ইরাবতী,ইরাবতী.কম,বিতস্তা ঘোষাল,irabotee.com,bitasta ghoshal,copy righted by irabotee.com

দিল্লির ডায়েরি (পর্ব-৮)

Reading Time: 3 minutes

হরিদ্বার তীর্থ ক্ষেত্র হিসেবে প্রখ্যাত হলেও এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অপরূপ।কে কবে প্রথম এই শহরের পত্তন করেন এ বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও ঐতিহাসিকরা অনুমান করেন, পৌডির রাজপুত মন্দাসুর পুত্র ঈশম সিং কানেসুর থেকে এসে এখানে এই শহরের পত্তন করেন।এই বংশের সর্ব শেষ রাজা বেনু।তিনি খুবই ধর্মপরায়ণ ছিলেন।তাঁর আমলের ভবন ও কেল্লার ভঙ্গুর চিহ্ন এখনো দেখা যায় ।তাঁর মৃত্যুর পর মোঘলরা বেশ কয়েক বার এই স্থান আক্রমণ করে ও মন্দির ভাংচুর করেন।তবে আকবর এই স্থানকে যথেষ্ট সমীহ করতেন।বলা হয়,তাঁর সেনাপতি মান সিংহের অস্থি এখানে বিসর্জন দেওয়া হয়েছে । মনে করা হয়, এখানে মৃত মানুষের অস্থি বিসর্জন দিলে তাঁর আত্মার মোক্ষ প্রাপ্তি ঘটে।এই কারণে হরিদ্বারকে মোক্ষ দ্বারও বলা হয় । পৌরাণিক মতে, রাজা শ্বেত ব্রহ্মার উপাসনা করে বর চান, শিব, বিষ্ণু ও ব্রহ্মা যেন এক সঙ্গে এই স্থানে এসে বাস করে স্থানটিকে পবিত্র ও পূণ্য করে করে তোলেন। ব্রহ্মা তাঁর সাধনায় প্রীত হয়ে এই আবেদন মেনে নেন ও এখানে একযোগে এসে বাস করেন।সেই জন্য এই জায়গাটা ব্রহ্মপুরী বলেও পরিচিত। আবার মহাভারতেও এই স্থানের কথা বলা হয়েছে ।পান্ডবরা তপস্যা করার জন্য কৈলাস যাবার উদ্দেশ্যে যাত্রা এখান থেকেই শুরু করেন ।ভীম গোডা নামক স্থানটি আজও তার প্রমাণ স্বরূপ রয়েছে । কথিত আছে , ভীম তার গদা দিয়ে আঘাত করে এখানে কুন্ড তৈরি করেছিলেন ।সেই কুন্ডে গঙ্গার জল আসে । যাহোক বহু মন্দিরের সমারোহ এখানে ।পাহাড়ের বাঁকে কিংবা সমতলে কোনো না কোনো দেব দেবীর অধিষ্ঠান । সবই যে প্রাচীন কালের তা কিন্তু নয়।গতবার যা দেখেছি এবার দেখলাম তার থেকে চতুর্থ গুন বেশি ।কোনো কোনো মন্দিরে সিকিউরিটি গার্ড পর্যন্ত রয়েছে ।প্রতিটি মন্দিরেই এত ডোনেশন বক্স, যদি সব জায়গায় দিতে হয়, আমি নিশ্চিত পকেটের সব টাকা চলে যাবে ।অবশ্যই যদি ওই যে প্রবাদ আছে যে খায় চিনি, তাকে যোগায় চিন্তামনি। এক্ষেত্রেও হয়তো তাই। আমরা অবশ্য সব মন্দির যাই নি এবার ।আসলে মন্দির মসজিদ বা আর যা যা আছে সেগুলোর তুলনায় আমার কাছে প্রকৃতি অনেকবেশি প্রিয়।এর মধ্যেই আমি খুঁজে পাই আমার ঈশ্বরকে।তিনিই তো সব কিছু সৃষ্টির মূল।বিশেষ করে এই পাহাড়, ঘন জঙ্গল আর নদ নদী দিয়ে তিনি যে সৃজনশীল কাজে মগ্ন তাকে দেখার জন্য আমি ইঁট কাঠ পাথরের মন্দিরে যেতে রাজি নই।তার থেকে এই অনন্ত আকাশ, এই চঞ্চলা নদী, ডিভাইডারে হলুদ ফুলের রাশি রাশি সম্ভার আমি দুচোখ ভরে দেখি, চেটে পুটে খাই সেই রূপ রস শব্দ ।প্রতিটি বাঁকে লুকিয়ে থাকে নতুন রহস্য।খাঁজে খাঁজে তার গন্ধের ভান্ডার।কোথাও জেসমিন তো কোথাও সোঁদা, কোথাও অ্যালকোহলের তো কোথাও নাম না জানা ফুলের। যাহোক, তবু তো ধর্মভীরু , তাই পবিত্র গঙ্গায় মাথা ডুবাই, প্রদীপ ভাসাই ।কতটা তাতে পাপে তাপে ভরপুর মনুষ্য জীবন পূন্য হল জানি না, কিন্তু জলের শীতলতা মনকে শান্ত করে দেয় । সমবেত স্বর যখন বলে গঙ্গা মাঈকী জয়, হৃদয়ের গভীর হতে হঠাৎ করেই বেরিয়ে আসে নমামি গঙ্গে, জয় মা গঙ্গে।ঠিক যেমন করে হর কৃষ্ণ নাম উচ্চারিত হয় কোনো লিরিক না জেনেই, আসলে এই সুর গুলোর সৃষ্টিই এমনভাবে যা ধার্মিক অধার্মিক নাস্তিক সকলকেই গলা মেলাতে বাধ্য করে।মন বলে কৃষ্ণ কৃষ্ণ, মন বলে রাধে রাধে. . . হরিদ্বারে ২ টো মন্দির যেতে ভালো লাগে ।মনষা ও চন্ডী মা।তবে এগুলো ঠাকুরের টানে নয়, আমি নিশ্চিত নিজেকে নিয়ে।রোপওয়ে করে শূণ্যে ভেসে যাওয়া , দূর থেকে শহরটাকে দেখা, চূড়ায় উঠে দিগন্ত বিস্তৃত আকাশ, নিচের চলমান নদী , দূরের পাহাড়, জঙ্গল সব মনে হয় স্থির হয়ে আছে ।আগে এই পাহাড়ে হেঁটে উঠতে হত।এখন সহজেই রোপওয়ে চড়ে পৌঁছে যাওয়া । কথিত আছে , এই পাহাড়ের উপরেই মহাশক্তি মহামায়া শুম্ভ অশুম্ভ নামে অসুরদের পরাজিত করেছিলেন ।এখানে যুগ যুগ ধরে সাধকরা তপস্যা করেন, আশ্রয় খুঁজে নেন প্রকৃতির কোলে । সত্যি বলতে কী, যাবার পথটাই কেবল উপলব্ধির।মন্দির প্রাঙ্গণে পৌঁছে সহসা আবিষ্কার করি কত কথা, কত চিৎকার, এতক্ষণ যে শান্তি বিরাজ করছিল, তা যেন সহসা ছিন্ন হয়ে গেল । অবশ্য মন্দির ঘিরেই তো এত মানুষের আনাগোনা, ব্যবসা, রুজি রোজগার । মনষা মন্দির যাবার টিকিট দেওয়ার কাউন্টার থেকেই চন্ডী দেবী মন্দির যাওয়ার কম্বো টিকিট পাওয়া যাচ্ছে ।টাকাটা কম্বো হলে কম পড়ে । আর একই স্টেশন থেকে যাওয়া যায় । তবে এই জার্নিটা রোমাঞ্চকর ।প্রায় ১৫ মিনিট রোপওয়েতে করে শূন্যে ভেসে চলা।ক্রমশ ছোট হয়ে আসে নিচের শহর।কেবল বিন্দুর মত জ্বলজ্বল করে দূরের আলোগুলো।যেন নক্ষত্রের মালা। বহু নিচে গঙ্গার ক্ষীণ ধারা । নীল পর্বতের উপর অবস্থিত এখানে আছেন মা চন্ডী ছাড়াও হনুমানজী ও তাঁর মা অঞ্জনা দেবীর প্রাচীণ মন্দির।তবে তা কতদিনের উপরের দোকানের দোকানদার কিংবা পুরোহিত কেউই বলতে পারল না। হরিদ্বারের আর যে উল্লেখযোগ্য মন্দির আছে সেগুলোর মধ্যে ভালো লাগে একাদশ শতাব্দীর মায়া মন্দির।ত্রিমস্তকী দুর্গা ও অষ্ট ভূজা শিব এখানে অবস্থান করছেন।এছাড়াও রয়েছে গীতাভবন, ভারতমাতা, সপ্ত সরোবর, ও একাধিক আশ্রম।

           

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>