| 23 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
গল্প ধারাবাহিক সাহিত্য

চোরাকাঁটা (পর্ব-৩)

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

লতিফুর রহমানের বয়স আশির ওপরে। তার ধারণা, পঁচাশির এদিকে না বরং ওদিকেই হবে তার বয়স। এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত করতে তিনি বদ্ধপরিকর। দীর্ঘজীবী মানুষ হিসেবে নিজেকে জাহির করতে তার বড় ভালো লাগে। এখনো কর্মক্ষম, প্রায় নিরোগ একটা শরীর নিয়ে পঁচাশিটা বছর বেঁচে থাকা মুখের কথা তো নয়! যদিও এতে তার বাহাদুরিটা কোথায়, সেটা ভেবে দেখার মতো অত সময় নেই লতিফুর রহমানের। তবু জাহির করতে পারলেই শান্তি লাগে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে বয়স প্রমাণ করার জন্য লিখিত কিছু একটা থাকা প্রয়োজন। তাদের যুগে তো আর বাচ্চাকাচ্চা হওয়ার পরে পঞ্জিকা দেখার তেমন একটা চল ছিল না! কেউ কেউ খাতা বা ডায়েরি জাতীয় কিছুতে লিখে রাখতো বটে। কিন্তু সেই খাতা কিংবা ডায়েরি সময়ের পরিক্রমায় কোথায় যে চলে যেত, তার আর হদিস খুঁজে পাওয়া যেত না। লতিফুর রহমান তবু চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। নিজের ঘরবাড়ি, গুদামঘর, গুপ্ত সিন্দুক…যা কিছু আছে সব জায়গায় চিরুনি অভিযান চালানো হচ্ছে। কাজের লোকদের দিনের মধ্যে বড় একটা সময় এই কাজেই লাগানো হচ্ছেমনে আশা, কিছু না কিছু আলামত নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। তার অতি বুদ্ধিমান পিতা নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও নিজের একমাত্র পুত্র সন্তানের আগমন সুসংবাদ লিখে রেখেই গেছেন! এত বড় একটা খবর তার সংরক্ষণ করতে ইচ্ছে করবে না, এটা কিছুতেই হতে পারে না।

লতিফুর রহমান দীর্ঘায়ু হয়েছেন। বিষয়টাতে তিনি একপ্রকারের আত্মগর্ব অনুভব করেন। তার সমসাময়িক কেউই আর বেঁচে নেই। এমনকি নিজের মেয়ে আর জামাই দুজনকেই হারিয়েছেন। স্ত্রীকে হারিয়েছেন আজ থেকে কুড়ি বছর আগে। অবশ্য স্ত্রীকে হারিয়ে তার বিশেষ একটা সমস্যা হয়নি। স্ত্রীর মৃত্যুর তিনমাসের মাথাতেই নিজের চেয়ে প্রায় পঁচিশ বছরের ছোট একজনকে ঘরে এনে তুলেছেন। মনে আশা ছিল, বড়জন পুত্র সন্তান না দিতে পারলেও এই ঘরে তিনি পুত্রসন্তানের মুখ দেখেই ছাড়বেন। সেই আশা ধুলিস্মাৎ হয়েছে। ছোটজনের অবস্থা হয়েছে বড়জনের চেয়েও খারাপ। বড় স্ত্রী হালিমা খাতুন তবু একটা সুস্থ কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছিল। ছোট স্ত্রী শর্মিলা বানু শারীরিক ভাবে অথর্ব এক অতি রুগ্ন ছেলেকে জন্ম দিয়ে জন্মের মতো বন্ধা হয়ে বসে আছে। সেই ছেলেকে খাইয়ে দিতে হয়, প্রস্রাব পায়খানা পরিষ্কার করে দিতে হয়। শুধু তাই না, তার এক হাত লুলা আর মুখটা বাঁকা। সেই মুখ দিয়ে সবসময় লালা ঝরতে থাকে। সন্তানের মুখের পানে স্নেহ আর মমতাভরা চোখ নিয়ে মানুষ তাকায়। লতিফুর রহমানকে তাকাতে হয় ঘৃণা আর বিদ্বেষ নিয়ে।

মনে মনে অদৃষ্টকে ক্রমাগত দুষতে থাকেন তিনি। স্রষ্টা তাকে একদিকে দু’হাত ভরে দিয়ে অন্যদিকে শূন্য করে রেখেছে। তার এই দীর্ঘায়ু আর শত রকমের টনিক সেবন করে বলবান হওয়া কোনো কাজেই লাগলো না। দুই স্ত্রীর একজনও আসল কাজটা করে দেখাতে পারলো না। একটা সুস্থ সুন্দর পুত্র সন্তানের মুখ দেখাতে পারলো না তাকে। এই বংশে আর নতুন বাতি জ্বালাতে পারলেন না তিনি।

চাইলে আরেকবার টোপর মাথায় দিতে পারতেন। কার বাপের তাতে কী বলার আছে? কিন্তু সেই রাস্তা আর মাড়িয়ে দেখেননি। কেন যেন আরেকবার টোপর মাথায় দিতে সাহসে কুলালো না। ছোট স্ত্রী শর্মিলার গর্ভে জোর না থাকলে কী হবে? মুখে জোর আছে ষোলআনা! আরেকবার বিয়ে করার হুমকি দিলে সেও পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বলে,

‘মাত্র আরেকবার ক্যান? চাইলে আরো পঞ্চাশবার বিয়া করেন। যেই লাউ সেই কদু! কিচ্ছু হইবো না। দোষ কি আপনার বউগো নাকি? দোষ আপনার বিছনে!’

এমন ঘোর অপবাদে ফুঁসে ওঠেন লতিফুর রহমান। তেড়ে উঠে বলেন,

‘কী! এত্তবড় সাহস তোমার! আমার বিছনে দোষ মানে! ক্যান সুফিয়ারে দেখো না তুমি? আমার মেয়ে কি আবাল হইছে নাকি? তুমি আবাল বিয়াইছো সেইটা কও!’

সুফিয়া হচ্ছে সুমনার মা। লতিফুর রহমানের একমাত্র মেয়ে আর তার প্রথম সন্তান। সুস্থ সবল সুফিয়া তার মেয়ে না হয়ে ছেলেও হতে পারতো! তাহলেই আর কোনো ঝঞ্ঝাট বাঁধতো না। শুধু শুধু এই মনঃকষ্ট আজীবন বয়ে বেড়াতে হতো না লতিফুর রহমানকে।

সুফিয়ার নাম বলার পরেও শর্মিলা বানুর গলার তেজে কিছুমাত্র ভাটা পড়ে না। সে একই হিংস্রতায় বলতে থাকে,

‘হুম! সুফিয়া আবাল হয়নি হেই কতা ঠিক আছে। একটু লেটে কাজ করছে এইখানে। সুফিয়ার শরীরের মধ্যে আবালের দোষ ঢুইকে গেছিল ঠিকই। তাই তার ছোটমাইয়া মানে আপনার নাতিন হইছে আবাল। বুঝলেন এইবার! এ্যামনে না হোক ওমনে ধরা আপনি খাইবেনই খাইবেন। করেন…আরো পঞ্চাশখান বিয়া করেন!’

লতিফুর রহমানের মতো মহা ঝানুলোকের মুখেও আর কথা যোগায় না এই কথা শুনে। ওপরে ওপরে তার ম্যালা কিছু বলতে ইচ্ছে করে ঠিকই। কিন্তু কেউ বুঝি তার গলার নলি খামচে ধরে থাকে। ফিসফিসিয়ে বলে,

‘বলিস না বলিস না। আর কিচ্ছু বলিস না। এই কথার পর বলছিস তো তুই গ্যাছিস!’

মনের মধ্যে চিন্তার ঘুনপোকা বিড়বিড় করতে করতে কামড়াকামড়ি শুরু করে। লতিফুর রহমান শান্তি পান না ভেতরে ভেতরে। শর্মিলা যা বলছে তা যদি সত্য হয়? হতেও তো পারে! একদম ভুল কিছুও তো বলছে না সে। যে হিসাব দেখাচ্ছে সেটা তো এক অর্থে ঠিকই! যদিও মেয়েমানুষের বুদ্ধি এতটা নিখুঁত হয় না। কিন্তু বলাও তো যায় না! রক্তে যদি সমস্যা না থাকে, তাহলে একই পরিবারে এরকম দু’জন আবাল জন্মালো কেন? তার মধ্যে হয়ত সমস্যা নেই। কিন্তু তার পূর্বপুরুষ কারো মধ্যে কি এমন কোনো ঝামেলা ছিল? হুউম… ছিল নিশ্চয়ই! হয়ত সেই রক্তেরই ধারাবাহিকতা বয়ে চলেছেন তারা। তাহলে তো ভারী চিন্তার কথা! এই দোষ কাটবে কিভাবে?

এসব নানাবিধ চিন্তা করেই মন থেকে কেন যেন আর বিয়ে করার ব্যাপারে খুব বেশি একটা জোর পান না লতিফুর রহমান। থাক গে বাবা! আর এক্সপেরিমেন্ট করে কাজ নেই! আবার যদি একই ঘটনা ঘটে, তাহলে শর্মিলা তাকে বাড়িতে তিষ্টাতে দিবে না। দিনরাত হায়েনার মতো খ্যাক খ্যাক করে হাসবে!

একমাত্র সুস্থ নাতনী সুমনার প্রতি তাই তার দরদটা একটু বাড়াবাড়ি রকমের বেশি সবটুকু স্নেহ সুমনাকে একেবারে উজাড় করে ঢেলে দিয়েছেন লতিফুর রহমান। সুমনার প্রতি তার অধিকারবোধও টনটনে। জামাই কিছুদিন আগ পর্যন্তও বেঁচে ছিল। তাকে পাত্তাই দিতে চাইতেন না তিনি। এক মেয়ে আর বউকে নিয়ে ঢাকায় একটা বাসা ভাড়া করে থাকার মুরোদ নাই, সে আবার জামাই! এমন জামাইকে এক হাটে কিনে আরেক হাটে নিয়ে বেচতে পারেন লতিফুর রহমান। শুধু তার বোকা মেয়ে সুফিয়াই মানুষ চিনলো না! মেয়েটা শারীরিক মানসিক ভাবে সুস্থ হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু মানুষ চেনার ক্ষমতা নিয়ে দুনিয়াতে আসেনি। রাজা বাদশাহর মতো ঘরে জন্মেও ছোটলোকের ছেলের দিকে চোখ পড়েছিল। চাইলে তিনি কয়েকগ্রাম থেকে ছেলে বেছে এনে মেয়ের সাথে জোড় বাঁধতে পারতেন। অথচ তার মেয়ে আর মানুষ খুঁজে পেল না! মন দিয়ে বসলো কী না জাত ছোটলোককে! লতিফুর রহমান মেয়ের পছন্দ শুনে রাগে লাল হয়ে গিয়েছিলেন। এক কথায় নাকচ করে দিয়েছিলেন সেই প্রস্তাব। তখন রাতের অন্ধকারে ঘর থেকে পালিয়ে গিয়ে বংশের মুখে মোটা আস্তরের চুনকালি লাগিয়ে দিয়েছিল তার গর্দভ মেয়ে। 

কিন্তু নিজের রক্ত বলে কথা! প্রথম কিছুদিন মুখ ঘুরিয়ে রেখেছিলেন ঠিকই, কিন্তু রাগ করে বেশিদিন থাকতে পারেননি। হয়ত সংসারে আরো দু’একজন সন্তান থাকলে আজীবন মুখ ফিরিয়েই রাখতেন। কিন্তু সেই সৌভাগ্য তো আর হয়নি লতিফুর রহমানের!

জামাই ছোটখাট একটা চাকরি করতো। মুখে বলা যায় না এত সাধারণ চাকরি। সেই চাকরি করে ঢাকায় ঘর ভাড়া করে থাকবে, নাকি বউ বাচ্চাকে খাওয়াবে? ভেতরে ভেতরে সব খবরই রাখতেন তিনিঅবস্থা বেগতিক দেখে নিজেই যোগাযোগ করে সুমনাকে নিয়ে আসেন নিজের কাছে। যখন নিয়ে আসেন তখন সুমনার বয়স আট কী নয় বছর। ফুটফুটে নাতনীকে দেখে মনের দুঃখ কষ্ট অনেকখানিই ভুলে গিয়েছিলেন লতিফুর রহমান। মনে মনে অনেক স্বপ্ন দেখে ফেলেছিলেন। কে বলেছে মেয়েসন্তান বংশধর জন্ম দেয় না? তিনি ভুল প্রমাণ করে ছাড়বেন এই ধারণা। নিজের হাতে নাতনীকে গড়েপিঠে তৈরি করবেন। নাতনীর পিতৃপরিচয় চাপা পড়ে যেতে ক’দিন লাগবে? 

এই পণ করেই সুমনাকে নিজের কাছে রেখেই স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। প্রতিদিন দুই দুই চার ক্রোশ রাস্তা মোটর গাড়িতে করে সুমনাকে সদরের স্কুলে নিয়ে যেতেন। হাতে কাঁচা পয়সা আসার পর পরই গাড়ি কিনেছিলেন শখ করে। সেই গাড়ি এতদিন বেকারই পড়ে থাকতো। সুমনাকে নিয়ে আসার পর থেকে গাড়িটা কিছু কাজে লাগতো। শুধুমাত্র সুমনাকে আনা নেওয়ার জন্যই একজন ড্রাইভার রাখলেন। মনে মনে ঠিক করেছিলেন, নিজের এত টাকাপয়সা বেকার ফেলে না রেখে এখন থেকে নাতনীর ভবিষ্যতের পেছনেই লাগাবেন। নাতনীর মাথাও ছিল একদম পরিষ্কার। পড়ালেখাতে খুবই ভালো করতে লাগলো সে। 

তার স্বপ্নের চারাগাছও তরতরিয়ে বাড়তে থাকেনাতনীকে তিনি ডাক্তার বানাবেন। এই গ্রামের একমাত্র লেডি ডাক্তার। নিজেই ক্লিনিক খুলে দিবেন। টাকাপয়সা তার অঢেল আছে। ও জিনিসের আর দরকার নেই। নাতনী গ্রামের লোককে সেবা দিবে। ব্যাপক নামডাক হবে তার। সেই নামডাকের সাথে লতিফুর রহমানের নামটাও লতায়পাতায় জড়িয়ে যাবে। লোকে তার ‘রহমান ভিলা’র দিকে হাত উঁচিয়ে বলবে,

‘ঐ যে ডাক্তার আপার নানাবাড়ি। এমন শিক্ষিত মাইয়া এই বাড়িতেই মানায়!’

কিন্তু হায়রে পোড়া কপাল! তার এত আশার এই কাঁচা সৌধেও এক বালতি পানি পড়ে একেবারে ভিজে চুপচুপে হয়ে যায়।

সুমনাও যে তার মায়েরই পায়ের ছাপ অনুসরণ করে বসে থাকবে, তা কে জানতে পেরেছিল? তিনি নিজে তো সেটা ঘুণাক্ষরেও আশা করেননি। যে মেয়েকে তিনি রোদের আঁচ থেকে বাঁচানোর জন্য ছাতা হাতে ধরিয়ে একজনকে সাথে দিয়ে পাঠাতেন, সেই মেয়ে যে গরীব এক মাস্টারের ছেলেকে মন দিয়ে বসবে তা কে জানতো? মাস্টারি শেষ করে সে এখন আবার অতি সাধারণ গৃহস্থ। এমন ঘরে তিনি তার আদরের নাতনীকে বিয়ে দেওয়ার কথা ভাবতেও পারেন না। অথচ এই ছেলেকেই কী না তার নাতনীর ভালো লাগলো! ইতিহাসের এমন পুনরাবৃত্তিও সম্ভব?

সুমনা তখন ক্লাস নাইনে পড়ে। তাদের গ্রামের প্রাক্তন স্কুলশিক্ষক রেজা মাস্টারের ছেলে ফরিদুর রেজার সাথে তার ভাব বিনিময় ঘটে গেল। অল্প বয়স, এমন বয়সে পা হড়কাতেই পারে! আগেভাগে জানতে পারলে শুরুতেই সব ঠেকানো যেত। কিন্তু এক কান দু’কান হয়ে কথাটা লতিফুর রহমানের কান অব্দি আসতে আসতে বেশ দেরী হয়ে যায়। জল ততদিনে অনেকদূর গড়িয়ে গেছে। গাঁয়ের লোক কথার মোরব্বা বানিয়ে বাড়ি বাড়ি বয়ে নিয়ে গেছে। চাটতে চাটতে উপভোগ করেছে সেই মজাদার বস্তু। কিন্তু সেটা করেছে খুব সতর্কতার সাথে। লতিফুর রহমানের নাতনী বলে কথা! গ্রামের লোক নিজেরা জানলেও কেউ সাহস করে তার কাছে এসে মুখ খোলেনিনিজেরা কানাকানি করেছে ঠিকই, কিন্তু সেটি করেছে অতি সঙ্গোপনে। সব রকম ফাঁকফোকড় বন্ধ করে নিয়ে। কথা যাতে কিছুতেই লতিফুর রহমানের কানে গিয়ে পৌঁছাতে না পারে, সেই ব্যাপারে তাদের সচেতন প্রচেষ্টা ছিল

সুমনা প্রতিদিন স্কুল থেকে ফেরা আর স্যারের কাছে পড়তে যাওয়ার পথে কিছু সময় ফরিদুর রেজা নামের ঐ ছেলের সাথে কাটাতো। গাঁয়ের বিলের ধারে… ধান কিংবা গম ক্ষেতের লম্বা সরু আল ঘেঁষে…কখনোবা বট অশথ গাছের নিচে তাদের দুজনকে লম্বা সময় ধরে গল্প করতে দেখা যেত গাঁয়ে এমন দৃশ্য সচরাচর চোখে পড়ে না। মানুষজন বেশ ঠারে ঠারে দুজনকে দেখতো। নিজেদের মধ্যে কানাঘুষা করতো।

‘রহমান ভিলার মাইয়া না?…হ, তাই তো দেহি!…লগের পোলাডা ক্যাডা রে? আরে, এইডাতো আমাগো রেজা মাস্টারের পোলা। ঢাকায় থেইকা পড়ে না? গেরামে কদ্দিন হয় আইছে? বড় বাড়ির মাইয়ার লগে ইটিস পিটিসে নামছে? পোলার কইলজার তো ম্যালা জোর আছে!’

‘ক্যা? এই মাইয়ার মায়ে কার লগে ভাগছিল ভুইলা গ্যাছোস? বড় বাড়ির ছাওয়াল হইলেই নজর উঁচা হইবো এমুন কতা আছে নাকি?’

ঘটনার বিন্দুবিসর্গ লতিফুর রহমানের কান অব্দি পৌঁছানোর আগেই তার সাধের রহমান ভিলার চুন সুড়কি এভাবেই খসে খসে পড়তে থাকে।

ছেলেটা সবসময় গ্রামে থাকে না। সে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ালেখা করে। ছাত্র খারাপ না। সামনের ভবিষ্যতও হয়ত ভালো। বলতে গেলে বলা যায়, সেই ছেলেও এই গ্রামের গর্ব। কিন্তু এসব কোনো কিছুতেই লতিফুর রহমানের মন ভরে না। তার কাছে বংশ পরিচয় হলো সবার আগে। কোন বাড়ির ছেলে এটাই যদি মাথা উঁচু করে বলা না গেল, তাহলে আর কীসের ফুটানি? সদ্য গজানো কাঁচা পয়সার বাতাস আর কতদূর যায়? তাই কোনোরকম ভাবনাচিন্তার মধ্যেই গেলেন না লতিফুর রহমান। ঘটনা জানতে পেরেই নাতনীকে একরকম গৃহবন্দী করে ফেললেন।

নিজের মেয়েকে ছোটলোকের মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে তিনি পরিণতি দেখেছেন। মেয়েকে ঠিকমত খাওয়াতে পরাতেই পারেনি তার গুণধর জামাই চেহারা সুরত আর ওপরের বেশবাস ফুটানিতে গলে যাওয়ার পাত্র তিনি নন। ছেলে যতই দেখতে শুনতে কিংবা লেখাপড়ায় ভালো হোক, এমন সাধারণ ঘরে তিনি তার নাতনীকে বিয়ে দেবেন না। আর তাছাড়া এখানে তার ইজ্জতের প্রশ্নও জড়িয়ে আছে। অনেক বড় মুখ করে তিনি নাতনীকে নিজের কাছে নিয়ে এসেছিলেন। জামাইকে বড় গলা করে শুনিয়ে এসেছেন,

‘আমার নাতনীরে আমি হীরার টুকরার ছাঁচে ফেলবো। দশজনে জানবে লতিফুর রহমান হীরা বানাইতেও জানে!’

এখন জামাই যখন জানবে যে, হীরার টুকরা তো দূর…মেয়ে তার মতোই সাধারণ ঘরের এক ছেলের সাথে মন দেওয়া নেওয়া সেরে নিয়েছে তখন লতিফুর রহমানের মান ইজ্জত কোথায় থাকবে? সেটি কি তখন ধুলায় গড়াগড়ি খাবে না?

 

 

(ক্রমশ)

 

 

 

 

আগের পর্ব ও লেখকের অন্যসব লেখা পড়তে ক্লিক করুন।

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত