দিল্লির ডায়েরি (পর্ব- ৩)

২০০১ থেকে ২০১৯। এই আঠারো বছরে নিয়মিত দিল্লি আসি।সেদিনের সুপ্রিম কোর্টে প্রাকটিশ করতে চাওয়া সেই ভীতু যুবক এখন প্রায় দিল্লিবাসী।ফলে আমিও অর্ধেক পা বাড়িয়ে রাখি ।তবে এখন আর পূর্বা বা রাজধানী বা দূরন্ত নয়।অধিক সময় থাকার বাসনায় ফ্লাইট।

প্রথম প্রথম যখন এখানে আসতাম উঠতাম কোটা হাউস কিংবা বঙ্গভবনে।সনাতন সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী হবার জন্য পরীক্ষা দিতে এসেছিল দ্বিতীয় বার।আমি আর ভোরাইও সঙ্গী হলাম।সালটা ২০০২। আমরা উঠেছিলাম বঙ্গভবনে।পাশের ঘরে বসে উঠেছিল নন্দিনী, তাপস পাল আর শতাব্দী ও তাঁর ছেলে। সেলিব্রিটিদের নিয়ে মাতামাতি বা দেখামাত্র ছবি তোলা কোনোটাই আমার আসে না। ফলে একটু দূর থেকেই দেখছি। অথচ ভোরাই এর সঙ্গে কিভাবে ভাব হয়ে গেল সেই বাচ্চাটার।ফলে সেই বাচ্চাটার এটেনডেন্টই ভোরাই কেও দেখতে লাগল। আমি খানিকটা রিল্যাক্সড মুডে থাকলাম।কিন্তু হোটেলের ঘরে দমবন্ধ লাগে আমার।মনে হয় বন্দী হয়ে আছি।ফলে ভোরাইকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ইন্ডিয়া গেটের উদ্দেশ্যে ।

ইন্ডিয়া গেট ভারতের জাতীয় স্মৃতিসৌধ। প্যারিসের আর্ক দে ত্রিম্ফের আদলে ১৯৩১ সালে নির্মিত এই সৌধটির নকশা করেন স্যার এডউইন লুটিয়েনস। আগে এর নাম ছিল “অল ইন্ডিয়া ওয়ার মনুমেন্ট”। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও তৃতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধে নিহত ৯০,০০০ ভারতীয় সেনা জওয়ানদের স্মৃতিরক্ষার্থে এই স্মৃতিসৌধটি নির্মিত হয়। লাল ও সাদা বেলেপাথর ও গ্র্যানাইট পাথরে তৈরি সৌধের পাশাপাশি চারদিকে সবুজের ছোঁয়া মন ভরিয়ে দিল। বেশ খানিকক্ষণ সেখানে থেকে চলে গেলাম শপিং করতে।
প্রথমবার যখন এসেছিলাম, আমার বন্ধু শাশ্বতী ও তার পরিবারের সঙ্গে দিল্লি ঘুরেছিলাম, কখনো বাসে কখনো অটোয়।যা যা দর্শনীয় স্থান সবই ঘোরা হয়েছিল।কিন্তু সে বার কোনো মার্কেট প্লেসে যাই নি।কারন সময় ছিল না।আর হরি কাকু তো একা বেরতেই দিলেন না কোথাও ।

শাশুড়ি মায়ের মুখে শুনেছিলাম দিল্লিতে পালিকা বাজার আছে মাটির নিচে।সস্তায় নানান স্টাইলিস্ট পোশাক পাওয়া যায় ।সে সময় শপিং করতে ভালোবাসতাম। সনাতনের অনুপস্থিতিতে বঙ্গভবনের ম্যানেজারের কাছে ভালো ভাবে জেনে নিয়ে এবার সেখানেও চলে গেলাম। এবং চমকিত হলাম বৈচিত্র দেখে। কিন্তু ভীষণ দরাদরি করতে হয়।যাহোক বেশ কিছু ফ্যাসানেবল স্কার্ট কিনলাম।তখনো প্যান্ট পরা শুরু করিনি। ফলে নানান রকম টপ দেখে মন ভরালাম। ফেরার পথে অটো না পেয়ে শেষ পর্যন্ত পুলিসের দ্বারস্থ হলাম। এখনো মনে আছে পুলিস খুব গম্ভীর ভাবে বলেছিল, বাঙ্গালী?
আমি বললাম, হ্যাঁ।কিন্তু বুঝলেন কি করে? বলল, আপনার মেয়ের হাত ধরে থাকা দেখে।
অবাক হলাম। জানতে চাইলাম, এতে করে কী বুঝলেন? তিনি বললেন, একমাত্র বাঙালিরাই তার বাচ্চাকে এভাবে ধরে রাখে। আমি বললাম, তাহলে তো ভালোই হল, আপনি আমাকে একটা অটো ঠিক করে দিন, বঙ্গভবন যাব। উনি অটো ঠিক করে দিলেন, আর বলে দিলেন অটোওয়ালাকে, একেবারে গেটে ছেড়ে আসতে। একটু আগেই কত অটো রিফিউজ করছিল, সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও, অথচ এখন নির্বিঘ্নে পেয়ে গেলাম। ধন্যবাদ জানিয়ে ফিরে এলাম।
সনাতন ঘরে ঢুকে আমাকে না দেখে একটু চিন্তা করছিল, কিন্তু ওর বরাবরই ধারণা আমি পৃথিবীর যে প্রান্তেই যাই ঠিক কাউকে ম্যানেজ করে নিরাপদে ফিরে আসব। কাজেই অতটা ভাবে নি।
যাহোক, সেবার ৩ দিন ছিলাম। তারপরের বার উঠলাম কোটা হাউজে। তখন নেভির চিফ কম্যান্ডার সিদ্ধার্থ গুপ্ত সনাতনের বন্ধু হয়ে গেছেন। তারই গেস্ট হয়ে আমরা নেভির গেস্ট হাউসে রইলাম। বহু বছর আমাদের বাড়ির মাসকাবারি সেখান থেকেই করেছি। আস্তে আস্তে সনাতন বাড়ি খোঁজা আরম্ভ করল। গেস্ট হাউস, হোটেল আর নয়, এবার স্থায়ী ভাবে থাকতে হবে। শুরু হল জীবনের আরেক অধ্যায় । কত অভিজ্ঞতা জড়ো হল, কত মানুষ এই শহরের আমাদের আপন করে নিল। আবার কতজন কালের স্রোতে হারিয়ে গেল।
আমাদের প্রথম বাড়ি ভাড়া নেওয়া হল রোহিণী তে।এক কামরার ঘর, ড্রইংরুম কিচেন একসঙ্গে। ছোট্ট একটা বাথরুম। আমার মা এসেছিলেন, হিমাচল প্রদেশ বেরাতে যাবেন আমাদের সঙ্গে বলে। গুছিয়ে দিলেন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে সেই ঘর। পাশের বাড়িতে থাকতেন হিন্দি সিরিয়ালের এক জনপ্রিয় নায়ক। তারসঙ্গে আমাদের পরিচয় হল।তিনি এবং তাঁর স্ত্রী নেমতন্ন করে খাওয়ালেন। সেখানে ৪ দিন থেকে চলে গেলাম বেরাতে।
সেই বাড়িওয়ালার সঙ্গে এক বছরের কনট্যাক্ট ছিল।কিন্তু রোহিনী থেকে কোর্টে যেতে সমস্যা হচ্ছিল বলে আবার বাড়ির খোঁজ শুরু হল। দিল্লিতে বাড়ি ভাড়া পাওয়া নাকি খুবই ঝামেলার। কিন্তু আমরা পেয়ে গেলাম। ডিফেন্স কলোনীর মধ্যে। সেখানে সব ভালো কিন্তু জলের খুব সমস্যা। ফলে আবার বাড়ি খোঁজা। অবশেষে এই বাড়ি। ২০০৪ থেকে এখনো পর্যন্ত সেখানেই আছি।

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত