মুদ্রা ছন্দ সুরে রোগ যাবে দূরে

Reading Time: 2 minutes

আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষ , এমন কি শিক্ষিত মানুষও , নাচ-গানকে নিছক বিনোদনের অঙ্গ বলে মনে করেন। ইদানীং নাচ-গানের চর্চা বেড়ে্ছে। সে সব শিক্ষার নানা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কিন্তু সে সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং ছাত্র-ছাত্রীদের মনেও নাচ-গান বিনোদনের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ  আছে। রোগ নিরাময়ের উপায় হিসেবে নাচ-গানকে ব্যবহার করার ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত যে নেই তা নয়। কিন্তু সংখ্যায় সে দৃষ্টান্ত কম , তার প্রচারও কম, তাই জনমানসে তার প্রতিফলনও কম।

সাম্প্রতিককালের এইরকম ব্যতিক্রমী এক দৃষ্টান্তের কথা উল্লেখ করা যাক। গত ২৭ অক্টোবর ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হন সঙ্গীতা দাস। হাসপাতালে ভর্তি হন ৬ নভেম্বর। পরীক্ষা করে দেখা যায় সংক্রমণ আর রক্তক্ষরণের ফলে মস্তিষ্কের বহু কোষ মরে গেয়েছে। থ্যালামাস সাড়া দিতে পারছে না। সঙ্গীতা গভীর কোমায় চলে গিয়েছেন। কার্ডিয়াক আ্যানাস্থেশিয়ার চিকিৎসক ও শিক্ষক সন্দীপ করের পরামর্শে সঙ্গীতাকে মিউজিক থেরাপি দেওয়া শুরু হয়। বেহালায় বাজানো হয় পণ্ডিত এন রাজনের দরবারি কানাড়ার সুর। একমাস বাদে ৭ ডিসেম্বর কোমা থেকে বেরিয়ে এলেন সঙ্গীতা। চোখ খুললেন। খুলে দেওয়া হল তাঁর  ট্র্যাকিয়োস্টোমির টিউব, খুলে দেওয়া হল রাইলস টিউব।

না, এটা  আজগুবি বা কল্পবিজ্ঞানের গপ্প নয়। বাস্তব ঘটনা। নানা রোগে সঙ্গীত যে কার্যকর ভূমিকা পালন করে সেটা প্রমাণিত সত্য। ইমন রাগ রিউমাটয়েড আথ্রাইটিসে , আহির ভৈরব বদহজম-ত্বকের আ্যলার্জি-উচ্চ রক্তচাপে, টোড়ি কাশি ও মাথাব্যথায়, রামকেলি অর্শ ও কোলাইটিসে, বসন্ত হার্ট-স্নায়ুরোগ-পক্ষাঘাতে, ভৈরবী শ্লেষ্মা-রক্তচাপ-ক্যান্সার-উদ্বেগে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করে।

‘গান তুমি হও বেঁচে থাকার রসদ সবার কাছে।’-সুমনের এই গানে সেই সত্য উচ্চারিত। মানবজীবনে সঙ্গীতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা প্রাচীন শাস্ত্র ও সাহিত্যে স্বীকৃত  হয়েছে। রোগ নিরাময়ে তার ভূমিকার বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান অবশ্য আধুনিককালের ব্যাপার। গত পনেরো বছরে সঙ্গীতের রোগ নিরাময় ক্ষমতা নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হয়েছে। মানুষের স্নায়ুবাহিত হয়ে সুর পৌঁছায় মস্তিকে। দেখা গেছে সমস্যা অনুযায়ী সঠিক সুর মস্তিষ্কে অনুপ্রবিষ্ট করাতে পারলে তা হৃদস্পন্দন, রক্তসঞ্চালন, মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে।

উদ্বেগ ও হতাশা বর্তমান যুগের একটা বড় সমস্যা। সঙ্গীতের সাহায্য উদ্বেগ কি ভাবে কমানো যায় তা নিয়ে প্রচুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন মনোবৈজ্ঞানিক ডেভিড লুইজ হজসন। উদ্বেগের ফলে মানব শরীরে কর্টিলে নামক যে রাসায়নিক পদার্থের উৎপত্তি হয়, সুর সেই অসুরকে দমন করে; মস্তিষ্কে ডোপামিন ও এনডরফিনের ক্ষরণ কমিয়ে দেয়। শুধু উদ্বেগ দূর করা নয়, সুর মানুষের মনের সংকীর্ণতা ও বৃত্তবদ্ধতা কাটিয়ে দিতে পারে।‘ আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে’ দাঁড়াতে সাহায্য করে। ফ্রন্টিয়ার সাইকোলজির পরীক্ষা থাকে তা প্রমাণিত।

স্ট্রোকের ফলে মানুষের কথা বলার শক্তি ও স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়। সেক্ষেত্রে সঙ্গীত যে নিরাময়ের ভূমিকা নিতে পারে সেরকম বক্তব্য অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রেন জার্নাল অফ নিউরোলজিতে প্রকাশিত হয়েছে। শল্যচিকিৎসার পরে তীব্র বেদনায় কষ্ট পায় মানুষ। নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পরীক্ষা থেকে দেখা গেছে এক শিশুর শল্য চিকিৎসার পরে রাইনা ও টেলর সুইফটের সঙ্গীত তার বেদনার অনেকখানি উপশম আনতে পেরেছে। স্মৃতিভ্রষ্টদের স্মৃতির পুনরুজ্জীবনের ক্ষেত্রে সঙ্গীতের ভূমিকা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হয়েছে।

সঙ্গীতের মতো রোগ নিরাময়ে নৃত্যেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। ডান্স থেরাপির কথা না জানলেও রবীন্দ্রনাথের চেতনায় ধরা পড়েছিল এই সত্য। তাই তিনি লিখতে পেরেছিলেন, ‘নৃত্যে তোমার মুক্তির রূপ’ এবং নটরাজের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন, ‘নৃত্যের তালে তালে নটরাজ ঘুচাও সকল বন্ধ হে / সুপ্তি ভাঙাও চিত্তে জাগাও মুক্ত সুরের ছন্দ হে।’

নৃত্যকে রোগ নিরাময়ের কাজে প্রথম ব্যবহার করেন আমেরিকান নর্তকী মারিয়ান চেস। কাজ করলেন সেন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে। গড়ে তুলেছেন আমেরিকান ডান্স থেরাপি আ্যসোসিয়েশন। ক্রমে সে পদ্ধতি আরও সমুন্নত  হয়েছে। এখন বেলজিয়াম, গ্রিস, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ইতালি, স্কটল্যান্ড, কোরিয়া, পেরু, জাপান, স্পেন, চিন প্রভৃতি পৃথিবীর ৪০টি দেশে ডান্স থেরাপি চিকিৎসার অঙ্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

মনে রাখতে হবে পৃথিবীতে মনোরোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে আগামী দুই দশকে মনোরোগ মহামারীর আকার নেবে। অবসাদ ও হতাশার ফলে হাঁপানি, বহুমুত্র, রক্তচাপ, সিৎজফ্রেনিয়া, এলঝাইমার, ক্যান্সার বাড়ছে। অপরাধবোধ, কোন কিছু ভালো না লাগা, কাজকর্মে উৎসাহের অভাব, রাগ, ক্লান্তিবোধ, সন্দেহপ্রবণতা মানসিক অবসাদের লক্ষণ। শরীরে উপর পড়ে মনের প্রভাব। মস্তিষ্কের মন অ‌্ংশটি প্রভাবিত করে শরীরে ইমিউন ব্যবস্থাকে। সুতরাং সুস্থ রাখতে হবে মনকে। আর সে কাজ সাহায্য করবে পারফর্মিং আর্ট – বিশেষ করে সঙ্গীত ও নৃত্য।

.

       

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>