কলকাতার বাংলা হাসির সিনেমা: সেকাল ও একাল

 


কৌশিক মাইতি


কখনও নিখাদ হাস্যরস, আর কখনও বা হাসির মধ্য দিয়ে চাবুকের আঘাত- টলিউড উপহার দিয়েছে অসংখ্য মন ভালো করা হাসির সিনেমা। শুধু মাত্র সূক্ষ্ম হাস্যরস না, দক্ষ অভনয়ের মধ্য দিয়ে এক একটা চরিত্র দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছে। নায়ক বা নায়িকার ছায়ায় না থেকে অনেক সময় কমেডিয়ানরাই সিনেমার মূল আকর্ষণ হয়ে উঠেছেন। এমনকি বেশকিছু সিনেমায় মূখ্য চরিত্র তাঁরাই। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘গল্প হলেও সত্যি’, ‘মোহনবাগানের মেয়ে’, ‘বসন্ত বিলাপ’, ‘ছদ্মবেশী’, ‘মৌচাক’, ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’, ‘ভানু পেল লটারী’, ‘ভানু গোয়েন্দা, জহর এসিটেন্ট’, ‘গুপি গাইন, বাঘা বাইন’, ‘আশি তে আসিও না’, ‘পরশ পাথর’, ‘ওগো বধূ সুন্দরী’, ‘পারসোনাল এসিটেন্ট’, ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’, ‘হীরক রাজার দেশে’, ‘ধন্যি মেয়ে’, ‘বাঞ্ছারামের বাগান’, চারমূর্তি’ ইত্যাদি সিনেমাগুলির প্রতিটা দৃশ্য আজও জীবন্ত দর্শকের মনে। ভানু বন্ধ্যোপাধ্যায়, রবি ঘোষ, তুলসী চক্রবর্তী, জহর রায়, চিন্ময় রায়, তরুণ কুমার, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, উৎপল দত্তরা দর্শককে অভিনয় দক্ষতায় মুগ্ধ করেছেন, হাস্যরসে হাবুডুবু খেয়েছে বাঙালি। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘চারমূর্তি’, ‘ওগো বধূ সুন্দরী, ‘মৌচাক’, ‘ভানু পেল লটারী’ সিনেমাগুলোয় যেমন দর্শক নিখাদ হাসির ভেলায় ভেসেছে, তেমনি ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমায় রাজা ও শাসন ব্যবস্থার নগ্নতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন। ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’ সিনেমায় সমাজের চরম সত্যগুলো ফুটে উঠেছে। কিমবা ‘আশি তে আসিও না’ সিনেমায় এক বৃদ্ধের জোয়ান হওয়ার স্বপ্ন ও ‘পরশ পাথর’ সিনেমায় নিতান্ত এক কেরানীর জীবনের নানা দিকগুলো অসামান্য দক্ষতায় উপস্থাপিত হয়েছে। হঠাৎ একদিন যুবক হয়ে যাওয়া কিমবা ‘পরশ পাথর’ লাভ, ধনী হওয়া, আবার পরবর্তীতে পুরানো জীবনে ফিরে যাওয়া- যেন মোহ ও মোহভঙ্গের একটা সম্পূর্ণ বৃত্ত। এক একটা সিনেমা সৃষ্টির চূড়ান্ত নিদর্শন। কখনও নির্ভেজাল হাসির কলতান উঠেছে, কখনও হাসির ভেতর লুকানো চাবুক দর্শকের হৃদয়ে অব্যর্থ নিশানায় আঘাত হেনেছে। জীবন, সংসার, সমাজ ও রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে হারিয়ে যাওয়া মানুষের জীবনে সিনেমাগুলো যেন সঞ্জীবনী মন্ত্র।

বাংলা কমেডিয়ানদের মধ্যে ভানু বন্ধ্যোপাধ্যায় অন্যতম, উপরে উল্লেখ করা সিনেমা গুলোর বেশিরভাগই তাঁর অভিনীত। তিনি অভিনয় গুণে এতটাই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন যে তাঁর নামেই বেশ কয়েকটি সিনেমার চরিত্রের নামকরণ হয়েছে। ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’ সিনেমার ‘সিদু’ ও তার ষাঁড় ‘ভোলা’র কথা চোখ বুজলেই ভেসে ওঠে, সিদুর স্বর্গে ‘হাম হাম গুড়ি গুড়ি’ ড্যান্স শেখানোর দৃশ্য মনে পরলেই মন ভালো হয়ে যায়। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ এ নবাগত ভানুর ‘কেদার’ চরিত্রটা আজও জীবন্ত। ‘গুপি গাইন, বাঘা বাইন’ সিনেমায় তপেন চ্যাটার্জী (গুপি) ও রবি ঘোষ (বাঘা) এর অভিনয় ও হাস্যরস বাচ্চা থেকে বৃদ্ধ সকলকেই মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন করে। ‘বাঞ্ছারামের বাগান’ সিনেমাটি একটি স্যাটায়ার, জমিদারের জমি কাড়া ও জমির মালিকের জমি বাঁচানোর গল্প- হাসতে হাসতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে দর্শক। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বনে নির্মিত ছবি ‘চারমূর্তি’ সিনেমায় বাকসর্বস্ব, পেটুক চিন্ময় রায় (টেনিদা) এর অভিনয় প্রতিটা বাঙালির মনের মনিকোঠায় জায়গা করে নিয়েছে, এটা একটা আইকনিক ছবি। এরকম অসংখ্য সিনেমা আছে, যেখানে সুন্দর গল্প আছে, অফুরন্ত হাসির রসদ আছে, অসাধারণ অভিনয় আছে, মুগ্ধতা আছে।

এতো বাংলা সিনেমার সেকালের গল্প, একালের সিনেমায় সেই নিখাদ হাস্যরস কোথায়? দক্ষ কমেডিয়ানের সংখ্যা তো নিতান্তই হাতে গোনা। আজকাল ঝাঁ চকচকে, ফাঁকা বাণিজ্যিক ছবি কিমবা আঁতেল, প্ল্যাস্টিক মার্কা ছবির ভিড় বাংলায়, ভালো সিনেমা কমই হয়। আর বর্তমানে ভালো বাংলা হাসির সিনেমার কথা মনে করতে হলে বেশ কিছুক্ষণ মাথার ব্যায়াম করতে হয়। ‘ভূতের ভবিষ্যত’, ‘আশ্চর্য প্রদীপ’ সিনেমাগুলোকে বর্তমান সময়ের সেরা হাসির সিনেমা বলা যায়, তবে এগুলো পুরোপুরি কমেডি সিনেমা না, স্যাটায়ার বলা যায়। পরাণ বন্ধ্যোপাধ্যায়, শাশ্বত, রুদ্রনীল, রজতাভরা কিছুটা হলেও সেই পরম্পরাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। চেষ্টা করেন দর্শককে সব ভুলে দাঁত বের করার তৃপ্তি দিতে। এগুলোই আশার আলো। কিন্তু সেই মানের হাসির সিনেমা আর নেই। কিছু কিছু সিনেমার কিছু দৃশ্যে তাদের রসবোধের দুর্দান্ত প্রকাশ দেখা যায় বটে। এছাড়া ‘বাই বাই ব্যাংকক’ ‘ছ এ ছুটি’, ‘গোড়ায় গণ্ডগোল’, ‘কেলোর কীর্তি’, ‘ঠাম্মার বয়ফ্রেণ্ড’, ‘হাওয়া বদল’ এগুলোর কোনোটাই ভালো হাসির সিনেমা না, অভিনয় নজরকাড়া তো নয়ই, উল্লেখ করার মতও কিছু না। অথচ আজকালকার হাসির সিনেমা এগুলো ছাড়া তো তেমন কিছুই নেই। বাংলা সিনেমায় বেশ কিছু বছর কমেডিয়ান হিসাবে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল শুভাশীষ চক্রবর্তীর, কিন্তু ভেবেও সেভাবে কোনো ভালো হাসির সিনেমার নাম মাথায় এল না। কাঞ্চন ও বিশ্বনাথের কথা ছেড়ে দেওয়াই শ্রেয়। অতি অভিনয় ও শুধুমাত্র বলপূর্বক অঙ্গভঙ্গি দিয়ে একজন অভিনেতা বড় কমেডিয়ান হতে পারে না, প্রয়োজন সূক্ষ্ম রসবোধের, চালচলন ও শরীরী ভাষা গুরুত্বপূর্ণ ।

বাংলায় নিখাদ হাসির সিনেমা বেশি করে হোক। কিছু উচ্চ মানের হাসির সিনেমার অপেক্ষায় থাকলাম। সাথে তো ভানু বন্ধ্যোপাধ্যায়, রবি ঘোষ, জহর রায়, তুলসী চক্রবর্তীদের কালজয়ী সিনেমাগুলো আছেই, মন ভালো করার ওষুধ তো তাঁরাই। তবুও নতুন ধরনের, নতুন স্বাদের হাসির সিনেমা নির্মাণ অত্যন্ত জরুরী। ‘ভূতের ভবিষ্যত’ ও ‘আশ্চর্য প্রদীপ’ এর মত বাংলায় আরো অনেক সুন্দর হাসির সিনেমা তৈরি হবে, এই আশা নিয়েই শেষ করলাম।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত