দাবা কেন খেলবো

।। আ রি ফু ল ই স লা ম রে জা।।

মজার খেলা, চিন্তা শক্তির খেলা, বুদ্ধির খেলা হচ্ছে দাবা । দুজন মাত্র ব্যাক্তি স্বল্প স্থানে রাজা – মন্ত্রী, ঘোড়া , হাতি ও সৈন্য নিয়ে বুদ্ধি ও মেধার সাহায্যে জীবনের এক রণক্ষেত্র তৈরী করে ফেলেন। এ কারণেই পৃথিবীব্যাপী দাবা বিপুলভাবে জনপ্রিয়। যাহোক আমরা আজকে দাবা সম্পর্কে জানবো এবং আর সেই সাথে দাবা আমরা কেন খেলবো এ সম্পর্কেও জানবো…..

১.দাবার জন্মকথা
আধুনিক যুগে দাবার যে উন্নয়ন ঘটেছে তার পিছনে রয়েছে বিশাল ইতিহাস। দাবা খেলার উৎপত্তি নিয়ে এশিয়া, ইউরোপসহ বিভিন্ন জাতি দাবিদার হলেও সবাই একমত নয় ।

দাবার সন্ধান পাওয়া যায় প্রাচীন মিশরে খ্রি: পূর্ব ৩০০০ অব্দে।জন্মের সূচনালগ্নে এই খেলার নাম দাবা ছিল না। এটা সেই সময় এ ভারত বর্ষে চতুরঙ্গ নামে পরিচিত ছিল। চতু’ মানে ‘চার’ এবং ‘অঙ্গ’ মানে ‘অংশ’ । তখন দাবা খেলায় রাজা – মন্ত্রী , হাতি ও সৈন্য এই চারটি অংশ ছিল। আর এ কারণেই এর নাম ছিল চতুরঙ্গ। সে সময় ভারতের সাথে পারস্য,স্পেন সহ বেশ কতগুলো দেশের সাথে বানিজ্যিক অনেক ভালো সম্পর্ক ছিল । পারস্যের বণিকেরা খেলাটি দেখে মুগ্ধ হয়েছিল এবং তাদের কাছে খেলাটি বেশ ভালো লেগে যায়। পরে পারস্যবাসীরা ভারত থেকে চতুরঙ্গ নামে খেলাটি তাদের দেশে নিয়ে এর উন্নয়ন সাধন করেন।


সেখানে চতুরঙ্গ খেলাটি পরিচিতি পায় শতরঞ্জ বা পাশা নামে। অনেকে আবার খেলাটির নাম দেয় শাহ মাত বা রাজার মৃত্যু। সম্ভবত শাহমাত শব্দটি থেকেই দাবায় চেক – মেট কথাটি এসেছে। ৬০০ সালের দিকের ঘটনা,এ সময় ভারত থেকে খেলাটা চীনযাত্রা করে। চীনারা এর নামকরণ করে জিয়ানকুই । তবে চীনাদের দাবি জিয়ানকুই তাদের নিজেদের উদ্ভাবিত খেলা। শুধু তাই নয়, তাদের দাবি, দাবা খেলা আসলে ভারতে নয় চীনে উদ্ভাবিত হয়েছে বলে মনে করা হয় । দাবা খেলায় বর্গাকৃতি ৮টি রোসারি ও ৮টি কলামে মোট ৬৪টি ঘর বিশিষ্ট একটি বোর্ড থাকে। ‍সারি হিসেবে ১ থেকে ৮ সংখ্যায় নির্ধারিত এবং কলামগুলো ফাইল হিসেবে যা ইংরেজী অক্ষর এ থেকে এইচ পর্যন্ত হয়ে থাকে। দাবা বোর্ড কাগজের, কাঠের, প্লাস্টিকের তৈরী হয়ে থাকে। ৬৪টি বর্গাকৃতি ঘরগুলো দু’ধরণের হয়।

একটি হালকা এবং অন্যটি গাঢ় কিংবা একটি সাদা এবং অন্যটি কালো। সাধারণতঃ ঘরগুলোর সাথে মিল রেখে ঘরগুলোর রং হয়। তবে দু’দলের মন্ত্রী বা কুইনের রং হবে নিজ ঘরের রংয়ে। গুটিগুলো দুই অংশে বিভক্ত। তাহলো সাদা এবং কালো সেট। ঘরগুলোতে প্রতিটি খেলোয়াড়ের একটি করে রাজা , মন্ত্রী , দু’টি করে – নৌকা , ঘোড়া ও গজ এবং ৮টি করে সৈন্য সহ মোট ১৬টি গুটি থাকে।এসব গুটি সাহায্যে রাজাকে চেকমেট দেয়াই হচ্ছে এ খেলার শেষ কাজ।
উপরের লেখা থেকে আমরা দাবা সম্পর্কে প্রথমিক ধারণা পেয়ে গেছি বলে আশা করা যায়। এখন আমরা জানবো আমাদের সেকেন্ড পার্ট -আমরা দাবা কেন খেলবো ও এর উপকারিতা কি।

২. দাবা কেন খেলবো ?

সাইন্স বলে মস্তিষ্ক চাঙ্গা থাকলে , আয়ু বৃদ্ধি পায়। মস্তিষ্ক হল আমাদের কেন্দ্র। আমাদের শরীরের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। আর একারণেই মস্তিস্ক ভালো বা চাঙ্গা থাকলে আমাদের কর্মক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। সেই সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। আর দাবা খেলার মাধ্যমে এই ক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব ।
তাই চিকিৎসকেরা সুস্থ থাকতে প্রতিদিন দাবা খেলার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে দাবা খেলার সময় মস্তিষ্কে বিশেষ কিছু পরিবর্তন হয়ে থাকে যা আমাদের ভালো থাকার জন্য খুবই দরকার । এখন সব বিষয় গুলো আমরা জানবো —

ডেনড্রাইটের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়

আমাদের মস্তিষ্কে লক্ষাধিক নিউরনের মধ্যে সিগনাল আদান প্রদানের কাজটি করে থাকে ডেনড্রাইট । তাই তো ডেনড্রাইটের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে নিউরাল কমিউনিকেশন বা সিগনাল আদান প্রদানেও উন্নতি ঘটে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ব্রেন এর কাজ করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। সেই সাথে বুদ্ধিমত্তা , মনোযোগ এবং স্মৃতিশক্তিরও উন্নতি সাধন হয় ।

মস্তিষ্কের দুই দিকের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়

বেশিরভাগ মানুষের মস্তিষ্কের ডান অথবা বাম, যে কোনও একটা দিক উন্নত। কিন্তু যদি কারো দুটি দিকই উন্নত হয় , সেক্ষেত্রে ওই ব্যাক্তি অন্য সাধারণ মানুষের ভালো করবে এটাই স্বাভাবিক। কেননা সেক্ষেত্রে আপনার মস্তিষ্কের পাওয়ার এতটাই বেড়ে যাবে যে আপনার কাজগুলো সহজে সমাধান করতে পারবেন। যেকোন আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে এখানে দাবার ভূমিকা কি?আপনি বোধ হয় অবগত আছেন যে দাবা একটা গণিতও বিষয় অর্থাৎ যারা গণিতে ভালো তারা দাবা ভালো খেলতে পারেন ।আর দাবা খেলার সময় মস্তিষ্কের দুই সেরিব্রামই ব্যবহৃত হয়।সুতরাং দাবার মাধ্যমে আমাদের জীবনকে আলোকিত করতে পারি।খা গেছে দাবা খেলার সময় মস্তিষ্কে বিশেষ কিছু পরিবর্তন হয়ে থাকে যা আমাদের ভালো থাকার জন্য খুবই দরকার ।

ভুলে যাওয়া রোগ হওয়ার সম্ভাবনা কমে

বর্তমানে ডিমেনশিয়া বা অ্যালঝাইমার্স রোগ বয়স্ক লোকদের মাঝে বেশি পরিলক্ষিত । অনেকে ভাবছেন ডিমেনশিয়া বা অ্যালঝাইমার্স রোগটা আবার কি ? এই রোগটি এমন একটি রোগ যার ফলে একজন মানুষের সবকিছু -(বুদ্ধি ,যুক্তি )ঠিক থাকা শর্তেও নিজের আশেপাশের অনেক সাধারণ বিষয় মনে রাখতে পারেন না। নিউরোনের বাইরে একধরণের আমালয়েড প্লাক জমার কারণে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক ক্রিয়াগুলি ব্যাহত হয়। আর মূলত এজন্যই মানুষের ভুলে যাওয়া রোগ বা ডিমেনশিয়া হয়।

একদল গবেষক ও চিকিৎসকেরা ৪৮৮ জন বয়স্ক মানুষের উপর একটা গবেষণা চালিয়ে দেখেছেন যে যারা নিয়মিত দাবা খেলে তাদের এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। দাবা খেলার ফলে মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহ বৃদ্ধি পায়।আর কারণে প্লাকে আমালয়েড নামক প্রোটিন জমে না এবং সেই সঙ্গে নিউরোনের মধ্যে কানেক্টিভিটি বাড়ে । ব্রেনকে আপনি যত কম কাজ করাবেন, তত কিন্তু সে বিকল হতে শুরু করবে। তাই সময় থাকতে থাকতে মস্তিষ্কের দেখভাল করা শুরু করুন। নিয়মিত দাবা খেলায় সময় দিন।

সিজোফ্রেনিয়া ক্ষেত্রে দাবা

সিজোফ্রেনিয়া একটি জটিল মানসিক রোগ। ডাক্তারেরা বলে সাইকোটিক ইলনেস। এই রোগে রোগীর কোনো অন্তর্দৃষ্টি থাকে না বা বাস্তবতাবোধ থাকে না। সিজোফ্রেনিয়া শব্দটিকে যদি আমরা ভাগ করি, অর্থ দাঁড়াবে স্লিপট মাইন্ড। মানে মনটা ভেঙে গেছে। আসলে সিজোফ্রেনিয়াতে চিন্তা-চেতনা, অনুভূতি, আবেগ এগুলোর ব্যত্যয় হয়। এটি বড় রকমের সাইকিয়াট্রিক ডিজঅর্ডার।১৩ থেকে ২৫ বছর বয়সী ব্যক্তি, যাদের ভেতর মাত্র সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ বেশি দেখা যায়।
ফ্রান্স ভিত্তিক একটা বিখ্যাত নিউরো ইনস্টিটিউট সেন্টার এর চিকিৎসকেরা দেখেছেন সিজোফ্রেনিয়া রোগে আক্রান্ত ব্যাক্তিদের উপর গবেষণা করে একটা প্রতিবেদন দাখিল করেন যে -যাদের নিয়মিত দাবা খেলার অভ্যাস তাদের এ রোগ হওয়ার কোনো পথ নেই বললেই চলে।

সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়

অনেক সময় দেখা যায় , যেসব বাচ্চারা ছোটবেলা থেকেই দাবা খেলে, তারা পড়াশুনাই খুবই ভালো । কারণ দাবা খেলার জন্য মস্তিষ্কের কাজ করার ক্ষমতা স্বেড়ে যায়। এমন বাচ্চারা সহজেই যে কোনও জটিল কাজের সমাধান বের করে দিতে পারে। ফলে স্বাভাবিকভাবই অঙ্ক থেকে বিজ্ঞান, এমনকি জীবন সম্পর্কিত নান ক্ষেত্রেও এরা বাকি বাচ্চাদের থেকে অনেক এগিয়ে যায়। গবেষকদের মতে ক্লাস ২-এর পর পরই যদি বাচ্চাদের চেস ক্লাসে ভর্তি করে দেওয়া যায়, তাহলে আগামী দিনে এসব বাচ্চারাই হবে দেশের সম্পদ ।

আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়

দাবার বোর্ডে আপনি জিতবেন না হারবেন , তা পুরোটাই নির্ভর করবে আপনার বুদ্ধির উপর। তাই তো নিয়মিত এই খেলাটি খেললে একদিকে যেমন বুদ্ধির শান বাড়তে থাকে, তেমনি অন্যদিকে আত্মবিশ্বাসের লেভেলটাও বাড়ে । আসলে ধারালো বুদ্ধি থাকলে যে কোনও বিপদ থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব, আর এই বিষয়টিই মনের ভিতর আত্মবিশ্বাসটা এতটাই বাড়িয়ে যায় যে, কোনও কিছুই আর জীবনের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।

দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে সাহায্য করে

স্ট্রোক, মারাত্মক কোনও অ্যাক্সিডেন্ট অথবা কোনও জটিল রোগ থেকে সেরে ওঠার পর সার্বিকভাবে মস্তিষ্ক এবং শরীরের কর্মক্ষমতা বাড়াতে দাবার কোনও বিকল্প নাই ।

অতীতে মানুষ তার নিজের আনন্দ খোঁজার জন্যই খেলাধুলার আবিষ্কার করেছে। খেলাধুলা যেমন নির্মল আনন্দ দেয় তেমনি জীবনকে উপভোগ্য করে তোলে। শুধু তাই নয় খেলাধুলা ব্যক্তিকে নাম, যশ, খ্যাতি, অর্থ এনে দেয়। মানুষকে বন্ধুত্বপূর্ণ ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে। পারস্পরিক তিক্ততা দূর করে মনে প্রশান্তি এনে দেয়। খেলার মাধ্যমে খেলোয়াড়রা দেশের প্রতিনিধি হয়ে বিশ্বের কাছে নিজের দেশকে উপস্থাপন করে। দেশের জন্য সুনাম ও সম্মান বয়ে নিয়ে আসে। তাই এখন জাতীয় জীবনে খেলাধুলার ভূমিকা অপরিসীম।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত