| 22 মে 2024
Categories
ধারাবাহিক সময়ের ডায়েরি

পদসঞ্চার (পর্ব-২১)

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

৩০ এপ্রিল । বৃহস্পতিবার

ভারতে  করোনা আক্রান্ত ৩০ হাজারের বেশি মানুষ। গত ২৪ ঘন্টায় আক্রান্ত হয়েছেন ১৫৪৩ জন। মৃতের সংখ্যা হাজার ছুঁতে চলেছে। আমাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের যুগ্ম সচিব অবশ্য বলেছেন চিন বাদে অন্য যে ২০ টি দেশে সব চেয়ে বেশি করোনা ছড়িয়েছে, তাদের মোট জনসংখ্যা ভারতের মোট জনসংখ্যার সমান। অথচ এই দেশগুলিতে সংক্রমিতের মোট সংখ্যা ভারতের ৮৪ গুণ আর মৃতের সংখ্যা ভারতের ২০০ গুণ। ভারতে সুস্থ রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। তা গতকাল ছিল ২০.৬৬%, আজ সেটা বেড়ে হয়েছে ২৩.৩%। এসব অঙ্কের কথা।

অঙ্কতে কি মন ভোলে! সেই যে কবি বলেছেন, মানুষের মুখ্য ভয় মৃত্যুভয়। মৃত্যুমিছিলের ছবি দেখি টিভিতে। আমেরিকায়, ইতালিতে, স্পেনে, ফ্রান্সে। শুনতে পাই এ দেশেও যারা মারা যাচ্ছে তাদের মৃতদেহ আত্মীয়-স্বজনকে দেওয়া হচ্ছে না। বিতিকিচ্ছিরিভাবে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাই ভয়।

মনকে প্রবোধ দেবার জন্য আবার অঙ্ক নিয়ে বসি। বিশ্বে করোনায় আক্রান্ত কতজন? ৩১৯২৬৯১ জন। মৃত কত? ২২৬৩০৫ জন। সুস্থ কতজন? ৯৮৮০৬৭ জন। কি দেখা যাচ্ছে? মৃতের অন্তত ৪ গুণ মানুষ আরোগ্য লাভ করছেন। সেই সঙ্গে কো-মর্বিডিটির তত্ত্বও মনকে সান্ত্বনা দেয়। যারা মারা গেলেন, তাঁদের অনেকেরই কিছু না কিছু অসুখ ছিল আগে থেকে।

মনকে সান্ত্বনা দেবার জন্য আরও একটা কাজ করলাম। যাঁরা করোনাকে হারিয়ে দিয়ে সুস্থ হয়েছেন, পড়তে লাগলাম তাঁদের কাহিনি। শুরু করা যাক ভারতের প্রথম করোনা আক্রান্তকে দিয়ে তিনি কেরলের এক কুড়ি বছরের যুবতী। ডাক্তারি পড়ার জন্য গিয়েছিলেন চিনের উহান মেডিকেল কলেজে, তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। জানুয়ারি মাস। ২০২০ সাল। তাঁর সেমিস্টার শেষ। ছুটিতে বাড়ি আসতে চান। সে সময়ে উহানে লকডাউন ঘোষণা হতে চলেছে।  তিনি উহান থেকে ট্রেনে এলেন কানমিং।

সেখান থেকে প্লেনে কলকাতা। কলকাতা থেকে ২৪ জানুয়ারি এলেন কোচিতে। বিমান বন্দরে তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা হল। সব ঠিক আছে। বাড়ি এলেন। ২৭ জানুয়ারি গলায় ব্যথা অনুভব করলেন, সেই সঙ্গে কাশি। চলে গেলেন ত্রিশুরের জেনারেল হাসপাতালে। পরীক্ষার জন্য তাঁর রক্ত আর লালারস পাঠানো হল পুনের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ ভায়রোলজিতে। ২৯ তারিখে শরীরে একটু তাপমাত্রা দেখা গেল। ৩০ জানুয়ারি রিপোর্ট এল পরীক্ষার। তিনি করোনা আক্রান্ত। ৩১ জানুয়ারি থেকে ত্রিশুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হলেন। থাকলেন কোয়ারেন্টাইনে। সপ্তাহ খানেক বাদে আবার পরীক্ষা হল। রিপোর্ট নেগেটিভ। আরও কিছুদিন হাসপাতালে থেকে ফিরলেন বাড়ি। ভীত বা হতাশ হননি। ফেব্রুয়ারি থেকে অনলাইনে পড়াশুনো শুরু করে দিয়েছেন। অবসর সময়ে মশগুল থাকেন রান্না-বান্না নিয়ে।

এলিজাবেথ সাচনেইডার। ৩৭ বছরের নারী। ওয়াশিংটনের সিয়াটেলের বাসিন্দা। বায়োএঞ্জিনিয়ারিং-এ পি এইচ ডি করছেন। ২২ ফেব্রুয়ারি তিনি একটা পার্টিতে গিয়েছিলেন। ২৫ তারিখে সকালে উঠে ক্লান্তি বোধ করেন। তবুও কর্মস্থলে যান। দুপুরে মাথা ধরা শুরু হয়। একটু জ্বর আসে। শরীরে ব্যথা অনুভব করেন। তাই চলে আসেন কর্মস্থল থেকে। একটু ঘুমের পরে উঠে দেখেন বেশ জ্বর এসেছে। পরের দিন জ্বর কমে যায়। এলিজাবেথ করোনার খবর জানতেন। তবে কাশি বা শ্বাসকষ্ট ছিল না তাঁর, তাই নিশ্চিন্ত ছিলেন। ডাক্তারও দেখালেন। ডাক্তার তাঁকে কয়েকদিন বিশ্রাম নিতে বললেন।

দিনকয়েক পরে তিনি এক বন্ধুর ফেসবুক দেখে চমকে উঠলেন। তিনি দেখলেন সেই পার্টিতে তাঁর মতো আর যাঁরা গিয়েছিলেন, সকলেই তাঁর মতো মৃদু অসুস্থতা বোধ করছেন। তখন এলিজাবেথের সন্দেহ হল। তিনি সেয়াটেল ফ্লু স্টাডিতে পরীক্ষা করালেন। দেখা গেল করোনা পজিটিভ। ডাক্তার তাঁকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বললেন। কিছুদিন পরে তিনি সুস্থ হয়ে উঠলেন। এলিজাবেথ বলেছেন যাঁদের লক্ষণগুলো গুরুতর নয়, তাঁরা বাড়িতে থেকে যেন পূর্ণ বিশ্রাম নেন আর প্রচুর জল খান।

বাংলাদেশের নাফিয়া রহমান। ১৯ মার্চ পর্যন্ত অফিস করেছেন। তারপরে লকডাউন। মিরপুর টোলারবাগের বাড়িতে বসে কাজ করেছেন। তাঁর কর্মস্থলে করোনা সংক্রমণের খবর পাচ্ছেন। ৩ এপ্রিল গলায় সামান্য ব্যথা অনুভব করলেন। তারপরে অন্য লক্ষণ প্রকট হল। ৭ এপ্রিল পরীক্ষার পরে ধরা পড়ল তিনি করোনা আক্রান্ত। হাসপাতালে ভর্তি হলেন। দেখলেন বাড়ির ফোন এলে অন্য রোগীরা কান্নাকাটি করছেন। তিনি তাদের বোঝাতে লাগলেন। বললেন, কান্নাকাটি করলে শ্বাসকষ্ট বাড়বে, বাড়ির লোকেরাও ভেঙে পড়বেন। এরকম অবস্থায় মনোবল ঠিক রাখা দরকার।

৪৫ বছরের ব্যবসায়ী রোহিত দত্ত। ২৫ ফেব্রুয়ারি ইউরোপ থেকে দিল্লি ফেরেন তিনি। ২৬ ফেব্রুয়ারি জ্বর আসে। ডাক্তারকে দেখান। ডাক্তার বলেন যে তাঁর গলায় একটা ইনফেকশন হয়েছে। তিনদিনের ওষুধ দেন। ২৮ তারিখে জ্বর সেরে গেল। তিনি নিশ্চিন্ত হলেন। কিন্তু পরের দিন আবার এল জ্বর। তখন তাঁর সন্দেহ হল। চিন, ইতালি, স্পেনের খবর কানে আসছিল। ১ মার্চ তিনি রামমনোহর লোহিয়া হাসপাতালে পরীক্ষা করালেন। ধরা পড়ল করোনা। তাঁকে সফদরজং হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হল।

তাঁকে রাখা হল আইসোলেশন ওয়ার্ডে। সেখানে দিল্লির করোনা আক্রান্ত আরও ৭ জন রোগী ছিলেন। একজন রোগী মারা গেলেন। রোহিত তা দেখে একটু বিচলিত হলেও মনোবল হারালেন না। শেষ পর্যন্ত করোনাকে হারোয়ে দিলেন তিনি। রোহিত বলেছেন করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে মনের জোরটাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

ইংল্যান্ডের ব্রাইটনের কাছে হোভের স্টিভ ওয়ালশ একজন ব্যবসায়ী। তিনি সিঙ্গাপুরে এক সম্মেলনে গিয়েছিলেন। ১৯-২২ জানুয়ারি সেই সম্মেলনে কাটান তিনি। এই সম্মেলনে প্রায় ৯০ জন প্রতিনিধি ছিলেন। সেখানে তিনি যে করোনা সংক্রমিত হয়েছেন, তা বুঝতে পারেননি। ৩ ফেব্রুয়ারি তিনি শুনতে পেলেন সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন এমন এক পরিচিত মানুষ করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। ওয়ালশ ডাক্তার দেখাতে যান। নিজের অজান্তে ডাক্তারকেও সংক্রমিত করেন। শুধু ডাক্তার নন, নিজের অজান্তে আরও ১০ জনকে তিনি সংক্রমিত করেন। সেজন্য তাঁর আফশোশের অন্ত্য নেই। হাসপাতালে ভর্তি হবে তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। হাসপাতাল থেকে বাড়িতে এসে তিনি হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকেন।

টালিগঞ্জের লেক আ্যভিনিউর নিতাইদাস মুখোপাধ্যায়। ৫২ বছর বয়স। কাজ করেন ডিজাসটার ম্যনেজমেন্টে। নন্দরাম মার্কেটের অগ্নিকান্ড, বাগরি মার্কেট ও স্টিফেন্স হাউসের অগ্নিকান্ড, পোস্তার সেতুভঙ্গ- এসবে তিনি ছিলেন সামনের সারির সৈনিক। লকডাউন হবার পরে ডিজাসটার ম্যানেজমেন্টের কাজ বন্ধ। কিন্তু চুপচাপ বসে থাকবার মানুষ নন নিতাই। সহকর্মীদের নিয়ে তিনি নেমে পড়লেন দুর্গত মানুষের হাতে ক্ষুধার অন্ন তুলে দিতে। সেখান থেকেই হল করোনার সংক্রমণ। বছর দুই আগে নিউমোনিয়া হয়েছিল, তাই করোনা তাঁকে কাবু করে ফেলল।

প্রথমটা বুঝতে পারেননি। শিশুমঙ্গলে এক্স রে করে পূর্বাভাস পাওয়া গেল। আমরিতে পরীক্ষা করে বোঝা গেল তিনি করোনা আক্রান্ত। ক্রমে শরীর অরও খারাপ হতে লাগল। টানা ২২ দিন ছিলেন কোমায়। নাকে-মুখে নল দিয়ে তাঁকে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। তারপরে তিনি জিতলেন যুদ্ধে। তিনি বলেছেন, ‘এখন তো হুইল চেয়ারে বন্দি হয়ে আছি। কোমরের নিচটা অসাড়। ফিজিওথেরাপি চলছে। ক’দিন পরে  নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পড়ব। আমার বিশ্বাস, করোনা যতই ভয়ংকর হোক, মানুষের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারবে না। একটা সময় হতোদ্যম হয়ে পড়বে।’

করোনাভাইরাস সম্পর্কে বৃদ্ধদের সাবধান থাকতে বলা হয়। কারণ বয়সের জন্য তাঁদের রোগ প্রতিরোধের শক্তি কম। তার উপর অন্যান্য অসুখ থাকাও স্বাভাবিক। কিন্তু বয়স সব সময় করোনাকে জিতিয়ে দিতে পারে না। উদাহরণ নিউ জার্সির সিলভিয়া গোল্ডশোল। তাঁর বয়স ১০৮ বছর। তিনি পৃথিবীর অনেক দুর্যোগ দেখেছেন। দেখেছেন দু-দুটি বিশ্বযুদ্ধ, স্প্যানিশ ফ্লু, গ্রেট ডিপ্রেশন। করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি, কিন্তু হারিয়ে দিলেন করোনাকে। দুর্জয় মনোবলই তার কারণ। তিনি বলেছেন, ‘বেঁচে থাকব ঠিক করে নিয়েছিলাম বলেই বেঁচে আছি।’

এবার বলি ড. সাজিদ হকের কথা। সাউথ আফ্রিকার ইউনিভার্সিটি অফ কেপটাউনের অধ্যাপক ও গবেষক তিনি। মাস কয়েক আগে চাকরি বদলে তিনি কেপটাউনে এসেছেন কানাডা থেকে। সেখানে তখন করোনায় কেউ আক্রান্ত হননি। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে ব্যক্তিগত কিছু কাজে তাঁকে কানাডা যেতে হয়। ফিরে আসেন মার্চের ৫ তারিখে। করোনায় কেউ আক্রান্ত না হলেও সতর্কতা আছে। সপ্তাহ খানেক বাদে তাঁর হালকা কাশি দেখা যায়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে বাড়িতে বসে কাজ করতে বলেন। করোনা হতে পারে এই সন্দেহ করে তাঁর মনে হয়, একদিন তিনি বাড়ির ও বাইরের যাঁদের সংস্পর্শে এসেছেন, তাঁদেরও তো সংক্রমিত করতে পারেন। মেল করে তাঁদের তিনি সতর্ক করে দেন। তারপরে যান ডাক্তারের কাছে। ডাক্তারের পরামর্শে এক বেসরকারি ল্যাবে পরীক্ষা হয়। ২ দিন পরে পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায় তিনি করোনা পজিটিভ। তাঁর স্ত্রী ও ছেলের কাশি দেখা গেলে তাদেরও পরীক্ষা হয়। অবশ্য তাদের রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। হোম কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন সাজিদ। দু সপ্তাহ পরে উপসর্গগুলো মিলিয়ে যায়। রিপোর্টও নেগেটিভ আসে।

লি ওয়েনলিয়াং। চিনের উহান সেন্ট্রাল হাসপাতালের চক্ষু বিশেষজ্ঞ। গত ডিসেম্বরে করোনা রোগের প্রাদুর্ভাব কেন্দ্রে কাজ করছিলেন তিনি। নতুন ধরনের এক ভাইরাসে আক্রান্ত ৭ জন মানুষকে দেখেন তিনি। তাঁর মনে হয় সি ফুড মার্কেট থেকে ভাইরাস ছড়িয়েছে। কিন্তু ভাইরাসের ব্যাপারে সতর্ক করতে চেষ্টা করেন প্রশাসনকে। ফল হয় উল্টো। আজেবাজে গুজব ছড়ানোর জন্য পুলিশ তাঁকে সতর্ক করে। এরপরে এক নারীর গ্লুকোমা চিকিৎসা করেন তিনি। জানতেন না যে নারীটি করোনায় আক্রান্ত। ফলে লি-ও করোনায় আক্রান্ত হন। প্রথমবার রিপোর্ট নেগটিভ এলেও কাশি, জ্বর ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে। নিউক্লিক আ্যসিড পরীক্ষায় ধরা পড়ে করোনা। ডা. লি অবশ্য করোনাকে জয় করতে পারেননি।

লন্ডনের বাসিন্দা রিয়া লাখনি। বছর সাতেক আগে তাঁর আকালেসিয়া রোগ ধরা পড়ে। এই রোগের ফলে খাবার গিলতে কষ্ট হত। তাই তিনি শক্ত খাবার খেতেন না। অস্ত্রোপচারের জন্য হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানেই আক্রান্ত হন করোনায়। প্রথমে শ্বাসকষ্ট হয় পরে জ্বর। ডাক্তাররা প্রথমে মনে করেছিলেন এসব অস্ত্রোপচারের প্রভাব। লালারসের নমুনা পরীক্ষা করে করোনা ধরা পড়ে। দিনকে দিন অবস্থা খুব খারাপ হয়। তিনি ভেবেছিলেন আর ফিরবেন না হাসপাতাল থেকে। তাই শেষ চিঠিও লিখতে বসেছিলেন। তারপরে দুর্বার জীবনীশক্তি দিয়ে তিনি ফিরে এলেন মৃত্যুর মুখ থেকে।

[ক্রমশ]

আগের সবগুলো পর্ব ও লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে ক্লিক করুন।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত