Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

ক্রিকেট

Reading Time: 8 minutes

আজ ০২ নভেম্বর কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় বিনম্র শ্রদ্ধা ও নিরন্তর শুভকামনা।


   

হরিবোল বুড়ো এসে ওই বসে আছে শিমুল গাছের তলায়। নিষ্পত্র গাছ, তার ছায়া নেই। গাছের কঙ্কালসার হাতগুলি রোদের দিকে বাড়ানো, ঠিক কাঙাল ভিখিরির হাতের মতো। শীতের শেষে যখন বসন্ত আসবে তখন তার হাত ভরে দেবে ফুলে। কে তার হাত ফুলে ভরে দেয় তা বোঝা যায় না। কিন্তু কেউ দেয়।

হরিবোল বুড়ো একা বসে আছে। ভারী অস্বস্তি তার। পাড়ার ছেলেগুলো এইবেলায় ধারে কাছে ডাংগুলি খেলে, সেগুলো আজ বেপাত্তা। কোথা গেল সব সোনার চাঁদ হাড়হাভাতেগুলো? গাছের ছায়া নেই, রোদ মুখে পড়েছে। তা এ রোদ বড় মিঠে, শীতের রোদ তো, কুসুম গরম।

পেয়াদা বগলাচরণ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল, হাঁক পেড়ে বলে,—কে, হরিবোল খুড়ো নাকি? মাগতে বেরিয়েছ?

–বসে আছি বাবা। কিছু অন্যায় হয়নি তো?

—না, কী আর অন্যায় হবে! তবে বলি, ছোঁড়াগুলো যে হরিবোল বললেই তেড়ে মারতে যাও সেটা ঠিক হচ্ছে না। কবে কোনটাকে জখমে করবে, অমনি থানায় গিয়ে এত্তেলা করবে।

—আজ সারাদিন উপোস আছি বাবা, অত কথা ভিতরে সেঁধোচ্ছে না।

–উপোস আছ! বগলাচরণ দু-পা এগিয়ে কোমরে হাত রেখে বলে—সেটা কীরকম? গতকালই তো অধর ভটচার্যের শ্রাদ্ধে সিধে পেলে।

হরিবোল বুড়ো উদাস হয়ে বলে—ভাই, আমি সারাদিন খাইনি, আজ কেউ হরি বলেনি। তুমি একবার হরিবোল-হরিবোল বলো, তবেই আমার পেট পুরে যাবে, এই ভিক্ষা চাই।

–বটে! তবে এই বললুম, হরিবোল-হরিবোল।

হাসতে-হাসতে বগলাচরণ বিষয়কর্মে যায়।

উড়োজাহাজের জানালা দিয়ে ইভান ওয়েলচ খুব নিরাসক্তভাবে তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে। বোয়িং জেট বিমানটি আকাশ ছিঁড়ে ফেলছে শব্দে-শব্দে। কিন্তু ভিতরে কিছুই টের পাওয়া যায় না। অতি ক্ষীণ একটু থরথরানি, অতি মৃদু একটু গোঙানির আওয়াজ।

একটু আগেই কালো কফি খেয়েছে ইভান, একটু হুইস্কি মিশিয়ে। তবু বড় ক্লান্তি লাগে। টোকিও থেকে সিঙ্গাপুর, দূরপ্রাচ্য, তারপর আবার ভারতের বম্বে শহর ছুঁয়ে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপের দিকে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের মস্ত প্রতিনিধি ইভানকে সারা পৃথিবী দৌড়ে বেড়াতে হয়। গোটা এক সপ্তাহেও তার বিশ্রাম নেই। আজ নিউইয়র্ক তো কাল হংকং, দু-দিন বাদে মেলবোর্ন, তারপর বেইরুট কি বার্লিন। বড় ক্লান্ত। বোয়িং-এর গতিকে বড্ড কম বলে মনে হয় ইভানের। কনকর্ড বিমান চালু হলে আরও অনেক বেশি গতিতে উড়ে যাওয়া যাবে। তখন ইভান হয়তো আর একটু সময় পাবে বিশ্রামের। তার বয়স পঞ্চান্নর কাছাকাছি। খুবই শক্ত সমর্থ চেহারা। মাথায় প্রচণ্ড সব চিন্তা। সারা পৃথিবীর যাবতীয় সমস্যা যেন তার মাথার কম্পিউটারে অনবরত ভরে দেওয়া হচ্ছে। পাশে বসা সেক্রেটারিকে ডিকটেশন দিচ্ছিল ইভান। একটু বাদেই মেসেজটা বম্বে থেকে টেলেক্স করতে হবে। জরুরি। তবু ইভান হঠাৎ থেমে গেল। জানলা দিয়ে দেখতে পেল, এক ধূসরতার ভিতরে সূর্যাস্ত ঘটছে। আকাশে খণ্ড মেঘ, নীচে একটা মাঠ। বিমান কিছু নীচু হয়ে যাচ্ছে। এক পলকের জন্য ইভানের মনে হল, বহু নীচে লম্বা কয়েকটা গাছের ফাঁক দিয়ে ছোট্ট আয়নার মতো জল চকচক করে উঠল। অতখানি মাঠ অত সহজে এক চিলতে পলকে পার হয়ে গেল তার বিমান। পশ্চিমের দিকে সূর্য ডুবছিল, কিন্তু বিমানটি যেহেতু পশ্চিমেই যাচ্ছে সেইহেতু সূর্যাস্ত ঘটল না। বরং বিমানের উন্মাদ গতি সূর্যকে কয়েক ইঞ্চি ঊধ্বাকাশে তুলে আনল যেন। ঝকঝকিয়ে উঠল রোদ। ইভানের জীবনে নিশ্চিত সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত কমই ঘটে। জাপানে একবার সূর্যোদয় দেখে সে আবার সিঙ্গাপুরে দ্বিতীয়বার সূর্যোদয় দেখছে একই দিনে। তার ওমেগা হাতঘড়ি সপ্তাহে সাতবার আন্তর্জাতিক সময়সীমা পার হয়।

খুব ক্লান্ত লাগছিল ইভানের। তার জীবনে বড় অতৃপ্তি। সে যেমনটা চেয়েছিল জীবনটা ঠিক তেমনই হয়েছে। কী আশ্চর্য, সে যা চায় তাই মুহূর্তের মধ্যে পেয়ে যায়। মেয়েমানুষ, টাকা, সৎমান, উচ্চপদ, কিছুই বাকি থাকে না। কে যেন তার জন্য পৃথিবীময় এক ঐশ্বর্যের ভাণ্ডার খুলে দিয়েছে। তার স্বাস্থ্যও অফুরন্ত। সেই কারণেই কি এত অতৃপ্তি?

ইভান ভাবল, এবার একদিন সে উপোস থেকে দেখবে। আর, সাতদিন মেয়েমানুষকে ছোঁবে। আর, গ্রামের দিকে গিয়ে অনেকক্ষণ ঘাসের ওপর হেঁটে-হেঁটে পোকামাকড় আর ফড়িং দেখবে। পাখির শিসের নকল করবে।

ইভান একটা শ্বাস ফেলে বলল—দেন ডেথ!

সেক্রেটারি এ কথাটাও ভুল করে টুকে নিয়ে চমকে বলল—ইয়েস মিস্টার ওয়েলচ? হোয়াট অ্যাবাউট ডেথ?

ইভান সেক্রেটারির ভুল বুঝতে পেরে ভীষণ হেসে ফেলল। এত হাসল যে তার চোখে জল এসে গেল। হাসতে-হাসতে কাশি এল। কাশতে-কাশতে রক্তাক্ত হয়ে গেল মুখ। পাঁচ ডলার দামের রুমাল মুখ চেপে সে বেদম হচ্ছিল। হোসটেস ছুটে এল।

ইভান হাত তুলে তাদের নিবৃত্ত করে নাক ঝাড়ল জোরে। সামলে নিয়ে সেক্রেটারিকে বলল —আই জাস্ট থট অ্যালাউড।

ইভান মনশ্চক্ষে একটু আগে দেখা ধূসর মাঠটাকে আবার যেন দেখতে পেল। মাঠটা দেখেই কি হঠাৎ মৃত্যুর কথা মনে এল তার।

সেক্রেটারি ডেথ কথাটা কেটে দিল।

.

ন’পাড়ার অবস্থা ভালো নয়। ধানভাসি বান এসেছিল এবার। দশ দিন ঠায় জল দাঁড়িয়ে রইল মাঠে আহাম্মকের মতো। ধান পচে গোবর। ছোট্ট জায়গার ছোট্ট মানুষ সব, কে তাদের খবর রাখে।

হাতে মাথায় পোঁটলা পুঁটলি নিয়ে একটা পরিবার উদোম মাঠটা পেরোচ্ছে পিঁপড়ের মতো। গোটা দুই দুরকম বয়সি বউ, ছ’রকম বয়সের ছ’টা ছেলেমেয়ে, তিনটে এক বয়সি বুড়ি, একটা বুড়ো, তিনটে মরদ।

শঙ্খচূড় সাপের খোলস সজনের ডালে লটকে আছে। বানের সময় ওই অত উঁচুতে উঠেছিল সাপটা। একটা ছেলে ঢেলা মারল। পাতলা কাগজের মতো খোলসটা হাওয়ায় উড়ছে ফুরফুর করে। ঢেলাটা লাগল বটে, খোলসটা পড়ল না। ঢেলাটা বুরুশ করে চলে গেল।

এক বউয়ের দশমেসে পেট। সে বলল—আস্তে চলে।

তার বর থেমে একটু মুখ ঘুরিয়ে দেখে নেয়। বলল বাবুদের রেলগাড়ি কি তোর মতো চাষানির জন্য বসে থাকবে নাকি।

–না থাকল। এখানে পড়ে থাকব কোথাও। তোমরা যাও।

—অত ঢিসকোতে-ক্সিকোতে হাঁটিস না। কদমের আর-একটু জোর কর।

বউটা বলে—পারব না।

–পোঁটলাটা আমার হাতে দে।

–তোমার তো আরও পুঁটলি আছে, নেবে কোথায়। হাত দুটো বই তো নয়।

—পারব।

মরদটার তেমন জোরবল নেই, কাঁকলাশের মতো চেহারা। তবু কোত্থেকে যেন তিন নম্বর আর একটা হাত বের করে পোঁটলাটা নিয়ে নিল। গলাটা চেপে বলল—পেটের বোঝাটা ব ঠিকমতো।

অপরূপ এক বিকেলবেলা চারধারে। কোদালে মেঘের চাপগুলো চুন হলুদ রং মেখে পশ্চিমের আকাশে ছয়লাপ হয়ে আছে। রূপকথার রাঙা আলোয় চারধারে স্বপ্নের মতো জগৎ। শিশুরা এই সৌন্দর্যের মধ্যে চেঁচিয়ে কথা বলে। বড়রা গম্ভীর, চুপ। রোদে পোড়া গাছপালার বন্য গন্ধ আসছে। এ সময়ে একটা বিশাল উড়োজাহাজ ঝুম করে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল। সবাই হাঁ করে দেখে একটু। কারা যায় ওইসব কলের পাখি করে?

পেটে খিদে মরে গিয়ে একটা গোঁতলানি এল গর্ভবতী বউটির। বুক চেপে সে মাঠের মধ্যে বসে পড়ে। তার পেট থেকে ওয়াক তুলে কেবল জল বেরিয়ে আসে।

এখানে কিছু তালগাছের জড়াজড়ি। তার মাঝখানে ছোট্ট একটু পুকুর। জল শুকিয়ে অনেকখানি কাদাজমি বেরিয়ে আছে দাঁতের মাড়ির মতো। মাঝখানে ছোট্ট একটু জলের চাকতি। বউয়ের বরটা কাদামাটির ওপর দিয়ে পা টিপেটিপে নামছিল। চারধারে পাখিরা ক্যাচাল করছে। পোকামাকড়ের শব্দ। নিথর জলের কাছে এসে লোকটি ঘটি ডোবানোর আগে স্থির জলে নিজের ভূতুড়ে মুখের ছায়া দেখল। এ মুখ একটা মুখ মাত্র। মানুষের মুখ বলে বোঝা যায় ঠাহর করলে। ঘটিটা ডোবাতেই হিজিবিজি হয়ে শতখান হয়ে গেল মুখখানা। লোকটা বলল—যা শেষ হয়ে যা!

.

মেলবোর্নের ক্রিকেট মাঠে এখন রাত্রি। অনেকক্ষণ আগে দিনের খেলা শেষ হয়ে গেছে। শূন্য স্টেডিয়াম, অন্ধকার মাঠ, কেউ কোথাও নেই। শুধু একজন তরুণ কোনও ফাঁকে এসে মাঠে ঢুকেছে। প্যাভিলিয়ানের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে সে অস্থির হাতে একটা সিগারেট ধরাল। আকাশে তারা ঝিকমিক করছে। মৃদু বাতাস।

ছেলেটা মাঠের সীমানার ধারে, সামনে পা ছড়িয়ে বসল। তার চোখে জল। জীবনের প্রথম টেস্টম্যাচ খেলতে নেমেছিল সে। প্রথম ইনিংসে শূন্য রানে আউট হয়ে যায়। ড্রেসিংরুমে ফিরে এলে ক্যাপ্টেন পিঠ চাপড়ে বলেছিল—বব, ঘাবড়াবার কিছু নেই। সেকেন্ড ইনিংসে সেঞ্চুরি করবে।

দ্বিতীয় ইনিংস খেলতে নেমেছিল আজ লাঞ্চ-এর পর। তার প্রেমিকা জ্যানেট স্ট্যান্ডে বসে খেলা দেখছে। দেখছে মা বাবা বন্ধুরা। নতুন টেস্ট খেলোয়াড়ের জন্ম দেখছে লক্ষ দর্শক, স্টেডিয়ামে বা টিভি-তে।

তার খেলা দেখে সকলেই বলত—এ হবে দ্বিতীয় ব্র্যাডম্যান।

ছেলেটিরও তাই বিশ্বাস ছিল। জীবনের প্রথম টেস্ট ম্যাচে খেলতে নেমে সে ভেবেছিল, আর পিছু ফিরে তাকানোর কিছু নেই।

দ্বিতীয় ইনিংস সে শুরুও করেছিল ভালো। প্রথম চার ওভারে তিনটে চার আর দুটো এক রান। বেশ ভালো শুরু। আধঘণ্টা সে ক্রিজে চমক্কার অবস্থান করছিল। তারপরই একটা বল এল লেগ স্ট্যাম্পের ওপর। মনে হয়েছিল সহজ বল, সুইপ করলে স্কোয়ার লেগ দিয়ে সীমানা পার হবে। করেওছিল সুইপ। কিন্তু ভূতুড়ে বলটা হঠাৎ পিচ থেকে ওপরে না উঠে মাথা নীচু করে মিডলস্ট্যাম্পের দিকে সরে এল। আর তখন স্ট্যাম্প আড়াল করে রয়েছে তার পা। পায়ে বলটা লাগতেই চারদিকে আনন্দে লাফিয়ে ওঠে বিপক্ষের খেলোয়াড়—হাও! আম্পায়ার বিনা দ্বিধায় আঙুল তোলে। ছেলেটি আম্পায়ারের দিকে তাকায়ওনি। সে জানত আউট হয়ে গেছে সে। যখন প্যাভিলিয়নের দিকে ফিরে আসছিল তখন কেউ হা-হুতাশ করেনি, হাততালিও দেয়নি। শুধু একটা চ্যাংড়া ছেলে একদলা চুইংগাম ছুড়ে মেরেছিল তাকে, সেটা এসে তার বুকে আটকে যায়।

ড্রেসিংরুমে দু-একজন তাকে স্তোক দিয়েছিল। ছেলেটি কিছুই শুনতে পায়নি। ড্রেসিংরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে তরুণী জ্যানেট কাঁদছিল। ছেলেটির বাবা একবার ঘরে এসে তার পিঠে হাত রেখে নীরবে বসে থেকে গেল কিছুক্ষণ। গভীর রাতে হোটেল থেকে চুপিচুপি চলে এসেছে ছেলেটি, মেলবোর্নের অন্ধকার ক্রিকেট মাঠে বসে আছে।

আকাশে একটা তারা খসল।

সিগারেট শেষ হয়ে গেল।

এই মাঠে কাল তারা অবশ্যই হেরে যাবে। হাতে মোট দুটো উইকেট আছে, তুলতেই হবে আরও দুশো রান, ছেলেটির ওপর নির্ভর ছিল দলের। সে পারেনি।

ছেলেটা দেখল, অন্ধকার স্টেডিয়ামে লক্ষ-লক্ষ ভূত বসে তাকে দেখছে আর খুব হাসছে। তারা তাদের দীর্ঘ হাত নেড়ে তাকে বাহবা দিচ্ছে।

ছেলেটা মাথা নীচু করে বসে রইল। চোখে জলের ধারা। মনে হল, তার আজকের দুঃখ আর কোনওদিনই ঘুচবে না। এইখানেই তার জীবন শেষ হয়ে গেল।

*

উড়োজাহাজ বম্বেতে নামল। ইভান দেখল, এখনও সমুদ্রের ওপর অন্ধকার আকাশে বুঝি সূর্যের খুব ক্ষীণ একটা রেশ রয়ে গেছে। কিংবা মনের ভুল।

এখানে কয়েকঘণ্টা বিশ্রাম। ইভান প্লেন থেকে নামতে না নামতেই প্রোটোকল শুরু হয়ে যায়। লোকজন ঘিরে ধরে তাকে। অনবরত ক্যামেরার ফ্ল্যাশে চমকাচ্ছে। সিকিউরিটি দু-পাশ থেকে তাকে চেপে ধরে। অনবরত তাকে শেকহ্যান্ড করতে হয়। অনেক লোকের সঙ্গে। যান্ত্রিকভাবে পরিচিত হতে থাকে সে।

ভি আই পি লাউঞ্জে সাংবাদিকরা ঘিরে ধরে তাকে। অনর্গল ইজরায়েল, আরব দেশ, মধ্যপ্রাচ্য, দূরপ্রাচ্য, চিন আর ইউরোপ সম্পর্কিত প্রশ্ন করা হতে থাকে তাকে।

ইভান রাষ্ট্রসঙ্রে প্রতিনিধি, বিশ্বশান্তির অন্যতম দূত। সব উত্তরই তার জানা আছে। সে যন্ত্রের মতো উত্তর দিতে থাকে। তার দক্ষ সেক্রেটারি পাশেই বশংবদ বসে থেকে অবিরল তাকে নানা পরিসংখ্যান বলে দিতে থাকে।

নানা কথার মধ্যে ইভান কেবল বলে—আমরা শান্তি চাই, আমরা ক্ষুধার নিবৃত্তি চাই, আমরা চাই অভাবমোচন, স্বাধীনতা। আমরা মানুষকে সবরকম অভাব থেকে মুক্তি দিতে বদ্ধপরিকর।

বলতে-বলতে ক্লান্ত ইভান টের পায়, সে কতবার জীবনে এইসব কথা বলছে। আজও বলছে। কিন্তু আজ তার ভিতরটা যেন এক জনশূন্য হলঘরের মতো ফাঁকা। সে যখন মুখে ‘শান্তি, শান্তি’ বলছে তখন তার ভিতরের হলঘর থেকে প্রতিধ্বনি বলছে—’মৃত্যু, মৃত্যু।’

কেন বলছে? ইভান খুবই অবসাদ বোধ করে। তার কোনও অভাব নেই, ব্যক্তিগত কিছুই আর চাওয়ার নেই, সেই জন্যই কি অবসাদ? ইভান মুখে চমৎকার সব উত্তর দিয়ে যাচ্ছে আর তখন তার মন তাকে বলছে বাস্টার্ড, ইউ বাস্টার্ড, ইউ হ্যাভ ডান এনাফ টু মেক হেল। নাউ ডাই। প্লিজ।

ইভান ভাবে, সে এবার একদিন কি দু-দিন উপোস করে থেকে দেখবে ক্ষুধা কাকে বলে। সে সাতদিন মেয়েমানুষের শরীর ছোঁবে না। সে একদিন দূর কোনও দরিদ্র দেশের গ্রামের পথে পথে হেঁটে বেড়াবে যেমন হাঁটত মিশনারিরা। সেই প্লেন থেকে দেখা ধূসর মাঠটায় সে কোনওদিন যেতে পারবে কি?

.

শেষবেলায় ওয়াক তুলে সেই যে বমি করছিল বউটি তারপরই তার গর্ভর্যন্ত্রণা শুরু হয়েছিল।

সূর্য ডুবে গেল নিঝুম হিম নেমে এল চারধারে। এতক্ষণ তারা দীর্ঘ পথ হেঁটেছে রোদে, তাই শীত গায়ে লাগেনি। কিন্তু এখন বউটিকে ঘিরে যখন তারা উদাস মাঠের মাঝখানে বসে আছে, তখন গভীর শীতে সবাই ঠকঠক করে কাঁপে। পেটে প্রকাণ্ড অন্ধকার খিদে, দেহে তুচ্ছ আবরণ। বউটা গর্ভর্যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে।

মাঠ পেরিয়ে একটা পাগল লোক এল এ সময়ে। তাদের কাছে এসে বলল—বাবারা, সারাদিন খাওয়া জোটে না আমার। তোমরা একবার হরিবোল-হরিবোল বলল, আমার পেট পুরে যাবে। এই ভিক্ষা চাই।

অবোধ লোকগুলি তার দিকে চেয়ে থাকে কেবল। তারা ভাষা ভুলে গেছে। কথা আসে না মুখে।

শুধু তাদের দলের সবচেয়ে প্রবীণ লোকটি বলে—আমরা বড় কাঙাল। কিছু নাই। হরির নাম

নিতে পারি, আর কিছু চেয়ো না।

—তাই বলো বাবা। তারপর চলো, দুনিয়াটা দখল করি।

সবাই হাসল। দুঃখে, শোকে।

*

মেলবোর্নের ছোকরা ক্রিকেট খেলোয়াড়টি ঘাসের ওপর শুয়েছিল। জ্যানেট তাকে আর ভালোবাসবে কি? টেস্ট খেলতে আর কখনও তাকে ডাকা হবে কি? সে নিজেও কি আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবে?

শুয়ে থেকে সে টের পায় অন্ধকার স্টেডিয়াম থেকে ভূতেরা নেমে আসছে। তাদের দীর্ঘ কালো শরীর বাতাসে দোল খায়। বাতাসে লতিয়ে লতিয়ে তারা চলে। অন্ধকারে হাজার-হাজার ভূত এসে তাকে ঘিরে দাঁড়াল। তারা তার কানে-কানে বলল—চলো, খেলবে।

চোখের জল মুছে ছেলেটি ওঠে। ভূতেরা তাকে প্যাড পরায়, গ্লাভস পরায়, হাতে ব্যাট ধরিয়ে দেয়। তারপর মহানন্দে হাততালি দেয় তারা।

ছেলেটি পিচের ওপর এসে স্ট্যানস নেয়। অন্ধকারে দেখা যায় আম্পায়ারের বদলে কেবল টুপি আর সাদা কোট দাঁড়িয়ে আছে। একটা ভূত এশিয়ার দিকে হাত বাড়িয়ে একটা নরমুণ্ড ছিঁড়ে আনে, তারপর দৌড়ে এসে বল করার ভঙ্গিতে ছুড়ে দেয় তার দিকে। ছেলেটা চমৎকার একটা কাট মারে, মুণ্ডুটা ছিটকে যায় মহাকাশে। মহারোল ওঠে চারধারে, হর্ষধ্বনি শোনা যায়। আবার আফ্রিকার দিকে হাত বাড়িয়ে একটা নরমুণ্ড ছিঁড়ে নিয়ে আর একজন দৌড়ে আসে।

এই রকমভাবে খেলা চলে আর চলে। এ খেলা আর শেষ হতে চায় না। যেন অনন্তকাল ধরে এই শেষহীন খেলা চলবেই। সে কোনওদিন আউট হবে না।

ছেলেটির আর দুঃখ থাকে না।

.

অনেক রাতে একটা গোয়ালঘরের মেঝের খড়ের ওপর গর্ভবতী বউটি এক নির্জীব শিশু ছেলেকে প্রসব করছে। জন্মের পর ছেলেরা কাঁদে, এ শিশুটিও কাঁদল। কিন্তু উপোসী মার শুষ্ক গর্ভ থেকে সে সামান্যই জীবনীশক্তি আনতে পেরেছে, তাই তার অতিক্ষীণ কান্নার আওয়াজ তার মাও শুনতে পেল না।

সে মুমূর্ষ কণ্ঠে জিগ্যেস করে—ও দিদি, বেঁচে আছে তো!

.

বাইরে বিপুল অন্ধকার। পুরুষেরা বাইরে বসে আছে হাঁ করে। আজ তাদের রেলগাড়ি করে শহরে যাওয়া হল না। কবে হবে কে জানে! আর একটা পেট বাড়ল।

অনেকদিন আগে এরকমই মাঠের মধ্যে গোয়ালঘরে, শীত-রাতে কে যেন জন্মেছিলেন, হরিবোল বুড়ো শুনেছে। তিনি কোনও সন্ত পুরুষ, ঈশ্বরের সন্তান।

আকাশে একটা তারা খসল। হরিবোল বুড়ো আস্তে-আস্তে গোয়ালঘর প্রদক্ষিণ করতে থাকে। পায়ের নীচে ঘাস, আশেপাশে গাছগাছালির ডালপালা গায়ে লাগে। হরিবোল বুড়ো গাছগাছালি আর ঘাসদের উদ্দেশ করে বার বার বলে—আহা, লাগল বাবা? ব্যথা পেলে? ঘুম ভেঙে গেল বাবারা সব। একবার হরিবোল হরিবোল হরিবোল বলল সব, কাঙালের খোকাটার পেট ভরে যাক। খোকাটা একটু কাঁদুক।

             

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>