ইরাবতী,ইরাবতী.কম,বিতস্তা ঘোষাল,irabotee.com,bitasta ghoshal,copy righted by irabotee.com

দিল্লির ডায়েরি (পর্ব-৭)

Reading Time: 3 minutes

হরিদ্বার, মহামতি ভীষ্মের তর্পণক্ষেত্র, মহাভারতীয় যুগের গঙ্গাদ্বার। পুরাণে উল্লিখিত মায়াপুরী আজকের পবিত্র হিন্দুতীর্থ হরিদ্বার। সপ্তপুরীর অন্যতম এই হরিদ্বারের পূর্বের নাম ছিল কপিলাস্থান। হর ও হরির সহাবস্থান ঘটেছে উত্তরাঞ্চল রাজ্যের সাহারানপুর জেলায় শিবালিক পাহাড়ের পাদদেশে প্রায় ২৯২ মিটার উঁচুতে। আর হরির দ্বার নাম থেকেই আজ হরিদ্বার। আবার সারা গাড়োয়াল হিমালয়ে হর অর্থাৎ মহাদেবের মহিমার অন্ত নেই। সে কারণে হরিদ্বারকে আজ অনেকে হর-কি-দুয়ারও বলেন। পূর্ব দিকে চন্ডী পাহাড়, পশ্চিমে মনসা পাহাড়। এরই মাঝে হরি-কি-পেয়ারিকে কেন্দ্র করে শহরও গড়ে উঠেছে গঙ্গার পশ্চিমে দেবভূমি হরিদ্বার। হরিদ্বারের যে প্রাঙ্গণে হর কি পেয়ারি আমরা এর আগে দুবার সেখানে উঠেছিলাম ।প্রথম বার হোটেল আদিত্য ডিলাক্স, পরেরবার জয়পুরিয়া গেস্ট হাউজ ।হেঁটে হেঁটে চলে যেতাম গঙ্গা আরতী দেখতে।সকালে গাড়ি নিয়ে ঘুরে আসতাম দর্শনীয় স্থান গুলো।ভোরাই একদম হাঁটতে চাইত না বলে সারাক্ষণ কোলো নিয়ে ঘুরতে হত।অবশ্য তখন ওর বয়স মাত্রই ১৯ মাস। তখনো মনষা মন্দিরের রোপওয়ে তৈরি হয় নি।মনে আছে হেঁটে উঠেছিলাম ওকে নিয়েই।পরের বার যখন ওর বয়স সাত তখন রোপওয়ে করেই গেছিলাম ।বয়স তখন অল্প।মনে আছে পাহাড়ি গাড়োয়াল মেয়েদের মতো পোশাক পরে তিনজনেই ছবি তুলেছিলাম। স্টুডিওর ছেলেটি বলেছিল, ম্যাডাম আপনার মেয়ে হিরোইন হবে।আমি তখন হেসে জানতে চেয়েছিলাম কেন? বলেছিল, এ মেয়ের ৬ টা ছবি ৬ মুডে, খুব ফটোজনিক আর এক্সপ্রেসিভ।তুমি আমার কথা মিলিয়ে নিও। সে ভোরাইএর একটি ছবি তার এ্যালবামে রাখার অনুমতি চেয়েছিল ।আমি অনুমতি দিয়ে ছিলাম ।সনাতন হোটেলে এসে একটু ধমক দিয়ে বলেছিল, মনা, মেয়েটার ছবি রাখতে না দিলেই পারতে।নজর লেগে না যায় । আসলে ভোরাই কে তখন এমন পুতুলের মতো দেখতে ছিল যে রাস্তা ঘাটে লোকজন আদর করত।আর বাড়ি ফিরেই সে অসুস্থ হয়ে পড়ত।আমার মেজ বোন খুব রেগে যেত আমার উপর, শুকনো লঙ্কা পুড়িয়ে বলত নজর লেগে গেছে ।ছাড়াতে হবে। আমি এসব সংস্কারে বিশ্বাস না করলেও যদি মেয়ে সুস্থ হয়ে যায় ভেবে মেনে নিতাম। সনাতন সেটাই উল্লেখ করে বলল, ঝুমা তো নেই, কে লঙ্কা পোড়াবে এখন? আমি বলেছিলাম, শোনো একদিন অনেকের কাছেই তোমার মেয়ের ছবি থাকবে।তখন তুমি কী করবে? গঙ্গা মার কাছে এসেছি, সব ঠিক থাকবে । সেবার বদ্রিনাথ থেকে নেমে কেদার যাবার পথে ভোরাই অসুস্থ হয়ে পড়ল।আমরা বাধ্য হলাম, দ্রুত নেমে এসে দিল্লি ফিরতে। যদিও জানি এসবই কুসংস্কার তবু কোথাও যেন, মনে হয়েছিল ছবিটা না রাখতে দিলেই ভালো হতো । যাহোক, সে বার একটা অসাধারণ ঘটনা ঘটেছিল, যা আজও ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয় ।রুদ্র প্রয়াগের কাছে একটা মন্দিরে গঙ্গা আরতির সময় আমাদের ড্রাইভার বললেন, এখানে কেউ তেমন আসেনা, কেবল স্থানীয় লোকেরা আসে পুজো দিতে।তুমি যদি ঈশ্বর মানো তবে মন্দিরে যাও বেটি আর সাব কে নিয়ে ।দেখবে কিভাবে দেবী গঙ্গা আর অলকানন্দা মাঈ দেখা দেবে। সনাতন বলল, গাঁজাখুরি গল্প।কিন্তু আমি ছোট থেকেই নানা অলৌকিক শক্তির পরিচয় পেয়েছি বাবার দৌলতে। তাই এই সুযোগ ছাড়তে চাইলাম না।তিনজনে প্রায় ১০০ টা সিঁড়ি ভেঙে নেমে এলাম । মন্দিরের ফাঁকা উঠোনে গোটা কয়েক স্থানীয় বাসিন্দা ।বহিরাগত বলতে আমরাই ।তখন ৫ টা মতো বাজে। দেখলাম, গঙ্গা আর অলোকনন্দা পাহাড়ি পথ বেয়ে সরু হয়ে বইছে , দুটো নদীর আলাদা রং।জলের মধ্যে পাথর নুড়ি পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে ।আর খুবই নিচু দিয়ে তা বহমান ।কোনো ভাবেই উঠোন ছুঁতে পারার কথা নয়, যদি না বন্যা হয় । একটু পরেই আরতি শুরু হল।সংস্কৃত মন্ত্র উচ্চারণ করছেন দুজন পন্ডিত।তার সঙ্গে চলছে বিশাল প্রদীপ দিয়ে নদী বরণ।মুগ্ধ হয়ে সেদিকে চেয়ে ছিলাম ।হঠাৎ মনে হল জলের স্রোতের আওয়াজ একদম পিছনে ।তাড়াতাড়ি পিছন ফিরে দেখি দুই নদী এক হয়ে সহসা উঁচু হয়ে উঠোন স্পর্শ করেছে ।না সেদিন পূর্ণিমা নয় যে জোয়ার ভাটার খেলা এত তীব্র হবে। আমি ভোরাই কে নিয়ে তাড়াতাড়ি সিঁড়ির উপর উঠে পড়লাম।সনাতন মুগ্ধ হয়ে সেদিকে তাকিয়ে ।পুরোহিত দুজন চিৎকার করে বলল, জয় গঙ্গা মাইকী, জয় অলকনন্দা মাইকী।আমার হাতে প্রদীপ ধরিয়ে দিল, বলল, শিগগিরি তুমি গঙ্গা মাকে আরাধনা করো।তোমাকে মা স্বয়ং দেখা দিয়েছেন।তোমার বেটি পূণ্যবতী। আরতি শেষ হবার পর পুরোহিত বলেছিলেন, এখানে বসেই মহাদেব নারদের কাছে সতীর দেহত্যাগের কথা শুনেছিলেন। পৃথিবীতে সেদিন প্রলয় হয়েছিল । আবার তান্ডব বন্ধ করে দেবাদিদেব ফিরে এসেছিলেন এখানেই ।গঙ্গা মা আর অলকানন্দা মা সেদিন তাকে শান্ত করে ছিল তার পায়ের উপর আছড়ে পড়ে।কোনো পূণ্যবান পূণ্যবতী এলে তারাই একমাত্র এ দৃশ্য দেখতে পায়। তুমি তোমার লক্ষ্মী কে নিয়ে এসেছ।তারা তাই আশির্বাদ করলেন। সেদিন আমি আর সমাতন স্তম্ভিত হয়ে গেছিলাম।আমার মেয়ের মাম তো লিচ্ছবী।বাবা বলেন, স্বয়ং মা লক্ষ্মীর অপর নাম লিচ্ছবী। বাবারই দেওয়া এই নাম। সেদিনের সেই দৃশ্য আমি আজও ভুলতে পারি না।কানে এখনো সেই মন্ত্র বাজে। তারপর কেটে গেছে এতগুলো বছর।ভোরাই এবার বায়না করল একদম সামনে থেকে আরতি দেখবে হর কি পেয়ারি ঘাটে।তিনদিন হল এখানে এসেছি । কালও সনাতন নিজ হাতে আরতি করেছে ।তাও ভোরাই বলল, সে একদম গঙ্গার ঘাটের প্রথম সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে দেখবে।সনাতন গেল না।সে হোটেলে ফিরে গেল। আমাদের এবার হোটেল হর কি পেয়ারি থেকে প্রচুর দূরে ইন্ডাস্ট্রি এরিয়ায় পেন্টাগন মলের হাইফেন গ্রান্ড।প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে। আমরা যখন ঘাটে গেলাম তখন লোকে লোকারণ্য ।সামনে এগিয়ে দেখার সম্ভাবনা নেই ।কিন্তু ভোরাই দুজনে মিলে ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেলাম । বললাম, গঙ্গা মা চাইলে তুমি একদম প্রথম সিঁড়ি তে দাঁড়িয়ে দেখবে, না চাইলে পাবে না। মুখে বললাম বটে, কিন্তু একদম প্রথম সিঁড়ি তো বহু দূর, আরতি দেখাই মনে হল অসম্ভব। অজস্র মানুষের মাথা ঠেলে এগুবো কী করে! অথচ কিভাবে জানি না ওই অবস্থাতেও হঠাৎ আবিষ্কার করলাম নিজেদের কে একদম পুরোহিতের পিছনে প্রথম সিঁড়িতেই। পুরো আরতিটা দেখলাম সেখানে দাঁড়িয়ে ।এবং আজও সেই পুরোনো দিনের মত আশ্চর্য হলাম। কারণ প্রথম প্রদীপের শিখার উত্তাপ দিয়ে পুরোহিত ভোরাইকেই আশির্বাদ করলেন।

         

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>