দিল্লির ডায়েরি (পর্ব-১০)

চলেছি হৃষিকেশ।গাড়োয়াল হিমালয়ে ঢোকার প্রবেশ পথ এই হৃষিকেশ আবার যোগ সাধনার রাজধানী বলেও পরিচিত ।
হরিদ্বার থেকে উত্তরে – হৃষিকেশ গাড়িতে ২৫ কিলোমিটার রাস্তা। এর দক্ষিণ দিকে দেরাদুন। জনসংখ্যার দিক থেকে উত্তরাখন্ডের সপ্তম জনবহুল রাজ্য এই পাহাড়ি শহরটা।
এর আগে প্রথম বার যখন এসেছিলাম গেছিলাম ।পরের বার যাইনি।কারণ সেবার আমাদের গন্তব্য ছিল কেদার বদ্রীধাম। এবার আবার গেলাম ।রাস্তার দু’পাশে সবুজ অথবা গঙ্গা চলেছে এঁকে বেঁকে ।কোথাও সামান্য প্রশস্ত, কোথাও বা নালীর মত।কার্তিক মাসে হর কি পেয়ারি ঘাটে গঙ্গাকে বেঁধে দিয়ে অল্প কিছু জল রাখা হয় ।তাতেই পূণ্যাত্মীরা প্রদীপ ভাসায়। বলে এই সময় নাকি পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে আলো জ্বালিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে হয় ।আবার এই সময় ই গঙ্গা মাকে পরিস্কার করানোর জন্য জল আটকে দেওয়া হয় । আমার বড় কষ্ট লাগে এটা ভেবেই, পরিপূর্ণ একটা নদীর স্রোত বেঁধে দিলে তাঁর আত্মা তো কষ্ট পায় ।নদী যদি মা হন, তবে এই সময় জোর করে তার স্বতস্ফূর্ত বহমানতা বন্ধ করে তাঁকে শোক স্তব্ধ করে দেওয়া ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক।
কিন্তু একই সঙ্গে এটাও প্রযোজ্য যে ময়লা সে বহন করে আনছে প্রতিমুহূর্তে তা পরিষ্কার না করলে মায়ের গা দিয়ে দুর্গন্ধ বেরোবে, পচন ধরবে তার সর্বাঙ্গে।এমনিতেই তো যত সে নিচে নেমেছে তত নিজের শরীরে বহন করে চলেছে সভ্যতার যাবতীয় বিষ।
যাহোক, দুধারের দৃশ্য মুহূর্তে মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে । সেগুলো দেখতে দেখতে ভাবছি, রামায়ণের কেদার খন্ডে বলেছে , রাম লঙ্কাপতি শিবভক্ত রাবনকে বধ করার পর প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য আশ্রয় নিয়েছিলেন এই পাহাড়ের কোলে গঙ্গার ধারে ।একদিকে শিবালিক ও অন্যদিকে মনিপুর পাহাড় প্রাচীণ কাল থেকেই মুনী ঋষিদের সাধনার স্থল বলে পরিগণিত ।সেখানেই এসে শান্তি খুঁজেছিলেন অযোধ্যা পতি রাম।সেখানেই তৈরি হয়েছে রাম ঝুলা।
আরও খানিকটা এগিয়ে লক্ষণ ঝুলা। রামায়ণে উল্লেখ করা হয়েছে, লক্ষণ এখানে বসে ধ্যান করছিলেন যখন, মা গঙ্গা তখন অত্যন্ত জোরে বয়ে এসে তাঁর ধ্যান ভগ্ন করছিলেন।ক্রোধান্বিত হয়ে লক্ষণ বান ছুঁড়ে তার গতি শান্ত ও ছোট করে দেন।এবং তারপর এপার থেকে অন্য পাড়ে যান।সেই স্মৃতি নিয়ে আজও দাঁড়িয়ে লক্ষণ ঝুলা।
তবে জুটের তৈরি ঝুলন্ত ব্রিজ পালটে হয়েছিল লোহার ঝুলন্ত ব্রিজ।সালটা ১৮৮৯।১৯১৪ সালের বন্যায় সেই ব্রিজ ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায় ।তার পর তৈরি হয় বর্তমান ব্রিজটি।কলকাতা নিবাসী এক মাড়োয়ারি ইংরেজদের টাকা দিয়ে এই নতুন ব্রিজ তৈরি করান।
শিবালিক পাহাড় বেয়ে গঙ্গা এখানে নিচে নেমে এসে সমতলের দিকে যাত্রা শুরু করেছে ।নদীর তীরে গড়ে উঠেছে একাধিক প্রাচীন ও আধুনিক মন্দির।যেমন আদি শঙ্করাচার্য দ্বারা নির্মিত শত্রুঘ্ন মন্দির, ভরত মন্দির, লক্ষণ মন্দির সেই প্রাচীন কাল থেকেই পৌরাণিক গল্পের সাক্ষী হয়ে রয়েছে ।
ঝুলন্ত ব্রিজ ধরে এ পাড় থেকে অন্য পাড়ে এলাম।দুধারা ২ টি ৫ তলা বাড়ি ।তার প্রতিটি তলেই মন্দির।সেখানে আগের বার গেছিলাম বলে এবার গেলাম না।চলে এলাম গঙ্গার কাছে।সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলাম পতিতপাবনী কে দর্শন করে ছোঁয়ার জন্য।এখানে গঙ্গার জল পাথর নুড়ি ভাসিয়ে দুর্দার গতিতে নীল রং নিয়ে এগিয়ে চলেছে।যথেষ্ট সে খরস্রোতা ।সিঁড়ির দুপাশে লোহার চেন বাঁধা।সেটা ধরেই গুটিকতক মানুষ পূন্য লাভের আশায় স্নান করছেন।আমি আর ভোরাই পা ডোবালাম, হাত ভেজালাম।মাথায় ভালো করে জল দিলাম।এক অনাবিল শান্তিতে সেই মুহূর্তে মন ভরে গেল।
গঙ্গার ধারে একটি ক্যাফেতে চা রুটি মিক্সড ভেজ খেলাম।জাপান, ইস্রায়েল, কোরিয়া থেকে আসা মানুষেরা দেখলাম এখানে খেতে এসেছেন।মেঝেতে গদি আর কুশান পেতে বসার ব্যবস্থা ।সামনে বাচ্চাদের বিছানায় পড়াবার জন্য যে মাপের টেবিল বানানো হয় তেমনি মাপের টেবিল পাতা।
তারা কেউ এসেছেন একা, কেউ দল বেঁধে ।কেউ ল্যাপটপ খুলে মনোযোগ দিয়ে কিছু দেখছে।কেউ একা ড্রিঙ্ক নিয়ে গঙ্গার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে, কেউ বা গাঁজায় টান দিচ্ছে ।
আমরা তাদের পাশ কাটিয়ে আরো নিচে নেমে ছোট্টো বাগানে পাতা চেয়ারে বসলাম।পরিচয় হল সার্ভিস বয়ের সঙ্গে ।জিজ্ঞেস করলাম, কবে হল এটা? কারণ প্রথম যখন এখানে এসেছিলাম, তখন এটা ছিল না।ছেলেটি বলল, ২০০৯ এ।
তারপর বলল, তুমি কোথা থেকে এসেছ? কলকাতা বলায় দারুণ অবাক হল।
আমি বললাম, না, আমি এখন দিল্লি থেকে এসেছি ।আমার বর দিল্লিতে থাকে ।
শুনে বলল, তাই বলো।বাঙালি এই ক্যাফেতে সচরাচর আসে না।এলেও খুব জ্বালায় এই বিদেশীদের।আমরা তাই খুব একটা বাঙালি পছন্দ করি না।
আমি বললাম, আমিও তো বাঙালি ।কিন্তু তুমি তো আমাকে এন্ট্রি দিলে।তাছাড়া বাঙালি হুল্লোর প্রিয় জাতি।কিন্তু বিদেশী দের জ্বালাবে এমন সংস্কৃতি বাঙালির নয়।
শুনে বলল, তাহলে তুমি জানোই না, দু ধরনের বাঙালি আসে ।একদল ধর্ম করতে।তারা এখানে ঢুকবে না।কারন এখানকার পরিবেশ।আরেক দল বাঙালি আসে ফূর্তি করতে, তারা ড্রিঙ্ক থেকে শুরু করে গাঁজা কোকেন সব খায়।তারাই এখানে এসে বিদেশীদের খুব জ্বালাতন করে, বিশেষ করে মেয়ে পেলে।
একটু চুপ করে থেকে বলল, এরা আমাদের দেশের অতিথি ।খারাপ কিছু হলে আমাদের দেশের ঐতিহ্য নষ্ট হবে।তুমি তো জানো, হৃষিকেষ হল যোগ সাধনার পিঠস্থান।এরা এখানে আসেই মেডিটেসন, যোগ শিখতে।সরকার এদের থেকে ভালো পয়সা রোজগার করে।আমাদের তো উচিত এদের সম্মান দেওয়া , তাই না!
আমি বললাম, একদম ঠিক কথা বলেছ।তবে বাঙালি মাত্র তুমি যা বলছ তা নয়।
সে বলল, তুমি কিন্তু খুব ভালো ।তুমি যখনি আসবে এখানে এসো।
বললাম, আসব।
জাতাভ্যিমান সব জাতির মধ্যে আছে।কিন্তু দুঃখ পেলেও বুঝলাম বাঙালি আর সেই মর্যাদা পায় না, সে নিজের দোষে তা হারিয়েছে।
ফিরে আসার পথে নদীর সঙ্গে দেখা হল অনেক নিচে নেমে।বোল্ডার পেরিয়ে তার মুখোমুখি দাঁড়ালাম।বললাম, আসার কথা ছিল, এলাম।ভোরাই সেই খানে বালি আর কাঁকর ভরা বোল্ডারের মাঝখানে গঙ্গা মন্ত্র সহযোগে নাচ করে দেবীকে শ্রদ্ধা অর্পন করল।তখন সূর্যের লাল আলো নদীর বুকে শেষ বিকেলের আভা ছড়াচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে ভাবলাম, এই সেই গঙ্গা যা শিবের জটা থেকে বেরিয়েছে , সগর রাজের ষাট হাজার ছেলেকে বাঁচাতে যাকে ভগীরথ আরাধনা করে নিয়ে এসেছে, যার শেষ হয়েছে গঙ্গাসাগরে, কপিলমুনির আশ্রমে, যার স্পর্শ পেয়ে প্রাণ ফিরে পেয়েছে তারা, সেই দেবী গঙ্গা কোন পুরাকাল থেকে এত মলিনতা পাপ ধুয়ে দিয়ে আজও বয়ে চলেছে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে।আর তার কাছে দাঁড়িয়ে আমি, এক অতি সাধারণ মেয়ে , যার নামও নদীর নামেই, যাকে কাশ্মীরের গঙ্গা বলা হয়, একি এক আশ্চর্য সমাপতন নয়!

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত