| 28 মে 2024
Categories
দুই বাংলার গল্প সংখ্যা

বালিয়াড়ি

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.comনীল নীল নীল…

নীলকে ডাকতে ডাকতে আমি এলোমেলো হাঁটি। কখনো পাহাড়, কখনো সৈকত আর কখনো নরম মাটির আল পেরিয়ে যেতে থাকে আমার পা দুটো। দূর থেকে একটা শিষের বাতাসে ভেসে ভেসে আসে, নী-ই-ল নী-ই-ল নী-ই-ল… সেই বাতাসকাটা শব্দের সাথে মিলিয়ে ফিসফিস করে নীলকে ডাকতে ডাকতে অচেনা সব পথ পেরিয়ে এবার আমি পরিচিত বালিয়াড়িতে থামি। এখানে ঢালু হয়ে নেমে গেছে ঝুরো বালি, এই বালিয়াড়ি আমার আজন্ম প্রিয়, নীলেরও। নীল আর আমি এখানে এসে বসে থাকতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ও খুব ভালোবাসত ঐ নিচের মরা নদীর সোঁতাটুকু। চিলতে নদীটার স্বচ্ছ পানি কী অসম্ভব শান্ত গতিতে বয়ে যায় ওখান দিয়ে।

নেই, কোত্থাও নেই নীল। সেই কবে থেকে ওকে আমি হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছি! একটা একত্রিশ বছরের ঝকঝকে মেয়ে হঠাৎ কোথায় হারিয়ে গেল? ওকে খুঁজতে বাদ রাখিনি কোথাও, তবু ওর দেখা মেলে না। আমি ওর কাছেই প্রশ্ন করি, তোকে আর কোথায় খুঁজব, নীল?

আমার হয়রান লাগে খুব। কত পথ হেঁটেছি আমি? এই বালিয়াড়ি আমার বাড়ির খুব কাছে, হেঁটে এলে সব মিলিয়ে মিনিট দশেকের পথ। তাহলে এত আদাড় বাদাড় হাঁটলাম কোথায় কে জানে! ক্লান্তিতে শরীর ছেড়ে দিচ্ছে। ব্যাকপ্যাকের সাইড পকেট থেকে পানির বোতলটা বের করে অনেকটা পানি গলায় ঢেলে দিই। বাতাস ছেড়েছে হঠাৎ, নদীপাড়ের এই বাতাস কী মিষ্টি! ঠিক নীলের মতো।

মিষ্টি না ছাই, আমি হলাম এক নাখাস্তা মেয়ে, বুঝলি- বলে হি হি করে হাসত নীল।

নাখাস্তা শব্দটার অর্থ আমি জানি না। জানতে চাইলে নীল হেসে কুটিকুটি হতো। তারপর হাসি থামলে খুব গম্ভীর গলায় বলতো- তুই যেদিন একেবারে আমার মতো হবি সেদিন এই কথাটার মানে বুঝবি।

নীল কি জানে না আমি ঠিক ওর মতোই হতে চেয়েছি সব সময়? ওরই মতো- বিতর্কে, আবৃত্তিতে, কথায়, পোশাকে, ভাবনায়, কাজে, সব কিছুতে আমি ঠিক নীলের মতো করেই গড়তে চেয়েছি নিজেকে। তাহলে কেন পারিনি? এ প্রশ্নের উত্তর নেই আমার কাছে। হাজারটা প্রশ্ন বুকে নিয়ে নিচের মরা নদীটার দিকে ঠায় তাকিয়ে থাকি। দিন দিন শুকাতে শুকাতে নদীটা একটা বাঁকা আলের মতো সরু হয়ে আসছে। একেক দিন ঐ চিলতে রেখার পানির দিকে তাকিয়ে নীলের চোখে কান্না চিকচিক করতো। ও ধরা গলায় কত দিন বলেছে- নদীগুলোর দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে রোজ। নদীগুলো শ্বাসকষ্টে মরে যাচ্ছে, জানিস?

তুই টের পাস নীল, ওদের শ্বাসকষ্ট হয়?- কিছুটা ভয় নিয়ে আমি জিজ্ঞেস করতাম ওকে। নীল যে কী সব আজগুবি কথা ভাবত!

অদ্ভুত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে ও বলতো- কেন, তুই পাস না?

না, নীলের মতো আমি নদীদের কষ্ট, গাছেদের কান্না টের পাই না। আমি আমার কষ্টে অস্থির। নয়টা পাঁচটার চাকুরির সাথে সাথে আমার কত চিন্তা আছে। আমার সমাজ আমার সংসারের চিড়েচ্যাপ্টা শিডিউলে ওর মতো গাছ নদী আকাশ নিয়ে ভাববার সময় কোথায়? আর ভাবলেই বুঝি আমি নীলের মতো করে ওদের মন পড়তে পারব!

সাদা আর ছাই রঙা কয়েক টুকরা মেঘ উড়তে উড়তে এ দিকে চলে এসেছে। যদি এবার ভিজিয়ে দেয়? আমি তবু চ্যাপ্টা মেরে বসে থাকি। ধুর! একটা বেলা ইচ্ছেমতো ভিজলে কী হয়? জ্বর? হোক না।

নীল বৃষ্টিতে ভিজত, বন বাদাড় ঘুরত, একলা একা রিকশার হুড ফেলে চক্কর দিতো সারা শহর। আমি তবে কেন পারি না? আমার ওর মতো সাহস নেই বলে? আমি ওর মতো আর সবাইকে থোড়াই কেয়ার করতে পারি না বলে?

কোথায় গেছিস তুই, নীল? তোকে আমার কত্ত দরকার জানিস তো। ফিরে আয় প্লিজ- আমি বিড়বিড় করে ওকে ডাকি। সে ডাক আমার আশেপাশে এক হাতের দূরত্ব ছেড়ে কোথাও যায় না। নীল তাই অনেক দূরের কোনো জায়গা থেকে শুনতে পায় না সেই ডাক।

নীল, কাল খুব ঝগড়া করেছি শাওনের সাথে। অকারণেই খুব গালি দিয়েছিলাম ওকে। এত খারাপ খারাপ কথা আমি বলতে পারি, তাই জানতাম না রে। খুব চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলেছি, গোটা পাড়ার মানুষ শুনতে পেয়েছে বোধহয়। শাওন কত বার আমাকে চুপ করতে বললো, শুনলাম না জানিস! তারপর শুনতে শুনতে একটা সময় শাওন আমাকে চড় মারলো। নীল! জানিস, আমি না কোনোদিন ভাবতেই পারিনি ও আমাকে মারতে পারে। চড়টা সামলাতে পারিনি, টেবিলের ধারে ঠুকে গিয়েছিল কপাল। এখনো ডানপাশটা কেমন ফুলে আছে দ্যাখ…

আমার ডান হাতটা অজান্তেই উঠে যায় কপাল বরাবর। ফোলাটা এখনো আছে বেশ,ব্যথাও। কালকের রাতটা যেন চোখের সামনে ভেসে উঠতে চায়। নীল আর আমি আর রাগে ফুঁসে ফুঁসে ওঠা দুটো ক্ষুধার্ত হায়েনা! আমি তীব্রভাবে মাথা নাড়ি, না, ঐ দুঃসহ সময় আর চাক্ষুষ করতে চাই না কখনো।

তুই কেন হারিয়ে গেলি, নীল? আমি এখন কাকে আমার সব কথা বলবো বল। কে শুনবে? কে সব শুনতে শুনতে আমার চুলে হাত রাখবে বল…

আমার আর্ত জিজ্ঞাসা নদীপাড়ের বাতাসে ভেসে ভেসে বেড়ায়। নীলের কান পর্যন্ত যায় না। আর গেলেই বা, ও বড় নিষ্ঠুর মেয়ে, নাহলে এই ভাবে আমার দুর্দিনে পালিয়ে যায়? আমার এই দুর্দিন কবে শেষ হবে কে জানে। আদৌ হবে কোনোদিন? শাওনের সাথে সুখের দিনগুলো ফিরে আসবে আর? কেবল দুজনে মিলে আমরা আবার সুখী হতে পারব কোনোদিন? আমার পেটের ভেতর একটা ছোট্ট চঞ্চল প্রাণ জন্ম নিলো না বলে দুজনের ভেতর দিন দিন বাড়তে থাকা হতাশাটা আমরা ভুলতে পারব আবার? কালকের রাতটা? লোম ফুলে ফুলে ওঠা রাগী হায়েনা দুটোর কথা ভুলতে পারব আবার?

এলোমেলো এসব প্রশ্নের একটারও উত্তর জানি না আমি। নীল থাকলে ঠিক বলে দিত। সুনীল বা বুদ্ধদেবের কবিতা আওড়াতে আওড়াতে ও ঠিক আমার সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দিতো। কবিতা বড্ড ভালোবাসত নীল। আরো কত কী ভালোবাসত! ফুল, সমুদ্র, মেঘ, গণিত, ঝড় সিগারেট! এক আকাশ ভালোবাসার ক্ষমতা নিয়ে কোথায় লুকিয়ে গেলো নীল? আমি বহু দূরের সেই নীলকে জিজ্ঞেস করি- আচ্ছা নীল, শাওন আর আমি কবে থেকে নিজেদের ওপর তিতিবিরক্ত হয়ে গেলাম বলতে পারিস?

মেঘদল উড়ে উড়ে চলে যাচ্ছে আরো দক্ষিণে। ওরা কি ঘুরতে ঘুরতে সাগরপারে যাবে? নাকি নীল জল দিগন্ত ছাড়িয়ে আরো বহু দূর? ওরা কি আরেকটু পরেই ভারি হয়ে বৃষ্টি হয়ে ঝরবে? আমি তন্ময় হয়ে দেখতে থাকি ছোট হয়ে আসা সেই মেঘের ভেলার চলে যাওয়া। নীলও ওভাবেই ঘুরতে ঘুরতে ঘুরতে ঘুরতে দূরে চলে গেছে কি? নীল, মেঘ আর বৃষ্টি মিলে মিশে হঠাৎ আমার কবিতা মনে পড়ে, প্রিয় জয় গোস্বামী, নীল খুব ভালো আবৃত্তি করত এটা-

“আমি যখন ছোট ছিলাম
খেলতে যেতাম মেঘের দলে
একদিন এক মেঘবালিকা
প্রশ্ন করলো কৌতূহলে-
এই ছেলেটা, নাম কী রে তোর?
আমি বললাম, ফুসমন্তর…”

কতদিন বাদে আমার কবিতা মনে পড়ল! মেঘবালিকার জন্য এক পৃথিবী লিখতে বসা ছেলেটার কথা ভাবতে ভাবতে আমার মনে পড়ে, নীল চলে যাবার দিন থেকে আমি এক লাইন কবিতা মনে করতে পারিনি!

সন্ধ্যার ছায়া নেমে গেছে। মরা নদীর স্রোতটুকু অন্ধকারে মিশে যাচ্ছে একটু একটু করে, আরেকটু পর তাকে আলাদা করে খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমার উঠতে হবে। উঠতেই হবে এখন। আমার সংসার আছে, কাল ভোরের আলো ফুটলেই নয়টা পাঁচটার চাকুরি আছে, শাওন আছে, একটা নরম তুলতুলে বাচ্চার জন্য হতাশায় ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাওয়া ভালোবাসার দাবিদাওয়া আছে। আমার কত কিছু আছে, চাইলেই নীলের মতো টুক করে পালিয়ে যেতে পারব না আমি।

তবু আমার আবারও চ্যাপ্টা হয়ে বসে থাকতে ইচ্ছে করে। কেবল নীলের কথা ভাবতে ইচ্ছে করে। এই নির্জন বালিয়াড়িতে আমার গলা ছেড়ে নীলের জন্য কাঁদতে ইচ্ছে করে।

আমি জানতাম তোমাকে এখানেই পাব- শাওনের গলার স্বরে আমি চমকে উঠি। কখন এলো ও? শাওন আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ওর চোখের দিকে আমি তাকাই না, তার বদলে হায়েনার কুতকুতে চোখের কথা মনে পড়ে। পানির বোতলটা ব্যাগের সাইড পকেটে রেখে আমি উঠতে যাই।

উঠো না, আরেকটু বসি এখানে- শাওনের কথায় আমি আবার বসে পড়ি। ও হঠাৎ এখানে এসে পড়ায় আমার কেমন লাগছে আমি বুঝতে পারি না। তবে সন্ধ্যার ঠান্ডা বাতাসটা এখন আর মন্দ লাগছে না।
এই বালিয়াড়ি তোমার খুব প্রিয় জায়গা, নীলা। তোমাকে কোথাও খুঁজে না পেয়ে তাই এখানেই এলাম। তোমার মনে আছে, এখানে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছি এক সময়। তুমি আবৃত্তি করতে, আমি শুনতাম। মনে আছে, নীলা?

আমি শাওনের কথা শুনি কী শুনি না, শুনতে ইচ্ছে করে না। তার বদলে আমার দুচোখ জুড়ে হঠাৎ এক ঝিম ধরা দুপুর নামে। সেই ভোরে দারুণ ছটফটে এক মেয়ে উচ্ছল কণ্ঠে কবিতা পড়ে-

“আমাকে বেসেছ ভালো, কতটুকু চিনেছ আমাকে
আমার ভেতর এক দুঃখবেলা মুখ লুকিয়ে থাকে…”

তারপর এই সন্ধ্যা কিংবা সেই দুপুর, আমি নীলা কিংবা হারিয়ে যাওয়া নীল সব একাকার হয়ে যেতে থাকে। নীলকে আবার পুরোটা ফিরে পাবার জন্য আমার এক পৃথিবী কান্না পায়। আমি ফিসফিস করে নীলকে ডাকি, ডাকটা অবিকল সেই বাতাসকাটা শিষের মতো শোনায়, নী-ই-ল নী-ই-ল নী-ই-ল। নীলের জন্য আমার পুরো পৃথিবীটা ভেঙেচুরে যেতে থাকে। এই নির্জন বালিয়াড়ির আধো অন্ধকারে সেই ভাঙচুরের সাক্ষী হয়ে থাকে কেবল শাওন নামের এক পঁয়ত্রিশের যুবক।

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত