Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,dhaka r kotha irabotee-gitaranga-special

গীতরঙ্গ: ঢাকার—নানা কথা, নানা দিক । ইন্দ্রজিৎ ঘোষ

Reading Time: 14 minutes

“নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে “উপন্যাসের সামসুদ্দিনকে খুব মনে পড়ছে! সামসুদ্দিনের ভেতরে ছি’ল নীলকন্ঠ পাখিকে খোঁজার এক স্বপ্নিল তাড়না! এই নীলকন্ঠ পাখির অন্বেষণে অস্থির সামসুদ্দিন পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের সমর্থক হয়েছি’ল, এমন কী হাতও মিলিয়ে ছি’ল! সে ভাবতে শুরু করেছি’ল, ভাবতে ভালোবাসছি’ল, ভারত উপমহাদেশ থেকে ভেঙে বেরিয়ে গিয়ে যে পৃথক রাষ্ট্র পাকিস্তান গ’ড়ে উঠবে, সেই রাষ্ট্র তাকে ও তার ধর্মের মানুষকে নিশ্চিত ভাবে নীলকন্ঠ পাখির খোঁজ এনে দেবে৷ না, সামসুদ্দিন আর কখনও নীলকন্ঠ পাখির খোঁজ পায় নি! বরং সদ্যজাত রাষ্ট্র কর্তৃক তারই ধর্মের মানুষ হয়ে পড়েছে এলেবেলে, নগন্য, অর্থহীন! এটা মানতেই হবে যে, কথাকার অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় অসামান্য দক্ষতায় গল্প কাঠামোর ভেতর বুনেছেন নীলকন্ঠ পাখির বহুমাত্রিক ইমেজ৷ হিন্দু পুরাণজাত এই নীলকন্ঠ পাখি পুরাণ পরিচিতির ছক ভেঙে এখানে হয়ে উঠেছে জীবনের বহু কাঙ্ক্ষিত না পাওয়ার নাম, যেখানে স্বপ্নলগ্ন, স্বপ্নতাড়িত মানুষ পৌঁছতে চায় ৷

আসলে ধর্মের ভিত্তিতে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং সেই রাষ্ট্রের জাতীয় ঐক্য যে মজবুত স্থিরতা নির্মাণ করতে ব্যর্থ হবে, এ সম্পর্কে তৎকালীন অনেক বুদ্ধিজীবী-ই প্রায় এক প্রকার নিশ্চিত ছিলেন৷ ভাষা এবং সংস্কৃতির বৈচিত্র্য তাই এক্ষেত্রে এমন এক অভিযোজনের মুখোমুখি হ’ল যেখানে নতুন এক রাষ্ট্র গঠনের দাবি অনিবার্য হ’য়ে উঠল৷ অতএব, দ্বিজাতিতত্ত্বের ভেতরেই যে উপজাতি সত্তার বীজ নিহিত ছি’ল সে বিষয়ে নতুন করে ভাবনার অবকাশ তৈরি হ’ল৷ এই অবকাশেই স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম নতুন এক ইতহাস নির্মাণ কর’ল৷ নবগঠিত বাংলা দেশের রাজধানী ঢাকা হ’য়ে উঠল আন্তর্জাতিক স্তরে আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু৷ বর্তমান আলোচনায় ইতিহাস ও সমকালের আলোয় ঢাকা-র নানা কথা, নানা দিক নিয়ে কিছু আলোচনার ইচ্ছা রই’ল৷

“ইতিহাসের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, অতীতের আলোতে বর্তমানের পথ দেখানো, সমাজ ও গোষ্ঠী চলাচলের পথ ও বিপথ দেখিয়ে মানুষকে সাবধান করা৷ বর্তমানে আমরা যাকে বলি ‘যথার্থ ইতিহাস’, হোমারের ট্রয় যুদ্ধের কি বেদব্যাসের ভারত যুদ্ধের ইতিহাস নয়, তার লেখকরাও অনেকে বলেছেন যে, তারা ইতিহাস লিখেছেন কেবল অতীতের কাহিনীকে বর্ণনার জন্য নয়, যাতে অতীতের কাহিনীর আলোতে বর্তমানের ও ভবিষ্যতের পথ-বিপথ চেনা যায় সেই উদ্দেশ্যে৷ …ইতিহাস লোক শিক্ষক—ন্যায় পথের সন্ধান দেয়, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জ্ঞানের সে পরামর্শ দাতা৷ ” ‘ইতিহাসের মুক্তি’ প্রবন্ধে এসব গভীর কথা গুলো বলেছেন অতুল গুপ্ত৷ কথাগুলো আবার নতুন ক’রে বুদ্ধি-বিচারের আলোয় ফেলে বুঝে নেবার ইচ্ছা তৈরি হ’ল ঢাকার ইতিহাস ও নানাকথা, নানা দিক নিয়ে আলোচনা করতে বসার মুহূর্তে ৷

ইতিহাস তো শুধু সময়ের দর্পণ নয়, সেই সঙ্গে সে পরম ধাত্রীর মতো সময়কে ধারণও করে, এই সময় আবার ইতিহাসকে সৃষ্টি করে৷ সময়ের প্রচন্ড চালিকা শক্তি ইতিহাসের গতিমুখকে নিত্য-নতুন মূল্যায়নের ভেতর দিয়ে এগিয়ে নিয়ে চলে৷ ইতিহাস তাই শুধু কাহিনিকার নয়, ইতিহাস উপদেষ্টার ভূমিকাতেও অবতীর্ণ হয়৷ আধুনিক সময়কালে ইতিহাসের উপাদান সংগ্রহ করা যেমন কঠিন বিষয়, তেমনি মূল্য বিচার করার পদ্ধতি এবং প্রচেষ্টাও যথেষ্ট জটিল৷ একারণেই পৃথিবীর আরও অনেক শহর, নগর বা সমৃদ্ধ ও ঐতিহ্যশীল জনপদের ম’ত ঢাকার ইতিহাস নিয়েও মত পার্থক্যের শেষ নেই!

ঢাকা বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র৷ শুধু তাই নয়, ঢাকাকে বাংলাদেশের হৃদপিন্ড ও মস্তিষ্ক বললেও ভুল বলা হবে না৷ ঢাকার কোষে কোষে নিহিত রয়েছে ইতিহাসের বিচিত্র ডি.এন.এ!

‘ঢাকা’, এই নামের সঙ্গে ধর্মীয় অনুষঙ্গের এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত জড়িত আছে ব’লে এক শ্রেণির ঐতিহাসিকদের অভিমত৷ কো’ন এক সময়ে নাকি সেন রাজা বল্লাল সেন বুড়িগঙ্গা তীর সংলগ্ন এলাকায় ভ্রমণ করার সময়ে কাছাকাছি এক জঙ্গলে দেবী দুর্গার একটি বিগ্রহ দেখতে পান৷ হিন্দু রাজা, অতএব দেবী ভক্তি তথা দৈবানুরাগ থাকাই স্বাভাবিক৷ ফলস্বরূপ রাজা এই দুর্গামূর্তি প্রতিস্থাপন করলেন মন্দির প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে৷ যেহেতু দুর্গামূর্তিটি ঢাকা বা আচ্ছাদিত অবস্থায় খুঁজে পাওয়া গিয়েছি’ল তাই বল্লাল সেন আচ্ছাদিত বা ঢাকা এই শব্দার্থের অনুষঙ্গে মন্দিরটির নামকরণ করেন ‘ঢাকেশ্বরী মন্দির৷ ‘ অনুমান, ‘ঢাকেশ্বরী’ এই নাম থেকেই মন্দির সংলগ্ন জনপদটির নাম হয় ‘ঢাকা’৷

“Samething to be read at religious services or at meals, unually a saint’s or marty’s life.” এমনই ছি’ল কিংবদন্তির আদি রূপ৷ পাশ্চাত্যে যা লেজেন্ড, আঞ্চলিক ঐতিহ্য বা আ্যান্টিকুইটিস্ হিসাবে পরিচিত হ’ত আমরা বাংলাতে তাকে বলে থাকি কিংবদন্তি৷ কিংবদন্তি অনেক সময়ে সমান্তরাল ইতিহাস হিসাবে বিবেচিত হয়৷ সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানীদের অভিমতানুসারে কিংবদন্তির ভেতরে ক্ষীণ হলেও ইতিহাসের সূত্র নিহিত থাকে৷ ঢাকার ইতিহাস নিয়েও এমন কিছু কিংবদন্তি প্রচলিত আছে৷ সম্রাট জাহাজ্ঞীর ঢাকাকে সুবা বাংলার রাজধানী রূপে স্বীকৃতি দেয়৷ এই স্বীকৃতি তুমুল এক উৎসবের রূপ নেয় সুবাদার ইসলাম খানের পৃষ্ঠপোষকতায়৷ ঢাকা রাজধানীর সীমানা নির্ধারণের জন্য ইসলাম খান এক অভিনব পন্থা গ্রহন করেন৷ তিনি কয়েকজন সুদক্ষ ঢাকি কে সর্বশক্তি দিয়ে ঢাক বাজাবার নির্দেশ দেন৷ ঠিক হয় যতদূর পর্যন্ত এই ঢাকের আওয়াজ পৌঁছবে ততদূর পর্যন্ত স্থান রাজধানীর সীমানা হিসাবে চিহ্নিত করা হবে৷ এই কাজ সুসম্পন্ন করার দায়িত্ব অর্পণ করা হয় তিন বিশ্বস্ত ঘোড়সওয়ার সৈন্যের ওপর৷ দন্ডলগ্ন নিশান নিয়ে তিন ঘোড়সওয়ার উত্তর, পূর্ব এবং পশ্চিম এই তিন দিকে ঘোড়া ছোটায়৷ সর্ব শেষ যে স্থান পর্যন্ত ঢাকের আওয়াজ শোনা যাবে সেই স্থানে নিশানা জ্ঞাপক দন্ডচিহ্ন স্থাপন করে তবেই ঘোড়সওয়াররা ফিরে আসতে পারবে৷ এই ঢাকের আওয়াজ এমন এক ইমেজ তৈরি করে, যা থেকে অর্থাৎ এই ঢাক বাদ্য থেকে কালানুক্রমে এই জনপদের নাম হয় ঢাকা, এমনই এক লোকবিশ্বাস এখনও টিকে আছে কো’ন কো’ন মহলে৷ তবে সম্রাট জাহাজ্ঞীর যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন পর্যন্ত তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য ঢাকার নাম রাখা হয় জাহাজ্ঞীর নগর৷ তবে ঢাকা নামটি লোকের মুখে মুখে টিকে যায়৷

তবে ঢাকা নামের আরও কিছু সূত্র মেল৷ যেমন— ‘ঢাক’ (বুডি ফুডোসা) নামের একজাতীয় গাছ এ অঞ্চলে নাকি প্রচুর পরিমাণে জন্মাত৷ সেই ‘ঢাক’ গাছের নামানুসারে এই জনপদের নামহয়েছে ঢাকা৷ ‘ঢাকাভাষা’ নামের একপ্রাকৃত ভাষা থেকে ঢাকা নাম এসেছে ব’লে কেউ কেউ মনে করেন৷ আবার “রাজতরঙ্গিনী”-তে ‘ঢাক্কা’ শব্দটি ‘পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র’ হিসাবে উল্লিখিত৷ ‘ঢাক্কা’ থেকে ব্যঞ্জন বিলোপের মধ্যে দিয়ে ঢাকা শব্দটি উদগত হয়েছে ব’লে অনেকের ধারণা৷ এলাহাবাদ শিলালিপিতে উল্লেখিত সমুদ্র গুপ্তের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য হিসাবে ‘ডবাকই’-এর উল্লেখ আছে৷ এই ‘ডবাকই’ শব্দই বিবর্তনের হাত ধরে ‘ঢাকা’-য় রূপান্তরিত হয়েছে ভাষাচর্চার সঙ্গে যুক্ত কো’ন কো’নাব্যক্তির ধারণা৷

“আকবরনামা” গ্রন্থে ঢাকা একটি সামরিক ফাঁড়ি বা থানা হিসাবে উল্লিখিত হয়েছে৷ আবার “আইন-ই আকবরী”-তে সরকার বাজুহার একটি পরগণা হিসাবে ঢাকাবাজু উল্লিখিত আছে৷ বিদেশী পর্যটক থেকে বিদেশী কোম্পানীর কর্মকর্তারা তাদের নানা বিবরণ ও চিঠিপত্রে ঢাকা নামটি ব্যবহার করেছেন৷ তবে মুসলিম শাসনের আগের সময় পর্যন্ত ঢাকা জেলা অঞ্চল বঙ্গ প্রশাসনিক অঞ্চল হিসাবেই পরিচিত হয় এবং ‘বঙ্গ’ নামেই পরিচিত হয় ৷ ‘ঢাকা’ নামের উচ্চারণ ছি’ল ‘ডাক্কা’৷ এর ইংরাজী বানান ছি’ল ‘Dacca’. ১৯৮২ সালে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার ঢাকার সরকারী নাম ‘ডাক্কা’ (Dacca) থেকে পরিবর্তন ক’রে ‘ঢাকা’ (Dhaka) রাখে ৷

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা আজ এশিয়ার এক প্রসৃদ্ধ নগরী৷ তবে কলকাতার তুলনায় ঢাকা অনেক প্রাচীন! বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থ জানাচ্ছে, খ্রিস্টীয় সপ্তম শতক থেকে ঢাকায় জনবসতি গ’ড়ে ওঠে৷ ৩৫০ থেকে ১১৪০ পর্যন্ত সময় পর্বে কামরূপ রাজত্ব বর্তমান ছি’ল ব’লে জানা যায়৷ দক্ষিণের সীমা ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্য নদী বেষ্টিত ছি’ল৷ যা ঢাকা অঞ্চলকে বেষ্টন ক’রে ছি’ল ৷পালরাই ছিল শেষ রাজবংশ,যারা কামরূপ শাসন করত৷ ঢাকার বিক্রমপুর ছি’ল ৮ থেকে ১১ শতকের সময়কালে পাল বংশের রাজধানী৷ ঢাকা থেকে বিক্রমপুরের দূরত্ব ছি’ল ১২ মাইল৷ পালরাজারা বৌদ্ধ হলেও হিন্দুরাই ছি’ল সংখ্যাগরিষ্ঠ৷ আবার ঢাকার কাছাকাছি এই বিক্রমপুরে সেন বংশের রাজধানী এক সময়ে বর্তমান ছি’ল৷

ঢাকা যেহেতু নদী অববাহিকায় অবস্থিত তাই সঙ্গত কারণেই মোঘল যুগের আগে থেকেই এটি স্থানীয় বাণিজ্য কেন্দ্র হিসাবে পরিচিত হ’তে থাকে৷ অত্যন্ত উচ্চমান সম্পন্ন সূতিবস্ত্রের উৎপাদন কেন্দ্র হিসাবে ভারতের বাইরেও ঢাকার ব্যাপক পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে৷ পৃথিবীর নানা অঞ্চলে ঢাকার মসলিনের প্রভাব ও প্রতিপত্তি গ’ড়ে ওঠে! বুড়িগঙ্গা এবং এর উৎস নদী ধলেশ্বরী ও অন্যান্য বড় নদীর মাধ্যমে প্রায় সবকটি জেলার সঙ্গে ঢাকার ভৌগোলিক সংযোগ সূত্র গ’ড়ে উঠেছে৷ নদী পরিবেষ্টিত এবং নিম্নভূমিলগ্ন এই অঞ্চলটি ছি’ল মুগল শক্তির বিরুদ্ধাচারী বিদ্রোহীদের আবাস ভূমি৷ মুগল কর্তৃত্ব কায়েমের জন্য ঢাকাকে বেছে নিয়ে ইসলাম খান যথেষ্ট দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছিলেন বলা যায়৷ ‘ঢাকাদুর্গ’ নামক স্থানটিকেই তিনি তাঁর আবাসভূমি রূপে গ’ড়ে তোলেন৷ মুগলদের প্রচেষ্টায় ঢাকার পরিধি বৃদ্ধি পেতে থাকে৷ পশ্চিমের দুর্গ থেকে শুরু ক’রে পূর্বদিকে বর্তমান সদরঘাট পর্যন্ত পরিচিত যে অংশটি সেই পর্যন্ত ছি’ল ঢাকা শহরের বিস্তৃতি৷

প্রশাসনিক এবং সরকারি কাজে গতি আনার জন্য সময়ের সঙ্গে তাল রেখে ঢাকা শহরটির সম্প্রসারণ ঘটতে থাকে৷ এ অঞ্চলে মুঘল সামরিক ও বেসামরিক কর্ম-কর্তাদের বসবাস বাড়তে থাকে৷ “দীউয়ান বাজার”, “বখশী বাজার”, “অতীশখানা” প্রভৃতি স্থাননাম আজও এই ইতিহাসগন্ধী সাক্ষ্য বহন করছে! পাশাপাশি অর্থনৈতিক লেনদেন তথা ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রভূমি হিসাবে ঢাকা শহরের সমৃদ্ধি ঘটতে থাকে৷ হিন্দু বৃত্তিজীবীদের কাছেও ঢাকা ছি’ল ভাগ্যন্নোতি ঘটাবার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র৷ এর প্রমাণ যেন আজও জড়িয়ে আছে—”তাঁতিবাজার”, “শাখাঁরিবাজার”, “নওয়াবগঞ্জ” “আলমগঞ্জ” প্রভৃতি নামের সঙ্গে! আবার “দেউড়ি” নামাঙ্কিত “বেচারাম দেউড়ি”, “মীরজামাল দেউড়ি” প্রভৃতি স্থাননাম গুলিও প্রমাণ করে এখানে সামন্ততান্ত্রিক সংস্কৃতির আধিপত্য স্বরূপ জমিদারি রাজত্বের কর্তৃত্বও বর্তমান ছি’ল৷ ১৬৬৬ খ্রিঃ পর্যটক টেভানিয়ারের বিবরণ থেকে জানা যাচ্ছে যে, সেই সময়ে ঢাকা ছি’ল রীতিম’ত বৃহৎ জনবসতিপূর্ণ শহর৷ বাস্তব লাভের কথা ভেবে বেশীরভাগ মানুষ নদীতীর সংলগ্ন অঞ্চলকে বসতি হিসাবে গ’ড়ে তোলার কারণে শহরটি একতরফা ভাবে দৈর্ঘ্যে প্রস্থে বাড়তে থাকে৷ তবে এর কিছুকাল পর অর্থাৎ ১৬৬৯-৭০ সাল নাগাদ ঢাকায় আগত ইউরোপিয়ান পর্যটক টমাস বাউরির অভিমতানুসারে ঢাকা শহরটি ছি’ল যথেষ্ট সুপ্রশস্ত এবং সবমিলিয়ে এর পরিধি ছি’ল প্রায় চল্লিশ মাইলের কাছাকাছি ৷

বাংলাদেশের ইতিহাস ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছে কেন্দ্রভূমি ঢাকাকে কেন্দ্র ক’রেই৷ “নগর ইতিহাসবিদ ও ঢাকা নগরের ইতিহাস চর্চাঃ পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমল” প্রবন্ধে মোহাঃ খালেদ সাইফুল্লাও বলেছেন—”সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে সুবাদার ইসলাম খান ১৬১০(মতান্তরে ১৬০৮) খ্রিঃ সুবা বাংলার প্রাদেশিক রাজধানী হিসাবে ঢাকাকে প্রতিষ্ঠা করেন৷ রাজধানী হিসাবে ‘ঢাকা’ মুগল আমলেই জাঁকজমকপূর্ণ হ’য়ে ওঠে ৷ শায়েস্তা খানের সময়ে ছিল মুগল ঢাকার স্বর্ণযুগ৷ অষ্টাদশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে সুবাহাদারি পাটনায় এবং দিওয়ানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর হওয়ায় ঢাকা রাজধানী শহর হিসাবে তার মর্যাদা হারায় এবং সেই থেকে ঢাকার অগ্রযাত্রা ব্যাহত হয়৷ রাজনৈতিক, সামরিক ও প্রশাসনিক কাজের কেন্দ্র হিসেবে এই সময় একদিকে যেমন কলকাতার উথ্থান হয়, অন্যদিকে তেমনি ঢাকার পতন হয়৷”

মোটমুটি আঠারো শতক থেকে ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির দাপট ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার গৌরব একটু একটু ক’রে ক্ষুন্ন হ’তে থাকে৷ ইউরোপীয় কোম্পানিগুলি শিল্প-কলকারখানার মুক্তাঞ্চল হিসাবে ঢাকা শহরের উত্তর অংশকেই বেছে নেয়, এর ফলে ঢাকা শহর উত্তরদিকে ক্রমশ বিস্তৃত হ’তে থাকে৷ তেজগাঁও এলাকাই ছি’ল এ সময় শিল্প-কারখানা স্থাপন ও বিস্তারের অন্যতম প্রাণ কেন্দ্র৷ চীন, আরব, পারস্য, মালয়, আর্মেনিয়, জাভা, সুমাত্রা ইত্যাদি নানান দেশ থেকে বণিকদের অবাধ যাতায়াত ছি’ল ঢাকায়৷ এমনকি মাড়োয়ারি ব্যাঙ্কার ও মহাজনরাও অর্থলগ্নির জন্য ঢাকাকে বেছে নিয়েছি’ল৷ ইউরোপীয় বণিকদের মধ্যে পর্তুগিজরা ঢাকায় সর্বপ্রথম পদার্পণ করে৷ পর্তুগিজ শিল্পবণিকদের পাশাপাশি ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্য নিয়ে পর্তুগিজ পাদ্রিরাও ঢাকায় আসে এবং গির্জা নির্মাণ করে৷ এরই সঙ্গে আবার ওলন্দাজ, ইংরেজ, ডাচ ও ফরাসি বণিকরাও এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে তোলে৷ আমদানি-রপ্তানির হাত ধরে ঢাকায় বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনীতির বিকাশ ঘটতে থাকে৷ তবে বাংলার বুকে ইংরেজ ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির দোর্দন্ড প্রতাপ বৃদ্ধি পাওয়ার মধ্যে দিয়ে ঢাকার নিজস্ব নাগরিক অর্থনীতির ভিত্তি বেশ মারাত্মকভাবে জখম হয়৷ এর ফলে আর্থ-সামাজিক ক্ষমতার বিন্যাস বৈচিত্র্য যেমন বদলে যায় , ঠিক তেমনিভাবে বেকার সমস্যা বেশ ভরাবহভাব আকার লাভ করে! বিকল্প জীবিকার অনুসন্ধান মানুষকে তৎপর ক’রে তোলে৷ ফলে মানুষ ঢাকা ছেড়ে নানান সুবিধাজনক স্থানে ছড়িয়ে পড়তে থাকে৷ এর ফলে জনবিন্যাসে বড় সড় পরিবর্তন আসে৷ স্বাভাবিক কারণেই জনসংখ্যা দিন দিন কমতে থাকে! সব মিলিয়ে ঢাকার সামগ্রিক জীবন-সংস্কৃতির মানেরও অবনমন ঘটতে থাকে৷ তবে ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ঢাকা আবার তার লুপ্ত গৌরব ফিরে পেতে ঘুরে দাঁড়াবার সুযোগ পায়৷

উনিশ শতকের প্রায় মধ্যভাগের কাছাকাছি সময়পর্বে ধারাবাহিক নগর উন্নয়ণের সূচনা হয় এবং ঢাকার গুরুত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে৷ ইউরোপের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংগোগের পাশাপাশি নব্য শিক্ষাধারা এবং নতুন নতুন ব্যবসা বাণিজ্যের হাত ধরে ঢাকা আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে৷ সরকারি স্তরে জন পরিষেবামূলক বেশ কিছু পদক্ষেপ, যেমন— শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নির্মাণ প্রকল্প, যোগাযোগ ইত্যাদির হাত ধরে ঢাকার নব উথ্থান ঘটতে থাকে৷ সরকারি কর্মকান্ডের হাত ধরে ঢাকা একটি সমৃদ্ধ প্রশাসনিক কেন্দ্রে পরিণত হয়৷

ব্রিটিশ আমলে ঔপনিবেশিক তথা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম আন্দোলনের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হ’য়ে ওঠে ঢাকা৷ মহাবিদ্রোহের সময়ে লালবাগ দুর্গের বাংলা সেনাবাহিনির সিপাহিরা ব্রিটিশ বিরোধী বিদ্রোহে যথেষ্ট ইতিবাচক ভূমিকা নেয়৷ ১৮৮৫ তে জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাএবং সংগঠন সম্প্রসারণের কালে ঢাকা নগরীও কংগ্রেসী কার্যকলাপের অন্যতম প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়৷ ঢাকাতেও চরমপন্থী কার্যকলাপ ছড়িয়ে পড়েছি’ল৷ এসব ঘটনা ব্রিটিশদের মনে ভালোম’ত ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছি’ল৷ এই কারণেই এরপর থেকে তারা তাদের যে কো’ন প্রশাসনিক পদক্ষেপে যথেষ্ট সজাগও সতর্ক ভাবেই কূটনীতির আশ্রয় নিতে থাকে৷ এ জন্যই ১৮৮৫ সালে কলকাতার পরে ঢাকা নগরীকে সর্ববৃহৎ বেসামরিক কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলতে ব্রিটিশ প্রশাসন মনোযোগী হয়ে ওঠে৷

১৯০৫ – ১০, এই সময় পর্বে প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসাবে ঢাকার গুরুত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে৷ এ সময় পূর্ববাংলা ও আসাম নামে নতুন প্রদেশের রাজধানী হিসাবে ঢাকা বেশ মর্যদ্যাসম্পন্ন অবস্থানে পৌঁছয়৷ ১৯৪৭ এ বহু কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা এ’ল ভারতবর্ষকে দ্বি-খন্ডিত করার মধ্যে দিয়ে! অঙ্গচ্ছেদের অসহনীয় যন্ত্রণার ভেতর দিয়েই জাতিরাষ্ট্র নির্মাণের এক নয়া অধ্যায় শুরু হ’ল! স্বাধীনতার মুহূর্তে পাকিস্তান বিভক্ত ছিল- পশ্চিম পাকিস্তান এবং পূর্ব-পাকিস্তান, এই দুই অংশে৷ পূর্বপাকিস্তানের অবস্থান ছিল ভৌগোলিক ভাবে ভারতবর্ষের পূর্বসীমান্ত ঘেঁষা৷ পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে নানা কারণে যথেষ্ট স্বাতন্ত্র্য বর্তমান ছি’ল৷ আপাত ভাবে ধর্মীয় ভাবাবেগের প্রাণনা দুটি অংশের মানুষকে একই রাষ্ট্রের মধ্যে সমাবিষ্ট করলেও , কৃষ্টি তথা সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য বোধ উভয় অংশের মানুষের মধ্যেই ক্রমশ এক দূরত্ব ঘনিয়ে তোলে৷ দিনে দিনে এই দূরত্ব বাড়তেই থাকে৷ ফলত উভয় সমাজের মধ্যেই পারস্পরিক বিরূপতা ও বিরোধিতা ধীরে ধীরে প্রকট হ’য়ে উঠতে থাকে৷ পশ্চিম পাকিস্তান যেখানে অ-বাংলাভাষী মানুষের বাসভূমি, সেখানে পূর্বপাকিস্তানের অধিকাংশ মানুষই ছিল বাংলাভাষী৷ এই ভাষাগত পার্থক্য তথা স্বাতন্ত্র্য উভয় অঞ্চলের মানুষের মধ্যে স্থায়ী ও আন্তরিক ঐক্য গড়ে ওঠার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াল৷ এর ফলে ইসলামীয় সত্তার সঙ্গে জাতিসত্তার দ্বান্দ্বিক অভিঘাত উভয় প্রদেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্কগত জটিলতা ও মানবিক সংকট ঘনীভূত ক’রে তুলল৷

সাবেক পূর্বপাকিস্তান কৃষি উৎপাদনে ছিল যথেষ্ট সমৃদ্ধ৷ পাকিস্তান সরকারের জাতীয় নীতিতে কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বিষয়টি এক প্রকার উপেক্ষিত ছিল৷ এছাড়া প্রশাসনিক দিক থেকেও পূর্ব পাকিস্তান ছিল রীতিম’ত বৈষম্যের শিকার৷ সব দিক থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানের কায়েমি স্বার্থের বাড়বাড়ন্ত তথা একচেটিয়া কর্তৃত্ব এবং আধিপত্য ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে৷ একটা কথা মানতেই হবে যে, দেশভাগের অনেক আগে থেকেই পূর্ববাংলার মানুষের মন প্রাণ জুড়ে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে এক স্বতন্ত্র ভালোবাসা ও মর্যাদা বোধ তৈরি হয়ে উঠেছি’ল৷ মওলানা আকরম খাঁ ১৯৩৭ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভায় বাংলাকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তুলেছিলেন৷ এর অনেক আগে ১৯১৮ সাল নাগাদ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বিশ্বভারতীর এক সম্মলনে ভারতের সাধারণ ভাষা হিসাবে বাংলা ভাষাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা দেবার দাবি উথ্থাপন করেছিলেন৷ নানান পর্যায়ে নানান পরিকল্পনার পর ১৯৪৭-এর ২৯-শে জুলাই আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য জিয়াউদ্দিন আহমদ উর্দু ভষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা করার প্রস্তাব পেশ করেন৷ এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা ক’রে প্রতিবাদ জ্ঞাপন করেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ৷ এ ঘটনার অনেক আগে ১৯৪৩ সালে ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ের এস.এম হলে অনুষ্ঠিত এক সাহিত্য সম্মেলনে বাংলা ভাষাকে পূর্ব-বাংলার রাষ্ট্রভাষা করার জোরালো দাবি জানানো হয়েছিল৷ তাই অতর্কিতে যদি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে একবারে বাতিলের তালিকায় ফেলে জোর পূর্বক রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস কায়েমের দ্বারা উর্দু বা বাংলা ছাড়া যে কো’ন ভাষাকে চাপিয়ে দেওয়ায় হয় তাহ’লে তার প্রতিক্রিয়ায় যে বাংলাভাষী মানুষদের দ্বারা প্রবল গণ প্রতিরোধ গড়ে উঠতে পারে, সেটাই তো স্বাভাবিক ঘটনা৷ কো’ন রকম পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই পাকিস্তান সরকার ১৯৪৭-এর নভেম্বরে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা রূপে সরকারি নানা ক্ষেত্রে ব্যবহার শুরু করে৷ প্রাথমিক ভাবে এর প্রতিবাদ স্বরূপ ঢাকা অঞ্চলের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিপত্র পেশ করেন তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের মূখ্যমন্ত্রীর কাছে৷ এর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু ক’রে ঢাক সহ পূর্ববাংলার নানা অঞ্চলে বাংলাভাষার দাবি নিয়ে সভা, সমিতি ও আলোচনা সভা চলতে থাকে৷ এই সব কিছুর মিলিত ফলস্বরূপ ১৯৫২ সালে গোটা পূর্ববঙ্গ জুড়ে বৃহত্তর গণআন্দোলন গড়ে ওঠে৷ এই আন্দোলনের স্ততঃস্ফূর্ত ঢেউ পৃথিবীর নানা প্রান্তের বাংলাভাষী মানুষকে এক ভাষাগত ঐক্য চেতনায় উজ্জীবিত ক’রে তোলে৷ ভাষা আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মনে মুক্তি যুদ্ধের তীব্র বাসনা জাগিয়ে তোলে৷ এক রক্তক্ষয়ী অভ্যুথ্থান ও সংঘর্ষের ভেতর দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশ করে ১৯৭১-এর ১৬-ই ডিসেম্বর৷ ১৯৭২-এ নভেম্বরের চার তারিখে স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন সংবিধান গৃহীত ও কার্যকরী হয়৷ অতএব, রাজধানী শহর হিসাবে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, শিক্ষা ও সংস্কৃতি সবদিক থেকে ঢাকার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়৷ ঢাকা আজ বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও সামরিক ক্ষমতার সর্বোচ্চ কেন্দ্র৷

ঢাকা নগরীর বর্তমান রূপঃ ঢাকা দক্ষিণ ও ঢাকা উত্তর৷ দক্ষিণই হ’ল মূল নগরী৷ ঢাকা উত্তর আসলে নতুন ভাবে বর্ধিত উপশহরগুলো নিয়ে গঠিত৷ বর্তমানে ঢাকা নগরীর জনসংখ্যা প্রায় ২ কোটি ১০ লক্ষ৷ আয়তন—৩৬০ বর্গকিলোমিটার৷ স্থানীয় প্রশাসন হিসাবে রয়েছে, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন৷ ভৌগোলিক ভাবে ঢাকাকে অতিমহানগরী বা মেগাসিটি বলাই যেতে পারে৷ ঢাকা মহানগরীর আদি অঞ্চলটি ‘পুরান ঢাকা’ নামে পরিচিত৷ এককথায় এটাই হ’ল ঢাকা মহানগরীর সবচেয়ে ইতিহাস সমৃদ্ধ এবং পুরান অংশ৷ এর সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যই এর গৌরব ও ঐতিহ্যের বিশিষ্ট দিক৷ এই পুরান ঢাকার উল্লেখযোগ্য অঞ্চলগুলি হ’ল; নবাবপুর, সূত্রাপুর, ইসলামপুর, আজিমপুর, টিকাটুলি, মাহুতটুলি, বাদামতলী, নিমতুলি, মালিটোলা, ফরাসগঞ্জ, উলটিগঞ্জ, রহমতগঞ্জ, আলমগঞ্জ ইত্যাদি৷ মুঘলদের ভোজন বিলাসের রসপ্রিয় সংস্কৃতি পুরাতন ঢাকার অত্যন্ত আন্তরিক গৌরব হিসাবে স্বীকৃত৷ এই স্বীকৃতিকে নান্দনিক করে তুলেছে নানা প্রকার কাবাব, তোহারি, মোরগ পোলাও, কাচ্চি, কাশ্মীরি শরবত, দইবড়া, কিমা পরটা, শাকপুলি, ছানামাঠা-র ম’ত অতি জনপ্রিয় খাদ্যসমূহ৷ এখানকার কুড়ি প্যাঁচ ওয়ালা অতি সুস্বাদু জিলাপির ওজন ১ থেকে ৪ কেজি পর্যন্ত হয়! আবার ‘বাকরখালি’ হ’ল এমন এক সুস্বাদু রুটিজাতীয় খাবার যা সাতসকালে না খেলে পুরান ঢাকার মানুষদের কাছে সারাদিনটাই বিস্বাদ মনে হয়৷ এখানকার বহু পরিবার বংশ পরম্পরায় এই বাখরখালি তৈরি ও এর ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে৷

পুরান ঢাকায় এক সময় পায়রা ওড়াবার প্রতিযোগিতা হ’ত৷ আজ ক্ষীণভাবে হলেও তা টিকে আছে৷ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, আঞ্চলিক স্বাতন্ত্র্যবোধ, পোশাক , কুটিরশিল্প, নানান সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড, পঞ্চায়েত প্রথা সবদিক দিয়েই পুরান ঢাকা যেন সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের কাছেই অত্যন্ত আগ্রহ আকর্ষণের কেন্দ্র ৷ পুরান ঢাকা যেন আজও সেই মোঘল ঘরানার দরবারি ও নাগরিক সংস্কৃতির ইতিহাসকে বক্ষলগ্ন করেই এগিয়ে চলেছে। এখনও পুরান ঢাকার কোনো কোনো অঞ্চলে উর্দু কবির উপস্থিতিতে ‘শায়ের’ অনুষ্ঠিত হয়৷ এটি হ’ল নানা অনুষ্ঠানে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা পাওয়ার অনুষ্ঠান৷ এ যেন অনুষ্ঠানের ভেতরে অনুষ্ঠান! কয়েক ‘শ বছরের ইতিহাস পেরিয়ে তৈরি হয়েছে ‘ঢাকাইয়া ভাষা’৷ উর্দু, বাংলা এবং বিভিন্ন স্বানীয় ভাষার মিশ্রণে গড়ে উঠেছে এই ভাষা৷ এ ভাষা পুরান ঢাকার ভাষিক অলংকার৷ ঢাকার উপভাষা হিসাবে এর অস্তিত্ব নিয়ে ভাষাবিজ্ঞানীরা আশাবাদী৷ ‘তাজিয়া মিছিল’, ‘আগুন খেলা’, ‘মোরগ লড়াই, , ‘কবুতরের লড়াই’, ‘লাঠিখেলা’, ‘গোল্লাছুট’, ‘কানামাছি’-র ম’ত নানা আনন্দদায়ক খেলা আজও কমপিউটার ও ভি.ডি.ও গেমস্ এর সঙ্গে অসম যুদ্ধ ক’রে পুরান ঢাকার ব্যবহারিক জীবনে টিকে আছে৷ বিশ্বায়িত অপসংস্কৃতির দাপুটে চোখে চোখ রেখে আজও টিকে আছে- বাউল, মুর্শিদি, জারি, সারি, গজল, কাওয়ালি-র ম’ত ঐতিহ্যশীল সাংস্কৃতিক সম্পদ৷ আবার আজও রমজান মাসের ভোররাতে তরুণ যুবকরা মিলিত কন্ঠে গেয়ে ওঠে ‘কাসিদা’-র ম’ত ধর্মীয় সংগীত৷ পুরান ঢাকার এ এক আবহমান ধর্মীয় কৃষ্টি৷ পেশাদার ‘কাসিদা’ গায়কদেরও দেখা মেলে এখনও৷

আহসান মঞ্জিল, লালবাগ কেল্লা, আর্মেনীয় গির্জা, বাহাদুর শাহ পার্ক, তারা মসজিদ, জগন্নাথ বিশ্ববদ্যালয়, এসবই হ’ল পুরান ঢাকার প্রাণের সম্পদ৷ ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসাবে এগুলিও আজও সমগ্র বাংলাদেশের কাছে ঐতিহ্যের স্মারক৷ ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার আন্তরিক মেলবন্ধনে ঢাকার অগ্রণী ভূমিকা ভোলার নয়৷ তাই পুরান ঢাকার রাস্তায় ঘোড়ায় টানা টমটমের পাশে দিব্যি এগিয়ে চলে নব্য অভিজাতর বি.এম.ডবলিউ৷ এটাই পুরাতন ঢাকার সহনশীলতা৷ তাই আধুনিক ডিজিটাল ব্যাঙ্কিং পদ্ধতি যেমন পুরাতন কোন ঢাকাবাসীর কাছে আগ্রহ বা অতি আগ্রহের বিষয়, তেমনই আবার পুরাতন ঢাকার বহু মানুষ আজও সিন্দুক বা আলমারিতে নগদ টাকা সঞ্চয় করতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন ৷ ঝকঝকে সপিংমল থেকে কেনা দামি লেদারের তৈরি মানিব্যাগ বহনকারীর পাশে দিব্যি হেঁটে যেতে পারে টাকার থলি ব্যাগ লুঙ্গির সঙ্গে কোমরে বেঁধে রাখা যে কো’ন আম-আদমি! এজন্য পুরানা ঢাকা আজও মানুষের মন প্রাণ জুড়ে আছে৷

সভ্যতার চলন কো’ন কালেই এক রৈখিক নয়, বরং তা বহু ক্ষেত্রেই বহুরৈখিক,জটিল ও দ্বন্দ্বময়৷ সময় এমন এক শক্তি যাকে বেঁধে বা ঠেকিয়ে রাখা কো’ন কালে সম্ভব হয়নি এবং আজ বা আগামীদিনও তা সম্ভব হবে না ৷ পৃথিবীর আরও অনেক নগর সভ্যতার ম’ত ঢাকা আধুনিকতার পথে যাত্রা করেছে সময়ের দাবি মেনে, সময়েরই হাত ধরে৷ শিক্ষা-সংস্কৃতি সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই হাত ধরাধরি চলছে আলোকদীপ্ত মানুষের এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত ইচ্ছার সহযোগিতার পথ ধরে৷ জনমনেও তীব্র হচ্ছিল আধুনিক হওয়ার স্বপ্নলালিত বাসনা৷ আর তাই ১৮৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা গভর্মেন্টস্কুল খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রভূমি স্বরূপ হ’য়ে উঠেছে৷ ১৮৪১-এ ঢাকা গভর্মেন্ট কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়৷ ১৮৭৪-এ গ’ড়ে ওঠে ঢাকা মাদ্রাসা, যেখানে আরবি-ফারসি-র পাশাপাশি ইংরাজী শিক্ষারও প্রচলন হয়৷ ১৮৮৪-এ প্রতিষ্ঠিত জগন্নাথ কলেজ, যা আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্তরে উন্নীত৷ সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও গ’ড়ে ওঠে৷ ১৮৬৩ সালে ঢাকা কলেজে আইন বিভাগ, ১৮৭৫-এ ঢাকা মেডিক্যাল স্কুল, ১৮৭৬-এ ঢাকা সার্ভে স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়৷ ১৮৭৮-এ প্রতিষ্ঠিত ইডেন গার্লস স্কুল স্ত্রী শিক্ষা বিস্তারে অগ্রগণ্য ভূমিকা নেয়৷ কিছু পরেই প্রতিষ্ঠিত হয় ইডেন কলেজ৷

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়৷ ঢাকা সহ সমগ্র বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশে এই বিশ্ববিদ্যালয় বৈপ্লবিক ভূমিকা নেয়৷ এ হল ঢাকার অক্সফোর্ড৷

বাংলাদেশ শিল্প কলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ জাতীয় আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার, জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্র, নজরুল ইনস্টিটিউট, চারুকলা ইনস্টিটিউট, বুলবুল ললিতকলা একাডেমি, বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম ও শিল্প ব্যাংক ভবন এ গুলি সবই ঢাকা সহ বাংলাদেশের আধুনিক মনন ও চরিত্র নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে চলেছে৷ অতি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, ফুটবল, হকি, ভলিবল ইত্যাদিতে রাজধানী হিসাবে ঢাকার পরিচিতি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে৷

আমরা জানি, ২০১১ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে এবং ম্যাচগুলি ঢাকার মিরপুর ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়েছে৷

বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বাণিজ্য শিল্পের কেন্দ্রভূমি হয়ে উঠেছে৷ শুধু ঢাকা নয়, ঢাকার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলিও বৃহত্তম শিল্পকেন্দ্র হিসাবে পরিচিত হয়ে উঠেছে৷ “পোশাক শিল্প” বর্তমানে ঢাকার সবচেয়ে অর্থকরী শিল্প৷ বিশ্ববাজারে এই শিল্পের প্রভাব নেহাত কম নয়৷ আধুনিক বিপণন তথা বাজার অর্থনীতি ঢাকার অর্থনীতিকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করছে৷

বিশেষ আন্তর্জাতিক কর্মকান্ড হিসাবে উল্লেখযোগ্য হ’ল জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত বইমেলা৷ যে বাংলাভাষা আন্দোলন ঢাকা বিশ্ববিদ্যায় সহ ঢাকার রাজপথকে স্বপ্নে-রক্তে উদ্দীপিত করেছি’ল সেই ভাষাঋণের স্মারক হ’ল এই বইমেলা৷ বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে প্রতিবছর আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসে পুরো ফেব্রুয়ারি মাস ব্যাপী এই বইমেলা অনুষ্ঠিত হ’য়ে থাকে৷ মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির বিবৃদ্ধি ঘটাবার লক্ষ্য নিয়ে গড়ে ওঠা এই বইমেলা বাস্তবিক আন্তর্জাতিক চেহারা লাভ করে৷ বই প্রকাশনার বাজারে ঢাকার ভূমিকা অগ্রগণ্য৷ আবার ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত ও মূল্যকে প্রবহমান কালের বুকে জায়গা করে দিতে ঢাকার বুকে গড়ে উঠেছে যে স্মৃতিস্তম্ভ শহীদ মিনার, তা সত্যিই যেন পৃথিবীর বুকে জেগে থাকা যে কো’ন প্রান্তের, যে কো’ন জমমানসের ও জনসমাজের মাতৃভাষার প্রতীকী স্বরূপ৷ মাতৃভাষার জন্য প্রাণদান, মাতৃভাষার জন্য যে কো’ন প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির চোখে চোখ রেখে মুখোমুখি দাঁড়াবার সর্বকালীন, সর্বজনীন স্পর্ধা, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের বিশ্বজনীন প্রতীক এই স্মৃতিস্তম্ভগুলি৷

থিয়েটার, সংগীত, সাহিত্য, চলচ্চিত্র সহ সাংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঢাকার ভূমিকা সত্যিই বহুমাত্রিক ও বহুবর্ণে উজ্জ্বল৷ আনুমানিক ১৮৬১ সাল নাগাদ ঢাকার প্রথম থিয়েটার মঞ্চ হিসাবে গড়ে ওঠে ‘রঙ্গভূমি’৷ সম্ভবত দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ ঢাকায় প্রথম মঞ্চস্থ নাটক৷ বর্তমানে ঢাকার থিয়েটার বহু ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত৷ অসংখ্য নাট্যদল অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য নাট্য প্রযোজনার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছে৷ এই প্রসঙ্গে কিছু নাট্যদল এবং তাদের কিছু দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী নাট্য প্রযোজনার নাম স্মরণ করা যেতে পারে- নাট্যচক্র (ভদ্দরলক), তাড়ুয়া (লেট মি আউট), নাট্যাঙ্গন (গহর বাদশা ও বানেছা পরী), ঢাকা পদাতিক (পাইচো চোরের কিচ্ছা), শব্দ (চম্পাবতী), সময় নাট্যদল (ভাগের মানুষ), ঢাকা থিয়েটার (ধাবমান), আরশী নগর (রহুচন্ডালের হাড়), জাগরণী (রাজার চিঠি), থিয়েটার আর্ট ইউনিট ( না-মানুষি জমিন), ইত্যাদি৷

সামগ্রিক ভাবে থিয়েটারি কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন, এমন কিছু উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব হলেন- নাসির উদ্দিন ইউসুফ, সৈয়দ শামসুল হক, আতাউর রহমান, আবদুল্লাহ আলমামুন, মামুনুর রশীদ, সেলিম আল দীন, সৈয়দ জালিম আহমেদ, বিপ্লব বালা, আব্দুস সেলিম, জাহিদ রিপন, সাইদুর রহমান রিপন, গোলাম শফিক, তারিক আলম খান, প্রমুখ নাট্য ব্যক্তিবর্গ ৷

১৯৭৩ সালের ২৯ শে জুলাই কয়েক জন তরুণ তুর্কি মুক্তি যোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পাথেয় করে গড়ে তুলেছিলেন “ঢাকা থিয়েটার”৷ মঞ্চ নাটকের রূপরীতির বিনির্মাণে এই নাট্য দলের ভূমিকা অত্যন্ত ইতিবাচক৷ নাটকের আঙ্গিক নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে এই দলের থিয়েটার যাপন৷ এই দলের উল্লেখযোগ্য প্রযোজনার সংখ্যা চশ্লিশের কাছাকাছি৷ তার মধ্যে “পুত্র”, “সংবাদ কার্টুন”, “সম্রাট ও প্রতিদ্বন্দ্বীগণ” বিশেষভাবে উল্লেখ যোগ্য৷ ১৯৮২ সালের ১৮-ই জানুয়ারী প্রতিষ্ঠিত “বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার” বাংলাদেশের একটি মঞ্চনাটক গোষ্ঠী, জাতীয় নাট্যআঙ্গিক নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই দল উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে চলেছে ৷

১৯৬৭ সালের জুন মাসে পাকিস্তানের তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন রেডিও-টেলিভিশনে রবীন্দ্র সংগীত প্রচারের বিরুদ্ধে ফ্যাসীবাদী কায়দায় ফতোয়া জারি করলেন৷ তাঁর এবং তাঁর পৃষ্ঠপোষক সম্প্রদায়ের স্পষ্ট হুকুম এই যে, রবীন্দ্রসংগীত পাকিস্তানের আদর্শের পরিপন্থী, অতএব তা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ৷ এই ফ্যাসিস্ট আচরণের বিরুদ্ধে মুক্তমনা মেধাজীবীদের পক্ষ থেকে খুব জোরাল এবং মার্জিত প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধ কল্প ঘোষিত হল৷ বলা হ’ল যে— রবীন্দ্রনাথ আত্মিক এবং সৃজিতভাবে প্রতিটি বাংলাভাষী পাকিস্তানীর অভিন্ন ও অবিচ্ছেদ্য অংশ৷ বিরুদ্ধবাদিরাও পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ফেটে পড়লেন৷ শুরু হ’ল এক নয়া আন্দোলনের পর্ব৷ শুধু রবীন্দ্রসংগীত নয়, সামগ্রিকভাবে রবীন্দ্র সাহিত্য চর্চাতেও প্রবল এক জোয়ার এল৷ যাঁর মানবিক সৃষ্টিকে খারিজ করার চক্রান্ত চলছে, সেই চক্রান্তের গোড়া গেঁষে কোপ মারার সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ হতে পারে তাঁরই সৃষ্টির চর্চা দিয়ে সমাজমনকে সার্বিক ভাবে জাগিয়ে তোলা৷ তাই এর সূচনা হিসাবে ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে টানা তিন দিন ধরে অনুষ্ঠিত হ’ল বুলবুল কলাকেন্দ্র ‘বাফা’ এবং ‘ছায়ানট’-এর সম্মিলিত রাবীন্দ্রিক অনুষ্ঠান৷ চারিদিকে রবীন্দ্রচর্চার ঢেউ জেগে উঠল৷ আসলে ঢাকার সাংগীতিক ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের৷

ঢাকার দরবারী সংগীতের ইতিহাস যথেষ্ট সমৃদ্ধ৷ সংগীতের নানান দিক এখানকার সংগীত প্রেমীদের সংগীত চর্চাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে৷ বাংলাগানের বহুবিচিত্র ধারা ঢাকার শিল্পীদের চর্চায় সমৃদ্ধ হয়ে চলেছে৷ “নজরুল সংগীত শিল্প পরিষদ” নজরুল সংগীত চর্চার এক ধারাবাহিক ইতিহাস তৈরি করে চলেছে৷ ঢাকার আঁগারগাওতে ১৯৬৩-তে প্রতিষ্ঠিত হয় “সরকারি সংগীত মহাবিদ্যালয়”৷ এটি সংগীতচর্চার একটি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান৷

১৯২৭ থেকে ১৯৩৭, এই সময় পর্বে, কাজী আব্দুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন এবং আবুল হোসেনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা “মুসলিম সাহিত্য সমাজ” সর্ব অর্থে হয়ে উঠেছিল এক আন্দোলনের নাম৷ তাঁরা চেয়েছিলেন বুদ্ধির মুক্তি৷ এই আন্দোলন তাই হয়ে উঠেছি’ল বুদ্ধি মুক্তির আন্দোলন৷ “শিখা” পত্রিকা ছিল এই আন্দোলন ও সংগঠনের মুখপত্র৷ মুক্তবুদ্ধির চর্চায় সমাজমনকে মুক্ত ও প্রসারিত করাই ছি’ল এই আন্দোলনের মৌল অভিপ্রায়৷ ঢাকা শহরে সাহিত্য চর্চার ইতিহাস নানা দিক থেকেই অত্যন্ত ঋদ্ধ৷ এই অবকাশে কিছু উল্লেখ যোগ্য সাহিত্য ব্যক্তিত্ব এবং সাহিত্যিক দৃষ্টান্ত স্মরণ করতে পারি— কবি, শামসুর রহমান (‘বন্দি শিবির থেকে’/’ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা’ দুঃসময়ের মুখোমুখি”/), আল মামুদ (‘কালের কলস’/ ‘সোনালি কাবিন’/’মিথ্যাবাদী রাখাল’), আহসান হাবিব (‘রাত্রি শেষে’/’সারাদুপুর’/’দুই হাতে দুই আদিম পাথর’), ফারুখ আহমদ (‘সাত সাগরের মাঝি’), আব্দুল গনি হাজারী (‘সাম্যের ধন’), আবুল হোসেন (‘নব বসন্ত’), আনোয়ার পাশা (‘নদী নিঃশেষিত হলে’), বেলাল চৌধুরী(‘নিষাদ প্রদেশ’/’স্বপ্নবন্দী’), এছাড়াও রয়েছে আরও অসংখ্য কবির অসংখ্য উল্লেখ করার ম’ত কাব্য গ্রন্থ ৷

কবিতার ম’ত এখানকার কথা সাহিত্যের জগৎও যথেষ্ট স্বর্ণখোচিত ও বর্ণময়৷ যেমন-আবু ইসহাক (‘সূর্য-দীঘল বাড়ি’) আবুলফজল (‘সাহসিকা’), আবুল মনসুর আহমদ (‘ধর্ম ব্যবসায়ী), সত্যেন সেন (বিদ্রোহী কৈবর্ত্য’), শওকত ওসমান (‘জননী’), সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (‘লালসালু’), শহীদুল্লাহ কায়সার (‘সংশপ্তক) বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য৷

কয়েকটি উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ ও প্রাবন্ধিকের নাম না করলেই নয়, কেননা এ সমস্ত রচনায় যে মননশীলতার চর্চা ধরা পড়েছে তা সত্যিই উল্লেখের দাবী রাখে৷ যেমন- ‘অভিভাষণ (মুহম্মদ শহীদূল্লাহ), ‘মার্চের স্বপ্ন’ (মুনতাসীর মামুদ), ‘বাঙালির আত্ম পরিচয়ের সূত্রপাত (আবু জাফর শামসুদ্দীন), ‘বাংলাদেশঃ পালিয়ে বেড়ায় দৃষ্টি এড়ায়’ (হাসান আজিজুল হক), ‘মুসলমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ (বররুদ্দীন উমর) ইত্যাদি ৷

সাময়িক পত্র-পত্রিকা ছাড়া সাহিত্য ও সাংবাদিকতার সংস্কৃতি পরিণত হতে পারে না৷ এ ব্যাপারেও ঢাকা পিছিয়ে ছি’ল না৷ ১৮৪৯ সালে কাটরা প্রেস কর্তৃক ব্যাপটিস্ট মিশনারির প্রকাশিত ‘ঢাকা নিউজ’ হ’ল ঢাকা শহরের প্রথম সংবাদ পত্র৷ আর ১৮৬১ সালের ৭-ই মার্চ প্রকাশিত ‘ঢাকা প্রকাশ’ হ’ল ঢাকায় বাংলভষার প্রথম সংবাদ পত্র , প্রথম সম্পাদক ছিলেন , কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার ৷ ঢাকা জেলার কয়েকটি উল্লেখ যোগ্য পত্র-পত্রিকা হ’ল- ‘বাংলার বাণী’, ‘বিষাণ’, ‘ভোরের কাগজ’, ‘ব্যানার’, ‘একুশে’, ‘জাগ্রত কন্ঠ’, ‘ফসল’, ‘মাতৃভূমি’, ‘জনকন্ঠ’, ‘প্রভাত’ ইত্যাদি৷

ঢাকার নানা কথা, নানা দিক নিয়ে আরও অনেক অনেক কিছু বলার কথা বাকী রয়ে গে’ল৷ ঢাকার ম’ত এক মহাকাব্যিক নগর সভ্যতা নিয়ে এত সহজেই কী কিছু ব’লে ফেলা যায়! যায় না, যাওয়াটা সম্ভবও নয়৷ এর জন্য দরকার গভীর, নির্মোহ ও বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস চর্চা এবং নিরপেক্ষভাবে সময়ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটকে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা৷ আপাতত সেই চেষ্টাতেই রইলাম৷ ঢাকার সবকিছু নিয়ে গভীর আগ্রহ দীর্ঘায়ু পাবে আশাকরি৷

শুধু এটুকু বলার কথা যে, বর্তমান এই অতিমারির পরিবেশে পৃথিবীর চেহারা আরও ভয়াবহ রকম শোচনীয় হ’য়ে উঠেছে এবং ভয়াবহতার মাত্রা আরও বৃদ্ধি পাবে৷ পুঁজির গর্ভ থেকে উঠে আসবে আরও বহুমাত্রিক অসুখ-বিসুখ৷ আমরা আমাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও নাগরিক জীবনে আরও বহুমুখি বিচ্ছিন্নতার শিকার হ’ব৷ তবুও আমাদের মানবিক চেহারাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে প্রাণপনে, আর তার জন্য প্রত্যেকের নিজের ভেতরে নীলকন্ঠ পাখির খোঁজটুকু আমরণ চালিয়ে যেতেই হবে আমাদের।

           

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>