| 22 এপ্রিল 2024
Categories
গল্প ধারাবাহিক সাহিত্য

চোরাকাঁটা (পর্ব-১৮)

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

হঠাৎ ড্রয়িংরুম থেকে অনিকের মোবাইলটা তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো। একদিকে সুমনার কান্না, আরেকদিকে রুমানার গুনগুন, আবার এদিকে মোবাইলে চিৎকার। অনিক বিরক্তি চাপতে চাপতে মোবাইলটাকেই সামলাতে গেল।

ফোন এসেছে আনিসুল হকের কাছ থেকে। অনিকের ভ্রু কুঁচকে গেল। ইনি আবার এই অসময়ে কেন? এত তাড়াতাড়ি আসামী পাকড়াও করে ফেলেছে তো বলে মনে হচ্ছে না। তাহলে যখন তখন এই উটকো জ্বালাতন কেন? নিজেই যে তার কাছে গিয়েছিল, এই কথাটা আর মনে থাকলো না অনিকের। উষ্মাভরা মন নিয়ে ফোনটা রিসিভ করলো। অপরপাশে আনিসুল হকের আওয়াজ আজ বেশ ঠান্ডা। আশ্চর্যরকম নিরাসক্ত গলায় বললেন,

‘অনিক তুমি এখনই একটু পুলিশ স্টেশনে চলে এসো তো। বেশি দেরি করো না। তোমার গাড়ি আছে তো? নইলে আমি আমার গাড়িটাও পাঠিয়ে দিতে পারি। আর হ্যাঁ, তোমার স্ত্রীকেও একটু সঙ্গে নিয়ে এসো। ইয়ে… আসামী সনাক্ত করতে হবে। একেবারে হাতে নাতে ধরে এনেছি।’

অনিক বিষম খেলো। আসামী সনাক্ত করতে হবে মানে? আসামী ধরে এনে পুলিশস্টেশনে বসিয়ে রেখেছে? কৌতুক বোধ করলো অনিক। আনিসুল হক আংকেল তো ভালোই খেল দেখালেন! অনিক তো সত্যিই এতটা নৈপুণ্য আশা করেনি। আনন্দিত কণ্ঠস্বরে সে বললো,

‘কী বলেন! সত্যি নাকি? এত তাড়াতাড়ি ধরে ফেললেন? কিন্তু… কে বলুন তো? খুব কৌতুহল হচ্ছে। আটকাতে পারছি না কৌতুহল।’

‘কেন? এত কৌতুহলের কী হলো অনিক? এ তো আর খড়ের গাদায় সুঁচ খোঁজা নয়। মাত্র কয়েকজনের মধ্যে থেকে আসল কালপ্রিটকে ধরে আনতে হবে। তোমার বাসায় তেমন কেউ আসতো না, তোমার বন্ধু বান্ধবরা ছাড়া। তুমি নিজেই বলেছো সেকথা! দু’একবার তুমি নিজে স্ত্রী আর শ্যালিকাকে নিয়ে তোমার বাবার বাসায় গিয়েছো, তাদের দোয়া বা আশীর্বাদ নিয়ে আসার জন্য। সেখানে হয়ত কিছু সময় ছিলে তোমরা। যদিও এই ব্যাপারে আমাকে খুলেমেলে কিছু বলোনি তোমরা বাপ ছেলে। তবু পুলিশের লেজ তো বাঁকা, বুঝোই তো।! কেউ খুলতে না চাইলে পুলিশ নিজেই সেটাকে খোলার দায়িত্ব নেয়। যাকগে। এখন আসা যাক তোমার শ্যালিকার প্রসঙ্গে।

তোমার শ্যালিকা যেহেতু স্বাভাবিক নয়, কাজেই তার জীবনে অন্য কোনো পুরুষও নেই যে এমন একটা ঘটনা ঘটাতে পারে। আর তাছাড়া সে এরমধ্যে কোথাও যায়নিও। কাজেই তার দিক থেকে মামলা ক্লিয়ার। তুমি নিজে তোমার তিনজন বন্ধুকে সন্দেহের তালিকায় রেখেছো। তোমার আরো কয়েকজন বন্ধু আছে, যারা নিয়মিতই তোমার বাসায় আসা যাওয়া করে। কাজেই… বুঝতেই পারছো, আসামী এদের বাইরে অন্য কেউ হতেই পারে না।’

অনিক অধৈর্য গলায় বললো,

‘আহ হা! তবুও… না জানা পর্যন্ত তো আর বুঝতে পারছি না কে সে? বলুন না প্লিজ!’

‘এত অধৈর্য হলে কি চলে? চলে এসো। এই তো, আর কিছু সময়ের মধ্যেই পর্দা উন্মোচিত হবে। তোমার স্ত্রীর এই সময়ে থাকাটা জরুরি। আফটার অল তার বোনের একটা সেনসিটিভ ইস্যু। এই সময়ে সে না থাকলে কি চলে?’

‘ও গেলে রুমানা কোথায় থাকবে? রুমানা যদি এত মানুষজন দেখে কান্নাকাটি করে?’

‘সেই সম্ভাবনা কিছুটা থাকলেও আমি সাথে করেই আনতে বলবো।’

অনিক আর কথা বাড়ানোর সুযোগ পেল না। আনিসুল হক ওপাশ থেকে লাইন কেটে দিলেন। সাতপাঁচ অনেককিছু চিন্তা আসছে মাথায়। অযথা কোনো সিনক্রিয়েট না হয়।রুমানাকে নিয়ে যেতে বলছে। রুমানা হুট করে অপরিচিত জায়গায় গিয়ে যদি উল্টাপাল্টা কিছু করে? এমনিতেই এ্যবরশনের পর থেকে সে কিছুটা বিভ্রান্ত অবস্থায় আছে। যখন তখন গুনগুন করে কান্না করে, একা একা হাসে। আজকে কিছু না করলেই হয়।

সুমনাকে পুলিশস্টেশনে নিয়ে যেতে অনেক ঝামেলা পোহাতে হতে পারে, এমনটাই ভেবেছিল অনিক। বিশেষ করে রুমানাকে সাথে নিয়ে যেতে হয়ত সে কিছুতেই রাজি হতে চাইবে না। আনিসুল হক আংকেল এত জোর দিয়ে বলেছেন যে, সুমনাকে নিয়ে না গেলে হয়ত রাগই করে বসবেন। এমনিতেই পুলিশকে এই বিষয়টা জানানো নিয়ে সুমনার অনেক দ্বিধা ছিল। রুমানার সম্মানের দিকটা নিয়ে সে ইনসিকিউরিটিতে ভুগছিল। এখন এভাবে যেতে চাইবে কী না কে জানে!

বেডরুমের দিকে আবার পা বাড়ালো অনিক। সুমনা ঠিক একইরকম হতবিহবল চোখে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছে। অনিকের মেজাজটা একটু খিঁচড়ালো। সুমনা মাঝে মাঝে অযথা ভাব দেখায়। আশেপাশের কাউকে দেখেও দেখে না। ভালোভাবে কথা বলতেও যেন মুখ ব্যথা করে। অথচ তার বন্ধুদের সাথে কথা বলার সময় হাবভাবই একেবারে পাল্টে যায়। যেন ওরা অনিকের নয়, সুমনারই বন্ধু! আদিখ্যেতা যত্তসব! স্বামীর কাছে ভাব দেখিয়ে পরপুরুষের সঙ্গে ঢলাঢলি।

অনিকের এই জন্যই কেমন যেন একটু সন্দেহ হচ্ছে ইদানিং। তবে কি শান্তর সাথে পুরনো প্রেমটা আবার চাগাড় দিয়ে উঠছে? প্রথম প্রেম নাকি ভোলা যায় না সহজে। চোরাকাঁটার মতো বিঁধে থাকে মনের গহ্বরে।সুমনার পুরনো প্রেম রেখেঢেকে রাখার অদ্ভুত পারদর্শীতা দেখে অন্তত সন্দেহের চোরাকাঁটা থেকে মুক্তি পাচ্ছে না অনিক। সেজন্যই শান্তকে একটু কড়কে দেওয়াটা দরকার। সেদিন আনিসুল হক আংকেলের কাছে প্রয়োজনের চেয়েও অনেক বেশিই বলেছে শান্ত সম্পর্কে। সন্দেহটা যাতে জোরালো থাকে। শান্তকে একটু দৌঁড়ের ওপরে রাখতে পারলে এদের অতীত প্রেমের নেশা চিরদিনের মতো ছুটে যাবে।

সুমনাকে উদ্দেশ্য করে অনিক বললো,

‘তাড়াতাড়ি একটু রেডি হয়ে নাও, আনিস আংকেল যেতে বলছেন। রুমানার কেসটা নিয়ে সম্ভবত কথা বলবেন। আর রুমানাকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে বলেছেন। অবশ্য আমরা গেলে ওকে তো আর একা বাসায় ফেলে যাওয়া যাবে না।’

সুমনার ভ্রুরেখা একটু কুঞ্চিত হয়েই আবার মিলিয়ে গেল। অনিক ভেবেছিল, হয়ত নানারকম প্রশ্ন করবে সুমনা। এভাবে রুমানাকে নিয়ে নাও যেতে চাইতে পারে। কিন্তু ওর সেই ধারণা মিললো না। সুমনা বেশ সহজেই রাজি হয়ে গেল। ছোট করে শুধু বললো, ‘রেডি হয়ে নিচ্ছি। তুমি গাড়ি বের কর।’

সুমনার ভাবভঙ্গি অচেনা ঠেকছে অনিকের। মাঝে মাঝে কী যে হয়! ছোটবোনের অসুস্থতার ছিটেফোঁটা ওর মধ্যেও নেই তো? ইদানিং এই আশঙ্কাও একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছে না অনিক। বলা যায় না, বংশের অসুখ বলে কথা। ব্যামোটা তো আসলেই মাথারই। মাথা থেকে মন। মন থেকে মানসিক।

রুমানাও সুবোধ বালিকার মতো রেডি হয়ে নিল। মুখে টুঁ শব্দটিও নেই। অনিকের দিকে নিস্পৃহচোখে একবার তাকালো। রুমানার আচার আচরণে অদ্ভুত একটা স্থিরতা দেখা যাচ্ছে আজকাল। কেমন যেন বুঝদার বুঝদার একটা ভাব। অনিক অল্প একটু হাসলো ওকে দেখে। রুমানার মুখভাব পাল্টালো না। বরং আরেকটু যেন শক্ত হয়ে গেল। আর সুমনা তো সেই তখন থেকেই কাষ্ঠমানবী হয়ে আছে। অনিক জিজ্ঞেস না করে পারলো না,

‘তখন থেকেই দেখছি গুম হয়ে আছো। কী হয়েছে তোমার? কেউ কিছু বলেছে নাকি?’

‘নাহ, কে কী বলবে?’

‘তাহলে কথা বলছো না কেন? কিছুই জানতে চাইলে না। জাস্ট বললাম ‘’চলো’’, ওমনি কোনো প্রশ্ন না করেই রেডি হয়ে নিলে।জানতে ইচ্ছে করছে না, কেন এভাবে হুট করে যেতে বললো আমাদের?’

‘সবসময় কথা বলতে ভালো লাগে না আমার। আর তাছাড়া পুলিশ যখন যেতে বলছে, তখন আর কী বলবে? সেই একই কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়েই বলবে। নতুন কিছু তো আর ঘটেনি। যা ঘটেছে সেটাই এখন সারাজীবন টানতে হবে।’

‘মানে! এসব কথার অর্থ কী? সারাজীবন টানতে হবে কেন? ছোটখাট দুর্ঘটনা ঘটে না জীবনে? তাই বলে কি কেউ সেটাকে সারাজীবন টেনে নিয়ে চলে?’

‘কেউ হয়ত চলে না… কিন্তু কাউকে কাউকে সারাজীবনই টানতে হয়।’

অনিক আর কথা বাড়ালো না। সুমনার সাথে কথা বলতে আজ আর ইচ্ছে করছে না। সে যখন এই বিশেষ ভাব নেয়, তখন পুরোপুরি অন্য দুনিয়ায় চলে যায়। সেই সময় তার মুখ থেকে বিচিত্র এক অজানা দুনিয়ার জ্ঞানগর্ভ সব কথাবার্তা উঠে আসে। এখন আনিসুল হক আংকেল কী জন্যে গুষ্টিশুদ্ধু যেতে বললেন কে জানে! অনিক মোটামুটি শতভাগ নিশ্চিত, উনি কিছুই বের করতে পারেননি। এত তাড়াতাড়ি দু’একজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেই উনি সব বুঝে গেলেন, এটা কিছুতেই হতে পারে না। যাহোক, যত দেরি হয় হোক। শান্ত ততদিন একটু অশান্ত অবস্থায় দিন কাটাক। অনিক তো সেটাই চায়। হারামজাদা ভন্ড একটা! সাধুর বেশ ধরে বসে আছে। অনিকের মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে, এক ঘুষিতে নাক উড়িয়ে দেয় ব্যাটার। সুমনার নীরবতাও অসহ্য। অক্ষম আক্রোশে রাগে হাত পা নিশপিশ করতে থাকে অনিকের। চারপাশটা মাঝে মাঝে কেমন গুমোট হয়ে আসে।

তখনই মনটা উড়াল দেয় অন্য কোথাও। ইচ্ছে করে শান্তির সন্ধানে কোথাও থেকে একটু ঘুরে আসে। সবকিছু ভুলে কিছুদিন মাতাল নেশায় দিন কাটুক। কিন্তু বিবাহিত’র তকমা লাগাতে হয়েছে শরীরে। খানিকটা ইচ্ছায়, খানিকটা বাধ্য-বাধকতায়। চাইলেও আগের মতো আর বেহিসাবী হওয়া যায় না। অথচ এই তো সুবর্ণ সুযোগ ছিল হিসাবের বাইরে কিছু সময় কাটানোর। বাবা-মা’র গণ্ডী থেকে বেরিয়ে, ক্যাডেট কলেজের ছকবাঁধা জীবন থেকে বহুদূরে সরে এসে এখন তো একেবারে ঝাড়া হাত- পা। পকেটটাও গরম থাকে সবসময়। কখনও পকেটের গরম ঠান্ডা মেরে গেলেও চিন্তার কিছু নেই। চাইলেই গরম পাত্তির সন্ধান জানা আছে। সুমনার নানা তো তার সাথে সেই মূল্য চুকাতেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ! জমিদারের বংশধরকে কি চাইলেই হাতের মুঠোয় ধরা যায়? ধরা যায় তখনই, যখন তাকে উপযুক্ত মূল্য দিতে অপরপক্ষের কোনো আপত্তি না থাকে!

এত বিপুল স্বাধীনতা সবখানে। তবুও আঁটসাঁট ভালোমানুষ হয়ে বসে থাকা কেন কে জানে!

 

গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করার জন্য পা বাড়িয়েছিল অনিক। এমন সময়ে আবার বেজে উঠলো মোবাইল। ওটাকে চার্জে বসিয়ে নিচে যাচ্ছিল সে। বিরক্তিসূচক একটা শব্দ করে ফোনের দিকে পা বাড়ালো। কাছে গিয়ে অবাক হয়ে দেখলো, তার বাবা ফোন করেছে। খুব অবাক হলো অনিক। বাবার সাথে বেশ অনেকদিন কোনোরকম কথাবার্তাই হয় না তার। বাবার নীরবতাতেই ইদানিং অভ্যস্ততা চলে এসেছে। নিজে থেকে ফোন করলেই অবাক হতে হয়।

ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে গমগমে আওয়াজে বাবা বললো,

‘হ্যালো…’

‘হুউম, শুনতে পাচ্ছি। বল।’

‘কেমন আছিস?’

অনিকের বিস্ময় কাটে না। বাবা তার কুশলাদি জানতে চাইছে!

‘আমি ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?’

বাবা খুক খুক করে কাশে কিছুক্ষণ। তারপর খুব ধীরগলায় বলে,

‘তোর মায়ের শরীরটা বেশি ভালো না। একবার দেখা করতে পারবি?’

‘কী হয়েছে মা’র? কিছু তো বলোনি আগে!’

অনিক মন থেকেই উদ্বেগ দেখায়। মা’র জায়গাটা এখনো অন্যরকম উচ্চতায়। মার অসুখের কথা শুনলে আর চুপ করে বসে থাকা যায় না।

‘হুউম… একটু খারাপই হয়েছে শরীরটা। প্রেসারটা বেড়েছে। বুক ব্যথার কথাও বলছিল। তুই একবার আসতে পারবি?’

অনিক অস্থির হয়ে ওঠে। পুলিশস্টেশনে যাওয়ার কথাটা আর মাথায় থাকে না। শশব্যস্ত হয়ে বলে ওঠে,

‘আমি এক্ষুণি আসছি!’

‘আয়…তোর মাকে ফোন দিস না যেন! একটু ঘুমিয়েছে। ফোনের আওয়াজ শুনলেই জেগে যাবে।’

ওপাশ থেকে ফোনটা রেখে দিয়ে ফজলুল আহমেদ কান পেতে রান্নাঘরের আওয়াজ শোনেন। টুংটাং আওয়াজ ভেসে আসছে রান্নাঘর থেকে। ফ্রাইপ্যানে কিছু একটা ভাজা হচ্ছে। সুন্দর একটা গন্ধ ভেসে আসছে। কীসের যেন ফোঁড়ন দিয়েছে রান্নায়। মিষ্টি গন্ধে পুরো ঘর মৌ মৌ করছে। নুরজাহান বানু মনের আনন্দে রান্নাবান্না করছেন। আজ তিনি কাজের মেয়েদের রান্না করতে দিবেন না। ফজলুল আহমেদ তাকে জানিয়েছেন, আজ অনিক আসবে। মায়ের অসুস্থতার কথা শুনলে অনিক ছুটে আসবেই, এটা জানতেন তিনি।

মায়ের মন। ছেলের আসার খবর শুনেই রান্নাঘরে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। আজ অনিকের প্রিয় সব খাবার রান্না হবে।

জানালার পাশে সরে এলেন ফজলুল আহমেদ। আকাশটা মেঘলা হয়ে আছে। খুব জোরে বৃষ্টি নামবে মনে হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতি কেমন যেন আশ্চর্য রকমের গুমোট। একটা গাছের পাতাও নড়ছে না। আসন্ন প্রবল বর্ষণের জন্য সবকিছু বুঝি থমথমে মুখে অপেক্ষা করছে। বৃষ্টিতে ধুয়ে মুছে যাক যত গ্লানি…মন থেকে সকাতর প্রার্থনা প্রকৃতির। অথচ এই বৃষ্টিকে স্বাগত জানাতে সেই প্রকৃতির বুকেই জমে কত অজস্র বেদনার ভার!

ঢাকার আবহাওয়ার সাথে আজ অব্দি নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেননি ফজলুল আহমেদ। সেই ছাত্রজীবন থেকেই পালাই পালাই মন নিয়েই বাস করে গিয়েছেন এখানে। তখন তো তবু ছুটি পেলেই উড়াল দিতে পারার একটা আস্তানা ছিল। এখন কী -ই বা ছুটি আর কীসেরই বা মুক্তি! এখানেই রচিত হবে অবশিষ্ট জীবনের বন্দি আলাপন।

দেওয়ালে ঝোলানো ঘড়িটার দিকে একবার তাকালেন ফজলুল আহমেদ। অনিক কি রওয়ানা দিয়ে ফেলেছে? কতক্ষণ লাগতে পারে ওর আসতে…আনুমানিক?

অনিক তখন রওয়ানা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সুমনার বিস্মিত মুখে নানারকম ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া চলছিল। চোখেমুখে অজস্র জিজ্ঞাসার আঁকিবুকি। অথচ মুখে কোনো ভাষা ছিল না। সুমনা জানতো, তার কিছু বলাটাই বাহুল্য। জানানোর কিছু থাকলে অনিক নিজেই জানাবে সেটা। সুমনার অনুমান কিছুক্ষণের মধ্যেই সত্যিতে পরিণত হলো। তার দিকে তাকিয়ে অনিক বোকার মতো একটা ভঙ্গি করলো। মুখে একটা হাসির রেখা ফুটিয়ে তোলার ব্যর্থ চেষ্টা করলো কিছুক্ষণ। তারপর মাথা নীচু করে বাসা থেকে বেরুতে বেরুতে বললো,

‘মা অসুস্থ। বাবা ফোন করেছিল। আজ আর পুলিশস্টেশনে যেতে পারবো না। আনিস আংকেল যেতে বলেছিলেন। কী জানি কী বলতেন আজকে! হয়ত আমাদের থাকাটা জরুরি ছিল। উনাকে ফোন করে দিব যে… না থাক! কিছু বলার দরকার নেই। বললেই আবার পুলিশস্টেশনে যেতে জোর করবেন। তোমরা বাসাতেই থাকো। আমি পৌঁছে জানাবো, মা কেমন আছে… যাচ্ছি আমি…সাবধানে থেকো দরজা বন্ধ রেখো…।’

অনিকের গলার স্বর সিঁড়ির নীচের ধাপগুলোতে মিলিয়ে গেল। তার অপসৃয়মান অবয়বটার দিকে তাকিয়ে থেকে প্রায় নিঃশব্দে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো সুমনার ভেতর থেকে। তারপর সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে ভুগতে মোবাইলটা হাতে নিয়ে ডায়াল করলো একটা নির্দিষ্ট নাম্বারে। গত বেশ কয়েকদিন যাবত এই নাম্বারটা তার লগলিস্টে একেবারে প্রথমে অবস্থান করছে।

ক্রমশ

 

 

আগের পর্ব ও লেখকের অন্যসব লেখা পড়তে ক্লিক করুন।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত