তুমি নও একা

 

দরজার বেলটা আবার বাজল। এর আগেও মনে হয় কয়েকবার বেজেছে। অসুস্থ শরীরে সকালে ঘুম ভাঙার পরও একটু তন্দ্রার মত এসেছিল। বিছানা থেকে উঠে লিভিং রুম পেরিয়ে দরজার পিপহোলে চোখ রাখতেই দেখে পাশের অ্যাপর্টমেন্টের ষন্ডা মার্কা কালো ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে। নীলিমার বুকের ভিতরটা ধক্ করে উঠল। ঘরে দুজন অসুস্থ মানুষ। দেখার কেউ নেই। এর মাঝে এই সাত সকালে আবার কোন হুজ্জত।কলিং বেলটা আবার বাজল। নীলিমা পূনরায় পিপহোলে চোখ রেখে নিশ্চিত হয় পাশের বাসার ছেলেটাই। মাথার চুলে বিনুনি করা। নাকে কানে দুল। হাতে একটা বাজারের ব্যাগ। কার সাথে যেন টেলিফোনে কথা বলছে।নীলিমা বেডরুমে গিয়ে আবীরকে গায়ে হাত দিয়ে ডাকতে গিয়ে দেখে গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।

⁃এই শুনছ! পাশের বাসার কালো ছেলেটা এক নাগাড়ে বেল টিপে যাচ্ছে।এই সাত সকালে কি একটা বিপদ বল তো। তোমার গায়ে তো অনেক জ্বর। এখন আমি কী করব?

⁃কিছু করতে হবে না। চুপচাপ শুয়ে থাক। হয়তো নেশাটেশা করে দরজা ভুল করে আমাদের দরজায় নক করছে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ঠিক চলে যাবে।

আবীর যখন কাশতে কাশতে কথাগুলো বলছিল তখন নীলিমার টেলিফোনে চন্চলের রিং। চন্চল নীলিমার জামাই। চন্চল আর ঊর্মি একমাত্র মেয়ে বুবলিকে নিয়ে বোস্টনে থাকে। রাতে ঘুমানোর আগে একবার কথা হয়েছে। শ্বশুর শাশুড়ি দুজনই একসাথে করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে ঘন ঘন খোঁজ খবর নিচ্ছে। লকডাউনের মাঝে খাবার, ওষুধ সব কিছুতেই টান পড়েছে। শুনে রাতেই চন্চল বলেছিল, দেখি সকালে কি করা যায়।

⁃মা, আপনাদের দরজাটা খুলুন। একজন আপনাদের খাবার আর ওষুধ নিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।

⁃আর বলো না বাবা। আমরা তো আছি মহাবিপদে। তোমার শ্বশুরের জ্বরটা আবার বেড়েছে। এরমাঝে পাশের বাসার কালো ছেলেটা দরজায় দাঁড়িয়ে বেল টিপে যাচ্ছে।সেদিন তুমি পুলিশ কল করে দিলে তারপর থেকেই তো আমরা ভয়ে ভয়ে আছি। ষন্ডা মার্কা এসব কালোদের কি কোন বিশ্বাস আছে?

⁃আচ্ছা আমি পরে শুনছি। আপনি আগে দরজাটা খুলে খাবার আর ওষুধগুলো নিন।আমি লাইনে আছি।নীলিমার কথা শেষ করতে না দিয়েই চন্চল কথাটা বলল।

নীলিমা হাতে হ্যান্ড গ্লাভস আর মুখে মাস্কটা লাগিয়ে দরজা খুলে দেখে আর কেউ নেই। ওই কালো ছেলেটাই ব্যাগটা এগিয়ে দিয়ে বলল, গুড মর্নিং। নীলিমা হতবাক হয়ে ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে সেখানে কোন রাগ ক্ষোভের চিহ্নমাত্র নেই। ছেলেটা আবার বলল, গুড মর্নিং।

⁃গুড মর্নিং। নীলিমা বেশ আড়ষ্ট গলায় উত্তর দিল।

⁃আমার নাম এন্ড্রু। মি: চৌধুরী আমাদের চ্যারীটিতে ফোন করেছিল তোমাদের খাবার আর ওষুধের জন্য। আমি এই পাশের দরজাতেই থাকি। কোন কিছু প্রয়োজন হলে আমাকে জানাবে। কোন লজ্জা করবে না।

নীলিমা আফ্রিকান ইংরেজি ভাল বুঝতে না পারলেও এন্ড্রুর কথাগুলো আর সেই সাথে তার আন্তরিকতাটাও বেশ বুঝতে পারে। মনে হয় চেহারার সাথে ওর আচরণের কোনই মিল নেই। হয়তো ওর আমেরিকাতেই জন্ম। নিউ ইয়র্ক আসার পর প্রথম প্রথম তো কালোদের দেখে খুব ভয়ই লাগতো। ঊর্মি বলেছিল, ওরা কিন্তু সবাই খারাপ না মা। দেখে তোমার পছন্দ হবে না। দেখবে মাজা থেকে প্যান্ট নেমে পড়ে যাচ্ছে। পা ফাঁক করে হাঁটছে। অথচ প্রয়োজনের সময় ওই ছেলেটাই ছুটে আসবে। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে। আর কিছু সাদা চামড়া দেখবে। ফিটফাট পোশাক পড়া। সাহেব মেমসাহেব মার্কা চেহারা। ওরা তোমাকে দেখে নাক সিটকাবে। ট্রেনে বাসে তোমার পাশে বসবে না।তুমি ওদের পাশে বসলে ডিসগাস্টিং, ন্যাস্টি, রিডিকুলাস বলে ছিট ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে থাকবে।তোমাদের নিউ ইয়র্ক বারো জাতির শহর। এখানে অনেক কিছুই বেশ গা সওয়া। সাদাদের স্টেটগুলোতে তো এসব জাতি বিদ্বেষ আরও ভয়াবহ।

নীলিমা যখন ব্যাগ হাতে এইসব ভাবছে তখন এন্ড্রু তার দরজা খুলতে হাই ভলিউমের মিউজিক এসে ধাক্কা খেলো নীলিমার কানে। এন্ড্রু ভেতরে কি যেন একটা ইশারা করতেই মিউজিকের শব্দটা কমে গেল। আর সেই অসভ্য নচ্ছার মেয়েটা দরজায় এসে মুখ বাড়াল।

⁃আমার বান্ধবী।জুলিয়া। এন্ড্রু পরিচয় করিয়ে দিল নীলিমার সাথে।

⁃হাই! গুড মর্নিং। তোমার সাথে দেখা হয়ে আমি খুব খুশি হলাম।

⁃গুড মর্নিং। আমিও তোমাকে দেখে খুশি হলাম।

নীলিমা কথাটা আমেরিকানদের মত ভদ্রতা করে বলল বটে কিন্তু মেয়েটাকে দেখলেই তার কাছে অসহ্য মনে হয়। স্প্যানিশ একটা অতি সুন্দরী মেয়ে। কালো ছেলেটার সাথে থাকে।আজ হাফ প্যান্টের উপরে ছোট্ট একটা টপস পরা। সারা শরীরে উল্কি আঁকা। নাভির উপরে একটা দুল লাগানো। গালে, ঠোঁটে, চোখের উপরে ভুরুর মাঝে নানান রকমের গোঁজ ঢোকানো, ঊর্মি ওগুলোকে বলে পিয়ারসিং। আজ কথা বলার সময় মনে হল ওর জিহ্বার উপরেও বল্টু ধরণে একটা কিছু লাগানো।মাথার চুল একদিকে চেঁছে উপরের দিকে তোলা। রুচির বলিহারি। বিল্ডিংএর করিডোরের মাঝেই দুজন মিলে নানা রকম অসভ্যতা করে।চোখে পড়লে লজ্জায় নিজেদের চোখ বন্ধ করতে হয় অথচ ওদের কোন লাজ লজ্জার বালাই নেই। আজও নীলিমার সামনেই জুলিয়া মেয়েটা এন্ড্রুকে টান দিয়ে চুমু খেতে খেতে দরজা বন্ধ করল।

নীলিমা নিজের ঘরে ঢুকতেই তার হাতের টেলিফোনটা বেজে উঠল। মনে পড়ল চন্চল যে এতক্ষণ লাইনে ছিল সেটা তো ভুলেই গিয়েছিল।

⁃সব কিছু ঠিক মত আছে কিনা দেখে নাও। সেই কালো ছেলেটা কোন ঝামেলা করেনি তো? এবার টেলিফোনে ঊর্মি কথা বলল।

⁃ওই ছেলেটাই তো খাবার আর ওষুধ নিয়ে এসেছিল। চন্চল নাকি ওদের অফিসেই ফোন করেছিল। আমি তো খুব ভয় পেয়েছিলাম। না জানি আজ আবার কি হয়। কথা বলার পর মনে হল ছেলেটা খারাপ না রে। মানুষের এই বিপদের সময় ওরা ওদের সংস্থা থেকে কী উপকারটাই না করছে। আমাকে ওর বউ না বান্ধবী সেই নচ্ছার মেয়েটার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। কী অসভ্য জানিস? আমার সামনে ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেলো। কোন লাজ লজ্জার বালাই নেই। ওর নাম জুলিয়া আর ছেলেটার নাম এন্ড্রু। কথা বলে মনেই হল না যে, ওদের লাউড মিউজিক বাজানোর জন্য দুদিন আগে আমরা পুলিশ কল করেছিলাম।

⁃বাদ দাও তো মা! ওরা কি ভাবে জানবে আমরা পুলিশ কল করেছিলাম। পুলিশ কি আর এসে আমাদের নাম বলবে। ওদের কাজ সতর্ক করার, সতর্ক করে দিয়ে গেছে। আর সব সময় এই সব অসভ্যতা অসভ্যতা করবে না তো! এতো দিন এদেশে থেকেও বুঝলে না ওগুলো এখানকার কালচার। তুমি বাবাকে ওষুধটা খাইয়ে দাও। জ্বরটা মাপ আর শ্বাসকষ্ট হয় কিনা খেয়াল রেখো। শ্বাসকষ্ট শুরু হলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। আর তুমিও নিজের প্রতি খেয়াল রেখো। মনে রেখো দেখার কিন্তু কেউ নেই। তাই নিজেদের মত করে যতটা সম্ভব ভাল থাকার চেষ্টা কর। আমি আবার পরে ফোন করব। এখন রাখছি, বাই।

টেলিফোন ছেড়ে নীলিমা দুজনেরই জ্বর মাপে। আবীরের ১০১ আর তার নিজের ৯৯ ডিগ্রী। গলার ব্যাথা আর কাশি দুটোই আরও বেড়েছে। বার বার আদা লবঙ্গের চা খেয়েও তেমন কোন উন্নতি হচ্ছে না। সারাদিন বিছানায় শুয়ে টিভি দেখে আর গান শুনে সময়গুলো বড় একঘেঁয়ে মনে হয়। মনের মাঝে নানা রকম ভয় আর আতংক বাসা বেঁধেছে। দেখার কেউ নেই। দেশে হলে আত্মীয় সজন পাড়া প্রতিবেশিদের সাহায্য পাওয়া যায়।এখানে দুজন মানুষ একা একা থাকা। কেউ একজন হারিয়ে গেলে তখন কী হবে, এটা ভাবতেই মনটা বিষন্নতায় ভরে যায়।

ওষুধ খাওয়ার পর থেকে আবীরের জ্বরটা সারাদিন বেশ কমের দিকে ছিল কিন্তু সন্ধ্যার পর থেকে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।মনের ভেতরে ভয় বাড়ছে। ঊর্মি আর চন্চল সারাদিনে বেশ কয়েক বার টেলিফোনে খবর নিয়েছে।মাঝরাতের পর শ্বাসকষ্টটা আরও বাড়তে থাকল। মনে হল হাসপাতালে পাঠানো দরকার। চন্চল আর ঊর্মিকে বারবার ফোন দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না। নীলিমা আসহায়ের মত কাঁদতে থাকে।দেখে আবীরের হাতের নক আর ঠোঁট কেমন যেন নীলচে হয়ে আসছে। হঠাৎ মনে পড়ল এন্ড্রুর কথা। কয়েকবার নক করার পর জুলিয়া চোখে ঘুম নিয়ে দরজা খুলল।

⁃কে? কি হয়েছে? এতো রাতে দরজা ধাক্কাচ্ছ কেন?

⁃এন্ড্রুকে একটু ডেকে দেবে, প্লিজ। আমার স্বামীর খুব শ্বাস কষ্ট হচ্ছে। ওকে হাসপাতালে পাঠাতে হবে।

⁃৯১১ এ কল দাও। তাছাড়া এন্ড্রুতো এখন বাসায় নেই। আমি কি তোমাকে কোন ভাবে সাহায্য করতে পারি।

⁃আমি তো কখনও ৯১১ এ কল করিনি। তুমি কি আমাকে একটু সাহায্য করবে, প্লিজ!

⁃ও, আচ্ছা। বুঝতে পেরেছি। আমি কল করে দিচ্ছি। ওরা এক্ষনি এসে যাবে। তুমি তোমার স্বামীকে রেডি করে ফেলো।

মিনিট দশেক পরে ইএমএস’র লোকগুলো ট্রেচার নিয়ে ঘরে ঢুকলো। কিছু চেক আপ সাথে আইডি, মেডিকেল ইনশিওরেন্স কার্ড আর কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য সহ আবীর কে নিয়ে চলে গেল।

ঘরটা ফাঁকা হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে নিজেকে খুব নি:স্ব মনে হয় নীলিমার। হতাশার সাথে সাথে কী যেন এক শূন্যতা তাকে ঘিরে ধরে।অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই এধরণের পরিস্হিতি হতে পারে তার একটি প্রস্তুতি মনে মনে ছিলোই। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিটা নতুন এক আঙ্গিকে ধরা দিল নীলিমার কাছে। আজ থেকেই কি আমি একা হয়ে গেলাম? আবীর কি সুস্থ হয়ে ফিরে আসবে? যদি ফিরে আসে, ততদিন কি আমি বেঁচে থাকব। এখন তো হাসপাতালে নাকি দেখা করতে দেয় না। আমাদের আবার কি কখনও দেখা হবে? নীলিমার মাথায় পন্চাশ বছরের নানান স্মৃতি এসে ভিড় জমাতে থাকে। রাতে আর ঘুম আসে না। ভোরের দিকে ঊর্মির ফোন আসে।

⁃বাবার অবস্থা এখন কেমন? তোমরা ভালো আছ তো?

উর্মির টেলিফোন পেয়ে কান্নায় ভেঙে পরে নীলিমা। বাঁধ দিয়ে বন্যার জল আঁটকে রাখার পর বাঁধ ভেঙে গেলে যেমন এক লহমায় সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায় তেমন নীলিমার বুক ভেঙে কান্না আসে।তার সব কথা ভেসে যায় কান্নার তোড়ে। ঊর্মি অধৈর্য্য হয়ে ওঠে। বুকের মাঝে চরম কোন সংবাদের জন্য ঢিপ্ ঢিপ্ শব্দ করতে থাকে।

⁃তুমি কাঁদছো কেন? কি হয়েছে আগে বলবে তো?

⁃তোর বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। আমি যে একা হয়ে গেলাম রে। আমি কেন আগে মারা গেলাম না।

⁃তুমি এতো কাঁদছো কেন? হাসপালে নিয়ে গেছে তো সমস্যা কি? ঠিকমত চিকিৎসা পেলেই ভাল হয়ে যাবে। বেশির ভাগ মানুষই তো হাসপাতাল থেকে ভাল হয়ে ফিরে আসছে। তুমি তোমার দিকে খেয়াল রাখ। আমরা তো এখন বোস্টন থেকে নিউ ইয়র্ক যেতে পারছি না। তুমি নিজের মনকে শক্ত কর।

ঊর্মি মায়ের মন শক্ত করার কথা বলতে বলতে নিজের মন গলে জল হয়ে যায়। সে জলের উথাল পাথাল ঢেউ এসে আছড়ে পরে বুকের মাঝে। গলার ভেতরে কথাগুলো আঁটকে গিয়ে কেমন যেন শব্দগুলো ভেঙে ভেঙে বের হতে থাকে। ঊর্মির হাত থেকে চন্চল টেলিফোন নিয়ে কথা বলে শাশুড়ির সাথে। কি পরিস্থিতি হয়েছিল? কখন হাসপাতালে নিয়ে গেল? কোন হাসপাতাল? এখন কেমন আছে? হাসপাতাল থেকে কোন খবর পাওয়া গেছে কিনা জেনে নিয়ে বলে, ঠিক আছে আমি যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি।

তখন সকল হয়ে এসেছে। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। কলিং বেলের শব্দ শুনে দরজা খুলে দেখে জুলিয়া আর এন্ড্রু। ওরা মুখে মাস্ক লাগিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে কথা বলে।

নীলিমা তার মাস্ক গলা থেকে তুলে নাক-মুখ ঢেকে নেয়। এন্ড্রু কেবল বাইরে থেকে ফিরেছে।জামা প্যান্ট ভেজা। হয়তো কারও ওষুধ কিংবা খাবার দিয়ে ফিরল।জানতে চায়, হাসপাতাল থেকে কোন খবর পাওয়া গেছে কিনা। শান্তনা দেয়। আশ্বস্থ করে, তারা সব কিছু টেক কেয়ার করবে।বেশির ভাগ মানুষই হাসপাতাল থেকে ভাল হয়ে ফিরছে। তার স্বামীও ভাল হয়ে ফিরবে। আর কোন কিছুর প্রয়োজন হলে কোন ইতস্তত: ছাড়াই যেন তাদের জানানো হয়।

অপেক্ষার সময় শেষ হয় না। চন্চল বার বার টেলিফোন করে জানতে চায়, হাসপাতাল থেকে কোন খবর পাওয়া গিয়েছে কিনা। আর জানায় সে হাসপাতালের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন খবর বের করতে পারেনি। দিনের শেষে হাসপাতাল থেকে টেলিফোন আসে। আবীর রয়কে আই সি ইউ বেড নং ৫৪ এ রাখা হয়েছে। তার শ্বাস কষ্ট আছে। ভেন্টিলেশন সহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। কোন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলে তাকে জানানো হবে। অপ্রয়োজনে টেলিফোন না করার জন্য অনুরোধ সহ সার্বিক পরিস্থিতির জন্য দূ:খ প্রকাশ করা হয়।

নীলিমা জুলিয়া-এন্ড্রুকে খবর দেয়। ঊর্মিকে ফোন দিয়ে কান্নাকাটি করে।

⁃তোর বাবাকে তো আই সি ইউ তে ভেন্টিলেটর দিয়ে রেখেছে। খবরে দেখেছিলাম ভেন্টিলেটর দেয়ার পর খুব কম রোগীই বেঁচে ফিরে আসে। তার উপরে তোর বাবা বলতো ৫৪ ধারা মানে সন্দেহ জনক। তোর বাবার বেড নম্বর ৫৪। আমার খুব ভয় হচ্ছে। তোর বাবা মনে হয় বাঁচবে না।

কথাগুলো বলে নীলিমা কাঁদতে থাকে।ঊর্মি এতো দূ:খের মাঝেও হাসি পায়।

⁃তুমি সবকিছু গুলিয়ে ফেলছ। ৫৪ ধারা তো বাংলাদেশের আইনের ধারা। যে কোন মানুষকে ধরে সন্দেহ জনক বলে জেলে ভরে দেয়ার একটা আইন। তার সাথে হাসপাতালের বেড নম্বরের কি সম্পর্ক?

⁃সে কথা তো আমিও জানি কিন্তু প্রতিদিনের খবর তো দেখছিস। এলমহার্ষ্ট হাসপাতালে লাশ রাখার জায়গা হচ্ছে না। লাশটানা গাড়ীর অভাবে খাবার পরিবহনের ফ্রিজিং ভ্যানগুলো লাশটানার কাজে লাগানো হচ্ছে।

⁃তুমি ওসব খবর টবর দেখা বাদ দাও তো। খবর দেখে মন খারাপ করে লাভ নেই। তাতে আরও তোমার শরীরের ক্ষতি হবে। বরং নিজের যত্ন নিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠার চেষ্টা কর।

সময় গড়িয়ে যেতে থাকে। নীলিমা নিজের যত্ন নিয়ে ঘরে থেকেই সুস্হ হয়ে ওঠে।হাসপাতাল থেকে কোন খবর আসে না। বোস্টন থেকে চন্চল-ঊর্মি আর নিউ ইয়র্কে জুলিয়া-এন্ড্রু অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কোন খবর পাওয়া যাচ্ছে না। জুলিয়ার এক বান্ধবী এলমহার্ষ্ট হাসপাতালের নার্স। অন্য একটি সেকশনে কাজ করে। ভেতরের ব্যাবস্থাপনা এমন যে ভেতরে কাজ করেও অন্য একটি সেকশনের খবর বের করা সম্ভব হচ্ছে না।

সতেরো দিন পার হওয়ার পর হাসপাতাল থেকে খবর আসে, মি. রয়কে আই সি ইউ থেকে সাধারণ বেডে স্থানান্তর করা হয়েছে। তার স্বাস্থ্য পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। কোন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলে জানানো হবে।

এই খবরের সন্ধান করতে করতে নীলিমার সাথে জুলিয়া আর এন্ড্রুর সম্পর্ক বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। ওদের লাউড মিউজিক শুনে নীলিমার এখন আর তেমন খারাপ লাগে না।জুলিয়ার বেশভুষা আচরণ কোন কিছুই এখন খারাপ মনে হয় না। দূর থেকে সাদা চোখে যা কিছু দেখা যায় তা সব কিছুই হয় তো সত্যি না। কাছ থেকে অন্তর দিয়ে দেখলে অনেক কিছুর চেহারাই অন্য রকম হয়ে যায়। ভালোবাসার আবরণে অনেক দোষ ত্রুটি বৈষম্য আর বৈপরিত্য ঢাকা পড়ে যায়। জুলিয়া বাসায় বসে মাস্ক তৈরী করে ওদের চ্যারিটি সংস্থার মাধ্যমে বিতরণ করছে।নীলিমা জুলিয়ার কাছ থেকে শিখে নিয়ে নিজের ঘরে বসে মাস্ক তৈরী করে এন্ড্রুর হাতে তুলে দেয়। আবীরের অবস্থার উন্নতি হলে হাসপাতাল থেকে রিলিজ নেয়ার জন্যখবর আসে। নীলিমা জুলিয়া-এন্ড্রুকে সাথে নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে আবীরকে বাসায় নিয়ে আসে।

পরদিন সকালে নীলিমা ইউটিউব থেকে জুলিয়া-এন্ড্রুর গানটা খুঁজে বের করে বাজাতে থাকে। মাস্কের ডেলিভারী নেয়ার জন্য জুলিয়া আর এন্ড্রু আসে নীলিমার ঘরে। জুলিয়া গান শুনে অবাক হয়ে চিৎকার করে ওঠে, হাউ সারপ্রাইজ! ইউ আর লিসনিং মাইকেল জ্যাকসনস মিউজিক। তারপর জুলিয়া আর এন্ড্রু মিউজিকের তালে তালে নাচতে থাকে। মিউজিকের ভলিউম বাড়িয়ে দিয়ে নীলিমা ওদের নাচের সাথে যোগ দেয়। আবীর বিছানায় শুয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। লাউড ভলিউমে মিউজিক বেজে চলে-

You are not alone

I am here with you

Though we’re far apart

You’re always in my heart

You are not alone.

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত