| 18 এপ্রিল 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত গল্প ধারাবাহিক

মহানগরের নয়জন নিবাসী (পর্ব-২০) । ডঃ দীপক কুমার বরকাকতী

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

irabotee.com,dipak kumar barkakatiমিজোরামের আইজল শহরের পদার্থ বিজ্ঞানের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ডঃ দীপক কুমার বরকাকতী (১৯৪৮) অসমিয়া সাহিত্যের একজন সুপরিচিত এবং ব্যতিক্রমী ঔপন্যাসিক। আজ পর্যন্ত আটটি উপন্যাস এবং দুটি উপন্যাসিকা, অনেক ছোটগল্প এবং প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তাছাড়া শিশুদের জন্য দুটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তারই ইংরেজি ভাষার একটি নতুন দিল্লির চিলড্রেন বুক ট্রাস্ট থেকে ১৯৯২ সনে প্রকাশিত হয়। দেশ-বিভাজন, প্রব্রজন, ভেরোণীয়া মাতৃত্ব (ভাড়াটে মাতৃত্ব), ধর্ম এবং সামাজিক বিবর্তন ইত্যাদি তাঁর উপন্যাসের মূল বিষয়। আলোচ্য ‘মহানগরের নয়জন নিবাসী’উপন্যাসে ১৯৩২ সনে স্টালিনের বিরুদ্ধে লেলিনগ্রাডের নয়জন টলস্টয়বাদী গান্ধিজির অহিংসা নীতির দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে করা আন্দোলনের ছবি ফুটে উঠেছে। তাঁর ইংরেজি ভাষায় অনূদিত গ্রন্থ দুটি হল From Valley to Valley (Sahitya Akademi, New Delhi, 2010) এবং The Highlanders (Blue Rose Publishers, New Delhi, 2010)। বাংলা ভাষায় অনূদিত গ্রন্থ ‘স্থানান্তর’ (অর্পিতা প্রকাশন, কলকাতা, ২০০৭)। বাসুদেব দাসের অনুবাদে ইরাবতীর পাঠকদের জন্য আজ থাকছে মহানগরের নয়জন নিবাসীর পর্ব-২০।


ভ্লাডিমির ভেলিক্সের সঙ্গে লেনিনগ্রাড থেকে মস্কো আসার সময় ভলকভ রিয়াজনভ নাডিয়া  পপভনার তৈলচিত্রটা  ভিক্টর একছুর্স্কির কাছ থেকে উপহার হিসেবে নিয়ে এসেছিলেন । তিনি শিল্পীকে বলেছিলেন – আপনি লেনিনগ্রাডের । নাডিয়াও লেনিনগ্রাডের। কিন্তু আমি হলাম মস্কোর। আমি নাডিয়াকে তৈলচিত্রের মাধ্যমে আমার ওখানে নিয়ে যেতে চাই । আমি খুব যত্ন করে রাখব এবং আমার কন্যা নীনাকে চিত্রটা উপহার দেব।

ভিক্টর একছুর্স্কি বন্ধুর অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারলেন না। লাইলাক ফুলের মধ্যে একটা ফুল হয়ে জ্বলজ্বল করতে থাকা নাডিয়া পপভনার উজ্জ্বল তৈলচিত্রটা তিনি ভলকভ রিয়াজনভকে উপহার দিলেন।

লেনিনগ্রাড থেকে মস্কো রেলযাত্রায় ভ্লাডিমির ভেলিস্কদের বসার জায়গার  সামনে দিয়ে বার তিনেক দুজন মানুষ আসা-যাওয়া করল । ভলকভ রিয়াজনভ লক্ষ‍্য  করলেন তাদের মধ্যে একজনের রয়েছে সূঁচলো মোচ এবং মাঝে মধ্যেই তিনি বাঁ হাতে মোচে তা দিচ্ছেন। 

মস্কো পৌঁছে ভলকভ রিয়াজনভ তৈলচিত্রটা বাড়িতে রেখেই দ্রুত বেরিয়ে গেলেন।

সেদিন বিকেলের দিকে ভ্লাডিমির ভেলিস্কের সঙ্গে ভলকভ রিয়াজনভ মস্কোর ফরেন ওয়ার্কস পাবলিশিং হাউসে যখন মিস্টার চট্টোকে খুঁজে বের করেছিলেন তখন তিনি প্রশাসন ভবনটির মাঝখানের একটি রুমে একান্ত মনে কয়েকটি কাগজ দেখছিলেন। ইংরেজি ভাষায় লিখিত ‘সিলেক্টেড ওয়ার্কস অফ ভি আই লেনিন’ নামের দুটো খন্ডে প্রকাশিতব্য গ্রন্থটির সংশোধনের দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়েছিল। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্টদের কমিনটার্নের কার্য বাহক সমিতির সম্পাদক ডিমিট্রি  মান‍্যুলস্কি এবং বার্লিনে থাকা ওয়েস্ট ইউরোপিয়ান ব্যুরো অফ কমিনটার্নের জর্জি ডিমিট্টিভ তাকে এই দায়িত্ব দিয়েছিল। এই কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। এরপরই তিনি ব‍্যুরো অফ কমিউনিস্ট একাডেমির ভারতীয় শাখায় কাজ করবেন বলে ঠিক হয়েছিল ।

অনেক বর্ণময় অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ পঞ্চাশ বছরের মিঃ চট্টোর সম্পূর্ণ নাম বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর পিতা অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায় পূর্ববঙ্গের ব্রহ্মনগরের লোক ছিলেন। তিনি এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৮৭৭  সনে রসায়নশাস্ত্রে ডিএসসি ডিগ্রি লাভ করে দক্ষিণ ভারতের হায়দ্রাবাদের নিজামের আমন্ত্রণে মহা বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। সেখানেই মিঃ চট্টোর জন্ম হয়েছিল। একুশ  বছর বয়সে মিঃ চট্টো আই সি এস পরীক্ষা দেওয়ার জন্য এবং একই সঙ্গে আইন পড়ার জন্য ইংল্যান্ড গমন করেন । আইসিএস হল না যদিও তিনি বিশেষ বিশেষ বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন এবং ‘ওরিয়েন্টাল রিভিউ’ নামের একটি ম্যাগাজিনের সম্পাদনাও  করলেন। সেই সময় ক্রমওয়েল এভিনিউতে শ‍্যামাজী কৃষ্ণভার্মা কেনা এবং পরবর্তীকালে ইন্ডিয়া হাউস ‘ নামে পরিচিতি লাভ করা বাড়িটিতে ভারতীয় জাতীয় বিপ্লবী সাভারকার সহ লাল-বাল-পাল, মাদাম কামা, এস আর রাণা এবং হরদয়ালের সঙ্গেও তিনি সাক্ষাৎ করেন এবং ধীরে ধীরে জাতীয় চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে ভারতের স্বাধীনতার কথা ভাবতে শুরু করেন। তিনি হিংসার পক্ষপাতী ছিলেন না কিন্তু ১৯০৯ সনের ১ জুলাই কার্জন উইলির হত্যার পরে তিনিও সন্দেহের আওতায়  থাকায় পরের বছর তাকে প্যারিস যেতে হয়। তিন মাস পরে তিনি ফরাসি সমাজবাদী দলের সদস্য হন। কিন্তু সেখানকার ভারতীয়দের মধ্যে ধীরে ধীরে ভাঙ্গন শুরু হওয়ায় ১৯১৪ সালের এপ্রিলে তিনি জার্মানিতে যান এবং হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট ডিগ্রির জন্য নাম ভর্তি করেন। সেখানে থাকাকালীন তিনি বার্লিন ইন্ডিয়া কমিটির প্রধান ভারতীয় রূপে বিবেচিত হন। বার্লিন কমিটির প্রচার ধর্মী কাগজপত্র নিয়ে তিনি ১৯১৭ সনে স্টকহোমে উপস্থিত হন। সেই সময় স্টকহোম আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক কর্মীর আশ্রয়স্থল ছিল। লেনিনকে নিয়ে রাশিয়ার বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক ভাবাদর্শের মানুষ তার মধ্য দিয়ে নিজের দেশে গিয়েছিল। সেই স্টকহোম থেকেই তিনি ভারতীয় স্বাধীনতার প্রস্তাবটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। তারফলেই  তিনি ইউক্রেনীয় বলশেভিক নেতা কনস্টানটিন মিখাইল’ভিছ ট্রয়ানভস্কির সাক্ষাৎ পেয়ে রাশিয়ার রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতি আগ্রহান্বিত হন।১৯২১ সনের জানুয়ারিতে তিনি ভিক্টর ক’পের  সাহায্যে মস্কোতে প্রথমবারের জন্য আসেন এবং বিদেশে থাকা ভারতীয় বিপ্লবীদের মস্কোতে একটি সম্মেলন আয়োজন করার ব্যবস্থা করেন। যদিও চট্টো বলশেভিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা প্রথম ভারতীয় ছিলেন । তথাপি এম এন রায় তার চেয়ে দেড় বছর আগে মস্কোতে উপস্থিত হয়েছিলেন ।চট্টো কমিউনিস্ট হিসেবে নয় ইংরেজের বিরুদ্ধে বিপ্লবী সত্তায় যুদ্ধ করার জন্য মস্কোর সাহায্য চাইতে গিয়েছিলেন । কিন্তু এম এন রয় কমিউনিস্ট হিসেবেই মস্কোতে ছিলেন এবং ১৯২০ সনে দ্রুত তাসখন্দে গিয়ে অক্টোবর মাসের ১৭  তারিখ ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করেছিলেন ।চট্টো এই কাজটাকে সুবিধাবাদী বলে মনে করেছিলেন এবং সুদূর থেকে ভারতে নিজেদের মানুষের দ্বারা কমিউনিস্ট দল গঠন করার চিন্তাধারা অবাস্তব বলে ভেবেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে ভারতে ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার বিপ্লব সেখানে থাকা রক্ষণশীল মধ্যবিত্ত বুর্জোয়া এবং সর্বহারার সম্মিলনেই সম্ভব হবে। চট্টোর ধারণা হয়েছিল এম এন রায়ের জন্যই তিনি সেবার লেনিনের সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। চট্টোর বিখ্যাত পরিবারের ইতিহাস, বার্লিনে থাকা সবচেয়ে প্রখ্যাত মহিলা সরোজনী নাইডুর ভ্রাতা এবং কয়েকটি ভারতীয় ভাষা ছাড়াও ইংরেজ, জার্মান, সুইডিশ,ডেনিস, নরওয়েজিয়ান, ডাচ, ইতালি এবং ফারসি ভাষা জ্ঞান থাকা অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত চট্টো হয়তো রায়ের ঈর্ষার পাত্র ছিল।

যখন তিনি জার্মান ফিরে আসেন তখন থেকে ইংরেজ  সরকারের চাপে জার্মান সরকার চট্টোর সেখানে থাকার অনুমতি দিতে অস্বীকার করেন। এই সমস্ত অশান্তি সত্বেও চট্টো ইন্ডিয়ান নিউজ সার্ভিস এন্ড ইনফরমেশন ব‍্যুরোর কাজ করে যান, বিশেষভাবে সেখান থেকে প্রকাশিত ম্যাগাজিনটির কাজ।১৯২৬ সনে তিনি উইলি মুয়েনযেনবার্গকে ‘ লিগ এগেইনস্ট ইম্পেরিয়েল জিম’,’লাই’ গঠন করায় সাহায্য করেন।


আরো পড়ুন: মহানগরের নয়জন নিবাসী (পর্ব-১৯) । ডঃ দীপক কুমার বরকাকতী


১৯৩০ সনের শেষের দিকে নাৎসি দল দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ দল হওয়ার পর থেকে জার্মানিতে রাজনৈতিক বাতাবরণের পরিবর্তন হয় এবং ‘লাই’ এর কার্যালয় প্যারিসে স্থানান্তরিত করতে হয়। ফ্রান্সে যাওয়ার বাধানিষেধ থাকার জন্য ডিমিট্রিভ এবং ডিমিট্রি মান‍্যুলস্কি চট্টোকে পরের বছরের শেষের দিকে পাবলিশিং হাউসে কাজ দিয়ে মস্কো পাঠায়।

তাই ১৯৩২ সনের জুলাই মাসের প্রথম দিকে যখন ভ্লাডিমির ভেলিক্স এবং ভলকভ রিয়াজনভ ফরেন ওয়ার্কস  পাবলিশিং হাউসে উপস্থিত হন তখন প্রশাসন ভবনটির একটি মাঝারি ঘরে ইংরেজি ভাষায় লিখিত ‘সিলেক্টেড ওয়ার্কস অফ ভি আই লেনিন’ নামের দুটি খণ্ডে প্রকাশিতব‍্য গ্রন্থটির  সংশোধনের দায়িত্ব গ্রহণ করা মিঃচট্টো কিছু কাগজপত্র একান্তমনে দেখছিলেন।

 মিঃচট্টো মাথা তুলে দরজার দিকে তাকালেন এবং দুজনকেই ভেতরে আসতে বলে পরিচয় নিয়ে বসতে ইঙ্গিত করলেন ।

ভ্লাডিমির ভেলিস্করা দেখলেন মানুষটা সুদর্শন নন। আধ পাকা চুল গুলি বাঁদিকে সিঁথি করে ডানদিকে আঁচড়ানো। সূঁচলো নাকটার নিচে হিটলারি গোঁফ। কান দুটি উপরের দিকে বেশ প্রশস্ত। গভীর কালো ভ্রুর নিচে একজোড়া উজ্জ্বল চোখ।

ভলকভ রিয়াজনভ  বললেন–’মিঃচট্টো , আপনি কি ভারতীয় নন?’

মানুষটা সায় দিলেন।

‘ সেই জন্যই আমরা আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।’– ভ্লাডিমির ভেলিক্স বললেন।

‘ বলুনতো, আমি আপনাদের কীভাবে সাহায্য করতে পারি?’–মিঃচট্টো বিনয়ের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন।

ভ্লাডিমির ভেলিস্ক জিজ্ঞেস করলেন–’ কিছু মনে করবেন না, আপনি আমাদের মতোই কমিউনিস্ট নয় কি?’

মিঃচট্টো ইউরোপে থাকাকালীন অনেকদিন পর্যন্ত নিজেকে ভারতীয় স্বাধীনতার বিপ্লবী বলে অভিহিত করেছিলেন। কখনও তিনি নিজেকে নৈরাজ্যবাদী বলেও পরিচয় দিতেন। কিন্তু তাঁর বামপন্থী সহকর্মী এবং বন্ধুরা তাকে একজন ইংরেজ বিরোধী বিদ্বৎ লোক বলেই জানতেন। কিন্তু ১৯৩০ সনের ২৬ ফেব্রুয়ারি জওহরলাল নেহেরুকে  লেখা একটি চিঠিতে মিঃচট্টো নিজেকে কমিউনিস্ট বলে জানিয়েছিলেন। তাই ভ্লাডিমির ভেলিস্কের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন–’ হ্যাঁ, আমিও কমিউনিস্ট।’

ভলকভ রিয়াজনভ বললেন –’ আমরা বলশেভিক বিপ্লব এবং শাসন থেকে অনেক আশা করেছিলাম। আমরা জারের শাসন থেকে মুক্ত হলাম। কিন্তু এখন মানুষ ভূমিস্বত্ব হারিয়েছে। গরু, ঘোড়া, শুয়োর হারিয়েছে। গির্জার লোকেরা প্রার্থনা করার অধিকারই নয়, সামাজিক প্রতিপত্তিও হারিয়েছে। মানুষের মধ্যে এখন হাহাকার দেখা দিয়েছে।’

মিঃচট্টো সায় দিয়ে বললেন–’হ্যাঁ, আমিও সেকথা  জানি।’

ভ্লাডিমির ভেলিস্ক বললেন–’ সাধারণ চাষির এই অবস্থার জন্য আমরা বড় চিন্তিত। এই অবস্থা প্রতিরোধ করার জন্য আমরা কিছু করতে পারি কি? অন্তত ভারতে গান্ধীজির চালিয়ে যাওয়া অহিংস আন্দোলনের অনুসরণে কিছু একটা?’

মিঃচট্টো সতর্ক হয়ে পড়লেন। তিনি অভিজ্ঞ লোক। মানুষ দুটির দিকে তাকালেন যদিও তিনি তাঁর দৃষ্টিতে সেই তীক্ষ্মতা প্রকাশ করলেন না। স্টালিনের অনুচর বাহিনীর দৃষ্টি তার ওপরেও থাকতে পারে। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুসারে আরম্ভ করা সমবায় ভিত্তিক কৃষির পামের জন্য এবং দেশের এখানে-ওখানে গত দেড় দু বছরে আরম্ভ হওয়া খাদ্যের অনটন এবং দুর্ভিক্ষে তার জনপ্রিয়তা অবনমিত হয়ে পড়ায় স্টালিন যে ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছে সে কথা তার অজানা নয়।  রাশিয়াতে স্টালিনের পরে দ্বিতীয় নেতা লেনিনগ্রাডের সার্গে মিরন’ভিছ কিরভের যে জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে এবং চট্টোর সঙ্গে যে কিরভের  ভালো ভাব রয়েছে সে কথাও নিশ্চয় স্টালিনের অনুচর বাহিনীর  অজ্ঞাত নয়। তাই রাজনৈতিক কারণে জনগণের সামনে মার্ক্স এবং লেনিনের অনুগত বলে প্রদর্শন করলেও নিজের একনায়কত্ববাদ ধীরে ধীরে বিস্তার করার জন্য স্ট্যালিন যেকোনো সময়ে তার উপরে কার্য পন্থা হাতে নিতে পারে সে কথাও চট্টোর ধারনার অতীত নয়। তাই ভ্লাডিমির ভেলিস্কের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন–’ আমি শ্রেণীসংগ্রামের নীতি গ্রহণ করেছি। সঙ্গে হিংসাত্মক কার্যের দ্বারা বিপ্লব এনে মূলনীতির আমূল পরিবর্তন আনায় বিশ্বাস করেছি। আমি গান্ধীজির অহিংস আন্দোলনে বিশ্বাসী নই।’

এই কথা বলে ভ্লাডিমির ভেলিস্কদের মিঃ চট্টোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার উদ্দেশ্যের যবনিকা টেনে দিলেন ।

মিঃচট্টো যখন কথাটা বলেছিলেন তখন তার অন্তরে কোনো কৃত্রিমতা ছিলনা। তিনি গত ১৯২৬ সন থেকে জওহরলাল নেহেরুর বন্ধুত্ব এবং নিকট সান্নিধ্য লাভ করেছেন।’ লীগ এগেইনস্ট ইম্পেরিয়ালিজম’ এ চট্টো নেহেরুকে  কার্যবাহী সদস্যরূপে অন্তর্ভুক্ত করে  পৃথিবীর নানা জায়গার সাম্রাজ্যবাদের স্বরূপ গুলির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। গত কয়েক বছর তিনি নেহেরুকে কর্মী, কৃষক এবং সশস্ত্র সংগ্রামীদের নিয়ে ভারতের কংগ্রেসের বাইরে একটা সাম্রাজ্য বিরোধী দল গঠন করে আলোচনা চালিয়ে যাবার পরামর্শ দিয়ে চলেছেন। কিন্তু এই প্রচেষ্টায় তিনি সফল হতে পারেননি। তাই তিনি ভারতীয় রক্ষণশীল মধ্যবিত্তের ওপরে ধীরে ধীরে আস্থা হারিয়ে ফেলছেন।তাঁর ধারণা অনুসারে ভারতীয় বুর্জোয়ারা মাত্র এক একজন সংস্কারক হতে পারে। এই সংস্কারকরা প্রচার করা সামাজিক এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনের গতি এতই মন্থর যে তিনি ধীরে ধীরে সেই সমস্ত কথা মন থেকে বাদ দিয়ে গণতান্ত্রিক পদ্ধতির প্রতি থাকা শেষ আস্থাটুকুও নিঃশেষ করে ফেললেন। তিনি সামাজিক এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনের জন্য হিংসা এবং বিপ্লবের পন্থার আবশ্যকতা মনেপ্রাণে গ্রহণ করলেন। তাই ভ্লাডিমির ভেলিস্কের গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের রূপে রুশ দেশের বর্তমান অবস্থার ও প্রতিরোধ করতে পারি নাকি বলে জিজ্ঞেস করা প্রশ্নের উত্তরে তিনি শ্রেণিসংগ্রাম এবং হিংসাত্মক বিপ্লবকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করার কথা অকপটে স্বীকার করলেন ।

মিঃচট্টো অবাক হয়ে চেয়ে থাকা মানুষ দুজনের দিকে তাকিয়ে বললেন–’ গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকায় করা আন্দোলনের কথা আমি জানি। এখন ভারতে আন্দোলনের কথাও জানি। সেই অহিংস আন্দোলনে আমি বিশ্বাসী নই।’

চুপচাপ বসে থাকা মানুষ দুটির দিকে তাকিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন–’ আপনারা নিজেকে কমিউনিস্ট বলে পরিচয় দিলেন, কিন্তু গান্ধীর আদর্শের কথা চিন্তা করছেন কেন?’ 

ভলকভ রিয়াজনভ বললেন–’ আমরা কয়েক শ বছরের জারের স্বেচ্ছাচারী শাসনের সমাপ্তি ঘটানোর সঙ্গে সঙ্গে শাসনের বলি হওয়া জনগণের সঙ্গে যোগ দিয়েছি। কিন্তু এখন আমরা যেন পুনরায় অন্য একটি স্বেচ্ছাচারিতার দিকে এগিয়ে চলেছি। আমরা টলস্টয়বাদে  বিশ্বাসী‌। অহিংসায় বিশ্বাসী। এই অহিংসাকে অস্ত্র হিসেবে নিয়ে গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকায় ইংরেজ নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন। এখন ভারতেও আন্দোলন করছেন। তাই আমরা গান্ধীর আদর্শের কথা চিন্তা করছি।

ভ্লাডিমির ভেলিস্ক বললেন–’ সেই পন্থায় দেশের নীতি রোধ করতে পারা যায় কিনা সেই বিষয়ে ভারতীয় হিসেবে আপনার পরামর্শের জন্যই আপনার কাছে এসেছি।’

বুদ্ধিদীপ্ত মিঃচট্টো বললেন–’ আমি ভারতীয়, কিন্তু আমার আদর্শ গান্ধীবাদ নয় । আর সঙ্গে’– তিনি বললেন’ আপনাদের অহিংসার পৃষ্ঠপোষকতা করা কার্য আমাকে দ্বিধায় ফেলেছে। আমার ধারণা হয়েছে আপনারা কমিউনিস্টের ধারণা থেকে দূরে সরে এসেছেন। আপনারা কমিউনিস্ট নন, টলস্টয়বাদী।’

নিজের পরিচয় এই বিদেশে থাকা ভারতীয় মানুষটির স্পষ্ট উক্তি থেকে পেয়ে ভ্লাডিমির ভেলিস্ক কিছুক্ষণ  অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। তিনি সায় দিয়ে বললেন–’ হ্যাঁ, আমরা টলস্টয়বাদী’।

এরপরে তারা বেশিক্ষণ বসলেন না। দুজনেই বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এলেন।

ভ্লাডিমির ভেলিস্ক বন্ধুকে বললেন–’ গান্ধী এবং চট্টো– দুজনেই ভারতীয়, কিন্তু আদর্শগত ভাবে দুজনের মধ্যে এত অমিল।’

ভলকভ রিয়াজনভ সায় দিলেন– হ্যাঁ , দুজনেই দুটো বিপরীত মেরুতে অবস্থিত ।’

‘ আমাদের তাহলে এখনই লেনিনগ্রাড যেতে হবে।’–ভ্লাডিমির ভেলিস্ক বললেন।

‘ হ্যাঁ।’– ভলকভ’ রিয়াজনভ সায়  দিয়ে বললেন–’ বাড়ির জন্য কিছুটা বাজার-টাজার করে চিত্রপটটা গুছিয়ে রেখে আমি ফিরে যেতে পারব।’

তারা ট্রামে উঠে বসলেন।

ট্রামের জানালা দিয়ে তারা দেখতে পেলেন লাইনের পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। একজনের সেই রেল যাত্রায় দেখার মতোই গভীর মোচ। তিনিও বাহাতে মোচের সূঁচলো দিকটাতে তা দিচ্ছেন। 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত