| 4 মার্চ 2024
Categories
সময়ের ডায়েরি

করোনা কালের উপলব্ধি

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

করোনা ভাইরাস, কোভিড-১৯,লকডাউন, কোরেন্টাইন, আইসোলেশন এই শব্দগুলো আমাদের জীবনের-ই একটা অংশ হয়ে গেছে এখন। কিন্তু ভাবতে অবাক লাগে; আবার মাঝে মাঝে খুব হাসিও পায়। কেননা মানুষ হিসেবে আমরা কতোটা স্বার্থপর তা এই মহামারি না আসলে হয়তো আমরা বুঝতেই পারতাম না।

চীনের উহান শহরে যখন কোভিড-১৯ হানা দিয়েছিলো তখনও আমরা বুঝতে পারিনি; করোনা আমাদের জীবন যাপনে কতোটা প্রভাব ফেলবে। যখন উহানবাসী  মুখে মাস্ক পড়ে চলাফেরা করতো; যখন ঘরে ঘরে লকডাউন দেয়া শুরু হল তখন  আমরা তাঁদের নিয়ে কত হাসি তামাশা করেছি। বলেছি অখাদ্য-কুখাদ্য খেয়েই আজ এই মহামারীকে দাওয়াত দিয়ে এনেছে চীন।যখন চীন ও ইতালীর ঘরে ঘরে, রাস্তায় মানুষ মরে পরেছিল অথচ কেউ তখন লাশ গুলো তুলছিল না তখন আমরা তাদের অমানবিকতা নিয়ে কতোই না লজ্জা দিয়েছিলাম।

এরপর প্রতিবেশী রাষ্ট্রে যখন মহামারী হানা দিলো তখন কী আমাদের  হৃদয় কেঁপেছিল? না কাঁপেনি। আমরা নিজেদের ধর্মপরায়ণ জাতি হিসেবে দাবী করি তাই ভেবেছিলাম স্রষ্টার অভিশাপ আমাদের কাছে আসবে না । কিন্তু আমরা কী নিষ্পাপ? বুকে হাত দিয়ে আমরা কী নিজেদের নিম্পাপ দাবী করতে পারি?

আমরা কী মিথ্যা বলি না? সুদ খাই না? ঘুষ দেই নেই না? আমরা কী অন্যের সম্পদ লুট করি না?

হ্যাঁ আমরা এসব করি। পাপ করি, অন্যায়ও করি। তাই স্রষ্টার গজব আমাদেরকেও ছাড় দেয়নি।  মহামারী ধেয়ে এসেছে আমাদের কাছে। এক, দুই, তিন করে লাখে পৌঁছেছে আক্রান্তের সংখ্যা। মৃত্যুর কোলে ঢেলে পড়েছে কত প্রান।

সকল ভালবাসা, মহানুভবতা ম্লান করেছে করোনা।প্রিয় মানুষ, কাছের মানুষ, মা-বাবা, ভাই-বোন যখন মৃত্যুর দিকে শেষ যাত্রায় হেঁটেছে; তখন আমরা বাধ্য হয়েছি অমানবিক হতে। শেষ বিদায় জানাতে পারিনি। দিতে পারিনি এক মুঠো মাটিও। করোনা আমাদের গৃহ বন্দিত্বের স্বাদ দিয়েছে। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস ঘরে থেকেও যে হাসি মুখে থাকা যায় তা বুঝিয়ে দিয়েছে করোনা। অনিশ্চিত এক ভয় নিয়ে বেঁচে থাকা কাকে বলে তা বুঝিয়েছে।

করোনাকালে মানুষের জীবনের অনেক ক্ষেত্রেই এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সুখী ও স্বাধীন জীবনে যা আমরা উপলব্ধি করতে পারিনি; তা এই কঠিন সময় আমাদের উপলব্ধি করিয়েছে। করোনা আমাদের উপলব্ধি করিয়েছে মৃত্যুকে।  মৃত্যুকে আমরা যে কতোটা ভয় পাই তা এবার হয়তো আর কেউ অস্বীকার করতে পারবেনা। করোনা আমাদের উপলব্ধি করিয়েছে স্রষ্টার অস্তিত্বকে। যারা এতদিন মানুষ মরণশীল বলে জীবনকে হেলিয়ে দিয়েছিল; তারা এবার স্রষ্টার সামনে মাথা নুইয়েছে।মানুষ স্রষ্টার সেরা জীব হিসেবে যাদের দম্ভ ছিল তারাও আজ মাটির দিকে তাকিয়ে হয়েছে স্রষ্টার অনুগত।

করোনা আমাদের সুযোগ করে দিয়েছে কর্পোরেট রুটিন থেকে বের হয়ে জানালার ফাঁকে আকাশের বিশালতা কে উপলব্ধি করার। সময় না দেয়ার অভিযোগ গুলো মিটিয়ে পরিবারের সাথে নতুন কিছু মুহূর্ত সৃষ্টি করার। দুরত্ব ও সময় না দেয়ার কারনে যে সম্পর্কগুলো ররং ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিলো সেগুলো ফিরে পেয়েছে নতুন রং। আবার কেউ দূরে থেকে উপলব্ধি করেছে ভালবাসার মর্ম।মূল্যায়ন করতে শিখেছে কাছের মানুষকে।

করোনা আমাদের অনেক বেশি প্রযুক্তি নির্ভর করেছে। দূরে থেকেও কাছে থাকার অনুভূতি দিয়েছে। নতুন অনেক কিছুই শিখিয়েছে। অনেক লুকায়িত প্রতিভার খোঁজ দিয়েছে। 

করোনা মানুষকে উপলব্ধি করতে শিখিয়েছে নিজেকে আরও একটু জানার, নিজের ভেতরের মানুষটিকে নতুন ভাবে আবিস্কার করার।  

করোনা বুঝিয়েছে মানুষ শুধু পেশাদারিত্বের জন্য কাজ করে না। মানুষ কাজ করে  দায়িত্বের জন্যে। ভয় পেয়ে লুকিয়ে না থেকে নিজেকে বিলীন করে যারা অন্যের সেবায় এগিয়ে এসেছে এমন মানুষদেরকেও চিনিয়েছে করোনা। 

করোনাকালের বন্দী জীবনে মানুষ হয়তো এবার উপলদ্ধি করবে বন্দী থাকার যন্ত্রণা। হয়তো আর কোন পাখিকে খাঁচায় বন্দী হতে হবে না। আমরা হয়তো এবার উপলন্ধি করতে পারবো প্রকৃতিকে বাঁচতে দিতে হবে। প্রকৃতির মাঝেই যে আমাদের অস্তিত্ব সেটা হয়তো বুঝতে পারবো। 

অন্যের দুঃখে না হেসে, দুঃখ গুলোকে সারিয়ে তোলার গল্প তৈরি হবে হয়তো। করোনা হয়তো উপলব্ধি করাবে মানুষ হয়ে নয়, মানবতা নিয়ে বাঁচতে হবে।

করোনাকালের জীবনে উল্টো উপলন্ধিও আছে। করোনা বুঝিয়েছে কারো জীবন বেশি দামি, আবার কারও জীবন মূল্যহীন। ক্ষমতাবানদের সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার সীমা পরিসীমার গন্ডি চিনিয়েছে করোনা । করোনা আমাদের পরিচিত করিয়েছে জন প্রতিনিধি নামের কিছু চাল,ডাল চোরের সঙ্গে।  করোনাকালীন সময়ে আমরা দেখেছি ক্ষমতায় কতোটা অন্ধ হলে মানুষ তার জ্ঞানহীনতা ও মূর্খতা  জাহির করতে পারে। করোনায় দেখেছি  জীবনের চেয়ে ব্যবসা বড়।  করোনা না আসলে আমাদের কাছে এই স্বরূপ স্পষ্ট হতো না।  

করোনা আমাদের ধৈর্য্যশীল করেছে। আমরা কেউ জানিনা কবে শেষ হবে এই অপেক্ষা। তবুও প্রতিদিন আশা নিয়ে বেঁচে আছি যে, হয়তো খুব শীঘ্রই সব ঠিক হয়ে যাবে। আমরা প্রকৃতির মতই মুক্ত হয়ে বাঁচবো। আমরা মাস্কবিহীন পৃথিবীতে নিশ্চিন্তে শ্বাস নেবো। আমাদের জীবনে এই অদৃশ্য বাধা, আতঙ্ক একদিন দূর হয়ে যাবে। একদিন সব ঠিক হবে, নতুন সূর্য উঠবে, সেদিন প্রকৃতির সাথে আমরাও হাসবো, গাইবো গান বিজয়ের।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত