অজানিত

 

লকডাউন অসহ্য লাগছে রূপমের। কতদিন দেখা হয়নি রিনির সঙ্গে। বসন্ত, গ্রীষ্ম চলে গিয়ে বর্ষা আসবো আসবো করছে। নাহ, সম্পর্কটা থাকবেনা। এসব সম্পর্ক থাকেনা। অফিস কলিগ দীপ্ত অনেক বুঝিয়েছে। ছেড়ে দেবে, কাটিয়ে দেবে ভাবতে ভাবতেই পেরিয়ে গেছে সাতটা বছর। রিনি ছাড়া অন্য কাউকে ভাবতেই পারেনা রূপম এখনো। ভোরের দিকে যখন বাকি সবাই ঘুমোয়, তখন লুকিয়েচুরিয়ে ওয়াশরুম থেকে ভিডিও কল করে রিনি। রূপম জানে যে রিনিও পাগলের মত ভালোবাসে ওকে। কিন্তু…  

 

– এখন তো খুলছে সব একটু একটু করে। বাইক নিয়ে চলে আসবো একদিন!

– নাহ! রিনি চোখ বড় বড় করে বলে, একদম বেরোবি না।

– আর পারছি না দূরে দূরে থাকতে। কতদিন দেখা হয়নি।

– এইতো দেখছিস!

– এভাবে ভালো লাগেনা আমার! 

– প্লিজ শান্ত হ! এখন বেরোবি না বাড়ি থেকে একদম।    

– না। বেরোবো। যাবো। জাস্ট পারছি না। শিকলে বাঁধা বুনো জন্তুর মত ছটফট করে রূপম।

 

রিনি হাত বাড়িয়ে ভিডিওটা অফ করে। না,  রূপমের আসা চলবে না এখন। একেবারেই নয়।  

ভয় করছে রিনির। ভয় করছে এটা ভেবে যে  রূপম চলে আসতে পারে। ভয়? রিনি কি রূপমকে ভয় পায়? কেন ভয় পায়? ভয় পায় এটা ভেবে যে সম্পর্কটা জানাজানি হয়ে যাবে? কিন্তু সত্যিই কি শুভ্রনীল বউয়ের পিরিতের খবর কিচ্ছু জানে না? কিচ্ছু আন্দাজ করেনা? নাকি রূপম আপন পিসির ছেলে বলে চুপ করে আছে! শুভ্রনীল কতটুকু বুঝতে পেরেছে সেটা রিনি জানে না, তবে এটা জানে যে সম্পর্কটা থাকবে না।

       

রিনি দ্রুত পোশাক পরে নেয়। মুখে-চোখে জলের ঝাপটা দেয়। ফেসওয়শ দিয়ে হাতমুখ ধোয়। কুড়ি সেকেন্ড। কিংবা আরেকটু বেশি। অভ্যেস হয়ে গেছে। হাতে মুখে ফেনা দিয়ে ঘষতে ঘষতে রিনি ভাবনাগুলো গুছোতে থাকে। না, রূপম নয়। ভাইরাস। রিনি ভাইরাসটাকে ভয় পাচ্ছে। রূপম নিজের অজান্তেই ভাইরাসের  বাহক হয়ে যেতে পারে। অ্যাসিম্পটোম্যাটিক লোকজন নাকি চারিদিকে প্রচুর ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাছাড়া, রেহান এখন খুবই ছোট। সেপ্টেম্বরে পাঁচ হবে। পাঁচ বছরের জন্মদিন বড় করে করবার ইচ্ছে ছিল ওদের। এই পরিস্থিতিতে অবশ্য জানা নেই যে আদৌ করা সম্ভব হবে কিনা। সেলিব্রেশান না হলে না হবে। বাচ্চার নিরাপত্তা সবার আগে। সেইজন্যই রূপমের আসা চলবেনা এখন। এসে তো সবার আগে রেহানকে নিয়ে আহ্লাদ করতে শুরু করে। বাচ্চাটার সঙ্গে গালগল্প, আদর; থাবড়েথুবড়ে কীভাবে যেন ঘুম পাড়িয়ে দেয়  রেহানকে। তারপর রিনিকে নিয়ে মেতে ওঠে। যখন শুভ্রনীল বাড়িতে থাকেনা, রূপম সাধারণত তখন আসে। এখন শুভ্রনীল সারাক্ষণ বাড়িতে। কাজেই রূপম যদি আসেও, ওকে দাদার সঙ্গে আড্ডা দিয়েই ফেরত যেতে  হবে। কিন্তু রেহান? রেহানকে আটকাবে কীভাবে রিনি? ও তো একলাফে গিয়ে রূপমের কোলে উঠবে! না- অসম্ভব! রূপমকে আটকাতে হবে।

 

ব্রেকফাস্ট তৈরি করতে করতে রিনি ভয়েস কল করে একফাঁকে।       

– শোন, এখন আসবিনা কিন্তু!  রিনির নিজের কানেই অদ্ভুত লাগে। এসব কী বলছে সে কোনোদিন এভাবে রূপমকে আসতে বারণ করতে হবে, সে কী ভেবেছিল?

– ঠিক আছে। আসবো না। রূপমের কণ্ঠস্বর অনেক স্থির শোনাচ্ছে এখন… ‘পরে কথা বলছি। ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম করছি। লগইন করলাম এইমাত্র!’ রূপম ফিসফিস করে। রিনি একটু আশ্বস্ত হয়। থাকুক। কাজের মধ্যে ডুবে থাকুক। এখন না এলেই হল।  

 

 

– কী করছিস? রিনির ফোনে হোয়াটস্যাপ মেসেজ ঢোকে সন্ধেবেলা।

– ছেলের সঙ্গে খেলছি!

– একটা কল করি?

– এখন? তোর দাদা আছে সামনে!  

– দাদার সঙ্গেও কথা বলবো। গুল্লুকে দেখবো!  রূপম রেহানকে ‘গুল্লু’ বলে ডাকে। 

 

রূপম ভিডিও কল করে। রিনি রেহানকে নিয়ে আসে স্ক্রিনের সামনে। রূপম হাসে, হাত নাড়ে। নানারকম আদুরে আওয়াজ করে।রেহান মজা পাচ্ছে। দুই অসমবয়সী পুরুষ ভারচুয়াল গালগল্পে মেতে উঠতে থাকে।  

 

রূপম এখন যাবে না। লকডাউন উঠলেও চট করে যাবে না। সাবধানে থাকা দরকার, গুল্লুর জন্যে। ভাইরাসের দাপট কমুক। কোনো তাড়া নেই। অপেক্ষা করবে সে। রিনির সঙ্গে কিছু বোঝাপড়া বাকি এখনো। সম্পর্কটা থাকবে না, রূপম জেনে গেছে কিন্তু গুল্লুর বাবা কে, এটা এখনো জানতে পারেনি। 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত