নিউ নরমাল

রূপসা মোবাইলের নেট অফ করে পাশ ফিরে শুলো। রাত আড়াইটে বাজে, অন্ধকারে জানালার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে ওর চোখের কোল জলে ভরে গেল। টপ টপ করে গাল বেয়ে ধারাপাতে বালিশ ভিজিয়ে দিচ্ছে।বালিশ গালে নরম ভেজা স্পর্শ দিল। পাশে অঙ্কুশ দেওয়ালের দিকে পাশ ফিরে ঘুমোচ্ছে, অকাতরে।বিছানায় শুলে ওর আর হুঁশ থাকে না। আর যেদিন মাত্রাছাড়া পান করে সেদিন পৃথিবীটা আরো রঙিন সুপ্তির আড়ালে থাকে। রূপসার ঘুম আসেনা,অঙ্কুশের সাথে মাঝে মধ্যে ও পান করে দেখেছে। কিন্তু তাতে ওর মাথা ধরে যায়। রাত জাগাটা আরো ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে। এ পাশ ও পাশ করে ও উঠে পড়ল। দক্ষিণের বারান্দার স্লাইডিং ডোর খুলে বাইরে এলো। দামাল ছেলের মত দমকা হাওয়া ঝাঁপিয়ে পড়ল গায়ে, চুল এলোমেলো করে দিল। মাঝরাতের মাতাল করা মিষ্টি বাতাস যেন বেহাগ রাগে বাজে। বারোতলার ওপর থেকে লকডাউনের রাতের কলকাতা বেশ মোহময়ী। আকাশ থেকে টুপটাপ ঝরে পড়া নিস্তব্ধতা , একটা একটা করে আলো নিভে ঘুমের দেশের দিকে শহরটার পাড়ি দেওয়া দেখতে বেশ লাগে রূপসার। ষষ্ঠ লকডাউনে এই শহরটা কোন এক রাক্ষুসীর শাপে রূপকথার রাজ্যের মত ঘুমের ঘোরে অচেতন। এর প্রাণস্পন্দন খুঁজে পাওয়া যায় শহুরে আলো জ্বলা নেভার দপদপানিতে।এমনিতেই মাল্টিস্টোরেড বিল্ডিংগুলোর বাতি জ্বালা জানলা দেখলে রূপসা ভাবে কত গল্প আছে প্রতিটি জানালার।হাসি-আনন্দ-সুখ-দুঃখ-সব কেমন মিলেমিশে একাকার।ওদের জানালায় বোধহয় মন খারাপ অকম্পিতভাবে পর্দা হয়ে ঝুলে থাকে।এই শহরটার বোধ হয় রূপসার মত অনিদ্রারোগ আছে।একটুখানি ঝিম মেরে থেকে আবার যখন জেগে ওঠে তখন আকাশও পুরোপুরি জাগে না।সূর্য যখন আড়মোড়া ভাঙে শহর তখন বেশ ব্যস্ত ।

রূপসা ঊষাকালের কলকাতাকে বেশ ভালবাসে,কেমন আপন আপন লাগে।বারান্দায় আরাম কেদারায় গুটিসুটি হয়ে আকাশটাকে দেখে মন দিয়ে।দীর্ঘ লকডাউনে বাস-ট্রাম-ট্রেন আর মানুষের অভাবে পরিবেশ স্বচ্ছ আর অমলিন। আকাশের ঘোলাটে ভাব কেটে গিয়ে স্বচ্ছ নীল শামিয়ানার মত ঝুলে আছে মাথা ছুঁয়ে ।রাতের তারাগুলো তখনও ম্লান হয়নি,শুকতারা জ্বলজ্বল করছে ।ঐ তারার মধ্যে রূপসা তুহিনকে খোঁজে।তুহিন ওকে বলেছিল-রূপ তোমায় নিয়ে সমুদ্রে ধারে পাড়ি দেব।ঝাউবনের আড়ালে সূর্যাস্ত দেখব বসে।তুহিন অঙ্কুশের বন্ধু ছিল,কতবার ও বলেছে এ সব কথা।রূপসা বিশ্বাস করত ওর কথা কারণ ওর বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করত।তুহিন ওর সব কথা শুনত মন দিয়ে।ও জানত রূপসা সমুদ্র ভালবাসে।এরকম কথা আরো কত কে বলে!মুঠোফোন অবলীলায় সে কথা কর্ণকুহরে ঢেলে দেয়।শুভাষীশ বলে আমি তোমায় ভালবাসি।অনির্বাণ বলে-আমি তোমায় ভালবাসায় ভরিয়ে দেব,এমন ভালবাসা যে তোমার শ্বাস প্রশ্বাসে শুধু আমার নাম শুনতে পাবে।রাতের পর রাত কেটে যায় প্রেমের গুঞ্জরণে।ডিপ্রেশনের ওষুধ ফুরিয়ে যায়,ঘুমের ওষুধ কাজ করে না।জয়ন্ত সকালে উঠে গোলাপের তোড়া পাঠায়,অরণ্য গানে গানে ভরিয়ে দেয়।রূপসা মেসেঞ্জার,ওয়াটস্যাপ খুলে তাকিয়ে থাকে ভোঁতা দৃষ্টিতে।এগুলো কি সত্যি ভালবাসার প্রকাশ নাকি রংচটা,ফ্যাকাশে পাপোষের মত কিছু অনুভব যা বহুবার ব্যবহৃত হতে হতে বিবর্ণ হয়ে গেছে।রূপসা তবু আঁকড়ে ধরে থাকে মুঠোফোন আর তার শব্দগুঞ্জনে কান তেতে ওঠে।রাতের পর রাত কাটে নিশিবান্ধবদের অকারণ গুনগুনানিতে,টেক্সট মেসেজে।কথায় রাত গভীর হয়,কথায় আকাশ ফরসা হয়,বেলার আলো ফোটে।রূপসা কী যে খোঁজে কথার মাঝে ও কি নিজে জানে?মাঝ রাতে ঘুম না এলে বা ঘুম ভেঙে গেলে রূপসা নেট অন করে অদৃশ্য ভার্চুয়াল বন্ধুদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করার চেষ্টা করে।অঙ্কুশ দেওয়ালের দিকে ফিরে ঘুমোয়-মাঝখানে বিরাজ করে দূরত্ব।একমাত্র মেয়ে মিমির চলে যাওয়ার পরে এই ফাঁক যেন কয়েক আলোকবর্ষীয় দূরত্বে পর্যবসিত হয়েছে।অনিদ্রায়,আধা জাগরণে ভোরে উঠে অবসন্ন লাগে।রাত জাগা চোখে অসীম ক্লান্তি নামে।অঙ্কুশ ওয়ার্ক ফ্রম হোম করছে।দুপুর পেরোলে ও গ্লাস সাজিয়ে বসে।রূপসা সারাদিন ঘরের কাজকর্ম আর রান্নাবান্না নিয়ে ব্যস্ত।কনভেন্ট স্কুলে পড়াত,ব্রেস্ট ক্যানসার ধরা পড়ার পর ট্রিটমেন্টের জন্য ওকে বারে বারে মুম্বাই যেতে হতো।চাকরি তখনই ছাড়তে হল ওকে।তাই ওর এখন ওয়ার্ক ফর হোম।সারাদিন খাটে ভাল থাকে কিন্তু রাত হলে ভুতুড়ে অনিদ্রারাক্ষসে ধরে ওকে।

রাত এলে ওর অবসাদ জাগে।

একটা নিথর মৃতদেহের মত মুঠোফোন পড়ে আছে বালিশের পাশে।যত প্রণয় প্রলাপ দিনের আলোয় শ্মশানের ধারে বিক্রি হওয়া সৌরভহীন রজনীগন্ধার ফুলের মত।বিবর্ণ ও বাসি।অঙ্কুশের সাথে মন খুলে না হোক মুখ খুলেও কথা হয় না।পরস্পরের কাছে নির্বাক দেওয়াল হয়ে থাকে দুজনে।আর রাতের দূরাভাষ-বান্ধবের আসঙ্গলিপ্সা আর রভসানুরাগ প্রলাপে রূপসা আরো বিমর্ষ,বিষণ্ণ হয়ে ওঠে।

মাঝে মাঝে রূপসা ভাবে পাখি হয়ে এই বারোতলার ব্যালকনি থেকে উড়ে গেলে বেশ হতো,উড়ে চলে যেত কোন এক সবুজ বনবীথির ধারে।।হাতের মুঠোয় ছোঁয়া যায় নীল মেঘ,এই মেঘের সমুদ্রে একটা ভেলায় করে যদি বিশ্বনাবিকের মত রোমাঞ্চকর অভিযানে ভেসে পড়ত।ঠেকত গিয়ে কোন এক নক্ষত্র প্রাচীরে,যার ওপারে আছে হয়ত তুহিন কিংবা মিমি।রূপসা ওদেরকে খুঁজে পাবে? ওরা কি চিনে নিতে পারবে রূপসাকে?নিশ্চয়ই চিনবে।মিমি কি ওর মায়ের গায়ের গন্ধ ভুলে গেছে! রাতে গা ধুয়ে ট্যালকম পাউডার ছড়িয়ে যখন শুতো,মিমি ওর গায়ের ওপর শুয়ে জড়িয়ে ধরে বলত -মাম্মাম তোমার বডি থেকে হাস্নুহানার গন্ধ পাই।তুমি কি আলাদা পাউডার ইউজ করো?দু হাত দিয়ে জাপটে ধরে মিমি বলত-তুমি একটা পাখির মত তুলতুলে।

আর তুহিন, রূপসার ঘাড়ের নীচে চুলের ঘূর্ণির আড়ালে কালো তিলটায় চিনে নিতে পারবে না?চুমু খেতে গিয়ে তুহিনই প্রথম তিলটা আবিষ্কারের করে বলেছিল-এই তিলটা কিন্তু আমার!

রূপসা ভাবে করোনা পরবর্তী জীবন কেমন হতে চলেছে…পত্র পত্রিকায় পড়েছে আগামীদিনের জীবন হবে নিউ নরম্যাল।এ কি স্বাভাবিক নাকি অস্বাভাবিক স্বাভাবিক,যাকে বিশেষজ্ঞরা নাম দিয়েছেন নিউ নরম্যাল?এক জীবনকে চালনা করতে গেলে কতবার পাল্টাতে হয়?অঙ্কুশের সাথে পাঁচ বছর প্রেম করার পর ওদের বিয়ে হয়।কিন্তু তিন বছর পার করতে না করতেই ওর নতুন রূপ দেখল রূপসা।নতুন করে বোঝাপড়া করল।এর পর ব্রেস্ট ক্যানসার হয়ে নিজের কেরিয়ার আর শরীরের একটা অঙ্গ হারিয়ে আরও একবার বোঝাপড়া করল ।মিমিকে পেয়েছিল,যেন কোলজোড়া এক মুঠো গন্ধরাজ ফুল।কোভিড ১৯ এ সংক্রামিত হয়ে তিন মাস আগে কাগজের ফুলের মত নিষ্প্রাণ হয়ে ঝরে গেল ও।এভাবে দুর্ভাগ্যের সঙ্গে বারে বারে বোঝাপড়া করে যাচ্ছে রূপসা।কিন্তু আর নয়,আজ ও ঠিক করে নিয়েছে ওর নিউ নরম্যাল হোক নিউ ওয়ার্ল্ড!

শেষ রাতে রূপসা ব্যলকনিতে এলো।গা ধুয়ে,প্রসাধিত ও সুসজ্জিত হয়ে।পড়নে নতুন শাড়ি।বিবাহবার্ষিকীতে নিজের জন্য কিনেছিল,পড়া হয়নি।দামী জামেয়ার।বেগুনি আর কমলায় ছোট ছোট ফুল আঁকা। আঁচলে ঢালা কাজ।অনেক যত্ন নিয়ে সেজেছে আজ,চোখে কাজল, ঠোঁটে লিপগ্লস।কানে গলায় হাতে মাননসই অলংকার।আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেই চোখ ফেরাতে পারছিল না রূপসা।মাথার সিল্কি চুল হাত দিয়ে একটা এলো খোঁপা করে নিয়েছে।তুহিন ওর এই সাজ খুব পছন্দ করত।যখনই সাজত ওকে বলত একটা সেলফি তুলে পাঠাতে।আজ আর সেলফির প্রয়োজন নেই।

ব্যলকনিতে আজ হু হু হাওয়া। আঁচলের অন্তরালে রয়েছে এক জোড়া ডানা।এই ডানা মেলে ও পাড়ি দেবে অনির্দিষ্টের উদ্দেশ্যে। রূপসা ব্যলকনির রেলিঙের দিকে এগোল।নৈশব্দ্য আর অন্ধকারের চাদরে মোড়া সমস্ত শহর।রেলিঙ থেকে ঝুঁকে নিজেকে মেলে দেবে ,তুলোর মত তুলতুলে হয়ে ভেসে যাবে ও।অন্ধকারে ভিজে ঐ দূর আকাশে,মেঘের দেশে মিলিয়ে যাবে সে।রোমাঞ্চে গা শিউরে উঠল রূপসার!

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত