| 2 মার্চ 2024
Categories
গল্প ধারাবাহিক সাহিত্য

চোরাকাঁটা (পর্ব-১)

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

শোভনের ফোনটা যখন এলো তখন বাজে রাত দেড়টা।

মুভিটা সবেমাত্র শেষ করে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলো শান্তআজ রাতে খেয়েদেয়ে বসতে বসতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল। দারুণ থ্রিলার মুভি। কিছুতেই শেষ না করে ওঠা যাচ্ছিলো না এই ওর একমাত্র প্রিয় শখ। প্রতি রাতে একটা করে মুভি দেখা চাইসেটা অনলাইনেও হতে পারে কিংবা টিভিতে। টিভিতে নানারকম মুভিজ চ্যানেল এখন। একটা না একটা ভালো মুভি পেয়েই যায়আর সেটা না হলে ইন্টারনেট বা পেইড চ্যানেল তো আছেই! ইউটিউব, হইচই, নেটফ্লিক্স…কয়টা চাই? থ্রিলারের পোকা শান্তসামাজিক মুভির চেয়ে থ্রিলার মুভি দেখতেই বেশি ভালো লাগে ওর ধীরে ধীরে রহস্যের কুয়াশা জমতে থাকে আর প্রতি দৃশ্যে অপেক্ষার প্রহর গুনে চলা সেই রহস্যের আবরণ উন্মোচনের। 

কিশোর বয়সে প্রচুর ডিটেকটিভ বই পড়তো শান্ত। আগাথা ক্রিস্টির ভক্ত ছিল একসময়। অন্যদের লেখাও কম পড়েনি। শার্লক হোমস পড়তে পড়তে নিজেকে সেই কোকেনসেবী ডিটেকটিভের ভূমিকায় দেখতে বেশ লাগতো। ব্যোমকেশ বক্সীর মোটা ভল্যুউমটা ওর বিছানার নিচেই পড়ে থাকতো সবসময়। যখনই একটু মন চাইতো, ঝট করে চোখ বুলিয়ে নিত। বাবার অনুপ্রেরণায় ওরা দুই ভাইবোনই গল্পের বইয়ের পোকা ছিল। বাবা বলতেন,

‘যখনই সময় পাবি, পড়বি। হতে পারে সেটা যেকোনো ধরনের বই। বই পড়ার বিকল্প আর কিছুই নয়। এমন কিছু নেই যা বই পড়ে জানা যায় না। তাহলে এই মুফতে সব জানার রাস্তাটা বন্ধ করে দিবি কেন?’

বাবা আধুনিকমনষ্ক মানুষ ছিলেন। সেজন্যই হয়ত বইয়ের কদরটা বুঝতেন। এখন বই পড়ার অভ্যাসটা অনেক কমে এসেছে। কেন যেন সেই মজাটা আর পাওয়া যায় না। পড়তে পড়তেই মনোযোগ সরে যায় অন্য কোথাও। স্মার্ট ফোনের নিত্য-নতুন নকরা আর ইন্টারনেটের সবজান্তা সুযোগসুবিধার সাথে সাদামাটা বই আর এঁটে উঠতে পারলো না। যান্ত্রিক জীবন-যাপনও হয়ত অনেকটা দায়ী। ব্যস্ত এই সময়ে ইচ্ছে করে কেউ এসে সব কাজ করে দিয়ে যাক। কানের কাছে গল্প শুনিয়ে গেলে আরো ভালো। আর তা থেকেই মুভি দেখা শুরু। আগে ইংলিশ ছাড়া ভালো থ্রিলার মুভি পাওয়া যেত না। এখন হিন্দি এমনকি বাংলা থ্রিলার মুভিগুলোও বেশ লাগে দেখতে। জমজমাট কাহিনি, চৌকষ অভিনয়। আগে থেকে একদম বোঝা যায় না, শেষে কী অপেক্ষা করছে। প্রতিটা রাত একেবারে জমে যায়। 

তবু এত বেশি রাত পর্যন্ত সাধারণত জাগে না শান্তসকাল দশটার মধ্যে অফিসে যেতে হয়। তাড়াতাড়ি না ঘুমিয়ে পড়লে সকালে উঠতে পারে না। 

সকালে উঠে নিজেকেই তো আবার খাবারের আয়োজন করে নিতে হয়। বোনটাকে এত করে বলেছিল, এখানে এসে থাকার জন্য! হোস্টেলে থাকাটা কী এত জরুরি হয়ে পড়েছিল! এখানে এসে থাকলে শান্তর কাজে একটু হাত লাগাতে পারতো। শান্ত তাতে কিছুটা আরাম পেত। দিনভর অফিস করে এসে আর কিছুই করতে মন চায় না। নিজের জন্য তিন কামরার বাসা কেন যে ভাড়া করেছে, সেটা নিজেও জানে না শান্তহয়ত ভেবেছিল, চাকরি পেলেই বিয়েটাও সেরে ফেলবে। নিজের ওপরে বেশ একটা বিশ্বাস ছিল। কিন্তু… প্ল্যান মোতাবেক কিছুই হয়নি। এখনো বিয়ের পিঁড়িতে বসা হয়নি। এই বারোশো স্কোয়ার ফিটের খালি বাসায় হাত পা ছড়িয়ে শান্ত নিজেই ঘুমায়, খায় দায়। এলাহী অবস্থা।

মুভি দেখতে দেখতে আজকেই এতটা রাত হয়ে গিয়েছিল। দেখা শেষ করে তৃপ্তির একটা হাই তুলে উঠতে যাচ্ছে, ঠিক এমন সময়েই শোভনের ফোন। বেশ অবাক হয়েই সে রিসিভ করলো ফোনটা শান্তর বন্ধুবান্ধবরাও জানে, ও রাত জাগে না। তাই এত রাতে তাদের ফোন আসাটা স্বাভাবিক ব্যাপার নয়। 

শান্তর নার্ভ বেশ শক্ত। সহজে ঘাবড়ায় না। নইলে এত রাতে ফোন পেলে অনেকেরই হৃৎস্পন্দন বেড়ে যেত। আজেবাজে সাতপাঁচ ভেবে আকুল হতো। শান্ত মোটেও সেই ধাঁচের নয়। কে জানে এসবও ডিটেকটিভ বই আর মুভি দেখারই পার্শ প্রতিক্রিয়া কী না। ওপাশে শোভনের গলায় কেমন একটা ঠান্ডা উত্তেজনা।

‘হ্যালো শান্ত। জেগে আছিস? সরি এত রাতে ফোন দিলাম দোস্তকী করবো বল, খবরটাই এমন ঝাঁঝালো। ঝাঁঝের মাত্রা তুঙ্গে থাকতে থাকতেই জানাতে হচ্ছে। সকাল পর্যন্ত আর ওয়েট করতে পারলাম না!’

শান্ত মহা বিরক্ত। বিরক্তি চেপে না রেখেই বললো,

‘আহ্‌! ফোনটা দিয়েই ফেলেছিস যখন, তখন চটপট কথা শেষ কর না! মেয়েদের মতো প্যাঁচাচ্ছিস কেন? কী হয়েছে?’

‘সেটাই তো বলছি! জানিস, অনিকের শ্যালিকা না প্রেগন্যাণ্ট!’

‘হোয়াট!’ শান্ত সত্যিকারের বিস্ময় নিয়েই বললো।

‘হ্যাঁ রে! কেমন একটা অবস্থা বল? এটা শুনে আর নিজের মধ্যে রাখতে পারলাম না। তোকে জানিয়ে দিলাম।’

খবরটা চমকে দেওয়ার মতোই। অনিক ওদের বন্ধু। ওদের একমাত্র বিবাহিত বন্ধু। শান্তদের ক্যাডেট কলেজের বন্ধুদের একটা বেশ বড়সড় গ্রুপ আছে। প্রায়ই তাদের দেখাসাক্ষাৎ আর আড্ডাবাজি হয়। নিজেদের মধ্যে বন্ধনটা বেশ মজবুত। ছোট্টবেলার বন্ধুত্বের শিকড়টা পরিণত বয়সেও মজবুত হয়ে গেঁথে আছে। অনেকদূর পর্যন্ত সীমানা ছাড়িয়েছে। ওদের মধ্যে অনিকই সবার আগে বিয়ের কাজটা সেরে ফেলেছে। বাকিরা লাইনে আছেকেউই কেন যেন এখনো সুবিধা করে উঠতে পারেনিএটা মিলছে তো সেটা মিলছে না। এসব করে করে মেঘে মেঘে বেলা হয়ে যাচ্ছে। বয়স ত্রিশের কোঠা পার হয়ে গেছে অথচ অনিকটা কেমন ফুড়ুৎ করে আসল কাজটা সেরে ফেলেছে!

অনিকের শ্যালিকা রুমানার বয়স পনের-ষোল বছর। মানসিক ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। এমনিতে দেখে কারোরই বুঝবার উপায় নেই। দিব্যি ফুটফুটে চেহারা। অনেকটা লম্বা। অনিকের বউ সুমনাও বেশ লম্বা। রুমানা অনিকদের সাথে ওদের বাসাতেই থাকে। সুমনার বিয়ের মাত্র এক বছরের মাথাতেই ওর বাবা মারা গেছেন। মা মারা গিয়েছিল প্রায় দশ বছর আগে, যখন রুমানার বয়স মাত্র পাঁচ বছর। ছোটবোনকে সুমনাই অনেকটা কোলেপিঠে করে মানুষ করেছে। বোনের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরে রুমানাকে ওদের বাসায় রাখা মুশকিল হয়ে পড়লো। সে সারাক্ষণ কান্নাকাটি করতো। জিনিসপত্র ভাঙচুর করতো। দিনরাত চেঁচামেচি করে বোনকে আবার এনে দিতে বলতো। সুমনার বাবা বিপদে পড়ে গিয়েছিলেন। বুঝতে পারছিলেন না কী করবেন। তখন অনিকই প্রস্তাবটা দিয়েছিল। রুমানা তাদের কাছে এসে থাকলে ওর কোনো আপত্তি নেই। 

অনিকের প্রস্তাবটা লুফে নেওয়ার মতোই। কিন্তু রুমানার ব্যাপারটা আলাদা। সে প্রতিবন্ধী একটা মেয়ে। নানারকম ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে হয় তাকে নিয়েনব বিবাহিত দম্পত্তির সাথে এমন একজন এসে থাকলে তাদের অনেক রকম সমস্যা হতে পারে। কিন্তু অনিক একজন আদর্শ স্বামীর মতোই সুমনার মনটা বুঝতে পেরেছিল। সুমনা সারাদিন মন খারাপ করে থাকে। নিজের অজ্ঞাতে সে ছোটবোনের মা হয়ে গিয়েছিল। দেখাশোনা করতে করতে তার মধ্যে সবসময় মাতৃসুলভ দুশ্চিন্তা কাজ করতো বোনকে ঘিরে। রুমানা তার জন্য কান্নাকাটি করছে শুনে সুমনার কিছু ভালো লাগতো না। কাজকর্মে মন বসাতে পারতো না। তখন অনিকই রুমানাকে নিয়ে আসার প্রস্তাবটা দিয়ে ফেলেসুমনারও রাজি না হয়ে উপায় ছিল না। কিন্তু মনের মধ্যে ভয়ও হয়ত বাসা বেঁধেছিল। বোন এসে আবার না এমন কাণ্ড করে বসে যে, তার মাথাটাই কাটা যায়!

এসব গল্প অনিকই শান্তদের কাছে করেছিল। অনিক সুমনার এই প্রতিবন্ধী বোনটার ব্যাপারে খুব আন্তরিক। সুমনার পাশাপাশি সে নিজেও অনেক কিছুর খোঁজখবর রাখে। সুমনা স্বামীর প্রতি সেজন্য বিশেষ কৃতজ্ঞ। 

ওদের তিনজনের জীবনটা ভালোই কাটছিল। রুমানা তার বোনের কাছে এসে অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল ওদের জীবনে। বন্ধুরা মাঝে মাঝে দল বেঁধে আড্ডা মারতে যায়কখনোবা দু’একজন আলাদাও যায়। অনিকদের বাসাটা ক্রমেই বন্ধুদের আড্ডাস্থল হয়ে উঠেছে। তাই ওদের পরিবারের অনেক গল্পও অনেকটা গল্পচ্ছলেই জানা হয়ে গিয়েছে সবার। অনিকের বাবা-মাও ঢাকাতেই থাকেন। কিন্তু তারা নিরিবিলিতে নিজেদের মতো থাকতে ভালোবাসেন। উত্তরার এক প্রান্তে নিজেদের জন্য একটা ছোটখাট বাড়ি বানিয়ে নিয়েছেন। দীর্ঘদিন মফঃস্বলে থেকেছেন তারা। শহুরে জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হতে সময় লাগছে। আলাদা থাকাতে সেই অভ্যস্ততা আয়ত্ত করতে নাকি বেশি সুবিধা হচ্ছে।

বিবাহিত বন্ধু আর বন্ধুপত্নীর সাথে কিছুটা সময় হৈ হুল্লোড় করে কাটিয়ে আসে শান্তরা। সুমনা সপ্তব্যঞ্জন রান্না করে। মা না থাকাতে সুমনা অনেক আগে থেকেই সংসারের কাজকর্মে পটু। সুন্দর রান্না করে, দারুণ ঘর সাজায়, টবে নানারকম গাছ লাগায়বোনের দেখাশোনাও করে এতসব কিছু সামলে। অনিকের দিক থেকে যাতে বোনকে নিয়ে কোনরকম আপত্তি না আসে, সেজন্য সুমনার দিক থেকে চেষ্টার কমতি নেই। ওদের বাসায় গেলে বন্ধুরাও এটা বুঝতে পারে। সুমনাকে অনিকের বন্ধুরা সবাই নাম ধরেই ডেকে এসেছে প্রথম থেকেঅনিকই এই নিয়ম করে দিয়েছে। বেশি ভাবী ভাবী করলে নাকি দেবরতুল্য বন্ধু বান্ধব একেবারে পেয়ে বসে মাথায় চড়ে বসতে চায়। তাই ওসব ভাবী টাবী বাদ। আর তাছাড়া সুমনা ওদের চেয়ে বয়সে বেশ ছোটকাজেই ভাবী ডাকটা একটু বেশি ফরমাল শোনাতো ওর জন্য।

অনিকের বন্ধুদের হাজার ঝুট ঝামেলাকে সুমনা হাসিমুখেই মেনে নিয়েছিল। প্রতি মাসেই না হলেও কয়েক মাস পর পরই গেট টুগেদারের আয়োজন করা হয়। ওদের এই গেট টুগেদার এতটাই ফেমাস যে, ঢাকার বাইরে থেকেও কেউ কেউ এসে যোগ দেয়। দেখা-সাক্ষাত মৌজমাস্তি শেষ করে আবার ফিরে যায় কর্মস্থলে। যৌবনের এই ঝাড়া হাত-পা দিনগুলো আর কদিনই বা আছে! বিয়েশাদী করলেই তো কানের কাছে প্যান প্যান করার লোক এসে জুটে যাবে। তখন কি আর এভাবে একসাথে বসে হৈ হুল্লোড় করা যাবে? সবাই যে সুমনার মতো এমন ধৈর্যশীলা হবে তার কী গ্যারান্টি আছে?

এই তো মাস দুয়েক আগেই ওরা সবাই মিলে এক জায়ান্ট গ্যাদারিং করলো অনিক সুমনার বাসায় গিয়ে! ওদের ঘরবাড়ি সবাই মিলে রীতিমত লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে এসেছেসুমনা কীভাবে যে সবকিছু আবার আগের জায়গায় নিয়ে এসেছে, কে জানে! সেই আমোদের রেশ এখনো কাটেনি সবার ওপর থেকে। এর মধ্যেই কী ঘটে গেল এসব!

‘কী রে শান্ত…চুপ মেরে গেলি কেন?’

শোভনের কথাতে আবার বাস্তবে ফিরে এলো শান্তএ কী ভয়াবহ সংবাদ দিল শোভন! সুমনার সেই আলাভোলা বোনটা প্রেগন্যান্ট! আহারে! মেয়েটা তো খাওয়া আর বাথরুমে যাওয়া ছাড়া কোনো কথাই বলতে বা বোঝাতে পারে না। এমন একটা মেয়ের সাথে কে করলো এমন একটা জঘণ্য কাজ?

‘কীভাবে জানা গেল বিষয়টা?’ শান্ত অবশেষে কথা খুঁজেপেতে নিয়ে বললো

‘চাপা থাকে নাকি এসব? মেয়েটার নাকি দু’মাস ধরে… ঐ যে মেয়েদের হয় না মাসে মাসে…’

‘পিরিয়ড?’

‘হুম ওটাই। ওটা নাকি বন্ধ ছিল দু’মাস ধরে। সুমনা অনিকের কাছে বলেনি এতদিন। চেপে রেখেছিল। ভেবেছিল কোনো স্ট্রেসজনিত কারণে হয়ত বন্ধ আছে। ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু পরের মাসেও যখন হয়নি, তখন সুমনা বোনকে নিয়ে গিয়েছিল ডাক্তারের কাছে। সেখানেই জানা গেছে যে, মেয়েটা প্রেগন্যান্ট।’

শান্তর মনটা বিষণ্ন হলো। সেই সাথে চকিতে একটা কথা মাথায় এলো তার। ধড়মড়িয়ে উঠে বললো,

‘কয়মাসের প্রেগন্যান্ট বলেছে ডাক্তার?’

‘ঐ তো দুইমাসের! কেন?’

‘সর্বনাশ! কী ঘটেছে বুঝতে পারছিস? দু’মাসের প্রেগন্যান্ট! আমরাও না দু’মাস আগেই গিয়েছিলাম অনিকদের বাসায়!’

‘হুম গিয়েছিলাম, তো? এই দাঁড়া দাঁড়া…তুই কি বলতে চাচ্ছিস, এসবের পেছনে আমাদের কারোর হাত আছে?’ শোভন যেন রীতিমত হকচকিয়ে উঠে প্রশ্নটা করলো।

‘আমি না বলতে চাইলেও ঘটনা সেদিকেই ইঙ্গিত করে জনাব! যদি পুলিশী কেস টেস কিছু হয়? রুমানা তো বাসা থেকে বেরিয়ে অন্য কোথাও গিয়ে থাকেনি। তাহলে এই ঘটনা কখন ঘটলো? সুমনা তার বোনকে ভীষণ ভালোবাসে। মায়ের মতো যত্নআত্তি করে বোনের। সেই বোনের এই দুর্যোগে ও কি হাত গুটিয়ে বসে থাকবে? খোঁজখবর বা চিন্তাভাবনা করবে না? আর সেটা করতে গেলেই তো মনে পড়ে যাবে যে, দু’মাস আগে অনেকগুলো ছেলে তাদের বাসাতে গিয়েছিল। আর তাছাড়া অনিক? অনিকই বা কেন আমাদের বিশ্বাস করবে? তার নিজের গলাতেও তো আসামীর খাঁড়া ঝুলতে পারে! দোষী কে এটা যতক্ষণ না সাব্যস্ত হচ্ছে, অনিক নিজেও তো সন্দেহভাজনের তালিকায় থাকে, তাই না?’

শান্ত প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বললোশোভন কেন এখনো আসল বিপদটা আঁচ করতে পারেনি, এটা ভেবে ভীষণ অবাক হয়ে গেল সেশোভনটা তো কোনোকালে এত বেকুব ছিল না!

‘তার মানে তু…তুই বলতে চাচ্ছিস… আমাদের ঘাড়ে দোষ আসতে পারে!’ শোভন এতক্ষণে পয়েন্টে এলো।

‘হুম ঠিক তাই! তবে সবার ঘাড়ে তো আর দোষ আসবে না! নির্দিষ্ট কারো ঘাড়েই আসবে। কারণ সেদিন যদি গ্যাং রেপ হয়ে থাকতো তাহলে তো আর বিষয়টা কারো অজানা থাকতো না, তাই না? যা ঘটেছে তা চুপিসারেই ঘটেছে।’

‘এই যাহ্‌! এসব কী বলছিস যা তা!’

‘হুম অমানবিক শোনাচ্ছে অবশ্যই। কিন্তু সত্য ঘটনা বের না হয়ে আসা পর্যন্ত আমরা কেউই সন্দেহের আওতা থেকে মুক্ত নইকাজেই জেলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাক!’ শান্ত বেজায় শান্ত মুখেই কথাগুলো বললো।

‘এই শান্ত…তুই কি পাগল টাগল হয়ে গেলি নাকি? আমরা কেন রেপ করতে যাবো ঐ বাচ্চা মেয়েটাকে? তার ওপরে মেয়েটা আবার প্রতিবন্ধী! কথাও বলতে পারে না ঠিকমত দেখলেই তো কেমন মায়া লাগে!’

‘হুম, আর সেটার সুবিধাই তো আমরা নেবো, তাই না? নিজের মুখে যে কিছু বলতে পারে না, তার সর্বনাশ করার মতো সহজ কাজ কি আর কিছু আছে? আর তাছাড়া… আমরা কি সবাই একেবারে ধোয়া তুলসিপাতা নাকি যে কেউ রেপ করতে পারবো না? আমাদের রিয়াজের যে ফুলের মতো চরিত্র! আর যে নড়বড়ে একখানা মুখ! প্রথমদিন মেয়েটাকে দেখে ফিরে এসে কী মন্তব্য করেছিল মনে আছে? মালটা তো জব্বর খাসা রে! একেবারে টসটসা! ইস! চান্স পাইলে খাইতাম বেদানার মতো দানা সরিয়ে সরিয়ে…ছিঃ মন্তব্যের কী ছিরি! সেদিন তো কেউ কোনো প্রতিবাদ করিসনি! দু’একজন আড়ালে মুখ ঘুরিয়ে হেসেওছে আমি দেখেছি। আর আজ এসেছিস একেবারে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির সাজতে?’

‘তুই আমাকে এভাবে বলছিস কেন? আমি কি হেসেছি নাকি?’

‘তুই না হাসিস, অন্য অনেকেই তো হেসেছে! আর তাছাড়া এরকম কথার পরেও রিয়াজের ব্যাপারে অনিককে কেউ সাবধান করে দেয়নি। রিয়াজকেও কেউ কিছু বলেনি সুমনা যদি এইসব ব্যাপার জানতে পারে, তাহলে কী ভাববে আমাদের সম্পর্কে? আর এখনই বা কী ভাবছে কে জানে! ছিঃ ছিঃ! মান সম্মান কিছুই আর থাকলো না!’

‘সেই রে! এভাবে তো চিন্তা করিনি! তুই তো খুব দুশ্চিন্তায় ফেলে দিলি! এখন কী করা যায় বল দেখি?’

‘আচ্ছা দাঁড়া। এখনই এত সাতপাঁচ ভেবে মাথা গরম করার দরকার নেই। আগে সকাল হোক। অনিকের সাথে কথা বলি। দেখি ও কী ভাবছে। এমনও তো হতে পারে, আমরা শুধু শুধুই আজেবাজে চিন্তা করে মাথা নষ্ট করছি। ওরা হয়ত এসব কিছু ভাবছেই না! কিংবা হয়ত রুমানাকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে গিয়েছিল সুমনা। ওর নানাবাড়িতেও যেতে পারে। সেখানেও কিছু হয়ে থাকতে পারে। তাই না?’ শোভন খুব ভড়কে গেছে দেখে শান্ত একটু সাহস দেওয়ার চেষ্টা করলো

‘ইস! তাই যেন হয় রে! তবু এসব শুনে মাথাটা কেমন যেন এলোমেলো লাগছে। আজ রাতে হয়ত আর ঘুমাতেই পারবো না।’ 

‘ঘুম কি আমারই আসবে এখন? আর…ঐটুকুন অবোধ একটা মেয়ে! ভাবা যায়? কে করলো এমন কাজ?’ আপন মনেই স্বগতোক্তি করলো শান্তওপাশে শোভনও আর কথা খুঁজে পেল না। ‘রাখছি তাহলে’ বলে লাইনটা কেটে দিল।

 

 

(ক্রমশ)

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত