ইরাবতী,ইরাবতী.কম,বিতস্তা ঘোষাল,irabotee.com,bitasta ghoshal,copy righted by irabotee.com

দিল্লির ডায়েরি (পর্ব-৯)

Reading Time: 2 minutes

কথিত আছে হরিদ্বারের পূর্ববর্তী নাম ছিল মায়াপুরী। স্কন্ধ পুরাণে এর উল্লেখ আছে ।এই মায়াপুরী বর্তমানে কনখল। মাইথোলজি অনুসারে এই স্থান ছিল দক্ষ রাজ প্রজাপতির রাজ্য।প্রজাপতি ছিলেন ব্রম্ভার পুত্র ।প্রজাপতি মহাদিদেব শিবকে পছন্দ করতেন না।তিনি নিজ রাজ্যে শিবের পুুজো নিষিদ্ধ করেছিলেন।কিন্তু তাঁর প্রিয় কন্যা সতী শিবকেই স্বামী হিসেবে পছন্দ করে ও তাঁকে বিবাহ করে কৈলাস বাসী হন।দক্ষ নিজের প্রতিপত্তি জাহির করা জন্য বিশাল যজ্ঞের আয়োজন করেন।তাতে সকলে নিমন্ত্রিত হলেও শিবকে তিনি আমন্ত্রণ জানাননি। নারদের কাছে সতী সে সংবাদ পেয়ে জোর করে বাপের বাড়ি যেতে চান।শিব বারণ করলে তিনি নিজের দশরূপ দেখান।এবং শিবকে বাধ্য করেন তাঁকে যেতে দিতে। পিতৃগৃহে উপস্থিত হয়ে সতী দেখেন তাঁর পিতা তাকে অভ্যর্থনা তো দূর কথা, তাঁর সামনেই শিবের সম্পর্কে নানান কূকথা বলছেন।সতী পতি নিন্দা সহ্য করতে না পেরে যজ্ঞ স্থলে আত্মাহুতি দেন।শিব সে সংবাদ শুনে ছুটে এসে দক্ষ রাজের বিনাশ করেন। কনখলে রয়েছে সতীকুন্ড ও যজ্ঞ স্থল।আগে যখন এসেছিলাম, দেখেছিলাম জায়গাটা বেশ ফাঁকা এবং নির্বিঘ্নে বসে ধ্যান করার উপযুক্ত ।সেবার মন শান্ত হয়ে গেছিল। এবার দেখলাম পুরো জায়গাটা জুড়েই একাধিক দেবদেবীর মন্দির ও মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা।কোথায় যেন হারিয়ে গেছে সতীর হাহাকার । মনটা বিষন্ন হয়ে গেল । ঈশ্বরও বিক্রি হয়, তাঁকে ঘিরেই চলে পুরোহিত তন্ত্র ।আর ধর্মের আফিং খেয়ে আমরা ঘুরে মরি এক মন্দির থেকে আরেক মন্দির শান্তির খোঁজে। অথচ নিজেদের মনের মধ্যে যে ঈশ্বর ঘুমিয়ে তাকে জাগাই না, ফিরেও তাকাই না তার দিকে। একই সঙ্গে মনে হল, সতী তো একটা রূপক মাত্র ।যুগ যুগ ধরে কত মেয়ে এভাবেই অগ্নিকুন্ডে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে সতী হচ্ছে , হয়, হবে। আর আমরা মেয়েরা নীরবে চোখের জল ফেলব। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে মন্দিরের চাতালে এসে দাঁড়াই।পবন ভাইয়া বলে, ম্যাডাম, এই যে দেওয়াল দেখছেন ভাঙা, সেটা দক্ষ রাজের বানানো। আমি হাসি ।কারণ ইঁটগুলো পালযুগে ব্যবহৃত ইঁটের মতো। একই সঙ্গে চমকিত হই, এত ভাঙাগড়া নিয়েও অল্প হলেও দাঁড়িয়ে আছে এই প্রাচীর।তার বয়সও নেহাত কম নয়।১০০০ বছর হতে পারে। মনে পড়ে গেল, এক কবি লিখেছেন, হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি . . কবি কী এসেছিলেন এখানে ! কে জানে! থমকে যাওয়া সে ইতিহাস হয়তো রাজপুতদের বানানো।যা মুসলিম আক্রমণে বারবার আক্রান্ত হতে হতেও রয়ে গেছে ।যা বিনষ্ট করা যায় নি, যাবে না।হিন্দু ধর্ম তো সেই হাজার হাজার বছর ধরে টিকে থাকা ধর্মের কথাই বলে।ধর্ম তো কেবল ঈশ্বর নয়, সেতো মানুষের মধ্যেই লুকিয়ে ।মানুষই ধর্ম নিয়ে খেলতে খেলতে মনুষ্যত্ব যে পরম ও একমাত্র সত্য চিরকালীন ধর্ম সেটাই ভুলে যায় । যাহোক, কনখল থেকে হোটেলে ফিরলাম। সনাতন, একটুতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছে, যদিও ওই এই সফরের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল, ওরই উৎসাহ বেশি তবু যেন মনে হচ্ছে শরীর ওর বশে নেই।চিন্তা হচ্ছে ওকে নিয়ে ।তবে আমি জানি , এ বিষয়ে কিছু বললে হেসে উড়িয়ে দেবে , তারপর নিজের সুর আর কথা বসিয়ে বিচ্ছিরি ভাবে গাইবে আলোকের এই ঝরনা ধারায় ভাসিয়ে দাও. . যা যা আছে চার পাশে মুছিয়ে দাও. . . আমি বকলে, চেঁচালে বলবে, রবীন্দ্র সংগীত এর কপি রাইট উঠে গেছে , আমার যে এত প্রতিভা ছিল তুমি তো বুঝতে চাইলে না, তাই আর কি এই নির্জন স্থানে বসে চর্চা করে নিচ্ছি, বলেই হি হি করে হেসে উঠবে। আমি সেই নিষ্পাপ মুখের হাসির দিকে তাকিয়ে ভাবি, আস্ত একটা পাগলই ছিল আমার কপালে ! তারপর মনে মনে বলি, এমন পাগলই ভালো , নইলে আমার মতো বোহেমিয়ান, খামখেয়ালী , পাগলকে কে সামলাতে পারত!

           

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>