| 23 জুলাই 2024
Categories
ধারাবাহিক সাহিত্য

করোনাকালে ইন্দু বিন্দু (পর্ব-৩)

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

করোনা শুরুর দিকে শেষ হয়েছিলো তারপর দুইমাস কয়েকদিনের বিরতি, পাঠকদের অনুরোধে আবারো শুরু হল ইরাবতীর পাতায় করোনাকালে ইন্দু বিন্দু। আজ রইলো করোনাকালে ইন্দু বিন্দু পর্ব-৩।


করোনাকালে ইন্দুবিন্দুর রান্নাবাটি

ছোটো থেকেই আমার দিদার, ঠাম্মার, আর আমার মায়ের রান্নাঘরটা আমার খুব ভালো লাগত।দিদার ছিল গ্যাস ওভেন। ঠাম্মার উনুন, যেটার কথা আমার মনে পড়েনা। ঠাম্মার সঙ্গে সেই উনুনের স্মৃতিটা মনে নেই কারণ আমার ঠাম্মার গায়ে বৃষ্টির জল পড়ত বলে পুরনো বাড়ি থেকে আমার বাবার বানানো বাড়িতেই ঠাম্মা ঠাকুরদাদা মারা যাবার পরে চলে এসেছিল। তাই আমাদের একতলার নতুন বাড়ির মোজাইকের মেঝের এক টুকরো রান্নাঘর টা ছিল ঠাম্মার তথা আমার মায়ের হেঁশেল।ঠাম্মার আঁশ নিরামিষের ছুঁতমার্গ ছিল আর পাঁচটা  ব্রাহ্মণ বিধবার মতই । তাই ১৯৬৭ সালে বানানো আমাদের আলমবাজারের রান্নাঘরেও একটা উঁচু কুলুঙ্গী ছিল। চিমনি বিহীন রান্নাঘারের ঝুলকালি মেখে কালে কালে সেই কুলুঙ্গির রঙ হত কষ্টিপাথরের মত কালো। যেখানে ডিমের ঝুড়ি ছাড়াও থাকত রাতের আমিষ তরকারিটা। অথবা বেশী মাছ এসে গেলে পরদিনের জন্য ভেজে রাখা মাছের জন্য বরাদ্দ ছিল সেই আঁশকুলুঙ্গী। পরে আমাদের সেই রান্নাঘরের প্রোমোশান হয়েছিল ঐ বাড়ির দোতলায়। তখন আমার মায়ের বড় শখের স্মোকলেস উনুন তৈরী হল বড় রান্নাঘরে।  যে উনুনের বিশাল ধোঁয়া নির্গমন পাইপ রান্নাঘরের মধ্যে দিয়ে ছাদ ফুটো করে ছাদের বাইরে বের করা থাকত। রোজ সকালে উনুনে ঘুঁটে, কয়লা দিয়ে আঁচ দিয়ে চাপা দিলেই সব ধোঁয়া ছাদ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে কিছুক্ষণেই গনগনে আঁচ হত। দুটো উনুন ছিল পাশাপাশি। একটা বড়, সেটাতে ভাজা, কষা রান্না হত আর ছোটোটিতে চায়ের জল, দুধ জাল প্রেসার কুকার এইসব বসানো হত।মায়ের চাই রোজ দই বসানোর জন্য বিশাল উনুন পাড়। ঠাম্মার চাই পোলাও এর হাঁড়ি রাখার জায়গা। এই উনুন পিঠেই গরম থাকত শনিবার ইশকুল হাফছুটির পর আমার জন্য মাংসের ডেকচি, ভাতের হাঁড়ি।
যেদিন বাড়িতে পোলাও কিম্বা তালক্ষীর চাপত সেদিন রাত অবধি সেই পোলাও এর হাঁড়িখানি বা পায়েসের লোহার কড়াইটি পেল্লায় উনুনের পিঠেই বসানো থাকতো। কোনোদিন সেই উনুনের মরা আঁচের নীচের লোহার ঝিঁকে বসানো থাকত এলুমিনিয়ামের টিফিন কৌটোয় বন্দী মায়ের সারপ্রাইজ পুডিং। দিদিশাশুড়ি আবার এমন মরা আঁচেই দুপুরের রান্নার পর বসিয়ে রাখতেন  ফিশমোল্ড। রুই বা কাতলা মাছ সেদ্ধ করে কাঁটা বেছে পিঁয়াজ, রসুন, আদা, কাঁচালংকা কুচি আর টম্যাটো দিয়ে চপের মত পুর করে শেষে একটা ডিম তার মধ্যে ফেটিয়ে সবশুদ্ধ পুডিং এর মত মাখন মাখানো কৌটোয় করে বসানো থাকত মরা আঁচে। তারপর তা নিভু তাতে জমে যেত একসময় । তখন মোল্ড উল্টে দিয়ে কেটে কেকের মত কেটে নেওয়া আর কি।  
 এইসব রান্নাঘরের কোণা কোণা থেকে কণায় কণায় জমিয়ে তোলা আমার রসুইঘরের অজস্র টিপ্‌স। সারাজীবনের সঞ্চয় এই সব রন্ধন পটিয়সী দ্রৌপদীদের মুখ থেকে শোনা অমূল্য সব হেঁশেল বেত্তান্ত। কোনোটাই আক্ষরিক অর্থে গালগল্প কোঠাবাড়ি নয়। একদম কেজো কথা অথচ ফিটফাট রান্নাঘরের হিট ফর্ম্যুলা। এমন সব হেঁশেলেই দেখেছি সাদামাটা রান্নাকে পরিবেশনের গুণে মহার্ঘ্য হয়ে উঠতে। সবুজ কলাপাতার ওপরে পুডিং কেটে গোলাপের পাপড়ি সাজিয়ে জামাইষষ্ঠীতে রেকাব সাজাতে কিম্বা আমের সময় হিমসাগরের খোসা নিপুণ হাতে বঁটিতে ছাড়িয়ে টুকরো টুকরো করে সেই আম আরো চারটে ফলের সঙ্গে মেয়ে বা বউ কে সাজিয়ে সাধ খাওয়াতে। ফুড কলামনিষ্ট ভীর সাংঘবী যাকে বলেছেন রুড ফুড তেমন সব সামান্য রান্না কে অসামন্য করে তুলতেন এই সাধারণী মায়েরা। মানে আটপৌরে রান্না। মা ঠাকুমার ঘরের খাস রেসিপি। একটা জাতির নিজস্বতায় মোড়া গন্ধমাখা সব সুখাদ্য।  
  আমার সামান্য মোক্তার ঠাকুরদাদা-ঠাকুমার এগারো জন ছেলেপুলের মধ্যে মাত্র ছ’জন বেঁচে ছিল। তাদের নিয়ে থৈ থৈ সংসারে কোনোদিনো তেমন বোলবোলা না থাকলেও ভাঁড়ারে টান পড়েনি জীবনেও। বাবারা ইশকুল ফাইনাল পাশ করেই সবাই টিউশানি পড়াতেন। সংসারে অনাবিল শান্তির মূলে ছিলেন আমার ঠাম্মা আর তাঁর হাতের কেরামতি। বাড়িতে ফ্রিজ ছিলনা। রাতের বাসি তরকারিকে পরদিন তাক লাগিয়ে দিতে ওস্তাদ ছিলেন ঠাম্মা। ছেলেমেয়েরা ইশকুল যাবার কালে গরম ভাতের পাতে লেফট ওভার বাঁধাকপির কিম্বা এঁচোড়ের ডানলায় সামান্য আটা, বেসন আর চালের গুঁড়ো ছড়িয়ে দিতেন। আরেকটু আদা-কাঁচালংকা কুচি। ব্যাস।  তারপর আলুর চপের মত গড়ে বেসনের গোলায় চুবিয়ে ভে দিতেন মুচমুচে সেই বড়া। বাবার মুখে শুনেছি এহেন অমৃতসম বাঁধাকপি বা এঁচোড়ের চপ দিয়ে গরম ভাতের সঙ্গে ডাল খেয়ে সাইকেল চড়ে ইশকুলে যাবার আনন্দের গল্প।  
আমার বড়পিসিমা ছিলেন ইশকুলের দিদিমণি। ভোরবেলার ইশকুল যাবার আগে চায়ের সঙ্গে পিসির জন্য থাকত আগের রাতের বাসি রুটির খড়খড়ে। আমরাও সাধ করে কতবার খেয়েছি এই খড়খড়ে দিয়ে আলুভাজা। চাটুতে এক চামচ তেল ছড়িয়ে বাসিরুটি ওলটপালট করে কিছুক্ষণ ঢিমে আঁচে রেখে দিলেই ঢাকার বাখরখানির মত এই খড়খড়ে এত মুখোরোচক এক ব্রেকফাস্ট তা বলার নয়।
 আমার মা আবার ঠাম্মা, দিদার থেকে আরেক কাঠি  ওপরে। সংসার করার ব্যাস্ততা যখন তুঙ্গে তখন আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্যের চিরঞ্জিবী বনৌষধি পড়ে তাঁর শয়নে স্বপনে জাগরণে বাড়ির সবার জন্য ব্যাকুল হতে থাকল প্রাণ। তার ফলে ভোরবেলায় খালিপেটে কাঁচা হলুদ, রসুনের কোয়া, নিমপাতার রসের সঙ্গে চর্মরোগের জন্য তুলসীপাতার রসের সঙ্গে কর্পূর মেশানো জল, চোট লাগলে আকন্দপাতার সেঁক, মুখে শ্লেষ্মা ঘা হলে সোহাগার খই দিয়ে খলনুড়িতে মধু দিয়ে ডলে অথবা জ্বরজারিতে শিউলিপাতার রস সেবন শুরু হল বাড়িতে। গায়ে হাতেপায়ে ব্যাথা বেদনার প্রশমনে এই শিউলিপাতার রস পরপর তিনদিন খেলে সত্যি সত্যি এখনো উপকার পাই আমি।  এই শিউলিপাতার রস তো মহাষৌধি আমার বাড়িতে কারণ সাধারণ সর্দিজ্বরে কফ তুলতে ওস্তাদ ওষুধ। করোনার দিনে ইমিউনিটি বাড়াতে নিয়মিত সেবন করেই চলেছি শিউলিপাতার রস। এই শিউলিপাতা মুচমুচে করে ভেজে দিদিমা শুক্তুনিতে ছড়াতেন। মা চালু করলেন শিউলিপাতার কাটলেট। প্রথম পাতে এক ফোঁটা ঘিয়ের সঙ্গে গরম ভাতে এই কাটলেট খেলে ভোলা যাবে না। পরিষ্কার পাতা তুলে এনে ধুয়ে নুন, হলুদ, পোস্ত দানা কলোজিরে ছড়িয়ে গোটা গোটা বেসন আর চালের গুঁড়োতে ডুবিয়ে ভেজে নিলে অনবদ্য এক ভাজা হয়। দেখতে কাটলেটের মত হয়। শিউলিপাতার রূপ তখন মনে হয় ফুলের চেয়েও দশগুণ বেড়ে গেল। পটলগাছের তেতো পাতা পলতা কুচিয়ে একটু মসটে নিয়ে ভাজতে হয়। কিন্তু শিউলিপাতা গোটা গোটা অতএব খাটুনিও বেশ কম।  

আজকাল আমপান্না মিক্স হয়েছে। আমাদের ছোটবেলায় কালবোশেখির ঝড়ে পড়ে যাওয়া কাঁচা আমগুলো প্রেশার কুকারে সেদ্ধ করতেন মা। তারপর খোসা থেকে আমের শাঁস ছাড়িয়ে নিয়ে আবারো কাঁটা দিয়ে ঘেঁটে ঠান্ডা জল, বীট নুন, চিনি মিশিয়ে ওপর থেকে জিরে ভাজার গুঁড়ো ছড়িয়ে সূর্যাস্তের ঠিক আগেই হাতে পাওয়া যেত কাঁচা আমের শরবত। আম পোড়ানোর কি দরকার? অবিশ্যি উনুনের আমলে মরা আঁচেও চাড্ডি কাঁচা আম গুঁজে দেওয়া হত ছাইচাপা আগুণের মধ্যে। আমের খোসার সেই পোড়া পোড়া গন্ধটা আজও ভুলতে পারিনা। বিশেষ বিশেষ বৈশাখি বিকেল ভরে উঠত সেদিন।এখন ঝড়ে আম কুড়োয় যে সব দস্যি ছেলে তাদের জীবনে এ শরবতি বিলাস নেই।
করোনার বাজারে রোজ ভোরে হাঁটতে গিয়ে ঝড়ের রাতে ঝরে পড়া টুপটাপ কাঁচা আম কুডিয়ে ফ্রিজে জড়ো করছি আমি। তারপর সেগুলোকে বারেবারে ধুয়ে নিয়ে ভিটামিন আর খোসার একগাদা রাফেজ সমেত সেই আম দিয়ে এমন সরবত মাঝেমধ্যে আমায় ভালো রাখছে। বেশি পাকা আমগুলি অম্লমধুর। সেগুলি দিয়ে টক দৈ আর দুধ মিশিয়ে চিনি দিয়ে হ্যান্ড ব্লেন্ডারে ঘেঁটে নিয়ে রাতের রুটির পর দিব্য সুইট ডিশ হিসেবেও চলে যাচ্ছে। আবাসনে হাঁটতাম না এদ্দিন। লেকের মাঠে যেতাম। তাই আম কুড়োই নি কলকাতার বুকে।  কত কিছু শেখলো করোনা!
 করোনা শেখালো একফোঁটা খাবার নষ্ট না করতে। খোসার স্টারফ্রাই হল ডালের সঙ্গে অভিনব এক সাইডডিশ।খোসার কথায় মনে পড়ে গেল আমার যশুরে জেঠিমা শাশুড়ির লাউয়ের খোসার ছেঁচকির কথা। আগেকার গিন্নীদের সব রান্নার শেষে উনুনের ঢিমে আঁচে বসানো হত এই ছেঁচকি। আমরা এখন গ্যাস সিম করে বানাই। তবে উনুনের নিভু নিভু মরা আঁচে সেই ছেঁচকি বসিয়ে জ্যেঠিমার নাইতে যাওয়া আর টুকটুকে লাল গামছা মাথায় বেঁধে ফিরে এসে বারেবারে নেড়েচেড়ে তাকে ন্যায়দম খাওয়ানো…আর তাতেই বুঝি ছেঁচকির স্বাদ বাড়ে। সরু সরু করে কাটা লাউয়ের একটু মোটা করে ছাড়ানো খোসা ধুয়ে নিয়ে হালকা ভাপিয়ে রাখতে হবে। প্রেসারে নয় কিন্তু। তারপর কড়ায় সামান্য সর্ষের তেলে কালোজিরে, শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে সেই খোসা সেদ্ধ দিয়ে নুন দিয়ে চাপা দিতে হবে। তারপর নাড়া আর চাড়া। যতক্ষণ না লাউয়ের খোসা স্প্রিং এর মত গুটিয়ে যায়। তখন সামান্য চিনি, পোস্তদানা। লঙ্কা গুঁড়ো, অল্প আটা আর বেসন আলগোছে ছড়িয়ে আরো কিছুক্ষণ স্টারফ্রাই। দরকারে একটু তেল ছড়ানো যেতে পারে। শুকনো ভাতে গরম গরম এই খোসার ছেঁচকির বিকল্প নেই। আলুর খোসা ধুয়ে ফ্রিজে জমিয়ে রেখে এইভাবেই ভেজে দিতেন মা খিচুড়ির সঙ্গে। বাবার ছিল ট্যুরের চাকরি। তখন আমাদের বাজার ফুরিয়ে এলে এসব দিয়েই মা দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতেন একেক দিন।
আমাদের গরমের ছুটি ভরে উঠত রোদে রাখা কাঁচা আমের চটজলদি আচারে। কাঁচের প্লেটে আম কুরিয়ে চিনি আর কাঁচালংকা কুচি দিয়ে মেখে  ছাদের কড়া রোদে রেখে আসতাম। দুপুরে সেই অনবদ্য রোদে জারানো আমের আচার তারিয়ে তারিয়ে টাকনা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গরমের ছুটির হোমওয়ার্কের হত চলত তাড়াতাড়ি।      
মায়েদের মুখে শুনেছি ঠাকুরের ভোগ রাঁধার সময় পুষ্পান্ন আর পরমান্নের কথা।চলতি কথায় যার আদুরে নাম ঘিভাত। পুষ্পান্ন শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মামারবাড়ির জগদ্ধাত্রী পুজোর ভোগপ্রসাদের গন্ধ। পুষ্পান্ন হল নিরামিষ পোলাও আর পরমান্ন যে পায়েস কে বলে তা আমাদের অজানা নয়। ঠাকুরের ভোগের পোলাও মূলতঃ সেসময় রাঁধা হত গোবিন্দভোগ চাল দিয়ে। এখন সুগন্ধি বাসমতীতেও রাঁধা হয়। ইস্কুলের ব্যাকরণ বই জানিয়েছিল পলান্ন সমাস ভেঙে হয় পল বা মাংস মিশ্রিত অন্ন অর্থাত বিরিয়ানির অনুরূপ কিছু একটা পোলাও জাতীয়। শোনা যায় আর্মেনিয়া বা টার্কির “পিলাও” থেকে উদ্ভব এই পোলাও শব্দের। যার আভিধানিক অর্থ হল ঘি আর মশলাপাতি দিয়ে রাঁধা সুগন্ধী অন্ন।আগে দেখেছি ঠাকুমা, দিদিমা আখনির জলে পোলাও রাঁধতেন। ফুটন্ত জলের মধ্যে নরম কাপড়ের পুঁটুলি বেঁধে সব মশলা গুলো দিতেন। তারপর ঘি মাখানো চাল ছাড়তেন। জলের মাপ হবে চালের ওপরে চার আঙুল অবধি। এখন আমরা চালের দ্বিগুণ জল মেপে আগেই বসিয়ে দি। পাকা গিন্নীরা সেসময় সব কাজ করতেন চোখের আন্দাজে। অভিজ্ঞতার চোখ সে কথাই বলে দিত। ওরা দিতেন কিশোরী রং। তারপর যেদিন মেটানিল ইয়ালোর নিষেধাজ্ঞা জারি হল তখন হয় সাদা পোলাও নয় সামান্য হলুদ গুঁড়ো ।
এই লকডাউনে নিজের মনে একলা একলা রান্না করতে করতে কতকিছুই মনে পড়ছে কেবলি। মা, দিদা, ঠাম্মা এমনকি আমার শাশুড়িমা কে দেখেছি রান্নার লোক বা ওড়িয়া ঠাকুর থাকলেও সকালে বাসিকাপড় ছেড়ে গৃহদেবতাকে জলবাতাসা দিয়ে ধূপ দেখিয়ে তারপরেই রান্নাঘরে ঢুকতে। তারপরেই হবে বাড়িশুদ্ধ সবার চায়ের আয়োজন। এবার চা খেয়েই  এঁরা সবাই কিন্তু সেই বিশাল সাবেকী বঁটিতে বসবেন আনাজের ঝুড়িখানি পাশে নিয়ে। পেঁয়াজ সে বঁটিতে কাটা হবেনা। তার জন্য আলাদা বঁটি। কারণ আনাজের বঁটিতে ফলপাকড় কাটলে পেঁয়াজের গন্ধ লেগে যাবে। মাছ কাটার বনেদী বঁটি একটি বড় মাপের। মাথার কাঁটা দিয়ে পেট না কেটে, অদ্ভুত ভাবে ছোট মাছের পেট থেকে পিত্তি বের করাটাও ছিল শেখবার মত। সেই বঁটিটি তোলা থাকত  রান্নাঘরের কুলুঙ্গীতে কিম্বা চৌবাচ্ছার পাশটিতে। সে দরকারী আবার অছ্যুত্ও। সেই বোষ্টমের হরিনাম জপতে জপতে হাঁড়ির ভেতর কাঁকড়া নিয়ে বৃন্দাবন যাবার মত।
এরা সবাই দুধ জ্বাল দিতেন একইরকম ভাবে। বলতেন বলক উঠলেই গ্যাস কমিয়ে বড় হাতা দিয়ে বারেবারে এক থেকে দশবার জ্বাল দেবে নেড়ে নেড়ে। তবে বলকা দুধের স্বাদ ভালো হয়।
নিরামিষ তরকারীতে মিষ্টি দিতেই হয়। এ আমাদের ঘটিবাড়ির নিয়ম। সত্যিই সুস্বাদু হয়। তবে একেকটি রান্নায় আবার চিনির দুচারটে দানা ছড়িয়ে দিয়ে আমার যশোরের জেঠিমা শাশুড়ি বলতেন, “দিবা দিবা, এমন দিবা যে কেউ বুঝতি পারবা না”
নিজেই রান্না করুন কিম্বা লোকে আনাজপাতি মনের মত করে কেটে গুছিয়ে দেবেন এঁরা। বড় পেতল বা কাঁসার কাঁসিতে ভাগেভাগে আনাজ রাখবেন কেটে আর পাশে রাখা পেতলের কিম্বা কাঁসার জামবাটিতে হাত ধুয়ে নেবেন বারেবারে। ঝুড়ি থেকে আনাজ নিয়ে ভেজাবেন পেতলের গামলায়। আলু ভেজানো হবে অন্য পাত্রে। এবার কারিগরি দেখবার মত। শুক্তোর মূলো ঝিরিঝিরি, চচ্চড়ির মুলো মোটামোটা, বেগুণভাজা হলে ফালাফালা, চচ্চড়ি বা ঘন্টের জন্য ডুমো ডুমো, ছেঁচকির কুমড়ো লম্বালম্বা আর কুমড়োর ছক্কার ডুমোডুমো, এইসব আরকি। বাটিচচ্চড়ি রান্না হবে টেপাগোঁজায় কারণ অল্প জায়গায় রাঁধলে নাকি আলু গলে গিয়ে কাঁচালঙ্কা, সর্ষের তেলে একটা মাখোমাখো ভাব হয় । পোলাও যেদিন রান্না হবে সেদিন হাঁড়ি ঝাঁকিয়ে উনুনের পিঠে একঘর পোলাও থাকবে কিছুক্ষণ। একে বলে সমঝানো। তার অনেক পরে সার্ভ করা হবে। আর ভুলে চাল সেদ্ধ হবার আগে চিনি দিয়ে দিলে সেই চাল আর সেদ্ধ হবে না। তখন মাথায় হাত পড়বে গিন্নীদের। বলবে, এই রে “ঢেঁকছেনে” গেল আজ! মানে সব খাওয়াটাই মাটি যেন। ধনে-জিরে-গোল-মরিচ বাটা দিয়ে মাছের ঝোল থাকবে “ছ্যাদরানো” গামলি তে নয়ত মাছ ভেঙ্গে যাবে। আনাজ গলে যাবে অত ঝোলে সাঁতার কাটতে গিয়ে। পরিবেশনের সময় খুঁজেই পাওয়া যাবেনা। মাছের মাথা বা চিংড়িমাছ দিয়ে পুঁইশাক চচ্চড়ি নামানোর সময় কড়াইতে শুকোতে হবে যতক্ষণ না “ছ্যাঁচড়া পোড়া” গন্ধ বেরোয়। তবেই তার “তার” হবে। এটা পরে বুঝেছি কেন। মাছ দেওয়া থাকলে প্রোটিন পুড়লে অন্যরকম গন্ধ বেরোয়। তাই বুঝি আমার দাদু কলেজ স্ট্রীট থেকে মেয়েদের জন্য সিল্ক কিনতে গিয়ে কোল আঁচলের একটু সুতো পুড়িয়ে নিয়ে নাকের কাছে ধরে বলতেন, হ্যাঁ, ছ্যাঁচড়া পোড়া গন্ধ মানেই পিওর সিল্ক। কারণ রেশম মঠের গুটি থেকে তৈরী ন্যাচারাল সিল্ক তো প্রোটিনের এক পলিমার। অদ্ভুত সব জিনিষ আবিষ্কার করছি। 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত