‘দি র‍্যালে সাইকেল’

গল্পকার গল্প লেখেন। শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে বয়ান করে যান আখ্যান। কল্পনার আখ্যান। জীবনের আখ্যান। গল্পকার নিজের একান্ত গল্প বা কল্পনাকে সামগ্রিকতার ছাঁচে ফেলে করে তোলেন নৈব্যর্ক্তিক। তা হয়ে ওঠে সকলের। আর এভাবেই লেখকের ভাবনা বা দর্শন পাঠকের সাথে গড়ে তোলে নিবিড় সম্পর্ক। রচিত হয় লেখক-পাঠকের সুদৃঢ় যোগাযোগ। যেখানে লেখকের পাশাপাশি পাঠকও হয়ে ওঠে সৃষ্টিশীল।

 

কুলদা রায় এমনই একজন লেখক যিনি তাঁর গল্প দিয়ে গড়ে তোলেন এক যাদুময় জগত। যে জগতে প্রজ্ঞা, বোধ আর দর্শন নিয়ে পাঠকও সমভাবে অংশগ্রহণ করে। বা বলা যায় তিনি পাঠককে বাধ্য করেন সে জগতের অংশীদার হতে। পাঠক হিসেবে কুলদা রায়ের গল্পের সেই যাদুময় জগতের সন্ধান আমিও পেয়েছি। তাঁর স্বতন্ত্র অন্তঃদর্শন ও সুক্ষ্ম অনুভূতির সাথে গড়ে তুলেছি এক নির্বাক যোগাযোগ।

 

খুব সম্প্রতি আমি পাঠ করেছি তাঁর গল্প ‘ দি র‍্যালে সাইকেল’। কুলদা রায়ের অনান্য গল্প পাঠের অনুভূতির মতো এটাও আমার মুগ্ধপাঠ। ‘দি র‍্যালে সাইকেল’ এমনই একটি গল্প যা বলার শৈলীতেই হয়ে ওঠেছে ইতিহাসের বিকল্প পাঠ। কল্পনার সংমিশ্রণে তা একই সঙ্গে নির্ভুল আখ্যান। জীবনবোধের তীক্ষ্ম উপস্থিতি গল্পটাকে করে দেয় সামগ্রিক। গল্পে গল্পে পাঠক পরিক্রম করে ইতিহাসের পথ। আর অন্য যে কোনো লেখক খুঁজে পাবে নিজের গল্পের অনুষঙ্গ। নতুন গল্পের সূত্র।

 

গল্পটি আবর্তিত হয়েছে একটি সাইকেল নিয়ে। র‍্যালে সাইকেল। গল্পে সাইকেলটির আবির্ভাব বেশ নাটকীয়। তিন মিনিটের একটি প্রবল ঘূর্ণিঝড় মাটির তলা থেকে তুলে আনলো একটি ভাঙ্গা সাইকেল। আর তার সাথে সাথে উঠে এলো রহস্য আর ইতিহাসের একটি পাতা।

 

মাটির তলা থেকে উঠে আসা জঙ ধরা সে সাইকেলের আপাত কোনো বিশেষত্ব নেই। তা শুধুই এক লোহা লক্কড়ের কঙ্কাল। তবে এই সাইকেলকে ঘিরেই লেখক আঁকতে শুরু করলেন একটি বাড়ি, একটি সমাজ সর্বোপরি একটি সময়ের ছবি। গল্পকার কুলদা রায়ের মুন্সিয়ানা এখানেই। তিনি খুব সচেতন ভাবে গল্পের একটি মৌলিক আবহ সৃষ্টি করেন। পাঠক মোহগ্রস্তের মতো এগিয়ে চলে গল্পের বাঁকে বাঁকে তাঁর সাথে।

 

এই র‍্যালে সাইকেলে আরোহণ করে পাঠক পৌছে যায় দেশ বিভাগের প্রাক্কালে, কলকাতায়। যেখানে আয়েনুদ্দিন মুন্সি, কাননবালা, তুফান মেল গান আর কম্যুনিয়াল রায়ট হাত ধরাধরি করে এসে দাঁড়ায় পাঠকের সামনে। সেই রায়ট কী প্রভাব রেখেছে বাঙালী জীবন ও সমাজে তা বোঝাতেই গল্পকার বলেছেন,’ আয়েনুদ্দিন মুন্সি এলেন বটে। কিন্তু তিনি আর স্বাভাবিক ছিলেন না। লোকজনকে এড়িয়ে চলতেন। একা একা ঘুরে বেড়াতেন আছন্নের মতো।’ সেই রায়ট বা দেশভাগ সত্যিই আমাদের প্রত্যেককে একা করে দিয়েছে।

 

আবার এই র‍্যালে সাইকেলই পাঠককে ফিরিয়ে আনে শহরের প্রবীণ সাংবাদিক মোজাম্মেল হক মুন্নার কাছে। যিনি সাহিত্য আর সংবাদ পরিবেশনের মধ্যে পার্থক্য না করতে পেরে বেশ নাজেহাল অবস্থায় আছেন। গল্পকার কুলদা রায় এখানে খুব সুক্ষ্মভাবে সাহিত্যকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। এরপর র‍্যালে সাইকেল গল্পে এগিয়ে চলেন সাংবাদিক মোজাম্মেল হক মুন্না। মাটির তলা থেকে অত্যাশ্চর্য এই সাইকেলের উত্থান রহস্য উদঘাটনের সব দায়িত্ব লেখক কৌশলে বর্তে দেন এই প্রবীণ সাহিত্যিক সাংবাদিকের উপর।

 

কঙ্কালসার এই সাইকেলে জঙের  তলায় লুকিয়ে থাকা ‘Postal Service Of India, 946′ গল্পটার বাঁক ঘুরায়। এই শব্দগুলোকে পুঁজি করেই গল্পকার কুলদা রায় হাজির করেন বৃটিশ ভারতীয় সমাজ ও রাজনীতিকে। সে সময়ের সিডিউল কাস্ট রাজনীতি, যোগেন মন্ডল, মতুয়া সমাজ, বিভাজিত সমাজ,ডঃ আম্বেদ কর এক এক করে পাঠকের সামনে আসে গল্পের পরত পেরিয়ে। এখানে গল্পকার বয়ান করছেন ইতিহাস কিন্তু তা কোনভাবেই গল্পকে ব্যাহত করে নয়। কুলদা রায়ের আখ্যান ঠিক এ কারণেই এত শক্তিশালী।

 

তবে র‍্যালে সাইকেলটি এখানেই থামে না। ইতিহাসের কোঠর থেকে এবার বের করে আনে একটি নির্মল মানবিক সম্পর্ক। সে সময়ের প্রেক্ষাপটে একজন হিন্দু বিধবার করুণ আখ্যান গল্পটিকে নিয়ে যায় অন্তের দিকে। সাইকেলের মৃদু বেলের শব্দও কারো কারো মনে সুর হয়ে ঝরে। আর সেসব সুর বিধবা সরলাবালারা গুনগুনিয়ে চলে আমৃত্যূ। রতন মোল্লারা নিখোঁজ হয়ে যায় সমাজ ও সময়ের নিয়মে। হারিয়ে গিয়েও তারা প্রাসঙ্গিক হয়ে রয় একটি সাইকেলের বেল হয়ে।

 

কুলদা রায়ের গল্প হয়ে ওঠে সমাজের সুক্ষ্ম প্রতিচ্ছবি,  সময়ের সুচারু বর্ণন আর ইতিহাসের নির্ভুল কাঠামো। গল্পের যাদুময় জগতেও তিনি বলে যান রূঢ় সমাজের কথা। তীব্র সত্যের তিক্ততার কথা। আর আদি মানবিক সম্পর্কের কথা। তাই তাঁর গল্পগুলো হয়ে ওঠে জীবনের গল্প।

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত