দেশবিভাগোত্তর কথাসাহিত্যে সামাজিক ইতিহাসের সন্ধানঃ জীবনানন্দ দাশ ও নরেন্দ্রনাথ মিত্র


।। সু ম ন ব্যা না র্জি ।।


চলমান জীবন আর প্রবাহিত সময়ের ঘাত প্রতিঘাতে নির্মিত-বিনির্মিত সংশ্লেষিত প্রতিচ্ছবি উদ্ভাসিত হয় সাহিত্যে। লেখকের ভাবনার ভূমণ্ডলে যখন প্রত্যক্ষ স্থান করে নেই রাজনীতির ভাবনা, তখন খানিকটা অচেতনভাবে বা অনিবার্যভাবেই সেখানে এসে জড়ো হয় সংশ্লিষ্ট বিষয়। কোনোটা ঘোর নিরাশাবাদের গভীরে নিমজ্জিত, কোনোটা বা আশাবাদের আলোয় উজ্জ্বল, কিংবা আশ্চর্য আরোপিত কোনো সম্ভাবনায় সমাপ্ত – এক কথায় দ্বান্দ্বিকতার বহুস্বর। রাজনীতি, ইতিহাস আর সাহিত্যের সেই ধাঁচার বাইরে গিয়ে লেখক-মনস্তত্ত্বের বহুমুখীনতার সন্ধান করাটা দুরূহ হলেও আকর্ষণীয়। মোটামুটি স্বাধীনতালাভের পর থেকে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্তি – এই সময় কালের বাংলা কথাসাহিত্যের দুই বরেণ্য শিল্পীর সাহিত্যভাবনার নাতিদীর্ঘ আলোচনা এখানে করা হয়েছে।
         “দূরে কাছে কেবলি নগর ঘর ভাঙে”    ব্যক্তির নাম যখন জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪ খ্রিঃ) তখন তাঁর লেখায় সমাজ রাজনীতির প্রগাঢ় ও প্রচ্ছন্ন ছায়াপাতকে খুঁজতে তাই তাঁরই পংক্তি দিয়ে শুরু করার লোভটা অসম্বরণযোগ্য। বিশ্বযুদ্ধোত্তর মূল্যবোধের ক্লান্তি রবীন্দ্রনাথের ছিল না। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে হানাহানি, দুর্ভিক্ষ, মারী, দারিদ্র, মানবতার বিকার প্রভৃতি স্পষ্ট করেছিল নতুন সময়ের ইঙ্গিত। ইতিহাস চেতনায় অনুসৃত ও সমৃদ্ধ হয়ে বর্তমান সভ্যতার উন্মন্থিত বিষ পরিপাক করেন জীবনানন্দ আর টের পান সভ্যতার এই অমানবিক জঙ্গলে প্রতিমুহূর্তে জীবনের ক্ষয়। চারদিকে কেবল বিচিত্র ভয় ক্লান্তি অবসান এত নিবিড় ও মর্মস্পর্শী ভাবনার বলয় সাহিত্যে জীবনানন্দের মতো কেউ তৈরি করতে পারেন নি। কবিতার আলোচনা এখানে অন্বিষ্ট নয়। দেশভাগের প্রেক্ষাপটে তিনি লেখেন দুইটি উপন্যাস ‘জলপাইহাটি’ আর ‘বাসমতীর উপাখ্যান’। দুটি উপন্যাসই রচিত হয়েছিল ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে। দেশভাগের অব্যবহিত পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে পূর্ববাংলার মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের ভাঙনের ছবি উপন্যাসদ্বয়ে চিত্রিত হয়েছে।

   দেশভাগ আর স্বাধীনতা উপন্যাস দু’টির ভিত্তিভূমিটা নির্মাণ করে দিলেও এগুলির লক্ষ্য হল সমাজের অর্থনৈতিক বিপন্নতা আর ব্যক্তিত্বের অন্তর্মুখীনতার সংকটের সাথে সাথে মানব মনস্তত্ত্বের ছবিটাকে তুলে ধরা। ‘জলপাইহাটি’র নায়ক নিশীথ বেসরকারি কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক। দীর্ঘ পঁচিশ বছর অধ্যাপনার পরও তার ভাগ্যে জোটে কর্তৃপক্ষের অসম্মান আর তার সাথে আর্থিক অনিশ্চয়তা তো ছিলই। রুগ্ন স্ত্রী সুমনাকে প্রতিবেশীদের তত্ত্বাবধানে রেখে বন্ধুদের কথামতো কলকাতায় আসে সুস্থ জীবনের আশায়। কিন্তু বন্ধুরা তাঁকে আশাহত করে। আবারও জলপাইহাটিতে ফিরে যেতে হয়। কিন্তু ন্যূনতম সাংসারিক সুস্থতাও সেখানে অবশিষ্ট ছিল না। স্ত্রী সুমনা আর কন্যা ভানু মারা যায়। পুত্র হারীতও ফিরে পায় না সুস্থ জীবন। মর্মভেদী শূন্যতা আর নৈরাশ্য থেকে সে মুক্তি খুঁজতে চায় প্রতিবেশী সুলেখাকে বিবাহের কথা ভেবে। তবে বিবাহ তো আর অর্থনৈতিক বিপন্নতার হাত থেকে মুক্তি দিতে পারে না। মানব মনের চিরন্তন প্রবৃত্তিই কি তাকে এই কাজে প্রণোদিত করে না? সুমনা যেমন বলে, “স্বাধীন হয়েও শান্তি নেই। ছেলেমেয়েগুলোর এই দশা। উনি কলেজটাকে এক পাশে ফেলে জলপাইহাটির ঘর ভেঙে চলে গেলেন যা নেই তার ভিতর হারিয়ে যেতে। …..  বড্ড বেকায়দায় পেয়েছে দেশের স্বাধীনতা আমাদের ক’জনকে….। যা নেই তার ভিতর নিশীথের হারিয়ে যাওয়া কি শুধুই সম্মান আর আর্থিক নিশ্চয়তার আশায়? বোধহয় নিশীথ আর সুমনা এই দুই চরিত্রের মধ্য দিয়ে জীবনানন্দ তুলে ধরেছেন দুই বিপরীত ভাবনাকে। নিশীথের পুত্র হারীত স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে কিন্তু কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার ফলশ্রুতি দেশ অর্জন না করায় সে আশাহত হয় শেষে সোস্যালিস্ট পার্টি গড়ার কথা ভাবে। ওপার বাংলায় আর্থিক সামাজিক স্থিতিশীলতার অভাবে কলকাতার অভিমুখে আসা ছিল একটা স্বাভাবিক ঘটনা – “এখানে জলপাইহাটিতে কেমন একটা অদ্ভূত অনিশ্চয়তার ভেতর নিরবিচ্ছিন্ন নিঃস্ব হয়ে ঘুরে ফিরছে সমস্ত অবুঝ ও বুদ্ধিমান। এদের অনেকেই দেশ ছেড়ে চলে গেছে। রোজই যাচ্ছে – এখনো যাচ্ছে”।

    তদানীন্তন পরিস্থিতির স্বাভাবিক মর্মন্তুদ ঘটনাপ্রবাহের কথা বলতে গিয়েই জীবনানন্দ একটা গূঢ় ব্যঞ্জনার মিশেল ঢাললেন এতে। এই যাওয়া কি একটা আশাবাদ, প্রচণ্ড প্রশান্তির দিকে মানুষের অহর্নিশ মনস্তাত্ত্বিক গমন নয়? সচেতন পাঠকের বুঝে নিতে অসুবিধে হয় না যে এই নিশীথই হলেন জীবনানন্দ। নির্জনতার কবি, নিশ্চেতনার কবি বার বার ডুব দেন নিজের মধ্যে, নিজের হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগান, নিজেকে আড়াল করেন বারবার সৃষ্টিমগ্ন হবার জন্য। কিন্তু কবির এই আড়াল হয়ে যাওয়া বিচ্ছিন্নতা বা সমাজ বিমুখতার প্রতীপে কখনো দেখা ঠিক নয়। ইংরেজি সাহিত্যের রোম্যান্টিক কবিকুল যেমন সমাজ-সভ্যতা আর রাজনীতির কাদামাখা সাজানো সত্যের মানচিত্র থেকে দূরে গিয়ে খুঁজতে চেয়েছেন তৃতীয় পরিসর, রোম্যান্টিকতাকে বিদ্রোহের রূপক হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছেন জীবনানন্দও তাই। তবে তিনি বোধ হয় প্রবল বিদ্রোহী নন। দেশ-কাল-সমাজের ঘটনাপ্রবাহের দ্রষ্টা। সেখান থেকে ভাবনার কাঁচামাল নিয়েছেন। তাঁর অন্তর্নিহিত মননের সাথে তাকে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন। কখনো তা মিলেছে, কখনো মেলেনি। একটা বিশেষ ঐতিহাসিক সময়ের প্রেক্ষিতে বাংলা কথা সাহিত্যে তাঁর অবদান পাঠকের কাছে আরও অনেক বেশি আত্মপ্রকাশের অপেক্ষায়। 



   জীবনানন্দ দাশের বাসমতীর উপাখ্যান (১৯৪৮) শীর্ষক উপন্যাসে দেশভাগজনিত সংকট চিত্রিত হয়েছে। স্বাধীনতা লাভের জন্য সমস্ত আন্দোলন যখন শেষ, দেশভাগের মধ্য দিয়ে অর্জিত হবে সেই স্বাধীনতা এমন সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ে গেছে ঠিক সেই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণকে কেন্দ্র করে উক্ত উপন্যাসটি রচিত। বিশিষ্ট কথাকার দেবেশ রায় বলেছিলেন, “দেশভাগ হচ্ছে, অখণ্ড বাংলাদেশের দুই স্বতন্ত্র, স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে বিভক্ত হয়ে যাওয়ার ঘটনা ইংরেজ শাসনাবসানের বাস্তবতাকে অপ্রত্যাশিতভাবে এক নতুন মাত্রা দিচ্ছে, ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক বদলে যাচ্ছে, গ্রামের পরিবেশ, তার সম্ভাব্য রাষ্ট্রমুক্তির পরিবেশ পরিবর্তিত হচ্ছে, কয়েকটি পরিবারের অভ্যন্তরীণ সংগঠন ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে – ‘জলপাইহাটি’ ও বাসমতীর উপাখ্যান’ দু’টি উপন্যাসেই জীবনানন্দ তাঁর আখ্যান গড়ে তুলেছেন এই ঐতিহাসিক নির্দিষ্ট সময়কে ভিত্তি করে”। খুব আকর্ষণীয়ভাবে এই উপন্যাসে এসেছে হিন্দু মুসলিম সম্পর্ক, ব্রাহ্মসমাজের ভাঙনের পাশাপাশি কবি মনের স্বভাবসিদ্ধ নিসর্গপ্রীতিও। 

   ‘বাসমতীর উপাখ্যান’ উপন্যাসটি পূর্ব বাংলার বাসমতী নামক মফস্বল শহরের মধ্যবিত্ত জীবনের বয়ান। নিশীথের মতো এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সিদ্ধার্থও সরকারি কলেজের অধ্যাপক তবে নিশীথ সেনের থেকে তাঁর অবস্থা উন্নত। বিশাল উপন্যাসের কাহিনি তিনটি বৃত্তে আবর্তিত। যার একটি অংশে রয়েছে সিদ্ধার্থ ও তার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি, অন্য অংশে ক্ষয়িষ্ণু ব্রাহ্মসমাজের চিত্র এবং শেষ অংশটি পোস্ট অফিসের অফিসার প্রভাসবাবু ও তাঁর মেয়ে রমাকে কেন্দ্র করে। দেশভাগের সমকালের পরিস্থিতির উত্তাপেই অভিযোজিত হয়েছে উপন্যাসের চরিত্ররা – “….দেশ তো দু’টুকরো হবে শোনা যাচ্ছে। এদিকটা তো পাকিস্তানে পড়বে, আগের মত জিভ নেড়ে সব কথা বলা সম্ভব হবেনা আর….”। আজন্ম লালিত যে মাটির সাথে সেই শৈশবের স্বপ্ন ও স্মৃতি ঘেরা সেই দেশ কৃত্রিমভাবে দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাবে, অনাগত ভবিষ্যতের অন্ধকারময় অস্বস্তিকর দিনগুলোর কথাই কল্পিত হচ্ছে এখানে। 

   অখণ্ড ভারতবর্ষে যেখানে দীর্ঘদিন ধরে হিন্দু-মুসলমান একত্রে সহবাসের ফলে একটা আত্মিক বোঝাপড়ার দায়রা তৈরি হয়েছে, দেশভাগ হলে তাতে চিড় ধরবে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাদীক্ষাহীন, রাজনৈতিক জ্ঞানশূন্য একজন সাধারণ মুসলিম মাঝির মুখ দিয়ে ঔপন্যাসিক বলান, “থাইক্যা যায়েন কত্তা আমাগো পাকিস্তানে, কই যাইবেন মাইয়া-পোলা লইয়া?”।  প্রাবন্ধিক হেনা সিন্‌হা তাঁর ‘দেশভাগ ভগ্ননীড়বাংলা উপন্যাস’ [সাতচল্লিশের দেশভাগ, ব্যঞ্জনবর্ণ, পৃঃ-৪৫] শীর্ষক প্রবন্ধে এই অংশটিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন যে, দীর্ঘ স্টিমার যাত্রার সঙ্গী গফুরের সাথে প্রভাসবাবুর  কথোপকথনের সময় গফুরের উক্তির মধ্যে দিয়ে অহংবোধ ও করুণা প্রদর্শন করার আত্মতৃপ্তি প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু শুধুই কি করুণা প্রদর্শন করার আত্মতৃপ্তি? এটা কি দীর্ঘদিন ধরে যাপিত শুদ্ধ মানবিক মূল্যবোধের উদ্ভাস নয়?  কোনো রাজনীতিকের মতো ভবিষ্যৎ সাফল্যের অঙ্ক সে কষতে পারে না কিংবা শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের মতো গোছানো ভবিষ্যতের স্বপ্নও সে দেখে না, তবু তার মধ্যে সবরকম অমঙ্গলকে অতিক্রম করে যাওয়া একধরনের সরল বিশ্বাস কাজ করে। যার মধ্যে খুঁজে নিতে অসুবিধা হয় না কবি মনকে। মুসলিম বিদ্বেষী কোনো মানসিকতা আমরা পাইনা জীবনানন্দের মধ্যে। বরং গফুরের মধ্য দিয়ে তিনি তুলে ধরেছেন ভাবী পাকিস্তানের নাগরিকদের মানসিকতাকে। জীবনানন্দ তুলে ধরতে চেয়েছেন যে কারণে হিন্দুরা পূর্ববঙ্গ থেকে বাস্তুত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল। দেশভাগের ফলে বাসমতী পাকিস্তান হয়ে যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও যাদের কাছে শিকড়ের টান প্রবল ছিল তারা সেখানেই থেকে যায়। সিদ্ধার্থের সরোজিনী পিসিমা সেমন জানিয়ে দেয় – “যে ক’দিন আছি বাসমতীতেই থাকব”।

   অধ্যাপিকা সুমিতা চক্রবর্তী বলেন যে, এই উপন্যাসে নিহিত আছে ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের পূর্ব বাংলার সামাজিক রাজনৈতিক সংকটের সারভূত নির্যাস। কোন পরিস্থিতিতে পূর্ববঙ্গের হিন্দু মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় উদ্বাস্তু হয়েছিল সেই স্পন্দনটি আমরা পাই এখানে। একটি গোটা আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতির সংঘাত, সংমিশ্রণ ও  সমন্বয়ই তৈরি করে দেয় শিল্পী মানস। কিন্তু শিল্পী মানস খুঁজতে চায় একটি তৃতীয় পরিসর। তাই তো কখনও প্রচণ্ড আশাবাদ আবার কখনও বা অতৃপ্তি আক্ষেপে প্রবাহিত হয় লেখনী। এ প্রসঙ্গে প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘কল্পনার কাজঔপনিবেশিক বাংলায় সময় ও ইতিহাস চেতনা’ [নিবন্ধ বৈচিত্র্যের তিন দশক, চর্চাপদ, ২০১০, পৃঃ- ২৫৭-২৫৯] শীর্ষক প্রবন্ধের ভাষ্যহীন হুবহু উদ্ধৃতি দিয়েই শেষ করলাম – “….কল্পনার কাজ সময়ের খণ্ডিতভাব দূর করে কালগত সংহতি তৈরি করা….. কল্পনার কাজ ইতিহাসের কয়েদ থেকে ঔপনিবেশিকের ভবিষ্যৎ ও মুক্তচিন্তাকে রেহাই দেওয়া। ….. কল্পনা যে সময়বোধের দিকে ইঙ্গিত করে…. এই কালবোধই বর্তমানের কারাগারে আজাদ ভবিষ্যৎ আর স্বাধীন স্মৃতি সৃষ্টি করতে পারে….এই ‘চিরন্তনকাল’ অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের পারম্পর্য নয়, কল্পনার দ্বারা সম্বন্ধবদ্ধ স্মৃতি-সত্তা-ভবিষ্যতের যৌথক্রিয়া”।

   বাংলার বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক নরেন্দ্রনাথ মিত্র (১৯১৬-১৯৭৫ খ্রিঃ) শরৎচন্দ্রের পর মরমী ভাষায় আরও গভীরভাবে আমাদের চিনিয়েছেন মধ্যবিত্ত জীবনের অন্দরমহলটিকে। যে সময় নরেন্দ্রনাথ কথাসাহিত্যে তাঁর কলম ধরেছেন, সেই সময়টি একটি বিশেষ নির্মাণের সময়। কী সেই নির্মাণ? দেশভাগের আর স্বাধীনতাপ্রাপ্তির পর মানুষের জীবনযাত্রা আশা-আকাঙ্ক্ষায় পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। সমাজের মধ্যে নতুন নতুন ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ওপার বাংলা থেকে একটু সুস্থ-নিরুপদ্রপ জীবন আর আর্থিক সামাজিক স্থিতির আশায় এদেশে আসছে বহু মানুষ। দুই বিপরীতমুখী ভাবনার ঘাত প্রতিঘাতে তৈরি হচ্ছে একটি মধ্যবিত্ত সমাজ। আর এই মধ্যবিত্ত জীবনই ছিল নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ভাবনার প্রধান চারণক্ষেত্র। খুব কম গল্প ও উপন্যাসেই তিনি সরাসরি রাজনীতির অনুষঙ্গ টেনেছেন। দেশভাগ ও স্বাধীনতাপ্রাপ্তি, বাস্তুভিটে বিদেশ হবার যন্ত্রণা, ছিন্নমূল মানুষের নতুন করে শিকড় সন্ধানের বিড়ম্বনা তাঁর লেখা দু’টি বিখ্যাত উপন্যাস ‘উপনগর’ (১৯৬১ খ্রিঃ) ও ‘মহানগর’ (১৯৬৪ খ্রিঃ)-এতে ঘুরে ফিরে এসেছে।



   ‘উপনগর’ উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে ঔপন্যাসিক নীলকণ্ঠ রায়ের পরিবারের কথা। দেশভাগের পরে নেতাজিনগর জবরদখল কলোনিতে মামাশ্বশুরের তৈরি করা বাড়িতে আশ্রয় নেন নীলকণ্ঠবাবু। তাঁর পরিবারে অনেক সদস্য। স্ত্রী নির্মলা, বড় কন্যা মালা, আরো দুই পুত্র ও এক কন্যা। নীলকণ্ঠবাবু এদেশে এসে লেখালেখির চেষ্টা করেন কিন্তু পারেন না। সৃষ্টিশীল কল্পনা তাঁর মনের মধ্যে কিছুতেই দানা বাঁধতে চায় না। সব সূত্র তিনি হারিয়ে ফেলেন, এতে বড় সংসারের ভরণপোষণ করতে পারেন না। কন্যা মালা হাসপাতালে চাকরি করে কোনো রকমে সংসার চালায়। নীলকণ্ঠবাবু ক্রমশ জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান, নিজেকে গৃহবন্দি করে রাখেন ও শেষ হয়ে যান। ‘উপনগর’ উপন্যাসের একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে পূর্ববঙ্গ ছেড়ে আসা উদ্বাস্তু মানুষের কলোনি গড়ে তোলা এবং কলোনিতে নতুন করে জীবন ধারণের বিবরণ। এখানে অনেকগুলি কলোনি গড়ে উঠেছে – সেগুলি জবরদখল কলোনি। নতুন করে গড়ে ওঠা কলোনিতে বিদ্যুতের আলো পৌঁছয় নি, রাস্তাঘাট কাঁচা। এরই মধ্যে বাস করে কলোনির মানুষেরা। তারা নতুন করে বাঁচতে চায়। এই কলোনির সাথে জড়িত হয়ে পড়েন রাজনৈতিক নেতা মণিময়। তিনি নীলকান্তবাবুর আত্মীয়। কলোনিতে পাকা রাস্তা তৈরির কাজে হাত লাগান। মণিময়ের এই সাধু প্রচেষ্টাকে উৎসাহিত করেছেন করুণা তাঁর সারা জীবনের সঞ্চিত অর্থ থেকে দশ হাজার টাকা রোড কমিটিকে দান করে। কলকাতা থেকে দূরবর্তী এই উপনগরে মানুষদের নতুন করে বাঁচার প্রচেষ্টা, তাঁদের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক, আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রভৃতি বহুবিধ দিক উপন্যাসে উদ্‌ঘাটিত হয়েছে।

   গরিব ও নিম্নবিত্ত যে সব মানুষ কলোনিতে আশ্রয় গ্রহণ করেছেন তারা নিজেদের জীবনকে গড়তে চাইছেন নতুন করে। নতুন আশায় বুক বেঁধে আগামী দিনের পথ চলতে চাইছেন। অস্থির ও উত্তাল সময়ের আবহে উপন্যাসটি লিখিত হলেও আশাবাদ ও প্রত্যয়ের স্পন্দন খুঁজে নিতে পাঠকের সমস্যা হয় না। 
    
    দেশভাগের পর ব্যক্তিমানুষের সংগ্রামের চিত্র পাওয়া যায় নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ‘মহানগর’ উপন্যাসে। ‘মহানগর’ ছিল নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ‘অবতরণিকা’ নামক ছোটগল্পের পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত রূপ। ‘মহানগর’ উপন্যাসটি দেশবিভাগের পটভূমিকায় লেখা। দেশবিভাগের পর পাকিস্তান ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে এসে একটি উদ্বাস্তু হিন্দু পরিবারের সমস্যার কথা লেখক এখানে চিত্রিত করেছেন। দেশবিভাগের পর পাকিস্তান ছেড়ে সুব্রতর বাবা মা সহ সমগ্র পরিবারটি কলকাতায় সুব্রতর বাসায় আশ্রয় নেয়। সুব্রত অবশ্য দেশভাগের পূর্বেই কলকাতার একটি ব্যাঙ্কে চাকরি করত। এখন সমস্ত পরিবারটির দায়িত্ব এসে পড়ে সুব্রতর ওপর। সুব্রতর পক্ষে বড় সংসার পরিচালনা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ে। নিদারুণ অর্থকষ্টের সম্মুখীন হয় সে। সুব্রতর স্ত্রী আরতি চাকরির চেষ্টা করে। সেলস গার্লের চাকরিও পায় সে। শ্বশুর-শাশুড়ির অমতে সে চাকরি করে এবং প্রভূত উন্নতিও করে। যে স্বামী একদা তাকে প্রণোদিত করেছিল সেই তার অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে মন থেকে মানতে দ্বিধান্বিত হয়। চাকরি ছেড়ে দেবার কথা বলে। আরতিও চাকরি ছাড়তে চাইল, রেজিগনেশন লেটারও তৈরি করল। কিন্তু সেদিনই সুব্রতর জয়লক্ষ্মী ব্যাঙ্কে তালা পড়ে গেল। সুব্রত বাধ্য হল আরতিকে চাকরি থেকে ইস্তফা দিতে নিষেধ করতে। মধ্যবিত্ত জীবনের সংকট ও মধ্যবিত্ত মানসে দ্বান্দ্বিকতা এত নিপুণভাবে নরেন্দ্রনাথ মিত্রের আগে কেউ তুলে ধরতে পারেননি। সুব্রত কিছুতেই চাকরি জোগার করতে পারল না। আরতির টাকাতেই কালাতিপাত করতে থাকে সে। কিন্তু এই নিদারুণ পরিস্থিতিতে সংকটের ছায়া আরও ঘনীভূত হয়। আরতির বস হিমাংশু মুখার্জী আরতির এক সহকর্মী এডিথের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে তার সম্পর্কে অশালীন মন্তব্য করে। এতে আরতিও তীব্রভাবে অসম্মানিত হয়। তার মনে হয় এডিথকে অপমানের অর্থ গোটা মহিলা সমাজকেই অপমান। আরতি হিমাংশুকে তার মন্তব্য প্রত্যাহার করে নিতে বলে। অন্যথায় চাকরি ছেড়ে দেবার সিদ্ধান্ত নেয়। মুখার্জী তার মন্তব্য প্রত্যাহার করেনি। ফলত আরতির চাকরি চলে যায়। সুব্রত এসে আহত হলেও শেষ পর্যন্ত স্ত্রীর পাশে এসেই দাঁড়ায় ও তাকে বলে, “তুমি ঠিকই করেছ”। মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবনের প্রাণভোমরা এই আত্মসম্মানবোধ যা নরেন্দ্রনাথ মিত্র সুন্দরভাবে চিত্রিত করেছেন। 
   এতো গেল মধ্যবিত্ত জীবনের দিকটির কথা। ‘মহানগর’ উপন্যাসে নরেন্দ্রনাথ দেশভাগের প্রেক্ষিতে পাকিস্তান পরিত্যাগ করে চলে আসার দিকটিকেও উপস্থাপন করেছেন। সুব্রতর বাবা স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি ছেড়ে, জ্ঞাতিভাইদের তত্ত্বাবধানে রেখে ছেলের বাসায় চলে আসে। আরতির একার আসার কথা থাকলেও গোটা পরিবারটির দায়িত্বই পড়ে সুব্রতও ওপর। প্রিয়গোপালের মুখ দিয়েই গোটা সমাজজীবনের কথা লেখক বলিয়েছেন – “দেশ গাঁয়ের মানুষ সবাই তো ঝেঁটিয়ে কলকাতায় চলে এসেছে”। আবার আরতির বস মি. মুখার্জী জানান – “আমরাও পূর্ববঙ্গের মানুষ মশাই……সব বাঙাল মশাই, কোনো চিন্তা করবেন না। বাঙালে বাঙালে ছেয়ে ফেলেছি আমরা, ব্যবসা বাণিজ্যের প্রায় বারো আনা তুলে আনতে হল পাকিস্তান থেকে”। সুব্রতর মতো অনেক পরিবারই কলকাতায় চলে এসে নতুন আলো হাওয়ায় একটু বাঁচার, মাথা তুলে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা করেছিল।

   দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর, উদ্বাস্তু-পরিকীর্ণ, বিপুল প্রতিকূলতার মধ্যে পায়ের তলার মাটি খুঁড়তে ব্যাকুল বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের নির্মাণকালের এক পরিবর্তমান ইতিহাসের জন্য নরেন্দ্রনাথ মিত্রের লেখার কাছেই ফিরে যেতে হয়। সামাজিক ইতিহাসের জ্বলন্ত নিদর্শন হয়ে থাকা তাঁর লেখালেখিতে ব্যক্তি মনস্তত্ত্ব থেকে সমাজ মনস্তত্ত্ব, ভাষা ভঙ্গিমার বাঁক বদল, আর দ্বান্দ্বিকতার সীমা পরিসীমাগুলো উজ্জ্বল উদ্ধারের অপেক্ষায়।

   রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও সমীকরণের পরিবর্তন কীভাবে একটা সমাজ জীবনের স্তরবিন্যাসগুলোকে বদলে দেয়, কদাচিৎ অস্বাভাবিকতা আর অসম্ভবই কার্যত বাস্তবের চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে, মানব মনের গহীনে থাকা দ্বান্দ্বিকার বাস্তবতাকে অনেক বেশি করে জায়মান করে গড়ে তোলে, কথাসাহিত্যের মধ্যেই সেই নিদর্শনগুলি স্বচ্ছতার সাথে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। মোটামুটিভাবে ৭০-র দশকের প্রাক্কাল পর্যন্ত দেশভাগ-স্বাধীনতা-ছিন্নমূল মানুষের জীবন কীভাবে দুই যুগের দুই প্রধান সাহিত্যিক জীবনানন্দ দাশ (যাঁর প্রধান পরিচয় মূলত কবি হিসেবে) ও পরবর্তীকালে নরেন্দ্রনাথ মিত্রের লেখনীতে কীভাবে পরিপূর্তি লাভ করেছে তারই নাতিদীর্ঘ চিত্র এখানে তুলে ধরার চেষ্টা হল।

.

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত