| 19 এপ্রিল 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

ডাক্তারের নথি

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট
১.
প্রথমেই বলে নেয়া ভালো আমি কোন গল্প লিখতে বসিনি। সে দিন মোপাসার ‘নেকলেস’ গল্পটা আবার পড়তে গিয়ে মনে হলেছিল— তিনি যাদের নিয়ে লিখেছেন তাদের একজন আমার খুব পরিচিত। আমি তাকে আগে থেকে চিনতাম। কেন লিখেছেন এমন গল্প? যা পড়তে গেলে, সেখানে নিকটজনের ছায়া ঘুরপাক খায়! আশ্চর্য, তারপর আমি মান্টোর একটা গল্প পড়তে গেলাম, সেখানেও আমার পরিচিত একজনকে পেয়ে গেলাম। ইদানীং আমি যে গল্প পড়ি, একটা চরিত্র ধরে উপস্হিত হয়- তারা আমার চারপাশের কোন না কোন চেনা মুখ। সেখানে একটা ছায়া ঘুরতে থাকে! এক সময় সিনেমা দেখতে বসলে আমার এমন হতো- সবচেয়ে কমফোর্ট জোনে আমি আমাকে বসিয়ে রাখতাম! নায়কের মৃত্যু হলে আমি ভীষণ দু:খ পেতাম। এ যেন আমারই মৃত্যু! মানতে কষ্ট হতো। ঘোর কাটতে সময় লাগতো। আমি আজ যার কথা বলবো হয়ত তাকে আপনারা চেনেন, বা চেনেন না। কখনো হোমিও ডাক্তারের চেম্বারে আপনি না গেলে— এক সঙ্গে এত প্রশ্নের জবাব আপনাকে নাও ফেস করতে হতে পারে। প্রশ্নকর্তা ডাক্তার আমার চোদ্দপুরুষ ধরে টান দিল। চোদ্দপুরুষ বলতে আমার পূর্বপুরুষদের কথা জানতে চাইলেন। পূর্বে এমন কোন ইতিহাস আছে কিনা? হাঁপানির ইতিহাস! আমি বললাম তখনকার সময়ে তো এত ধুলোবালি ছিল না। আমার পূর্বপুরুষ হয় মাছ ধরতেন, অথবা জমিজিরাত করতেন। মানে কৃষক পরিবার। তিনি বললেন— আপনি জেনে নেবেন। এই জানতে গিয়ে আমি ঝামেলায় পরলাম। কাকে জিজ্ঞেস করবো আমার বাবার দাদার কি কি অসুখ ছিল! ঝামেলা এড়াতে বললাম, আমার বাবাও তো আপনার রুগী ছিলেন। বাবা কি তার রোগের অতীত ইতিহাস আপনাকে বিবৃত করেনি? ষাট উর্দ্ধ ডাক্তার বললেন তুমি কার ছেলে? বাবা তাঁর রুগী ছিলেন বলায়- সম্বোধন এক ঝটকায় তুমিতে নামিয়ে আনলেন। বললাম, আমি রহিম মোল্লার ছেলে। ওহ তুমি হাকিম মোল্লার নাতি! হুম। দাঁড়াও পুরাতন খাতাটা বেড় করি। উনি প্রায় আধা ঘন্টা ঘেটে ঘুটে একটা নথি নিয়ে আসলেন। 
হুম এ তো দেখছি হাকিম মোল্লার বাবারও হাঁপানি ছিল! বুঝলে, তোমার বাবার দাদাও এই সমস্যা নিয়ে একবার আমার চেম্বারে এসেছিলেন। আমি তখন বয়সে তরুণ। কেবল নতুন চেম্বার খুলে বসেছি। তোমার বাবার দাদু মানে সুরুজ মোল্লা সেকি কেতাদুরস্ত চেহারা। ধবধবে একটা ধূতি পরে এসেছিলেন। আমার এখনো মনে আছে, বেতের লাঠিটা কী সুন্দর। সম্ভবত তেল মালিশ করে চকচকে করে রাখতেন। তাঁরও তো তামাকের অভ্যাস ছিল। কী বলেন? উনি ধূতি পরতে যাবেন কেন? আমরা কী হিন্দু? আরে না, আমি কী সে কথা বলেছি। তোমরা হিন্দু হতে যাবে কেন? তখনকার সামর্থবানদের পোষাকই ছিল ধূতি-পাঞ্জাবি। এর বাইরে বেশির ভাগ মানুষ লেঙ্গচা পরত। ওগুলো স্টাইলিশ পোষাক তো নয়- কিছু একটা জরিয়ে থাকা আরকি! লুঙ্গী টুঙ্গির চল সবে শুরু হয়েছে, বলা যেতে পারে। মানুষ প্রায় উদোম গায়ে-ই ঘুরে বেড়াতো। পূর্ববঙ্গে ইন্ডাষ্ট্রিয়াল যুগে প্রবেশের ইতিহাস খুব বেশি দিনের না বাপু। পাটকে কেন্দ্র করেই বোধ হয় শুরুটা হয়েছিল। বৃটিশদের কোট-প্যান্ট-টাই পরা দেখে আমরা সাহেব হয়েছি। কোট-প্যান্ট পরেছে মানেই তো সে আর খৃষ্টান হয়ে যায়নি! এলাকা ভেদে পোষাক। ধর্ম ভেদে আচার। এটাও তোমাদের জান নাই দেখছি। তারপর একের পর এক প্রশ্নবাণে জর্জরিত করলেন। খুধা লাগে কেমন? দিনে কত গ্লাস পানি পান করি? পান, জর্দা, তামাকের অভ্যাস আছে কিনা? দিন-রাত মিলিয়ে কয় বার টয়লেটে করি? নরম না কষা?  আমার জীবনাচরণের আদ্যপ্রান্ত জেনে খাতায় টুকলেন। লিপিবদ্ধ করা শেষ।এবার তিনি এগিয়ে গেলেন একটা পুরাতন তেতুল রঙের আলমিরার দিকে, সেখানে থরে থরে সাজানো ঔষধের তাক থেকে দু’চার ফোটা লিকুইড ঢাললেন দুটো ছোট্ট বোতলে। গোল গোল শুভ্র দানাগুলো ভিজে গেল। বোতল দুটো হাতের তালুতে নিয়ে কাগজের মত কিছুক্ষণ মোচড়ালেন, বললেন- সকালে খালি পেটে চারটে, আর রাতে ঘুমানোর আগে চারটে করে খেয়ে নিতে হবে। এক মাস বাদে আবার যেন দেখা করি। আমি দেখলাম আমার চোদ্দপুরুষের কাহিনি যদি কারো জানা থাকে তাহলে এই হোমিও ডাক্তার অমলেন্দু মজুমদার-ই জানেন। 
২. 
ঔষধ খেয়ে আমার অবস্থার উন্নতি হয়েছে। এক মাস বাদে আমি যখন আবার আসলাম। তখন জানতে পারলাম। রাজনৈতিক পরিস্হিতি বড় গোলমেলে। অমলেন্দু বাবুর ছেলের নামে কে বা কারা যেন ফেসবুকে সাম্প্রদায়িক উস্কানি মূলক একটি লেখা ট্যাগ করে দিয়েছে। বাজারের কেন্দ্রে দীর্ঘ চল্লিশ বছরের চেম্বারখানা ভাংচুর হয়েছে। ডাক্তার আমল বাবু পরিবার পরিজন নিয়ে এলাকা ত্যাগ করেছেন। 
তাঁর নথিতে আমার নামটি সদ্য লিপিবদ্ধ করেছিলেন, যেমন আমার পরিবারের রোগের ইতিহাস তিনি লিখে রেখেছেন। আমার শুধু সেই নথিটার কথা মনে পড়ছিল। কত দিনের হিস্ট্রি- নিমিষেই নেই! হয়ত কোন এক গল্পে এই চরিত্রটাও খুঁজে পাওয়া যাবে, যাকে আমি অনুসরণ করব অমলেন্দু মজুমদারের ছায়ার মতো। 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত