দিল্লির ডায়েরি (পর্ব-১)

যেকোনো মানুষ যখন বাড়ি ছেড়ে বেরোয় অন্য কোনো শহরের, রাজ্যের, দেশের পথে তখন তার বুকের মধ্যে নিশ্চয়ই নানান দৃশ্য উঁকি মারে। সেই অজানা শহরের বিভিন্ন ঘ্রাণ, পথ, ইতিহাস, পুরাণ সব তখন চোখের সামনে আনাগোনা করে।এভাবেই মানুষ ভালোবেসে ফেলে এক জায়গায় বাসিন্দা হয়েও অন্য জায়গাকে।এই আমার ক্ষেত্রেই যেমন।আজীবন কলকাতায় বড় হওয়া, কর্ম জীবন ও কলকাতা। তবু দিল্লি শহর আমাকে বারবার টানে।সেখানকার অলি গলি, রাজপথ, পুরোনোর সঙ্গে নতুনের সহবস্থান, ইতিহাস থেকে বর্তমান, ব্যস্ত জনজীবন সব আমার মনতে প্রভাবিত করে।অন্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় কেন জানিনা মনে হয় এই শহরটা আমারও।তাই সুযোগ পেলেই বারবার ছুটে আসি ।দিল্লি ঘুরে দেখার অনেক কিছুই আছে । ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে কুতুবমিনার, রেড ফোর্ট, ইন্ডিয়া গেট, রাষ্ট্রপতি ভবন, জামা মসজিদ, গুরুদুয়ারা, যন্তর মন্তর, রাজ ঘাট, পুরনো কেল্লা (ওল্ড ফোর্ট) লোধি গার্ডেন, হুমায়ূনের সমাধিসৌধ, সফদরজঙ্গ সমাধিসৌধের পাশাপাশি অক্ষরধাম মন্দির, কনৌট প্লেস, লোটাস টেম্পল প্রমুখ। আমি অবশ্য এসব দেখতে দিল্লি আসি না।আমি প্রতিদিন নতুন নতুন ভাবে দেখি এই রাজধানী শহরটাকে।আমার চোখের সামনে যেন ইতিহাস ফিসফিস করে জানান দেয় এর অতীত, খুঁজে বের করি এর নামকরণ কিভাবে হল। দেখি , দিল্লি’ নামটির উৎপত্তি নিয়ে একাধিক পুরাণকথা ও কিংবদন্তি রয়েছে। এগুলির মধ্যে একটি হল এই যে, ‘ধিল্লু’ বা ‘দিলু’ নামে এক রাজা এই স্থানে একটি শহর নির্মাণ করেছিলেন এবং নিজের নামানুসারে এই শহরটির নামকরণ করেছিলেন। আরেকটি কিংবদন্তি অনুসারে, মূল হিন্দি বা প্রাকৃত ‘ঢিলি’ (‘আলগা’) থেকে দিল্লি । তোমররা এই নামটি ব্যবহার করতেন। কারণ, দিল্লির লৌহস্তম্ভ একটি দুর্বল ভিত্তির উপর স্থাপিত হয়েছিল এবং সেই কারণে এটিকে স্থানান্তরিত করতে হয়েছিল। তোমরদের রাজত্বকালে এই অঞ্চলে যে মুদ্রা প্রচলিত হয়েছিল, তার নাম ছিল ‘দেহলিওয়াল’। ভবিষ্যপুরাণ অনুসারে, ইন্দ্রপ্রস্থের রাজা পৃথ্বিরাজ অধুনা পুরানা কিল্লা অঞ্চলে তাঁর রাজ্যের চার বর্ণের ব্যবহারের উপযোগী একটি দূর্গ নির্মাণ করেছিলেন। তিনি সেই দূর্গের একটি সিংহদ্বার নির্মাণের আদেশ দেন এবং পরবর্তীকালে দূর্গটির নাম হয় ‘দেহলি’। কোনো কোনো ইতিহাসবিদ মনে করেন, ‘দিল্লি’ নামটি উর্দু ‘দেহালিজ’ বা ‘দেহালি’ শব্দের অপভ্রংশ। এই দুই শব্দের অর্থ ‘প্রবেশপথ’ বা ‘দরজা’। দিল্লি শহরটি গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলের প্রবেশপথ। এই নামটি তারই প্রতীক। আরেকটি মত অনুসারে, এই শহরের আদি নাম ছিল ‘ধিল্লিকা’। দিল্লি সংলগ্ন অঞ্চলে জনবসতি স্থাপিত হয়েছিল সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের পূর্বে। খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দী থেকে এই অঞ্চল যে নিরবিচ্ছিন্নভাবে একটি জনবসতি অঞ্চল ছিল, তারও প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। মনে করা হয়, এই শহরটিই হিন্দু মহাকাব্য মহাভারতে উল্লিখিত পাণ্ডবদের রাজধানী ইন্দ্রপ্রস্থের স্থান। মহাভারত অনুসারে, এই অঞ্চলটি প্রকৃতপক্ষে ছিল ‘খাণ্ডবপ্রস্থ’ নামে একটি বিরাট বনাঞ্চল। সেই বন পুড়িয়ে ফেলে ইন্দ্রপ্রস্থ শহরটি নির্মিত হয়। এই অঞ্চলের প্রাচীনতম স্থাপত্য ধ্বংসাবশেষটি মৌর্য যুগের (খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দ)। ১৯৬৬ সালে শ্রীনিবাসপুরীর কাছে মৌর্য সম্রাট অশোকের (খ্রিস্টপূর্ব ২৭৩-২৩৫ অব্দ) একটি স্তম্ভলিপি পাওয়া গিয়েছে। দিল্লিতে আটটি প্রধান শহরের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রথম পাঁচটি শহর অধুনা দিল্লির দক্ষিণ অংশে অবস্থিত ছিল। গুর্জর-প্রতিহার রাজা তোমর রাজবংশের অনঙ্গ পাল ৭৩৬ খ্রিস্টাব্দে লাল কোট শহরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১১৮০ খ্রিস্টাব্দে চৌহানরা লাল কোট দখল করে এবং এই শহরের নামকরণ করে কিলা রাই পিথোরা। ১১৯২ সালে মহম্মদ ঘোরি আফগানিস্তান থেকে এসে পৃথ্বিরাজ চৌহানকে পরাজিত করেন। ১২০০ সালের মধ্যে স্থানীয় হিন্দু রাজাদের প্রতিরোধ দুর্বল হতে শুরু করেছিল। পরবর্তী পাঁচশো বছর উত্তর ভারত বিদেশি তুর্কি মুসলমান রাজবংশগুলির শাসনাধীনে ছিল। এরপর কুতুব উদ দিন আইবক কুতুব মিনার ও কাওয়াত-আল-ইসলাম (ইসলামের শক্তি) মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু করেন। এটিই ভারতের প্রাচীনতম মসজিদ যেটি এখনও বিদ্যমান রয়েছে। পরবর্তী তিনশো বছর দিল্লি ছিল একাধিক তুর্কি এবং আফগান লোদি রাজবংশের অধীনে। তাঁরা দিল্লিতে একাধিক দূর্গ ও নগর নির্মাণ করেছিলেন। ১২৯০ সালে মামলুক সুলতানিকে সিংহাসনচ্যুত করে খিলজি রাজবংশ (১২৯০-১৩২০) দিল্লি অধিকার করে। ১৫২৬ সালে বাবর মুঘল রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। মুঘল রাজবংশ তিনশো বছরেরও বেশি সময় দিল্লি শাসন করেছিল। মাঝে ষোলো বছর (১৫৪০-১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ) শের শাহ সুরি ও হিমু দিল্লি শাসন করেছিলেন।১৫৫৩ সালে হিন্দু রাজা হিমু মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের বাহিনীকে আগ্রা ও দিল্লিতে পরাজিত করে দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন। যদিও ১৫৫৬ সালে আকবর পানিপতের দ্বিতীয় যুদ্ধে হিমুর বাহিনীকে পরাজিত করে মুঘল শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। আওরঙ্গজেবের পর মোঘল শাসন ভেঙে পড়ে ও এরপর মারাঠারা দখল নেয়।তারপর ইংরেজ দিল্লি অধিকার করে সিপাহি বিদ্রোহের পর। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হলে দিল্লি হয় ভারতের রাজধানী । এই এতগুলো বছর ধরে নানান রক্তের ঝনঝনানি, তারই মাঝে সুফি সাধকদের সাধনা, তাদের সংগীতের মূর্চ্ছনা, পুরোনো কেল্লার পাশে নতুন প্রশস্থ রাস্তা, হিন্দু, মুসলিম, তুর্কি , ব্রিটিশ সবার ঐতিহ্য মিলেমিশে আমাকে বারবার টেনে আনে এখানে ।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত