তিতে এই রিয়াজকে তলব করতে হবেদেখা যাক, তার পেট থেকে কী কী বের হয়। ঘটনা পরম্পরায় বোঝা যাচ্ছে, তার পেট থেকে আলাদীনের চেরাগ বের না হয়ে যাবেই না!

 

ক্রমশ

 

 

আগের পর্ব ও লেখকের অন্যসব লেখা পড়তে ক্লিক করুন।

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত