দিল্লির ডায়েরি (পর্ব-২)

প্রথম যখন দিল্লি এলাম উঠেছিলাম হরিকাকুর বাড়ি।হরি কাকু আমার বাবাকে বড়দা বলতেন।মাকে বৌদি।দীর্ঘদিন দিল্লি প্রবাসী এই কাকু পেশায় সরকারী উকিল।কিন্তু উকিল বললেই যেমন একটা দাপুটে ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে হরি কাকুর চেহারার মধ্যে তেমন কোনো কিছুই ছিল না।আদ্যন্ত ভালো মানুষ।খানিকটা ভীতু প্রকৃতির ।তখন ভোরাই সবে ১বছর ৯ মাস।
দিল্লি কিছুই চিনি না।সনাতন তো হিন্দির হ ও বলতে পারত না। কিন্তু তখন তার শখ সুপ্রীম কোর্টে প্রাকটিশ করবে।তার আগে বাড়ির সকলে দিল্লি এলেও আমার কখনো আসা হয় নি।ভাবলাম, এই সুযোগে দিল্লি ঘোরা ও সুপ্রিম কোর্টে কথা বলা দুটোই হবে।
আমরা পূর্বা এক্সপ্রেস ধরে এসেছিলাম।কারণ তখন জানতাম না অন্য কোনো ট্রেন আছে, সদ্য আমার শ্বশুর শাশুড়ি দিল্লি ঘুরে গেছেন বড় ননদ মানে দিদিভাইয়ের সঙ্গে , ওই পূর্বাতেই।উঠেছিল চিত্তরঞ্জন কালিবাড়ি। বাবা এসে উঠতেন এশিয়া হাউস অথবা বঙ্গভবনে। আমরা উঠব পতপরগঞ্জে পুলিস ফাঁড়ির পাশে বাটলা আপার্টমেন্টে।
ট্রেনের অভিজ্ঞতা ভয়বহ।শীতের দিন।ডিসেম্বর মাসের ১২ তারিখ । আমাদের দুজনের হাতে সবমিলিয়ে ১০ হাজার টাকা।তাই নিয়ে চলেছি দিল্লি অভিযানে।
ট্রেন থেকে নেমেই দেখি স্টেশনে ভয়ঙ্কর চেকিং চলছে।সনাতন বলল, রাজধানী বলে এত চেকিং।স্টেশন থেকে বেরিয়ে অটো নিলাম। বললাম পতপরগঞ্জ পুলিস স্টেসনে যাব।সে জানি না কী বুঝল, সনাতনকে বলল, নয়া চৌকিদার? তিনি কী বুঝলেন জানি না।গম্ভীর মুখে বললেন, হ্যাঁ ।থানায় গিয়ে হরিকাকুর সন্ধান করলাম।একজন কনস্টেবল বাটলা আপার্টমেন্টে পৌঁছে দিল।
রাস্তায় সেদিন পুলিসে পুলিসে ছয়লাপ।কিছু না বুঝেই পৌঁছে গেলাম ।যাওয়া মাত্র হরিকাকু উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে বলল, কলকাতা থেকে অজস্র বার ফোন এসেছে তার কাছে ।এমননি বড়দা থানাতেও ফোন করেছেন।তখনো জানি না পার্লামেন্ট অ্যাটাক হয়েছে সেদিনই ।তাই এত কড়াকড়ি, চেকিং।
হরিকাকুর ফ্ল্যাট ছিল বিশাল ।কিন্তু একেবারেই সাধারণ ।কাকিমা , দুটো ছেলে নিয়ে কাকুর সংসার।ভোরাই বাচ্চা দুটোর সঙ্গে মেতে গেল। তখন ভোরাই কথা কম বলত।ইশারায় বোঝাতো অনেক বেশি ।কাকিমা প্রচন্ড ঝাল দিত রান্নায়।আমি খেতে পারতাম না।কিন্তু ভোরাই সেই তরকারি অবলীলায় খেয়ে নিত।বাটি নিয়ে বলত, তক্কারি খাব।
সেই প্রথম ভোরাই ইশারা ছেড়ে কথা বলতে শুরু করল।
যাহোক, কাকু বলল, দিল্লি তো কিছুই দেখতে পারবে না। রেড আলার্ট জারি হয়েছে ।দিল্লির পাড়ায় পাড়ায় জঙ্গী ঘুরে বেড়ায় ।তাই আমি অফিস ছাড়া কোথাও যাই না।
সনাতন একটু নার্ভাস হল।সেই সময় সে অনেকটাই আমার উপর নির্ভরশীল।আমি তখন হিন্দিতে তুখোর।ঠিক করলাম, হরিদ্বার চলে যাব।বাসে করে রওনা দিলাম সেদিন রাতেই হরিদ্বারের পথে।
হরিদ্বার পর্ব শুরু করার আগে বলি, প্রথম দিল্লি আসার সেই দিনটা আজও পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে মনের কুঠুরিতে পরপর সাজানো রয়েছে ।
একটু টান দিলেই সেই কক্ষ থেকে পরপর দৃশ্য গুলো সামনে এসে দাঁড়ায় ।মনে হয় এই তো সেদিন ২৪ বছরের এক তরুণী তার স্বামী কন্যাকে নিয়ে নামল দিল্লি স্টেশনে , কুলি নিল না, বেশি টাকা খরচা করা যাবে না বলে, ভীতু বর, পদে পদে মানা করে, মনা এত ডেসপারেট না হওয়াই ভালো , আর আমি অপরিসীম সাহস নিয়ে বলছি, কুছ পরোয়া নহি।ম্যায় হুঁ না।
তারপর কেটে গেছে ১৮ টা বছর।আজও দিল্লি এক রহস্যময়ী নারীর মত কখনো কুয়াশা কখনো আলো মেখে সামনে দাঁড়ায়।তার পরতে পরতে আমি খুঁজে পাই জীবন ।যে জীবনের অর্ধেক কলকাতা অর্ধেক দিল্লি।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত