| 14 এপ্রিল 2024
Categories
ধারাবাহিক সাহিত্য

করোনাকালে ইন্দু বিন্দু (পর্ব-১)

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

করোনা শুরুর দিকে শেষ হয়েছিলো তারপর দুইমাস কয়েকদিনের বিরতি, পাঠকদের অনুরোধে আবারো শুরু হল ইরাবতীর পাতায় করোনাকালে ইন্দু বিন্দু। আজ রইলো করোনাকালে ইন্দু বিন্দু পর্ব-১।


জামাইদের নিয়ে মজার গল্প

মায়েরা ছিল চার বোন। জামাইষষ্ঠী উপলক্ষে প্রতিবছর খুব ধুম করে চার জামাইয়ের জন্য এলাহী আয়োজন হতে দেখেছি মামাবাড়িতে।মায়েদের কোল আলো করে সব আমরা এসে গেছি তখন। তাই সেদিন দিদিমার সঙ্গে মায়েদের ষষ্ঠীব্রত পালন হত।  আর বাড়িতে জামাইয়ের জন্য হাঁস মেরে গুষ্টিশুদ্ধ খেত মাস। না না হাঁসের মাংস নয় পাঁঠার মাংস। সঙ্গে ঘিভাত, তপসে ফ্রাই, চিংড়ি মালাইকারী এইসব আর কি। বড় কাঁসার থালার এধার থেকে ওধার সাজানো পঞ্চব্যাঞ্জনের বাটি। পাশের রেকাবে দৈ মিষ্টি, সুন্দর করে কুচোনো আম । যে বছর বাটা থাকত পাঁচফল, স্ত্রী আচার তার আগেই হয়ে যেত। যেমন সব জামাইদের দেওয়া হয়, আর সব বাড়িতে। মায়েদের হত ফলারের আয়োজন। আমাদের মঙ্গলার্থে। চিঁড়ে, মুড়ি, খই, মিষ্টি দই, আম, কলা, মিষ্টি সব থরেথরে সাজানো হত। মিষ্টি খেয়ে মুখ মরে যাবে বলে মাঝেমাঝে থাকত নোনতা । লুচি আর পটলভাজার টাকনা। জামাইদের জন্য লুচির ময়দা মাখা হতই দুপুরে । ভাতের পাতে এইদিনটাতেই কেবল লুচি হতে দেখেছি।  ফলার মেখে প্রত্যেক মা আগে দিতেন সন্তানের মুখে। তারপর নিজেরা খেতেন। খেতে খেতে ব্রতী উঠবে না। তাই জোগাড় ঠিকমত হলে তবেই খেতে বসবে সবাই। ওদিকে বাবা, মেসোমশাইদের খাইয়ে নিয়ে তবেই এঁটো ঘর মুছে আবার বসবে মায়েরা। আমরা অবিশ্যি বাবাদের সঙ্গেই বসে যেতাম পঙক্তিভোজনে। প্রতিবার বাবাদের বেড়ে দিতে দিতে দিদিমার মুখে, মা, মাসীদের মুখে মজার মজার গল্প শোনা ছিল আমাদের উপরি পাওনা।  
এক নতুন জামাই তার শ্বশুরের মুখোমুখি বসে আছে দীর্ঘক্ষণ। কি কথা বলবে দুজনেই আর ভেবে পায়না। জামাইয়ের কিঞ্চিত লজ্জা আর শ্বশুরের কুণ্ঠা। অবশেষে জামাই মুখ খুলল। বাবা, আপনি বিবাহ করেছেন?
হাসিতে ফেটে পড়েছিলেন শ্বশুরমশাই।  
বাড়িতে চার জামাই একসঙ্গে আমন্ত্রিত তাই দিদিমার হাতেও সেদিন উপলক্ষে আরো চারগাছা সোনার চুড়ি, বালা, বাউটি উঠত বটে। জামাইরা দেখবে বলে? না জামাইদের দেখাবে বলে? উত্তরে মা বলেছিল, এখনকার মত অত আর বেরুতো কোথায় মায়েরা? তাই একটু আনন্দ করত আর কি? ঘরে তো আর সোনার জিনিষ পরলে ক্ষতি নেই। একে জৈষ্ঠ্যের অসহনীয় পচা গরম তায় অত গুরুপাক সব রান্নাবান্না করে দিদিমার দম বলিহারী। সব সেরে আরেকবার চান করে পাটভাঙা একখানা শাড়িও পরা চাই। জামাইদের সামনে আবার ঘোমটাও টানা চাই নইলে মান থাকবে কেন? শাউড়ি ঠাকরুণ বলে কথা। কি ভাগ্যিস্! যাদের  আবার পাল পাব্বণে নাকের নথ পরা আছে তাদের তো অবস্থা কাহিল! তা যা বলছিলাম। দিদিমা পরিবেশন করতে করতে মাথার ঘোমটা টেনে বলত, বুঝলি? এক শাশুড়ি জামাইকে ভাত বেড়ে দিতে দিতে কেবলি বলে, আরেক হাতা দিই বাবা? কিম্বা আরেকটা মাছ নিতেই হবে তোমাকে, নয়ত আমার মাথা খাও আজ। জামাই দুহাতের তেলো দিয়ে থালার ওপর আচ্ছাদন দিতেই শাশুড়ি দেখতে পেলেন বড়লোক জামাইয়ের সেদিন আট আঙুলে আটখানি জ্বলজ্বলে আংটি। শুধু বৃদ্ধঙ্গুষ্ঠ বাদ। মনে মনে শাশুড়ি ভাবতেন, বড় ঘরে লাউ বেঁধেছেন। মেয়েকে যোগ্য পাত্রে দিয়েছেন। অমনি নিজের মনে হল, হাম কিসিসে কম নেহি। নিজের হাতের বালা, বাউটি, চুড়ি ঝনঝনিয়ে তিনি আরো আরো তেড়ে গেলেন পোলাওয়ের পেল্লায় পেতলের হাঁড়ি নিয়ে।নিতে তোমাকে হবেই বাবাজীবন। আর দুটিখানি দিই তবে। এদিকে জামাইয়ের হাঁসফাঁস। সেদিন বুঝি জামাই মনে মনে বলেছিল, আপনি যতই গয়না ঝমঝমান না কেন আমার পেটে কিন্তু হুইশ্‌ল বেজে গেছে। অথবা কেউ কেউ লজ্জায় পেটে খিল মেরে ঘুমিয়ে পড়ত। মামারবাড়িতে সেদিন খাওয়ার পরে জামাইদের জন্য পানের পরে সে যুগের কোকাকোলা বরাদ্দ থাকত। হজমের জন্য। রাতে আবার বড়া খানা তো! খেয়ে তারপর জামাইরা বিদ্যায় হবে সেবারের মত।  

আরেকটা মজার গল্প বলত দিদা। নতুন জামাই প্রথমবার ষষ্ঠীর দিন বেশ লজ্জা করে খেয়েছে রাতে। লুচি আরও কয়েকটা খেলে তবেই পেট ভরত কিম্বা আরও কয়েক পিস মাংস বা খান দুয়েক সন্দেশ খেলে পেট টা ঠিকমত ভরত। কিন্তু নতুন শ্বশুরবাড়ি আসার সময় জামাইয়ের মা বারণ করে দিয়েছে। চেয়েচিন্তে না খেতে। লোকে হ্যাংলা বলবে। কাজেই সে আধপেটা খেয়ে ঘরে গিয়ে বউকে নিয়ে খিল দিয়েছে। এবার রাত বাড়তেই প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। শুনশান নিশুতি রাতে সবাই দুয়ার এঁটে অঘোরে ঘুমোচ্ছে। জামাইয়ের মনে পড়ে আহা! আর দুটো লুচি পায়েস দিয়ে খেলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হত! নিশ্চয়ই রান্নাঘরে পড়ে আছে উনুনের পাড়ে। ধুতি মালকোঁচা দিয়ে অবশেষে সে বেরিয়ে পড়ে ঘর থেকে । রান্নাঘরের লোহার শিকল আস্তে আস্তে খুলে ফেলে উনুনপিঠে বসানো সেই পায়েসের হাঁড়ি দেখতে পায়। খান কয়েক লুচিও ছিল পাশের গামলায় রাখা। জামাই মনে মনে বলে, এরে কয় সুখ! ব্যাস! আর কে পায় তাকে? পায়েসে লুচি ডুবিয়ে মনের সুখে খেয়ে চলে সে। ওদিকে রান্নাঘরের পাশেই শ্বশুর শাশুড়ির ঘর। শাশুড়ির ঘুম ভেঙে যায় শব্দে। ভাবেন বেড়াল ঢুকল বুঝি । এবার তিনি এসে সটান দাঁড়ান জামাইয়ের পেছনে। চোর চোর বলে চেঁচান সেই অন্ধকারে। জামাই একে ভয় তায় লজ্জায় শেষে সোনার মত চকচকে পেতলের হাঁড়িটা নিজের মাথায় উপুড় করে দেয় নিজের মুখ ঢাকবে বলে। অসামান্য, উপাদেয় সেই পায়েস তখন গড়িয়ে তার ঘাড় গলা পিঠ বুক বানভাসি করে… বয়ে চলেছে খরস্রোতা নদীর মত। তারপর? নাহ! ধরা পড়তেই দুপক্ষের মাথায় হাত এই আর কি! তবে সেই ফাঁকে জিবের আরাম হয়েছিল বটে।
আরেকটা মজার ঘটনা বলত মা। কোন্‌ এক পাড়াগেঁয়ে জামাইয়ের দাঁতে খুব হলুদ ছোপ ধরা। শাশুড়ির নাপসন্দ। ফন্দী আঁটলেন মনে মনে। শিক্ষা দিতে হবে জামাইকে। অতএব আসামাত্রই  তিনি জামাইয়ের হাতে টাকা দিয়ে বললেন, যাও বাবা, একটু আখ চিবিয়ে খেয়ে এসো বেশ করে। বাড়িতে লোকজন এসে যাবে এরপর, আর বেরুনোর সময় পাবে না। মাংস খেতে হবে প্রচুর। দাঁতের জোর বাড়িয়ে নাও খানিক।  জামাই বেরুলো টাকা হাতে নিয়ে আখের খোঁজে। বাড়ি থেকে বেরিয়েই দেখে এক কালোজামওয়ালা।  বছরে আখ অনেক পাওয়া যায় কিন্তু কালোজাম? মরশুমি ফল। টোপা টোপা কালোজাম দেখে খুব লোভ হল তার। সে শাশুড়ির দেওয়া টাকায় দিব্য করে কালোজাম খেয়ে  সেদিন শ্বশুরবাড়ি ফিরল। শাশুড়ি তার ছোপধরা বেগনী দাঁতের হাসি দেখে বলেছিলেন, তুমি এটাও জানো না? খালিপেটে আম আর ভরপেটে জাম? তাঁর সেদিন কার্যসিদ্ধি তো হয়ইনি উপরন্তু সব ঘেঁটে ঘ হয়ে গেছিল। বলাই বাহুল্য। একে হলুদ ছোপ তায় বেগুনি জাম। হলুদ ছোপে বেগুনি প্রিন্ট। এক্কেরে সোনায় সোহাগার মত।  
এক জামাইকে ষষ্ঠীতে শ্বশুরবাড়ি যাবার আগে তার মা শিখিয়ে দিল সাধুভাষায় কথা বলতে, যাতে লোকে মান্যি করে। তাই গোরু কে ধেনু বলবি, ফুল কে পুষ্প আর নুন কে লবণ বলবি কিন্তু। খেতে বসে জামাই বলল, মা কিঞ্চিত লবণ দিবেন।
সেই শুনে শাশুড়ি বললেন, কি ভালো জামাই আমার! তখন জামাই আর থাকতে না পেরে বলেছিল, তবু তো ধেনু ছাড়ি নাই মা! 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত