| 15 এপ্রিল 2024
Categories
ধারাবাহিক সময়ের ডায়েরি

পদসঞ্চার (পর্ব-২২)

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

৫ মে, মঙ্গলবার

চলে গেল মে-দিবস। আট ঘন্টা কাজের দাবিতে লড়াই করেছিলেন শ্রমিকরা এই দিনে। কার্ল মার্কস বলেছিলেন এই শ্রমিকরাই হবেন আগামী দিনের বিপ্লবের অগ্রগামী বাহিনী। এঁরাই সর্বহারা। সর্বহারার শৃঙ্খল ছাড়া হারাবার কিছু নেই। পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা মার্কস বিশেষভাবে বলেছিলেন কিনা জানি না। করোনা কবলিত দেশে পরিযায়ী শ্রমিকদের দুর্দশা দেখে মনে হল, এঁদের অবস্থার মৌলিক কোন পরিবর্তন হয়নি। এঁরা রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’র সংখ্যাবাচক শ্রমিকদের মতো নামহীন। জীবিকার টানে এক রাজ্যের শ্রমিক চলে গিয়েছেন অন্য রাজ্যে। লকডাউন শুরু হবার পরে বিপদে পড়েছেন তাঁরা। ভাড়ার অভাবে বাড়িওয়ালা তাঁদের উৎখাত করতে চান, হাতে টাকা-পয়সা নেই, খাবার-দাবার নেই। তাই মরিয়া হয়ে তাঁরা ঘরে ফিরতে চান। এর মধ্যে বেশ কিছু শ্রমিক পায়ে হেঁটে বা অন্য কোন উপায়ে ফিরে এসেছেন ঘরে। কিন্তু এখনও বিপুল সংখ্যাক ফিরতে পারেন নি।

‘স্ট্র্যান্ডেড ওয়ার্কাস আ্যকশন নেটওয়ার্ক’ তাঁদের এক সমীক্ষায় বলেছেন ৫ সপ্তাহ লকডাউন চলার পরে ৬৪% পরিযায়ী শ্রমিকের হাতে ১০০ টাকাও নেই। ৯৭% শ্রমিক কোন নগদ সাহায্য পান নি সরকারের কাছ   থেকে। মজুরি পান নি ৭৮% শ্রমিক। মাত্র ১৬% মজুরি পেয়েছেন, তাও আবার আংশিক। হকার, ঠেলাওয়ালা, রিকশাওয়ালাদের ৯৯%এর কোন রোজগার হয় নি। ৫০% শ্রমিক জানিয়েছেন তাঁদের হাতে ১ দিনের বেশি রেশন নেই। এ অবস্থায় তাঁদের মরিয়া হয়ে ওঠা ছাড়া উপায় ছিল না।

এঁদের কথা মনে ছিল না সরকার বাহাদুরের। দ্বিতীয় দফা লকডাউনের শেষ পর্বে মনে পড়ল। ঘরে ফেরার ছাড়পত্র দিলেন কেন্দ্র। কিন্তু সব দায় নিতে হবে রাজ্যকে। প্রতি রাজ্যে গড়তে হবে নোডাল অথরিটি। তারা আটকেপড়া শ্রমিকদের তালিকা তৈরি করবে। যেহেতু ট্রেন বা বিমান পরিষেবা বন্ধ, তাই সড়কপথে বাসে করে  নিয়ে আসতে হবে। বাসগুলিকে সংক্রমণমুক্ত করতে হবে, দূরত্ববিধি মেনে চলতে হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি।

কেন্দ্র নির্দেশ দিয়ে খালাস। রাজ্যগুলির পরিকাঠামো আছে কিনা সে খোঁজ নেবার দরকার নেই। এক ধাক্কায় এই বিপুল সংখ্যক মানুষের করোনা পরীক্ষার দায়ভার রাজ্যের পক্ষে নেওয়া বাস্তবিক অসম্ভব। তাছাড়া উপসর্গহীন মানুষের ক্ষেত্রে কি হবে!  সমগ্র দেশে উপসর্গহীন মানুষের সংখ্যা ৬৯%। উপসর্গহীন এইসব মানুষ সমাজে মিশে নতুন বিপদ তৈরি করবেন। এখনও পর্যন্ত গ্রাম সুরক্ষিত, এরপর তা আর সুরক্ষিত থাকবে না। গোষ্ঠী সংক্রমণের আশঙ্কা বেড়ে যাবে বহুগুণ। সেই সঙ্গে আর্থিক প্রশ্ন তো আছেই। সংক্রমণ বৃদ্ধি পেলে অথবা অব্যবস্থা দেখা দিলে কেন্দ্র দোষ দেবে রাজ্যের। একেই বলে, ভাত দেবার ভাতার নয়, কিল মারবার গোঁসাই।

এ পর্যন্ত লেখার পরে আরতি আজকের খবরের কাগজ হাতে সামনে এসে দাঁড়াল। আমি চশমা খুলে বললাম, কি ব্যাপার?

সে বলল. আজকের কাগজে একটা ছবি বেরিয়েছে, দেখেছ?

-না, এখনও কাগজ দেখিনি। কিসের ছবি?

সে বলল, মদের দোকানের সামনে খদ্দেরদের লাইনের ছবি । বলিহারি বাবা, করোনা নিয়ে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা, লকডাউন, এর মধ্যে নেশাখোরদের হুড়োহুড়ি।

মনে পড়ল গত ২৩ শে মার্চ থেকে মদের দোকান বন্ধ। গতকাল থেকে সরকার মদের দোকান খোলার অনুমতি দিয়েছেন। মদের দাম ৩০% বাড়লেও নেশাখোরদের তা দমাতে পারে নি। দোকান খুলেছে তিনটেতে। কিন্তু সকাল থেকে লোক লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। বৃষ্টিকে তোয়াক্কা করেন নি। তিনটের সময় যখন দোকান খুলল, দেখা গেল বহু জায়গায় লাইন ছড়িয়ে গিয়েছে প্রায় এক কিলোমিটার। নির্দেশ ছিল লাইনে পাঁচ জনের বেশি দাঁড়ানো যাবে না। সে নির্দেশ মানার দায় কারোর নেই। তবে অনুগ্রহ করে মুখে মাস্ক পরেছিলেন তাঁরা। করোনার ছোঁয়াচের আশঙ্কা ভুলে গেছেন মানুষ, ভুলে গেছেন সামাজিক ব্যবধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভিড় সরানোর জন্য কয়েক জায়গায় পুলিশকে লাঠি নিয়ে তাড়া করতে হয়েছে।

প্রথম দিকে একটা গুজব রটেছিল যে মদ খেলে করোনা হয় না। এটা কি সেই গুজবের জের? নাকি, উদ্বেগ আর হতাশা দূর করার জন্য মদ খাওয়া? উদ্বেগ আর হতাশা বাস্তব। আমরা জানি না লকডাউন কতদিন থাকবে। পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে। আর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও জীবন-জীবিকার সংকট কি দূর হবে?

চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন করোনা-পূর্বের জীবন আর ফিরবে না । মাস কয়েক পরে সংক্রমণ কমতে পারে, কিন্তু তার আবার ফিরে আসার সম্ভাবনা থেকে যাবে। ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ’এর বিজ্ঞানীরা বলে দিয়েছেন যে কোভিদ-১৯কে জীবনের অংশ মনে করে  আগামী কয়েক বছর চলতে হবে আমাদের। বলতে হবে : কোভিদ-১৯ তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ।

সার্স-কোভ-২ ভাইরাস চিরস্থায়ী কিনা এই মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়।

‘ন্যাশনাল সেন্টার ফর সেল সায়েন্স’এর এক বিজ্ঞানী বলেছেন: সমস্ত জীবিত অর্গানিজমেই মিউটেশন হয়। যদি দেখা যায় যে, সেই মিউটেশন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাচ্ছে, তখন সেই গোষ্ঠী টিকে যায়। যদি খাপ না খায়, তাহলে তা বিলুপ্ত হয়ে যায়। সার্স-কোভ-২ চিরস্থায়ী কি না তা বলা সময় সাপেক্ষ। এমনও হতে পারে, যেমনভাবে মার্স বা সোয়াইন ফ্লু পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয় নি, কোভিদ-১৯ও সেই ভাবে থেকে যাবে মানুষের জগতে।

আর কয়েক মাস পরে সারা পৃথিবীতে আর কোথাও যদি নতুন সংক্রমণ না হয়, যাঁদের স্বল্প উপসর্গ আছে অথবা যাঁরা উপসর্গহীন, তাঁরা আপনা-আপনি সুস্থ হয়ে যান, তাহলেও তখনকার জীবন কোভিদ-১৯এর পূর্ববর্তী জীবন আমরা ফিরে পাব না।

পূর্ববর্তী মানবিক সম্পর্কযুক্ত জীবন আর ফিরে পাব না আমরা ? আমাদের সামাজিক জীবন, আমাদের প্রেম-প্রীতি হারিয়ে যাবে সব? আলিঙ্গন, চুম্বন, করমর্দন, মুখোমুখি আলাপন সব বন্ধ হয়ে যাবে? দুজনে মুখোমুখি গভীর দুখে দুখী আর কখনও হতে পারব না আমরা?

সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে রাখতে মানুষ অসামাজিক হয়ে যাবে। এই অসামাজিকতা কি মানুষের মনকে বিলুপ্ত করে দেবে না? মনহীন মানুষ তো মানবেতর প্রাণীর সমান। তাহলে কোভিদ-১৯এর ধাক্কায় আমরা সবাই যান্ত্রিক হয়ে যাব?

এসব ভাবনা কুরে কুরে খাচ্ছে মানুষকে।

ভাবনা ভুলে থাকার জন্য কেউ আশ্রয় নিচ্ছেন উত্তেজক পানীয়ের। কেউ বা আবার যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের ‘ঘুমিওপ্যাথি’র আশ্রয় নিচ্ছেন । ‘ঘুম ঘুম নিশ্চিন্ত / নাকের ডগায় মশাটা মশাই আস্তে উড়িয়ে দিন তো’। কবি জীবনানন্দও চেয়েছিলেন ধানসিঁড়ি নদীটির তীরে শুয়ে থাকতে- ‘কোনদিন জাগব না জেনে, কোনদিন জাগব না আমি / কোনদিন আর’।

আমাদের পাড়ার বাসিন্দা রাকেশ বসু। বয়স ৭০। স্ত্রী গত হয়েছেন বছর দুই আগে। এক ছেলে আর এক মেয়ে। ছেলে লন্ডনে থাকে। ডাক্তার। মেয়ে তার স্বামীর কর্মস্থল মুম্বাইতে থাকে। দুটোই করোনার হটস্পট। দু-জায়গায় লাফিয়ে লাফিয়ে আক্রান্ত বাড়ছে, বাড়ছে মৃত্যু। দুশ্চিন্তার অন্ত্য নেই রাকেশবাবুর। এর মধ্যে তাঁর যদি কিছু হয়ে যায়, ছেলে-মেয়ে শেয দেখাও দেখতে পারবে না। আবার ছেলে-মেয়ে অসুস্থ হলে তিনিও দেখতে পারবেন না।

পাড়ার ওষুধ দোকানে ওষুধ কিনতে এসেছেন রাকেশবাবু। ঘুমের ওষুধ। চেনা দোকানদার। যুবক। দোকানদার বলল, কাকু আপনার ঘুমের ওষুধ লাগল কেন?

রাকেশবাবু বললেন, দ্বিতীয় দফা লকডাউন হবার পরে হঠাৎ কেমন অস্থির অস্থির লাগছিল। দিনে আমি ঘুমোই না। কিন্তু রাতের ঘুমটাও চলে গেল। চোখের পাতা বন্ধ করলেই আজে-বাজে চিন্তা আসে। তাই ডাক্তার চক্রবর্তীর পরামর্শ নিলাম। তিনি ঘুমের ওষুধ লিখে দিলেন।

দোকানদার যুবক বলল, খুবই মাইল্ড ডোজের। তাও বলছি কাকু, এটা যেন অভ্যেস না হয়ে যায়।

-সে কথা ডাক্তার চক্রবর্তীও বলে দিয়েছেন।

-কাকু, একটু ব্যায়াম-ট্যায়াম করলে ঘুমের অসুবিধে হবে না।

রাকেশবাবু ক্লিষ্ট হাসি হেসে বলেন, জানি রে। কিন্তু বাবু, মনটা যদি তেতে থাকে তাহলে শারীরিক পরিশ্রম তাকে কাবু করতে পারে না। উদ্বিগ্ন মন দু-চোখের পাতা বন্ধ হতে দেয় না। একটু তন্দ্রা মতো আসে, ঠিক তক্ষুণি মনের ভেতরকার চিন্তাগুলো বিজ বিজ করে ওঠে।

সমস্যাটা শুধু রাকেশবাবুর নয়। করোনার আতঙ্ক আর অনির্দিষ্ট লকডাউনের ফলে অনেকেরই জাগরণে যায় বিভাবরী। তাই নিদ নাহি আঁখিপাতে। একটার সঙ্গে আর একটা যুক্ত। উদ্বেগ যেমন ডেকে আনছে নিদ্রাহীনতা, তেমনি নিদ্রাহীনতা ডেকে আনছে হজমের সমস্যা ও অন্যান্য ব্যাধি। তার মানে করোনা ভাইরাস ডেকে এনেছে এক সার্বিক সংকট – সামাজিক, আর্থিক, মানসিক।

 

 

[ক্রমশ]

 

আগের সবগুলো পর্ব ও লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে ক্লিক করুন।

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত