| 23 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
গল্প ধারাবাহিক সাহিত্য

চোরাকাঁটা (পর্ব-২২)

আনুমানিক পঠনকাল: 10 মিনিট

আনিসুল হক সরকারী বাসভবন ছেড়ে দিয়ে ধানমন্ডিতে নিজের কেনা ফ্ল্যাটে উঠেছেন। সেখানেই আজ অনিক আর সুমনাকে আসতে বলেছেন তিনি। ঠিকানাটা বার বার ফোনে বলে দিয়ে মুখস্থ করিয়ে নিয়েছেন। ওরা আসছে কী না, সকালে ফোন করে সেই ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়েছেন। 

শান্ত আর সুমনা আসার ব্যাপারে কোনো আপত্তি করেনি। বয়স্ক একজন মানুষ যিনি কী না সুমনার সেই চরম দুঃসময়ে সম্পূর্ণ অযাচিতের মতো পাশে থেকে সাহস দিয়েছেন, নতুন করে বাঁচার হিম্মত জুগিয়েছেন…তার আমন্ত্রণে সাড়া না দেওয়ার মতো অমানুষ কোনোদিনও ছিল না সুমনা। আর শান্তও এই মানুষটার কাছে নানাভাবে কৃতজ্ঞতিনি যেভাবে বেশিকিছু না জেনেই প্রতিটি ধাপে শান্তর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তা ভাবলে আজ অবাক না হয়ে পারে না সে। পুলিশের সংজ্ঞা এই মানুষটার কাছে এসে নতুন করে শিখতে হয়েছিল শান্তকে

নানাবাড়ির সেই অনিশ্চিত দিনগুলোতে এটা সেটা অনেক কথাই মনে হতো সুমনার। পায়ের নীচের ভিত কীভাবে শক্ত করা যায়, বিনিদ্র রাত কাটিয়ে দিত সেইসব ভাবনার পিছনে লেগে থেকে। দিনকে দিন রুমানার প্রতি তার নানাজানের অবহেলা আর ঘৃণার নগ্নরূপ প্রকাশ পেতে শুরু করে। আগে সুমনার সামনে অন্তত কিছু বলতে সাহস করতেন না তিনি। সুমনাকে কিছুটা হলেও যেন সমঝে চলতেন লতিফুর রহমান। কিন্তু একসময় সেই চোখের পর্দাটুকুও সরে গেল। সুমনার সামনেই রুমানাকে যা তা ভাষায় কথা শোনাতে শুরু করলেন তিনিঘৃণার তীব্র প্রকাশে খানখান করে দিতে লাগলেন সব শান্তি।

‘ঐ পাগলী সইরা যা সইরা যা আমার সামনে থেইকা! ছেহ্‌ কই থেইকা আইসা আমার দুয়ারেই খাড়াইছে। যা ভাগ! জন্মের পর আমার মাইয়াটারে খাইছেতাও খিদা মেটেনি…আইছে এনে আমার সুখ কাইড়া নিতে! যা যা ছেই ছেই।’

‘ছেই’ শব্দটা সুমনাদের গ্রামে সাধারণত কুকুর বেড়াল তাড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। লতিফুর রহমান অনায়াসেই সেই শব্দটাকে রুমানার জন্য ব্যবহার করতে শুরু করে দিলেন। সুমনার প্রতিবাদেও আর কোনো কাজ হতো না। বেশি শক্তগলায় কিছু বলতে গেলে তার নানাজান নিজের আসল মূর্তি ধারণ করতেন।

‘বেশি তেড়িবেড়ি করলে বাইর হইয়া যা এখান থিইকা। আমি কি পায়ে শিকল পরাইয়া রাখছি? ঢাল নাই তলোয়ার নাই…নিধিরামের সর্দার আইছে। তরে আর পুইষা আমার কীয়ের কাম? আশা করছিলাম ডাক্তার হইবি। এই বাড়ির মুখ রোশনাই করবি। হেইডা মনে লাগলো না। মায়ের রাস্তায় হাঁটা দিলি এমুনই ছোটলোকের জাত! হাভাতের পোলার দিকেই গিয়া চোখ পড়লোতারপর যাও বা ধরপাকড় কইরা জমিদার বংশের বাত্তিরে জুটাইয়া দিলাম, তারেও আগলাইয়া রাখবার পারলি না। উড়াল দিলো। তর কপালের দোষে মইরা গেলো পোলাডা! কয়লার কালির লাগান কপাল লইয়া আমারে উদ্ধার করবার আইছোশ? মাটি কামড়াইয়া থাকবার পারলে থাক…নইলে বিদায় হ! কে থাকবার কইছে তরে? আমার সামনে ফোঁসফাঁস দ্যাখাস!’

সুমনার দিনরাত্রি অসহ্য হয়ে উঠতে লাগলো। সৎনানীর যেটুকু আগল ছিল, সেটুকুও একসময় আলগা হয়ে আসতে লাগলো। তার সৎনানীরই বা আর কতটুকু ক্ষমতা! তিনিও তো এক অথর্ব বিকলাঙ্গ সন্তানের জন্ম দিয়ে দিনরাত তার স্বামীর তোপের মুখে থাকতেন। নিজের চোপার জোর খাটিয়েই বুঝি বহুকষ্টে টিকে আছেন এতগুলো বছরআরো দুইটা অসহায় প্রাণীকেও আগলে আগলে রাখা তার পক্ষেও কঠিন হয়ে উঠলো এক সময়।

সেই ভীষণ দুঃসময়েই একদিন অচেনা একটা নাম্বার থেকে ফোন এলো সুমনার কাছে। 

ঢাকা থেকে চলে আসার পর সুমনার কাছে তেমন একটা ফোন টোন আসতো না। সে নিজেও কাউকে ফোন দিত না। কোনোরকম যোগাযোগ ছিল না কারো সাথে। অবশ্য তার আত্মীয় পরিজন আর কেই বা ছিল, যে তাকে ফোন দিতে পারে? বন্ধু বান্ধবও তো তেমন একটা ছিল না।

অনিকের বন্ধুরা প্রথমদিকে খোঁজখবর রাখতো। টাকা পয়সার প্রয়োজন আছে কী না এমন অবাঞ্ছিত প্রশ্নেরও মুখোমুখি হতে হয়েছিল একসময়। এই অনাহুত সমবেদনা জ্ঞাপন ভালো লাগতো না সুমনার। নিজেকে কারো করুণার পাত্রী ভাবতে কোনোদিনই স্বস্তি বোধ করেনি সে। নিজের কিছু একটা উপার্জনের রাস্তা তৈরির উপায় সে ভেতরে ভেতরে খুঁজতে শুরু করে। ফোন নাম্বার জোগাড় করে দু’একটা এনজিওর সাথে যোগাযোগ করে। তারা অনেক সময় নানারকম কর্মী নিয়োগ করে থাকে। সেরকম কিছু একটা কাজ পেয়ে গেলেও চলে যায় আপাতত। যদিও মনে উৎকণ্ঠা ভর করে থাকতো সবসময়। তার উপস্থিতিতেই নানাজান রুমানার ওপরে চড়াও হচ্ছেন। সে উপার্জনের জন্য বাড়ির বাইরে গেলে রুমানাকে কার ভরসায় রেখে যাবে? নানাজান যে তাকে বিষ খাইয়ে মেরেই ফেলবে না, সেটাই বা কে বলতে পারে? নিজের নানার সম্পর্কে এমন কথা ভাবতে কষ্টে বুক ফেটে যেত সুমনার। কিন্তু না ভেবে উপায়ই বা কী!

কাছের মানুষের কাছ থেকে আঘাত পাওয়ার ঘটনা তো নতুন কিছু নয় তার জীবনে।

অপরিচিত নাম্বার দেখে অবাক হলেও ফোনটা ধরে সুমনা। ওপাশ থেকে চেনা এক কণ্ঠস্বর ভেসে আসে বেশ অনেকদিন পরে।

‘হ্যালো, কে সুমনা বলছো? আমি আনিসুল হক বলছি। চিনতে পারছো? কী ব্যাপার…বলো তো সুমনা? তুমি দেখি আমার নাম্বারটাকে ব্লক করে রেখেছো। কেন কারো সাথে কথা বলতে চাইছো না? শোনো, সেই কেসটার সূত্রে হলেও তুমি তো আংকেল বলে ডেকেছিলে আমাকে। আমি জানি তুমি সব জেনে গেছো। কে তোমার বোনের সর্বনাশ করেছে, কিছুই আর অজানা নেই তোমার। সম্ভবত সেইজন্যই আর কারো মুখোমুখি দাঁড়াতে চাওনি। কিন্তু তুমি যে এখন খুব একটা ভালো নেই সেই খবরটা কিন্তু আমার অজানা নেই সুমনা।’

আনিসুল হক আরো অনেক কিছুই বলেছিলেন। আরো বলেছিলেন শান্তর কথাশান্ত নাকি এখনো সুমনার জন্য অপেক্ষা করতে রাজি আছেখুব অবাক হয়েছিল সুমনা। দুই বছরের সংসার ধর্ম পালন করে আসা একজন বিধবা নারীকে, হোক সে একসময়ের প্রেমিকা…তাকেও যে কেউ বিয়ে করতে আগ্রহী হতে পারে এটা জানা ছিল না সুমনার। শান্ত এসব করে মহৎ সাজতে চাইছে না তো তার কাছে? মনের ভেতরে আবার কিছু একটা দলা পাকাচ্ছিল সুমনার। নতুন করে কারো দয়ার পাত্রী হতে চায় না সে।

কিন্তু ঘটনা অন্য পথেই প্রবাহিত হলো।

আনিসুল হকের ফোন পাওয়ার অল্প কিছুদিন পরই তিনি স্বয়ং এসে হাজির হলেন সুমনার নানাবাড়িতে। সাথে করে শান্তকেও নিয়ে এলেন। অভিভাবক হিসেবে এসেছেন তিনি। গত বছরই শান্তর বাবা মারা গিয়েছেনকাজেই একজন অভিভাবকের প্রয়োজন ছিল শান্তর।

একদিন এই শান্তকেই অপমান করে বাড়ির দুয়ার থেকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন সুমনার নানা। কিন্তু আজ পরিস্থিতি ভিন্ন। এখন বিধবা নাতনী তার গলার কাঁটা বৈ অন্যকিছু নয়। সাথে জুটেছে আরেক অথর্ব আপদ। তবু পাণিপ্রার্থী হিসেবে সেই শান্তকেই এসে আবার দাঁড়াতে দেখে মনে মনে বাঁকা হাসি খেলে যায় লতিফুর রহমানের মনে

সে আবার সাথে করে নিয়ে এসেছে ফজলুল আহমেদের সেই বন্ধুটাকে এর সাথে শান্তর কীভাবে পরিচয় হলো কে জানে! তিনি গ্রামে একটা প্রকল্প চালু করতে গিয়ে পিছিয়ে গিয়েছিলেন। সেসব আর জিজ্ঞেস করার মানে হয় না কোনো।  লতিফুর রহমানের এখন অনেক বয়স। এতদিনে এসে বয়সটা যেন সত্যি সত্যিই তাকে কাবু করতে পেরেছে। দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে দেখার মতো আর বুদ্ধি কুলায় না। আর তাছাড়া খুশিতে গদগদ হওয়ার মতো কিছু ঘটেনি শেষমেষ ঐ হাড় হাভাতের ঘরেই নাতনিকে দিতে হচ্ছে তারতবু গোড়াসহ আপদটাকেও উপড়ে ফেলানো যাচ্ছে দেখেই এই বিয়েতে তিনি আর আপত্তির ধুয়া তুলতে গেলেন না।

সুমনার জীবনে আরেকটা নতুন অধ্যায় শুরু হলো। 

একদিন অল্প বয়সের যে আবেগ ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল তাকে, পরিণত বয়সে এসে তা এখন অনেকটাই থিতিয়ে এসেছে। জীবনের বহুমুখী ঘাত প্রতিঘাতে অনেক ক্লান্ত লাগে এখন। প্রেম ভালোবাসা বা ছেলেমানুষী আবেগে ভরা মোহময় সেই সময় এখন স্বপ্নেও আর ধরা দেয় না। 

রুমানাকে নিজের কাছে রাখতে পারার সম্মতি পাওয়ার পরেই সুমনা রাজি হয়েছিল এই বিয়েতে। নিজের জীবনের নোংরা সেই অতীতের কথা স্পষ্টভাষায় তুলে ধরেছিল শান্তর কাছে। শান্ত আহত হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু অপ্রস্তুত হয়নি। ঘরপোড়া গরু তো সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পাবেই। তাই শান্ত হাসিমুখেই বলেছিল,

‘আমার বোন সুপ্তিও থাকবে আমাদের সাথে। আমরা চারজনে একসাথে মিলেমিশে বাস করবো। আপত্তি আছে?’

সুমনা তবুও নিশ্চিন্ত হতে পারে না। তার গলার স্বরে এটা শুনেও নমনীয়তা আসে না। বলে,

‘সুপ্তি তো আর আজীবন থাকবে না আমাদের সাথে! ওর সংসার হবে। তখন আবারও তুমি আমি আর রুমানা। রুমানার সাথে অতীতে যা হয়েছে তার পুনরাবৃত্তি হবেই তা বলছি না…কিন্তু যদি হয়? যদি আবার সেই একই বিভীষিকা নেমে আসে জীবনে? আমাদের দুই বোনের তো কেউ নেই! কই যাবো আবার?’ অতি পাষাণের মতো কথাগুলো আওড়ে যায় সুমনা। শেষের দিকে কেঁপে ওঠে গলার স্বর। শান্ত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে কাছে এসে সুমনার হাতটা চেপে ধরে নিজের শক্ত মুঠিতে। মুখে বলে,

‘আমার আর সুপ্তিরও কেউ নেই সুমনা। আমরাও দুই এতিম ভাই বোন। একটুখানি বিশ্বাস নিয়ে পাশে চাই শুধু। আরেকবার কি বিশ্বাস করে দেখতে পারবে?’

এরপরে আর কথা চলে না। অতীতকে অন্ধকারের গহ্বরে কবর দিয়ে সুমনা আর শান্ত সিদ্ধান্ত নেয় আবার একসাথে পথ চলবে। সামনের অদেখা পথটা কী নিয়ে তাদেরকে স্বাগত জানাবে, জানে না ওরা। বিশ্বাসের আলোটুকুই এখন একমাত্র দিশারী

সুমনা আর শান্ত আনিসুল হকের বাসার দারোয়ানকে নিজেদের পরিচয় দেওয়ার আগেই তিনতলার ফ্ল্যাট থেকে আনিসুল হকের গলার আওয়াজ শোনা গেল।

‘ওদের ঢুকতে দাও মকবুল। ওরা দুজন আমার গেস্ট।’ আনিসুল হকের উচ্ছ্বসিত আওয়াজে বোঝা গেল, তিনি সুমনা আর শান্তর জন্য সাগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন।

রিক্সায় বসে নানারকম কান্ডকীর্তি ঘটিয়ে সুমন অবশেষে তার মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়েছে। সেদিকে তাকিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে শান্ত বললো,

‘যাক বাবা! পিচ্চি ঘুমিয়েছে। নাহলে আরাম করে তো দু’দণ্ড বসতেও দিতো না।’ 

শান্ত আসার পথে রিক্সা থেকে নেমে ‘রস’ থেকে দু’প্যাকেট মিষ্টি কিনেছেসুমনের ছটফটানি সামাল দিতে গিয়ে সেই মিষ্টির প্যাকেট ভচকিয়ে গেছে। একটা প্যাকেট থেকে চুইয়ে চুইয়ে রস পড়ে শান্তর প্যান্টের অনেকখানি ভিজিয়েও দিয়েছে। সেই দিকে এতক্ষণ বাদে চোখ পড়লো শান্তর। মুখটা কালো করে বললো,

‘এই রে এটা কী হলো! আমার প্যান্ট তো একেবারে ভিজে গেছে! এই অবস্থায় কেমন করে ভেতরে যাই? আনিস আংকেল কী মনে করবেন? দেখে তো মনে হচ্ছে যে আমিই…’

সুমনা শান্তর অবস্থা দেখে ফিক করে হেসে ফেললো। আনন্দিত গলায় বললো,

‘বেশ হয়েছে! এটাই দরকার ছিল। আমার দুর্দশা নিয়ে মজা পাচ্ছিলে তো! এখন নিজের মজা সামলাও।’

পকেট থেকে রুমাল বের করে কিছুটা ধাতস্থ হয়ে নিয়ে ওপরে রওয়ানা দিলো সুমনা আর শান্ত।

আনিসুল হক দরজা খুলে সিঁড়ি থেকে দু’ধাপ নেমে ওদের সাদর অভ্যর্থনা জানালেন। তিনি এই দুজনের উপস্থিতি যে ভীষণভাবে আশা করছিলেন, ভাবভঙ্গিতে তা একেবারে স্পষ্ট। আন্তরিক গলায় বললেন,

‘তোমরা তো এখনো লুকিয়েই আছো দেখছি! একটাবার খোঁজ-খবরও নাও না। আংকেলের মাঝে মাঝে খোঁজ না নিলে কি চলে? বুড়ো হয়ে গেছি। কবে আছি কবে নাই! এ কী! জুনিয়র শান্তমশাই তো দেখছি ঘুমে কাদা।’

শান্ত আর সুমনা দুজনেই আপ্লুত হলো এই আন্তরিক সম্ভাষণে। এক স্যাঁতস্যাঁতে মন খারাপের দিনে দেখা হয়েছিল পুলিশ কমিশনার আনিসুল হকের সাথে। সেই দেখা থেকে পরিচয়, পরিচিতি থেকে হৃদ্যতা। ওপরের পুলিশি শক্ত খোলসের অন্তরালের স্নেহময় মানুষটার সন্ধান ওরা বেশ অনেকদিন আগেই পেয়েছিল। আনিসুল হকের এই আন্তরিকতাময় মধুর ভৎসনা দুজনেই একটু অনুতপ্ত হলো। 

মনের কোথায় যেন অদ্ভুত একটা কুয়াশা জমে আছে। ওদের বিয়েটা কোনো অপরাধ ছিল না। পরিস্থিতির বাস্তবতায় বিয়ের চেয়ে সুন্দর কোনো সমাধান হয়ত আর হতেই পারতো না। তবু মাঝে মাঝে কেমন একটা হীনমন্যতায় মন ছেয়ে যায়। অনিকের চলে যাওয়ার অল্প কিছুদিন বাদেই এই বিয়ের কথা শুনে অনিকের বন্ধুদের কেউ কেউ চোখ নাচিয়েছিল। হালকা ঠাট্টা বিদ্রুপ করতেও ছাড়েনি কেউ কেউ। ঠোঁটকাটা রিয়াজের নাম্বার থেকে ফোন এলে শান্ত এখন আর রিসিভই করে না। বিয়ের কথা শুনে বাঁকা অভিবাদন জানিয়ে তার প্রতিক্রিয়া ছিল,

‘কী রে তরা দুইজনে লুকায়ে লুকায়ে বিয়া করে ফ্যাললি আর আমরা বসে বসে আমের আঁটি চুষলাম। কেউ কিছু জানতেও পারলাম না! ব্রাভো ব্রাভো! তলে তলে এতদূর চলে গেলি কবে রে শান্ত? সুমনাও দেখি দারুণ খেল দেখাইলো। পতিব্রতার নাটক করে শেষমেষ কী না স্বামীর বন্ধুর সাথে ইটিসপিটিস…হা হাহ হা!’

শান্তর মুখ কালো হয়ে গিয়েছিল। বুঝতে পেরেছিল, এই কথা সুমনার কান পর্যন্ত যাওয়া যে করেই হোক ঠেকাতে হবে। চলে গেলে লজ্জায় অপমানে কী করে বসবে কে জানে। আর কেউ না জানুক, অনিকের মহৎকীর্তির খবর রিয়াজের কাছে অন্তত অজানা ছিল না। তবু এখন এমন একটা ভাব করছে, যেন মৃত্যুর সাথে সাথে সেই সব পাপ ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেছে। এখন সুমনাকে মুছে সাফ হয়ে যাওয়া অনিকের সেই ধবধবে প্রতিমূর্তির সাথে বাকী জীবনটা কাটিয়ে দিতে হবে! তবেই মিলবে সতী সাবিত্রী পতিব্রতা পত্নীর দুর্মূল্য খেতাব।

আনিসুল হকের স্নেহময় মুখের দিকে তাকিয়ে সুমনার হঠাৎ কিছু একটা হলো। চোখের সামনে নিজের হারিয়ে ফেলা পিতৃমুখটাকে একেবারে যেন স্পষ্ট দেখতে পেল সে। আচমকা উবু হয়ে ঠুক করে আনিসুল হকের পা স্পর্শ করলো সুমনা। উনি টের পাওয়া মাত্রই না না করে বাধা দিতে গেলেন

‘আরে আরে কী করছো সুমনা! পা ছুঁয়ে সালাম করতে হয় না, এটা বুঝি জানো না?’ সুমনা উত্তরে কিছু বললো না। ওর চোখের কোণে শিশিরবিন্দু ঝলমল করছে। সেদিকে তাকিয়ে আনিসুল হক হৃষ্টচিত্তে বললেন,

‘জীবনে একটাই ঘটকালি করেছি। সেটা যে সফল হয়েছে, আমারও তো দেখতে ইচ্ছে করে মাঝে মাঝে।’

সাজানো গোছানো যে ড্রইংরুমে আনিসুল হক তাদের নিয়ে গেলেন তার সর্বত্র রুচিশীলতার ছাপ। দেওয়ালে ঝোলানো শিল্পী কামরুল হাসান আর জয়নুল আবেদীনের আঁকা দুষ্প্রাপ্য কিছু তেলচিত্র। সেদিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শান্তর বহু আগের কিছু স্মৃতি মনে পড়ে গেল। অনিকদের সেই প্রাচীন জমিদারবাড়ির দেওয়ালে ঝোলানো ওর পিতৃপুরুষদের সেইসব বিশাল পেইন্টিং দেখে চোখ ধাঁধিয়ে যেত। আটপৌরে সাধারণ ঘরের ছেলে হওয়ার সুবাদে ওদের কাছে সেসব দেখা ছিল বিরাট সৌভাগ্যের বিষয়। সেই ছবিগুলো দেখে কত কৌতুহল জাগতো ওর কিশোর মনে। না জানি অনিকের পূর্বপুরুষদের হাতে কী অঢেল সম্পদ ছিল। সেই সময়ে এরকম ছবি আঁকতে দূর অঞ্চল থেকে শিল্পী নিয়ে আসা, দিনের পর দিন তাদের সামনে এভাবে সাজপোষাক পরে বিশেষ ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে থাকা…এসব না জানি কত খরচের ব্যাপার ছিল। বিলাসিতার রূপ দেখে প্রথমেই কেন যেন ব্যয় বাহুল্যের কথাটাই মাথায় আসতো সবার আগে।

সেই পেইন্টিংগুলো এখন কী অবস্থায় আছে কে জানে! ওদের বাড়িটা নাকি এখন সরকারী সম্পত্তি। লোকজন টিকিট কেটে বাড়ি দেখতে আসে। অথচ সেই বাড়িতেই ওদের কত আনন্দময় স্মৃতি জড়িয়ে আছে! এখনো চোখ বুজলে সব একেবারে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে ভেসে ওঠে। আজ যদি এসব কিছুই না ঘটতো! সেই জমিদারবাড়িটা যদি আজো অনিকদের দখলে থাকতো! কিন্তু… সব শেষ হয়ে গেল।

শান্তকে একদৃষ্টে ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে আনিসুল হক বললেন,

‘আমার এক ব্যবসায়ী বন্ধু আছেন, খুব ছবির সমঝদার। উনার কাছে দেশ বিদেশের দুর্মুল্য সব পেইন্টিং এর কালেকশন আছে। বিদেশী ছবির প্রতি আমার কোনোকালেই কোনো আকর্ষণ ছিল না। কিন্তু দেশী গুণী শিল্পীদের আঁকা ছবি দেখে একটু লোভ জন্মেছিল মনে। ছাপোষা মানুষ আমি। এসব ছবি কেনা আমার কাছে হাতি কেনারই সামিল। বন্ধুটি আমার লোভের কথা কীভাবে যেন জানতে পেরে গিয়েছিল। উপহার হিসেবে দান করে আমার মানরক্ষা করেছে আর কী! হা হা…’

শান্ত আর সুমনা কিছু বললো না। এই কথাগুলো উপক্রমণিকা মাত্র। ওরা উশখুশ করছে ভেতরে ভেতরে। এতদিনে কিছুটা হলেও এই মানুষটাকে তারা দুজনেই চিনেছে। উনি কিছু একটা বলতেই আজ ওদের এখানে ডেকে এনেছেন। কী কথা বলতে চাইছেন আনিস আংকেল? তাও আবার এতদিন বাদে? 

ওদের ইতঃস্তত ভাব দেখে আনিসুল হক সহজ করানোর ইচ্ছে নিয়ে বললেন,

‘তোমরা এত টেন্সড হয়ে আছো কেন বলো তো? আমি কি তোমাদের একবার ডাকতে পারি না আমার বাসায়? পুলিশ ডাকলেই বুঝি সেটা খুব চিন্তার বিষয়?’

‘না না আংকেল তা কেন… আমরা তো এমন কিছু ভাবছি না মোটেও!’

‘কিন্তু তোমাদের চেহারা তো তেমন কিছু বলছে না। দুজনেই ভয়ে কাষ্ঠমূর্তি ধারণ করেছো! আচ্ছা যাক। আগে একটু চা নাস্তা খাওয়া যাক। চা খেতে খেতে গল্প করি বরং।’

ভৃত্য এসে বিশাল ট্রলিতে করে নানারকম খাবারদাবার দিয়ে গেল। আনিসুল হকের স্ত্রী এসেও ওদের সাথে কিছুক্ষণ গল্পগুজব করলেন। হাসিখুশি মানুষ, গল্প করতে ভালোবাসেন। ভদ্রমহিলা হয়ত ওদের সম্পর্কে অনেককিছুই শুনেছেন। কিন্তু কথাবার্তা সেইদিকে গড়ালো না। সাধারণ বিষয় নিয়েই বেশ হাসি আনন্দে সময় কেটে গেল। কিছু পরে তিনি উঠলেন। ‘তোমরা বসো…আমি রান্নাটা একটু দেখে আসি’…এই বলে ভেতরে চলে গেলেন।

আনিসুল হক চায়ের কাপ নামিয়ে রাখতে রাখতে কোনোরকম ভনিতা না করেই বললেন,

‘অনিকের ব্যাপারটা প্রথম কবে সন্দেহ করেছিলাম জানো? সেই একেবারে প্রথমদিনেই। যেদিন অনিক, রুমানার প্রেগন্যান্সির ব্যাপারে জিডি করতে এসেছিল। টু আর্লি এনাফ! তাই না?’

সুমনা আর শান্তর বিস্ময় চাপা থাকলো না। ওরা দুজনেই বিস্মিত জিজ্ঞাসু চোখে আনিসুল হকের দিকে চাইলো। 

আনিসুল হক গল্পে ঢুকিয়ে ফেলেছেন দুজনকে, এটা বুঝতে পারলেন। তৃপ্তমনে বললেন,

‘হুম, সেইদিন থেকেই অনিক ছিল আমার সন্দেহের তালিকায়। তবে সেদিনের আগেও অনিকের সাথে আমার দেখা হয়েছিল। তখন আমি আলাদাভাবে অনিককে নিয়ে কিছু ভাবিনি।  অনিকের বাবা ফজলুল আহমেদ ভাই আমার পূর্ব পরিচিত ছিলেন, সেটা তো এতদিনে জেনেই গিয়েছো। উনি ভার্সিটিতে আমার বড়ভাইয়ের ক্লাসমেট ছিলেন। ফজলুল ভাই সেই সুবাদে আমাদের বাসায় প্রায়ই আসতেন। সদালাপী নিরহংকার একজন মানুষকে চিনে এসেছি সেই সময়কাল থেকেই। একদিন উনি অনিককে সাথে নিয়ে আমার কাছে এসেছিলেন। উনার আদি বাড়িতে জমাজমিঘটিত কিছু ঝামেলা ছিল। সেসব নিয়ে টেলিফোনে প্রায়ই কথাবার্তা হতো। পুলিশী কিছু জটিলতা এড়ানোর জন্য আমার সাহায্যের হয়তোবা প্রয়োজন ছিল ফজলুল ভাইয়ের। অনিককে উনিই প্রথম পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন আমার সাথে। মুখে বলেছিলেন, পরিচয়টা থাকা ভালো আনিস। জমিজমা খুব খারাপ জিনিস, জানো তো? কখন কোন ফ্যাসাদে পড়ে যায় কে জানে? আমার পরে ঐ তো আমার একমাত্র উত্তরাধিকারী। কোনো সমস্যায় পড়লে একটু দেখো।

যাহোক, ফজলুল ভাই জমিজমা নিয়ে ঝামেলার কথা বলেছিলেন ঠিকই। কিন্তু খুব বেশি ভেঙ্গেচুরে বলার প্রয়োজন মনে করেননি হয়ত। এত বড় একটা বাড়ি, চারপাশের এত এত শান শওকত, জায়গাজমি, গাছপালা পুকুর…সবকিছু এভাবে ফেলে কেন উনি আচমকা হুট করে ঢাকাতে এসে বসত গড়লেন সেটা একটা রহস্যের জায়গা তো বটেই! কিন্তু নতুন করে ঝড় না উঠলে পুরনো পুরু আস্তরেও অভ্যস্ততা এসে পড়ে হয়ত। তাই অতশত কারণ আর খুঁজতে যায়নি কেউ। ফজলুল ভাইও হয়ত আশা করেছিলেন আর পুরনো কাসুন্দি না ঘেঁটে বর্তমানের ঝুটঝামেলা গুলোই মেটানো যাক। উনার জায়গা থেকে উনি হয়ত একেবারেই ঠিক ছিলেন। যেসব কথা  টেনে না আনলেও চলছে, সেগুলোকে কেন শুধু শুধু আর…

যাহোক, প্রসঙ্গ থেকে দূরে চলে এলাম। অনিক যেদিন আমার কাছে রুমানার ব্যাপারে জিডি করতে এসেছিল, সেদিন আমার রুমে আমি আর অনিক ছাড়াও আরেকজন ছিলেন। তিনি একটু দূরে সোফায় বসে পত্রিকার পাতা উল্টাচ্ছিলেন। আমার পরিচিত সজ্জন উনি। দেশের বেশ বিখ্যাত একজন সাইকোলজিস্ট, নাম বললে অনেকেই চিনতে পারবে। সঙ্গত কারণেই নামটা বলতে চাইছি না আমি। পুলিশের কাছে লোকে নানা দরকারেই আসে। উনিও তেমনি এক পেশাগত ঈর্ষার শিকার হয়ে আমার কাছে এসেছিলেন। অনিক প্রথমে উনার সামনে কথা বলতে ইতঃস্তত করছিলো। আমি আশ্বস্ত করার পরেই অনিক বলতে আরম্ভ করে। আমার সেই সাইকোলজিস্ট বন্ধুটি তখন নিবিষ্টমনেই নিজের কাজ করছিলেন। অনিকের কথাবার্তার দিকে তার দৃষ্টি ছিল বলে অন্তত আমার কাছে মনে হয়নি। অনিক ওর কাজ শেষ করে চলে যাওয়ার পরে বন্ধুটি আমাকে বলেন, ছেলেটির আচার আচরণে অনেক অসঙ্গতি আছে। সে হয়ত কোনো এডিকশনে ভুগছে।

আমি শুনে খুব অবাক হয়েছিলাম। কারণ অনিকের সামগ্রিক ভাবভঙ্গিতে এমনটি আমার মোটেও মনে হয়নি। কিন্তু আমার সেই বন্ধুটি নিজের বক্তব্যের ব্যাপারে বেশ জোর দেন। বলেন, অনিকের চোখের চঞ্চল চাউনি, কথা বলার সময়ে অস্থির ভঙ্গিতে হাত নাড়ানো, কিছু বিশেষ মুদ্রাদোষ…এসব নাকি তার এডিক্ট স্বভাবকেই নির্দেশ করে। 

আমি খুব বেশি চিন্তিত হলাম না উনার কথায়। ডাক্তাররা যেমন সবকিছুতেই রোগের লক্ষণ খুঁজে পায়, সাইকোলজিস্টরাও হয়ত তেমনি সাধারণ আচার আচরণের মধ্যেও অন্যকিছুর অস্তিত্ব অনুভব করে। উনাকে নিছক কৌতুহলের বশেই জিজ্ঞেস করলাম, কী ধরণের এডিকশন হতে পারে বলে উনার কাছে মনে হয়? তখন উনি বললেন, হতে পারে এমন কিছুর এডিকশন, যেটা সম্পর্কে ছেলেটা নিজেও ভালোভাবে অবগত নয়। হয়ত সে এটাকে নিজের প্রয়োজন বলেই মনে করছে। কিন্তু সেই প্রয়োজনের বাহুল্য তাকে খুব সঙ্গোপনে একটা মারাত্মক এডিকশনের দিকে ঝুঁকিয়ে দিয়েছে। উনি আমাকে আরো বললেন, আমি এই ছেলের শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে থাকলে তার পিতামাতাকে এই বিষয়টা আমার জানানো দরকার।’

 

ক্রমশ

 

 

আগের পর্ব ও লেখকের অন্যসব লেখা পড়তে ক্লিক করুন।

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত