মুদ্রা ছন্দ সুরে রোগ যাবে দূরে

আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষ , এমন কি শিক্ষিত মানুষও , নাচ-গানকে নিছক বিনোদনের অঙ্গ বলে মনে করেন । ইদানীং নাচ-গানের চর্চা বেড়ে্ছে। সে সব শিক্ষার নানা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে । কিন্তু সে সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং ছাত্র-ছাত্রীদের মনেও নাচ-গান বিনোদনের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ  আছে । রোগ নিরাময়ের উপায় হিসেবে নাচ-গানকে ব্যবহার করার ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত যে নেই তা নয় । কিন্তু সংখ্যায় সে দৃষ্টান্ত কম , তার প্রচারও কম , তাই জনমানসে তার প্রতিফলনও কম ।

সাম্প্রতিককালের এইরকম ব্যতিক্রমী এক দৃষ্টান্তের কথা উল্লেখ করা যাক । গত ২৭ অক্টোবর ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হন সঙ্গীতা দাস । হাসপাতালে ভর্তি হন ৬ নভেম্বর । পরীক্ষা করে দেখা যায় সংক্রমণ আর রক্তক্ষরণের ফলে মস্তিষ্কের বহু কোষ মরে গেয়েছে ।থ্যালামাস সাড়া দিতে পারছে না । সঙ্গীতা গভীর কোমায় চলে    গিয়েছেন । কার্ডিয়াক আ্যানাস্থেশিয়ার চিকিৎসক ও শিক্ষক সন্দীপ করের পরামর্শে সঙ্গীতাকে মিউজিক থেরাপি দেওয়া শুরু হয় । বেহালায় বাজানো হয় পণ্ডিত এন রাজনের দরবারি কানাড়ার সুর । একমাস বাদে ৭ ডিসেম্বর কোমা থেকে বেরিয়ে এলেন সঙ্গীতা । চোখ খুললেন । খুলে দেওয়া হল তাঁর  ট্র্যাকিয়োস্টোমির টিউব, খুলে দেওয়া হল রাইলস টিউব ।

না, এটা  আজগুবি বা কল্পবিজ্ঞানের গপ্প নয় । বাস্তব ঘটনা । নানা রোগে সঙ্গীত যে কার্যকর ভূমিকা পালন করে সেটা প্রমাণিত সত্য । ইমন রাগ রিউমাটয়েড আথ্রাইটিসে , আহির ভৈরব বদহজম-ত্বকের আ্যলার্জি-উচ্চ রক্তচাপে , টোড়ি কাশি ও মাথাব্যথায় , রামকেলি অর্শ ও কোলাইটিসে , বসন্ত হার্ট-স্নায়ুরোগ-পক্ষাঘাতে , ভৈরবী শ্লেষ্মা-রক্তচাপ-ক্যান্সার-উদ্বেগে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করে ।

‘গান তুমি হও বেঁচে থাকার রসদ সবার কাছে ।’-সুমনের এই গানে সেই সত্য উচ্চারিত । মানবজীবনে সঙ্গীতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা প্রাচীন শাস্ত্র ও সাহিত্যে স্বীকৃত  হয়েছে । রোগ নিরাময়ে তার ভূমিকার বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান অবশ্য আধুনিককালের ব্যাপার ।গত পনেরো বছরে সঙ্গীতের রোগ নিরাময় ক্ষমতা নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হয়েছে । মানুষের স্নায়ুবাহিত হয়ে সুর পৌঁছায় মস্কিষ্কে । দেখা গেছে সমস্যা অনুযায়ী সঠিক সুর মস্তিষ্কে অনুপ্রবিষ্ট করাতে পারলে তা হৃদস্পন্দন , রক্তসঞ্চালন, মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে ।

উদ্বেগ ও হতাশা বর্তমান যুগের একটা বড় সমস্যা । সঙ্গীতের সাহায্য উদ্বেগ কি ভাবে কমানো যায় তা নিয়ে প্রচুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন মনোবৈজ্ঞানিক ডেভিড লুইজ হজসন । উদ্বেগের ফলে মানব শরীরে কর্টিলে নামক যে রাসায়নিক পদার্থের উৎপত্তি হয় , সুর সেই অসুরকে দমন করে ; মস্তিষ্কে ডোপামিন ও এনডরফিনের ক্ষরণ কমিয়ে দেয় । শুধু উদ্বেগ দূর করা নয়, সুর মানুষের মনের সংকীর্ণতা ও বৃত্তবদ্ধতা কাটিয়ে দিতে পারে ।‘ আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে’ দাঁড়াতে সাহায্য করে । ফ্রন্টিয়ার সাইকোলজির পরীক্ষা থাকে তা প্রমাণিত ।

স্ট্রোকের ফলে মানুষের কথা বলার শক্তি ও স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয় । সেক্ষেত্রে সঙ্গীত যে নিরাময়ের ভূমিকা নিতে পারে সেরকম বক্তব্য অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রেন জার্নাল অফ নিউরোলজিতে প্রকাশিত হয়েছে । শল্যচিকিৎসার পরে তীব্র বেদনায় কষ্ট পায় মানুষ । নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পরীক্ষা থেকে দেখা গেছে এক শিশুর শল্য চিকিৎসার পরে রাইনা ও টেলর সুইফটের সঙ্গীত তার বেদনার অনেকখানি উপশম আনতে পেরেছে । স্মৃতিভ্রষ্টদের স্মৃতির পুনরুজ্জীবনের ক্ষেত্রে সঙ্গীতের ভূমিকা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হয়েছে ।

সঙ্গীতের মতো রোগ নিরাময়ে নৃত্যেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে । ডান্স থেরাপির কথা না জানলেও রবীন্দ্রনাথের চেতনায় ধরা পড়েছিল এই সত্য । তাই তিনি লিখতে পেরেছিলেন, ‘নৃত্যে তোমার মুক্তির রূপ’ এবং নটরাজের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন, ‘নৃত্যের তালে তালে নটরাজ ঘুচাও সকল বন্ধ হে / সুপ্তি ভাঙাও চিত্তে জাগাও মুক্ত সুরের ছন্দ হে ।’

নৃত্যকে রোগ নিরাময়ের কাজে প্রথম ব্যবহার করেন আমেরিকান নর্তকী মারিয়ান চেস । কাজ করলেন সেন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে । গড়ে তুলেছেন আমেরিকান

ডান্স থেরাপি আ্যসোসিয়েশন । ক্রমে সে পদ্ধতি আরও সমুন্নত  হয়েছে । এখন বেলজিয়াম , গ্রিস , আর্জেন্টিনা , জার্মানি , ইতালি , স্কটল্যান্ড , কোরিয়া , পেরু, জাপান , স্পেন , চিন প্রভৃতি পৃথিবীর ৪০টি দেশে ডান্স থেরাপি চিকিৎসার অঙ্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ।

মনে রাখতে হবে পৃথিবীতে মনোরোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে । আশঙ্কা করা হচ্ছে আগামী দুই দশকে মনোরোগ মহামারীর আকার নেবে । অবসাদ ও হতাশার ফলে হাঁপানি , বহুমুত্র , রক্তচাপ ,সিৎজফ্রেনিয়া , এলঝাইমার , ক্যান্সার বাড়ছে । অপরাধবোধ , কোন কিছু ভালো না লাগা , কাজকর্মে উৎসাহের অভাব , রাগ , ক্লান্তিবোধ , সন্দেহপ্রবণতা মানসিক অবসাদের লক্ষণ । শরীরে উপর পড়ে মনের প্রভাব  । মস্তিষ্কের মন অ‌্ংশটি প্রভাবিত করে শরীরে ইমিউন ব্যবস্থাকে । সুতরাং সুস্থ রাখতে হবে মনকে । আর সে কাজ সাহায্য করবে পারফর্মিং আর্ট – বিশেষ করে সঙ্গীত ও নৃত্য ।

( লেখিকা ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক ডান্স কাউন্সিলের সদস্য )

.

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত