ভারতের ক্রীড়াজগতে এক উপেক্ষিত নায়ক: ধ্যানচাঁদ

ধ্যানচাঁদ ও হকি এই শব্দ দুটি বোধ হয় সমার্থক। সেই কবে ধ্যানচাঁদের  সতীর্থ ও পরে পাকিস্তান হকির অন্যতম রূপকার আলি ইক্তিদার শাহ্দারা বলে গেছেন- Cricket may affectionately recall its Grace, Hobbs and Bradman, and soccer its Matthews and Puskas, but hockey has one and only one Dhyan Chand, incomparable and unique. বার্লিন অলিম্পিকের সেই ঐতিহাসিক ফাইনালে জার্মানিকে দেওয়া আট গোলের তিনটে ছিল ধ্যানচাঁদের আর দুটো এই এআইএস দারার।  দিনটা ছিল ১৫ আগস্ট,১৯৩৬। হিটলার তখন জার্মানির মসনদে। ধ্যানচাঁদের নেতৃত্বে সেই জার্মানিকে তার ঘরের মাঠে হারিয়ে অলিম্পিকে পরপর তৃতীয়বার হকিতে সোনা জিতেছিল ভারত। জে সি ওয়েন্সের দৌড় আর ভারতের সেই স্বর্ণপদক জয়ের গল্প আজ এক কিংবদন্তিগাথা। অবশ্য ধ্যানচাঁদকে ঘিরে এমন কিংবদন্তি কম নয়! তার কোনটা যে সত্য আর কোনটা যে নয় সেও বলা কঠিন। সমস্যা এটাই যে এতসব কিংবন্তির মাঝে অনেক সময় চাপা পড়ে যায় সেই রক্তমাংসের মানুষটির সত্যিকারের সংগ্রামের কাহিনী।


 ধ্যানচাঁদ


সত্যি কি ধ্যানচাঁদকে হিটলার ব্যক্তিগতভাবে ডেকে সেনাবাহিনীতে উচ্চপদ দিয়ে রেখে দিতে চেয়েছিলেন জার্মানিতে! ধ্যানচাঁদের আত্মজীবনী ‘গোল’-এ ১৯৩৬-এর সেই বার্লিন অলিম্পিকের নানান ঘটনার বয়ান বিস্তারিত ভাবে থাকলেও এবিষয়ে একটা শব্দও নেই। অথচ তাঁর পুত্র ১৯৭৫-এর ভারতের একমাত্র হকি বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য অশোক কুমারের স্মৃতিচারণায় বারবার উঠে আসে সেই কথা। এমন কত যে গল্পের উল্লেখ করা যায়। সেই তাঁর হকি স্টিকে আঠা লাগানো আছে কিনা তার পরীক্ষা থেকে শুরু করে একটি ম্যাচে গোল না পেয়ে ধ্যানচাঁদের আম্পায়ারকে বলে গোলপোস্ট মাপিয়ে ভুল ধরিয়ে দেওয়ার গল্প অবধি। আছে আমস্টারডামে এক মহিলার ওয়াকিং স্টিক নিয়ে হকির জাদু দেখানোর গল্প। এসব ঘটনার কোনোটা সত্যি, কোনোটা নয়।  যেমন অষ্ট্রিয়ার ভিয়েনা শহরে চারটে হাতওয়ালা ধ্যানচাঁদের মূর্তির গল্পটি যার প্রতিটি হাতে ধরা নাকি একটি করে হকি স্টিক, এমন মূর্তি কিন্তু সত্যি নেই অথচ খবরের কাগজ, বিভিন্ন ওয়েব সাইটে এসব গল্পের প্রচার নিয়মিত ভাবে চলে আসছে বছরের পর বছর। আসলে ধ্যানচাঁদের জীবনটা এমনই রূপকথার মত যে তা নিয়ে এমন গল্পগাথা রচিত হবেই। তাঁর নামেই তো আছে এমনই এক গল্প! পিতৃদত্ত নাম ধ্যান সিং সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে বদলে গেল ধ্যানচাঁদে। আসলে সেনাবাহিনীর ডিউটির শেষে রাতেরবেলা চাঁদের আলোতে ঘন্টার পর ঘন্টা অনুশীলন করে যেতেন মানুষটি, সেখান থেকেই ধ্যান সিং হয়ে গেলেন ধ্যানচাঁদ! কিন্তু ধ্যানচাঁদকে সত্যিকারের সম্মান দিতে গেলে এসব গল্পের চেয়েও অনেক বেশি দরকার তাঁর নিষ্ঠা, পরিশ্রম ও দেশের সাফল্যের জন্য সর্বস্ব পণ করার মানসিকতাকে এ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা, সম্মান দেওয়া। মাত্র পাঁচ ফুট সাড়ে ছয় ইঞ্চির এই ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির ‘ফার্স্ট ব্রাহ্মণ রেজিমেন্টের’ সিপাইয়ের ভারতের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ক্রীড়াবিদ হয়ে ওঠার কাহিনী উদ্বুদ্ধ করতে পারে একটা গোটা প্রজন্মকে।


১৯৩৬ এর সোনাজয়ী দল


স্বাধীন ভারতের হকি ও হকি প্রশাসনের কাজের সমালোচনা করে গেছেন ধ্যানচাঁদ। জীবনসায়াহ্নে এসে আক্ষেপ করেছেন ‘ভারতীয় হকি শেষ’ বলে! মেনে নিতে পারতেন না এত সুযোগ সুবিধা পেয়েও খেলোয়াড়দের পরিশ্রম বিমুখতাকে।  আসলে হারতে ভালোবাসতেন না একেবারেই। ১৯৩৬-এর বার্লিন অলিম্পিকের ঠিক আগে জার্মানির সঙ্গে প্রদর্শনী ম্যাচের হার তাঁকে তাড়া করে বেরিয়েছিল অলিম্পিক ফাইনাল পর্যন্ত, ঘুমোতে দেয়নি। তবেই না সেই সোনা জয়ের চূড়ান্ত সাফল্য। ফলে কোনোকালেই রূপো কিংবা ব্রোঞ্জে সন্তুষ্ট হতে পারতেন না তিনি। আবার হারের কোনো অজুহাতেও ছিল আপত্তি। পুত্র অশোককুমারকে একবার এই বলে ধমক দিয়েছিলেন যে- তোমরা হেরেছ কারণ বিপক্ষ তোমার থেকে ভালো হকি খেলেছে, ব্যাস। ব্রিটিশ ভারতে তাঁর হকি কেরিয়ারের উত্থান ও সাফল্য সেইসময়ের সদ্য গঠিত হকি ফেডারেশনের কর্মকর্তাদের অবদানের কথাও কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করেছেন বারবার। ইংরেজ আমলের হকিদলে গনতান্ত্রিক পদ্ধতি, দলবাছাইয়ের স্বচ্ছতা ও ইংরেজ অফিসারদের সাহায্য ও তাদের হকির প্রতি ভালোবাসার কথা নিজের আত্মজীবনীতে অকপটে স্বীকার করেছেন ধ্যানচাঁদ।

ইংরেজ হকি প্রশাসকদের প্রশংসা করলেও  ধ্যানচাঁদ আদ্যন্ত একজন দেশপ্রেমিক। ১৯২৮ সালে আমস্টারডাম অলিম্পিকে ভারতের ক্যাপ্টেন জয়পাল সিং মুণ্ডার হঠাৎ মাঝপথে দল থেকে সরে যাওয়ার পিছনে জাতিবিদ্বেষই যে কারণ তার উল্লেখ করেছেন ধ্যানচাঁদ। ১৯৩২-এ লস এঞ্জেলেস অলিম্পিকে যাওয়ার পথে জাপানে তাঁদের অভ্যর্থনা জানাতে আসে ভারতীয়দের মধ্যে ছিলেন স্বয়ং রাসবিহারী বসু। আবার জার্মানিতে ভারতীয় দলের ব্রিটিশ ইউনিয়ন জ্যাকের পরিবর্তে ভারতীয় তিরঙ্গা ব্যবহার করতে জোর করেছিলেন বিপ্লবী চিন্তাবিদ গদর পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তারকনাথ দাস। এসব কথাও নিজের আত্মজীবনীতে জানাতে ভোলেননি ধ্যানচাঁদ।

বেঙ্গল হকি অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি পঙ্কজ গুপ্তের সাথে ধ্যানচাঁদের বন্ধুত্ব ছিল প্রগাঢ়। তাঁর আত্মজীবনীতে কলকাতা তথা বাংলার মানুষের হকির প্রতি ভালোবাসার কথা বারবার এসেছে। কলকাতা ছিল তাঁর অন্যতম প্রিয় শহর। ভারতীয় হকিতে তথা তাদের অলিম্পিক অভিযানে বাংলার হকি সংস্থার অবদান কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করেছেন ধ্যানচাঁদ। ১৯৪৯-এ কলকাতায় শেষবার খেলার পর তাঁকে দেওয়া সম্বর্ধনা তাঁকে আবেগ তাড়িত করেছিল। আর একটি ব্যাপারে কলকাতার স্মৃতি তাঁর চিরকালীন মনিকোঠায় স্থান নিয়েছে। যে ধ্যানচাঁদের জাদুতে সারা বিশ্বের তাবড় দেশ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে বশ্যতা স্বীকার করেছে তাঁর নিজের মতে জীবনের কঠিনতম ম্যাচটা তিনি খেলেছেন এই কলকাতায় ১৯৩৩-এর বেটনকাপের ফাইনালে কলকাতা কাস্টমসের বিরুদ্ধে। ধ্যানচাঁদের ঝাঁসি হিরোজ্ মাত্র একগোলে জিতেছিল ম্যাচটি।

ধ্যানচাঁদ ভোলেননি নিজের সতীর্থদেরও। নিজের ভাই ও সতীর্থ রূপ সিংয়ের কেউ প্রশংসা করলে তিনি নিজেই বলতেন- রূপ সিং আমার থেকে ভালো খেলোয়াড়। রূপ সিং আবার তাঁর দাদাকে বলতেন- হকির দেবতা। নিজের সতীর্থদের প্রশংসায় ভরিয়ে দিতেন তিনি। গোলকিপার রিচার্ড অ্যালান, হাফ ব্যাক কার্লাইল ট্যাপসেল, গজনফার আলি চুন্নান, ফরোয়ার্ড সৈয়দ মহম্মদ জাফর অথবা দারা সবার জন্য তাঁর অসীম শ্রদ্ধা, তাঁদের কারো মৃত্যুতে প্রকাশ করেছেন প্রিয়জন হারানোর শোক। আবার নিজের কথা বলতে গিয়ে অন্তর্মুখী  সেই মানুষটি বলেন “You are undoubtedly aware that I am a common man first and then a soldier. It has been my training from my very childhood to avoid any limelight and publicity.” হ্যাঁ, এই বাক্য দিয়েই শুরু তাঁর আত্মজীবনী।

Common man, সাধারণ মানুষ! না, মোটেও সাধারণ ছিলেন না তিনি। সারা বিশ্ব সেটা জানত। সেই ১৯২৬ সালে ভারতীয় হকি দলের নিউজিল্যান্ড সফরের মাধ্যমে হকির জগতে প্রবেশের পর থেকে ধ্যানচাঁদের স্টিকের জাদু আচ্ছন্ন করে ফেলে আপমর দর্শকদের। অবশ্য এর আগেই জাদুকরের তকমা পেয়ে গেছেন তিনি। ১৯২৪-এর মিলিটারি টুর্নামেন্টের ফাইনাল। ২-০ তে হারছে তাঁর দল। কমান্ডিং অফিসার ধ্যানচাঁদকে এরপর নাকি বলেন- দল হারছে কিছু করো! তখন মিনিট চারেক আর বাকি খেলার। এরপরই হকির জাদুতে ছেয়ে যায় মাঠ। জাদু শেষে দেখা যায় ৩-২ এ জিতে গেছে ধ্যানচাঁদের দল। তিনটে গোলই ধ্যানচাঁদের! তাই তাঁকে দেখতে ভরে উঠত মাঠ। বার্লিনে অলিম্পিক ফাইনালের আগে নাকি পোস্টার পড়েছিল- হকি ফাইনালে জাদু দেখাতে আসছেন ভারতের জাদুকর ধ্যানচাঁদ, সবাই আসুন খেলা দেখতে। সেন্টার ফরোয়ার্ড পজিশনে খেলে ম্যাচের পর ম্যাচে শুধু গোলের পর গোল। ব্র্যাডম্যান নাকি তাঁর এই গোল করার অদ্ভুত ক্ষমতা দেখে বলেছিলেন- আপনি তো দেখছি ক্রিকেটের রানের মত গোল করেন! ১৯৩৫-এ অ্যাডিলেডে ভারতীয় হকি দলের নিউজিল্যান্ড অস্ট্রেলিয়া সফরের সময় ব্র্যাডম্যানের সঙ্গে সেই সাক্ষাৎকে ধ্যানচাঁদ উল্লেখ করেছেন নিজের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঘটনা হিসেবে। অভিনেতা পৃথ্বীরাজ কাপুর, গায়ক কুন্দনলাল সায়গলরা ছিলেন তাঁর খেলার ভক্ত। ১৯৩২-এর লস এঞ্জেলেস ও ১৯৩৬-এর বার্লিন অলিম্পিক ধ্যানচাঁদের সাথে যোগ দিলেন ছোটভাই রূপ সিং। ভারতের জোড়া ফলার সামনে মাথা নুইয়ে দিল সারা বিশ্ব। ১৯৩৬-এর বার্লিন অলিম্পিকে ধ্যানচাঁদের গোল বারোটি রূপ সিংয়ের তেরোটি। দুই ভাই মিলে একবার বোম্বেতে এক ম্যাচে কে এল সায়গলের সঙ্গে শর্ত রেখে বারোটা গোল করেছিলেন। শর্তটি ছিল এই যে তাঁরা যতগুলি গোল করবেন সায়গলকে ততগুলি গান শোনাতে হবে! মিউনিখে একটা রাস্তা আছে রূপ সিংয়ের নামে। ২০১২-এর লণ্ডন অলিম্পিকের সময় লন্ডনের দুটো টিউব স্টেশনের নামকরণ হয় এই দুই ভাইয়ের নামে, সেই যুগের হকির জগতে যাঁরা পরিচিত ছিলেন হকি টুইন্স নামে।


 হকি টুইন্স ধ্যানচাঁদ ও রূপ সিং


১৯৪৭-এ সদ্য স্বাধীন দেশের হকি ফেডারেশনের কাছে ব্রিটিশ ইস্ট আফ্রিকা (বর্তমানে কেনিয়া) সফর করার অনুরোধ এলো; শর্ত একটাই ধ্যানচাঁদকে পাঠাতে হবে অধিনায়ক হিসেবে। তখন তাঁর বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে। একেই বলে ক্যারিশমা। মধ্য পঞ্চাশেও তাঁর থেকে বল কেড়ে নেওয়া যেত না বলে জানিয়েছেন ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক ও ১৯৬৪-এর টোকিও অলিম্পিকে সোনাজয়ী ভারতীয় হকিদলের সদস্য গুরবক্স সিং। ১৯২৮,৩২,৩৬ তিনটে অলিম্পিক মিলিয়ে তাঁর গোলের সংখ্যা ৩৯। বলা বাহুল্য এই তিন অলিম্পিকে অপরাজেয় ছিল ভারতীয় হকিদল, দিয়েছিল ১০০-এর বেশি গোল। সব হিসেব ধরলে হকিতে তাঁর গোলের সংখ্যা হাজার ছাড়াবে অবশ্য। শুধু জাতীয় দলের হয়েই গোলের সংখ্যা ৪০০ এরও বেশি।  আর একটা ছোট বিষয় মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে এখানে যে ভারতের ক্রীড়াজগতের অরিজিনাল দাদা কিন্তু ধ্যানচাঁদ। এই নামেই তাঁকে ডাকা হতো ক্রীড়াজগতে। ১৯৫৬ সালে পদ্মভূষণ পান ধ্যানচাঁদ। কিন্তু ভারতরত্ন সম্মান আজো অধরা থেকে গেল! এ নিয়ে ধ্যানচাঁদের পরিবারের ক্ষোভ আছে। ক্ষোভ স্বাভাবিক। ভারতের আরেক দিকপাল হকি খেলোয়াড় ও ১৯৪৮, ৫২, ৫৬ অলিম্পিকের সোনাজয়ী দলের সদস্য প্রয়াত লেসলি ক্লডিয়াস বলেছিলেন, It is true that Dhyan Chand did not get his due in the country but that’s how hockey is treated in India. It is regretful.  আক্ষেপ করেন পুত্র অশোক কুমারও। ১৯৭৯-র ৩ ডিসেম্বর  ধ্যানচাঁদের মৃত্যুর পর দিল্লি থেকে ঝাঁসিতে ধ্যানচাঁদের মৃতদেহ এসেছিল সরকারি হেলিকপ্টারে, শেষকৃত্য হয়েছিল পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়। অশোক কুমার বলেন- শুধু বাবুজি এসবের কিছুই দেখতে পেলেন না! বেঁচে থাকাকালীন যদি এসবের একটু পেতেন শান্তিতে মরতে পারতেন!

রাজপুত বংশে জন্ম হলেও হকি ছিল ধ্যানচাঁদের একমাত্র ধর্ম। পিতা সোমেশ্বর সিংও ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে হকি খেলতেন।  ছোটবেলায় অবশ্য ধ্যানচাঁদের হকির থেকে কুস্তিতে আগ্রহ ছিল বেশি। মাত্র ষোলোবছর বয়সে সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেন ধ্যানচাঁদ। তার হকিতে আগ্রহের শুরু সেখানেই। প্রথম কোচ সুবেদার মেজর বালে তিওয়ারি। সেনার পরিচয় ছিল তাঁর কাছে বরাবরের শ্লাঘার বিষয়। সাধারণ সিপাই থেকে শুরু করে তেত্রিশ বছর সার্ভিস করে মেজর হিসেবে অবসর নেন তিনি। সৈনিকের মতই কঠোর নিয়মনিষ্ঠ ছিল তাঁর জীবন। নিয়মানুবর্তিতা ছিল অনুকরনীয়। বৃদ্ধ বয়সেও কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়ার থাকলে ঘন্টাখানেক আগে প্রস্তুত হয়ে যেতেন। বরাবরের মেরুদন্ড সোজা মানুষ তিনি। স্বাধীনতা পরও বেঁচে ছিলেন বত্রিশ বছর। চোখের সামনে দেখেছেন ধীরে ধীরে ভারতীয় হকির ক্রমাবনমন। কিন্তু সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এই হকি খেলোয়াড়ের অভিজ্ঞতা, দক্ষতাকে সেভাবে ব্যবহার করা হলো কই! অভিমান ছিল। কিন্তু মুখ ফুটে সেকথা বলার মত মানুষ ছিলেন না তিনি। যখন যেভাবে হকির উন্নতিতে তাঁকে কোনো দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তা পালন করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে অনাড়ম্বর মানুষটির শখ ছিল শিকার, মাছধরা আর রান্না করা। তাঁর মাছ ধরার সঙ্গী হতেন ধ্যানচাঁদের উত্তরসূরি আরেক হকির দিকপাল কুমার দিগ্বিজয় সিং বাবু (কে ডি সিং বাবু) আর বাকি বন্ধুরা।

ধ্যানচাঁদের জন্মদিন পালিত হয় জাতীয় ক্রীড়া দিবস হিসাবে। কিন্তু একথা বলতে দ্বিধা নেই যে ভারতের এই সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ক্রীড়াবিদ প্রায় উপেক্ষিতই থেকেছেন চিরকাল।  ২০১৩ সালে ভারতরত্নের জন্য ভারতের ক্রীড়া দপ্তর তার নাম সুপারিশ করলেও তৎকালীন ইউপিএ সরকার শচীন তেণ্ডুলকারকে বেছে নেন। শচীন তেণ্ডুলকারের এই নির্বাচন নিয়ে আপত্তি না থাকলেও এক্ষেত্রে ভারত সরকার তথা হকি ফেডারেশনের হকির জাদুকরের প্রতি সেই বরাবরের উপেক্ষাকেই ফের স্মরণ করিয়ে দেয়। ধ্যানচাঁদ নিজেও জানতেন সে কথা। তাই মৃত্যুশয্যায় শুয়ে তিনি বলেছিলেন- When I die, the world will cry, but India’s people will not shed a tear for me, I know them.”

তথ্যসূত্র:

  1. Goal: An Autobiography by Dhyan Chand
  2. Dhyan Chand – The Legend Lives On:  Niket Bhushan
  3. Wikipedia
  4. The World’s Hockey Champions 1936: M.N

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত