দৌড়

বাস থেকে নেমেই পল্লবী অনুভব করলো, বড় ভুল হয়ে গেছে।এ তার দ্বারা হবে না।অতীশ বারবার বলেছিলো,তুমি পারবে না।রোজ এতটা রাস্তা ডেইলি প্যাসেঞ্জারি,তাও ভেঙে ভেঙে যাওয়া।বাড়ি থেকে বাস এ শেয়ালদা স্টেশন, সেখান থেকে ট্রেনে,তারপর বাস জার্নি করে যেখানে নামলো পল্লবী,কোথাও কোন রিকশা বা ভ্যানের চিহ্নমাত্র দেখা যাচ্ছে না।এদিক ওদিক জিজ্ঞাসা করে জানলো মিনিট পনেরো হাঁটতে হবে।

কমলাসুন্দরী বালিকা বিদ্যালয়। পাক্কা আড়াই ঘন্টার রাস্তা বাড়ি থেকে,তাও যদি ঠিক ঠাক সময়ে ট্রেন, বাস সব পাওয়া যায়।একেবারে অঁজ পাড়া গাঁ।খাঁস কলকাতার মেয়ে পল্লবী।বিয়ের পরও কলকাতাতেই শ্বশুর বাড়ি।মাস্টার্স করার পরেই বিয়ে হয়ে গেল।চাকরি বাকরির জন্য উৎসাহ অনুভব করেনি কখনও।বিয়ের তিন বছর পর দু’একজন বন্ধুর দেখাদেখি স্কুল সার্ভিস কমিশনের ফর্ম তুলেছিল। অতীশ পাত্তা দেয় নি।ভেবেছিলো বউএর দুদিনের শখ।অতীশের নির্লিপ্ততা পল্লবীর জেদটা বাড়িয়ে দিয়েছিল।ছোট থেকে খুব জেদী মেয়ে সে।তবে প্রথমবারেই যে চাকরি পেয়ে যাবে, সেটা সে নিজেও ভাবে নি।কিন্তু জয়েনিং লেটারটা হাতে পেয়েই তার সব উৎসাহ উড়ে গিয়েছিলো।এত দূরের স্কুল,একদম গ্রামের ভেতর। জায়গাটার নাম ও সে শোনেনি জীবনে।সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছিল,কাজে যোগদান করবে না।কিন্তু, যেই অতীশ বললো,ছেড়ে দাও,এ তোমার দ্বারা হবে না,অম্নি জেদটা চেপে গেলো।

কিন্তু প্রথমদিন স্কুলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সে বুঝে গেল সত্যিই সম্ভব নয়।বছর ছয়েক আগে পায়ের একটা লিগামেন্ট ছিড়েছিলো।বেশিক্ষন দাঁড়িয়ে থাকলে,হাঁটলে ব্যাথা করে এখনো।রোজ এই এতটা যাতায়াত সে নিতে পারবে না।তারপর স্কুলের চেহারা দেখে যেটুকু উৎসাহ অবশিষ্ট ছিল,সেটুকুও উড়ে গেল।পুরনো ঝরঝরে স্কুলবাড়ি,এদিক ওদিক থেকে চাপড়া খসে পরে ভেতরের কঙ্কাল হাঁ হয়ে বেরিয়ে পরেছে।অযত্নের ছাঁপ সর্বত্র।পল্লবী মানসচক্ষে অতীশের বিদ্রূপভরা হাসি দেখতে পারছিলো।

প্রথমদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে ধূম জ্বর।পরের তিন দিন আচ্ছন্নতার মধ্যে কাঁটলো।চতুর্থ দিনে আবার দুর্বল শরীরের স্কুল রওনা দিল।হাল ছেড়ে দেওয়ার আগে একবার শেষ চেষ্টা করে দেখতে চায় পল্লবী।ছেড়ে দাওয়া তো এক মূহুর্তের ব্যাপার।যেকোন সময়ই ছাড়া যায়।কিন্তু অন্তত আরেকবার চেষ্টা না হলে এত সহজে ছাড়তে চায়না সে।

সপ্তাহখানেক পর যাতায়াতটা অনেকটাই সহজ হয়ে এলো পল্লবীর কাছে।একটা সাইকেল ভ্যান ঠিক করে নিয়েছে,বাসস্ট্যান্ড থেকে স্কুল অব্ধি আসা যাওয়ার জন্য।স্কুলের অধিকাংশ ছাত্রী খুব গরীব পরিবারের মেয়েরা।নিচু ক্লাসে তবু বেশ কিছু ছাত্রী আছে।উঁচু ক্লাসগুলোতে মাছি তাড়ানোর দশা।বারো তেরো বছর হতে হতে মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়।ব্যাস,পড়াশোনার ইতি সেখানেই।প্রধানা শিক্ষিকা সুহাসিনী দি বয়স্ক মানুষ।আর দু’ বছর বাকি অবসরের।শান্ত,নরম স্বভাবের মানুষ।প্রথম আলাপেই ভালো লেগে গেছিল মানুষটিকে।এই কদিনে ভাল লাগাটা আরো গভীরতর হয়েছে।খুব সুন্দর করে কথা বলেন,মনে হয় যেন কত দিনের চেনা।

“দেখো,এই চাকরিতে তুমি মনের সন্তষ্টি আশা করো না।এমন নয় যে ভাল প্রতিভা নেই।গত আঠেরো বছর ধরে এই স্কুলে আছি আমি।অনেক ভাল মেয়ে পেয়েছি,জানো।মাথা ভাল,প্রতিভা আছে।কিন্তু ধরে রাখতে পারিনি।একটু বয়স বাড়লেই বিয়ে দিয়ে দেয়।অনেক বুঝিয়েছি, স্থানীয় লোকেদের ডেকে মীটিং করেছি।বাড়ি বাড়ি গিয়ে অনুরোধ করেছি।কিন্তু কোন লাভ হয়নি।জানো,রাস্তায় হয়তো কোন পুরোন ছাত্রীর সাথে দেখা হয়ে যায় কখনো,যার মধ্যে কিছু করার ক্ষমতা ছিল,দেখি কোলে কাঁখে তিনটে বাচ্চা নিয়ে যাচ্ছে,হয়তো বয়স কুড়িও পেরোয় নি।খুব কষ্ট হয়।”

পল্লবীর বিষয় ভূগোল।কিন্তু সব বিষয়ই পড়াতে হয়।সব বিষয়ের শিক্ষিকা নেই স্কুলে।পল্লবীর ছোট থেকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ার সুবাদে উঁচু ক্লাস এ ইংরেজি ক্লাস নিতে হয়।বেশি ভাগ ছাত্রীই ইংরেজিতে ভয়ংকর দুর্বল।ক্লাস সিক্সে অংক।সেটাতেও ছাত্রীদের অবস্থা তথৈবচ। পাশের হার খুবই কম।কি করেই বা হবে?এদের বাড়িতে সারা সংসারের কাজ, রান্নাবান্না,ছোট ভাইবোনের দেখাশোনা সবই করতে হয়।মা বাবারা অনেকেরই সারাদিন ক্ষেতে কাজ করে।কারও কারও মায়েরা ভোর হবার আগেই বাসে ট্রেনে চেপে কলকাতায় পাড়ি দেয় গৃহপরিচারিকার কাজ করার জন্য।সন্ধ্যেবেলা ফিরে আসে।এইরকম অবস্থায় ছোট ছোট মেয়েদের পড়াশোনায় কতটা মন দাওয়া সম্ভব?তবু পল্লবী চেষ্টা করে নিজের কাজটুকু মন দিয়ে করার,যতটা পারা যায়।

এই কদিনে কাজে পল্লবীর মন বসতে শুরু করেছে।পল্লবী এরকমই। যখন যেটা করে,সেটাই মন দিয়ে করার চেষ্টা করে যতদূর সম্ভব।এর মাঝে একদিন বড়দি সুহাসিনী দি ঠিক করলেন, স্কুল পরিষ্কার করা হবে।কিন্তু খরচ করার মত টাকা নেই।ঠিক হল ছাত্রী শিক্ষিকারা নিজেরাই সেটা করবেন।দু’চার জন শিক্ষিকা ছাড়া সবাই উৎসাহের সাথেই সম্মতি জানাল।দুদিন ধরে চললো সাফাই অভিযান।পল্লবী লক্ষ্য করলো, গ্রামের মেয়ে বলেই হয়তো ছাত্রীরা অসম্ভব পরিশ্রম করতে পারে।দায়িত্ববোধও অসাধারণ।দুদিনের মধ্যে স্কুলের অনেকটাই হাল ফিরে গেল।সবাই খুব খুশী।

এর মধ্যে একটি মেয়েকে পল্লবী বিশেষভাবে লক্ষ্য করলো।ক্লাস সিক্সে পরে অন্তরা।পল্লবী জানে না কেন,ওকে বেশ অন্যরকম লাগে তার।বাকিদের থেকে আলাদা।ডাকাবুকো মেয়ে।স্কুল সাফাইএর সময় দেখেছে ওর পরিশ্রম করার ক্ষমতা;অফুরন্ত জীবনীশক্তি মেয়েটির।আর ভীষন গায়ের জোর।কথাচ্ছলে জেনেছে,ওর বাবা মা অন্যের জমিতে জনমজুরি খাটে।মাঝে মাঝে ওকেও কাজ করতে হয় ক্ষেতে।গতবার ফেল করেছে।বলে পড়ার সময় পায় না,কিন্তু পড়তে ভালো লাগে।

কিন্তু অন্তরার যে জিনিসটা পল্লবীকে অবাক করেছে,সেটা সম্পূর্ণ আলাদা একটা ব্যাপার।স্কুলে বাৎসরিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হয় ফী বছর।খুব বড় কিছু নয়।কিছু ইভেন্ট থাকে।মেয়েরা অংশগ্রহণ করে।বেশিরভাগই ছোট ক্লাসের মেয়েরা।একটু বড় মেয়েরা লজ্জা পায়।গ্রামের পরিবেশে মেয়েদের একটু বড় হয়ে যাবার পর দৌড়ঝাপ ভালো চোখে দেখা হয়না।তাই উঁচু ক্লাসের মেয়েদের দৌড় প্রতিযোগিতায় স্বাভাবিক ভাবেই খুব বেশি প্রতিযোগী ছিলনা।দৌড় শুরু হওয়ার পর দেখা গেল অন্তরা প্রথম কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অন্য সবাইকে পেছনে ফেলে অনেকটা দূরত্ব তৈরি করে নিয়েছে।দু’শো মিটারের রেসে দেখা গেলো বাকিদের এক পাক ঘুরে শেষ করার আগেই অন্তরা দু’পাক চক্কর দিয়ে রেস সম্পূর্ণ করেছে।পল্লবী নিজে কোনদিন খেলাধুলা করেনি।ছোট থেকেই একটু দুর্বল সে।খুব ভুগতো।কিন্তু খেলাধুলার পরিবেশে বড় হয়েছে সে।তার বাবা কলকাতার একটি বিখ্যাত স্কুলের গেম টিচার ছিলেন,এখনো একটি নামকরা স্পোর্টস ক্লাবের সাথে যুক্ত। দিদি ছোট থেকে খেলাধুলায় ভীষণ ভাল; জেলা, রাজ্যস্তরে অনেক মেডেল এনেছে অ্যাথলেটিকসএ।খেলার সূত্রেই জামাইবাবুর সাথে আলাপ,প্রেম,অতঃপর বিয়ে।পল্লবীর জামাইবাবু সিতাংশু দত্ত একসময়ের বিখ্যাত অ্যাথলেট। দৌড়ে এশিয়াডে ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন।এখন কলকাতায় সাইএর অ্যাথলেটিকসএর কোচ।

সুতরাং নিজে না খেললেও খেলাটা বোঝে পল্লবী।অন্তরার দৌড় দেখতে দেখতে পল্লবী বুঝে নিলো,এই মেয়ের মধ্যে সফল হবার সবরকম উপকরণ মজুত আছে।কিন্তু শুধু সে ভাবলে তো হবে না।এমন কাউকে দিয়ে বাজিয়ে দেখা দরকার,যে বুঝবে পল্লবীর অনুমান কতটা ঠিক,যে তার ধারণার উপর শীলমোহর লাগাতে পারবে।দিদি জামাইবাবু তো আছেই।প্রথমেই জামাইবাবুকে বলা ঠিক হবে না।যদি দেখা যায় পল্লবী যাকে হীরে ভাবছে,সে শুধুই কাঁচ?বড়দির সাথে কথা বলা দরকার।পরেরদিন টিফিন পিরিয়ডে পল্লবী গেলো সুহাসিনী দির ঘরে।সব খুলে বললো,নিজের অনুমানের কথা।বড়দি মন দিয়ে শুনলেন।তারপর বললেন,
“তুমি এত কিছু ভাবছো ওকে নিয়ে,আদৌ ও কি চায় জিজ্ঞাসা করেছো?এদের নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা খুব খারাপ পল্লবী।যাদের পিছনে পরিশ্রম করেছি,ভেবেছি একে ভালো ভাবে তৈরি করবো,তাদের বাবা মায়ের হাতে পায়ে ধরতে বাকি রেখেছি শুধু,কিছুতেই কিছু করে উঠতে পারিনি।আমি অন্তরাকে নিয়ে তোমার উৎসাহে জল ঢেলে দিতে চাইনা।কিন্তু সাবধান অবশ্যই করব।নইলে শেষে তুমিও আমার মত কষ্ট পেলে আমার খারাপ লাগবে।যাই হোক,আমায় কি করতে হবে বল?

পল্লবী বললো,”আপনি আরেকটা দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করুন বড়দি।শুধু দৌড়।তাহলেই হবে।আমি আমার দিদিকে নিয়ে আসবো স্কুলে।আমি চাই, ও একবার অন্তরার দৌড় দেখুক।”
“বেশ তাই হবে।পরের সোমবার আসতে পারবেন উনি?”
“সে দায়িত্ব আমার বড়দি।আপনাকে যে কি করে ধন্যবাদ জানাবো জানিনা”।পল্লবী উৎসাহে ফুটছে তখন।তার বেড়িয়ে যাবার রাস্তার দিকে চেয়ে সুহাসিনী মৃদু হাসলেন।এই মেয়েটির মধ্যে তিনি নিজেকে দেখেন।পল্লবীর বয়সে ঠিক এরকমই ছিলেন তিনি।জেদী,অত্যুৎসাহী।স্বপ্ন দেখতেন তিনিও।হে ভগবান,ওর উৎসাহটা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিওনা।না হলে ওও আর কারো জন্য কিছু করতে চাওয়ার সাহস করবে না কোনদিন।

এরপর নির্দিষ্ট দিনে দিদি এসে দেখে গেছে অন্তরার দৌড়। স্টপওয়াচ চালিয়ে বারবার দৌড় করিয়েছে ওকে।প্রতিবারই দারুন টাইমিং।দিদিও উৎসাহে ফেটে পড়েছে।
” পলু রে,এ তো হীরে রে।একে আমার চাই।তুই যে করে হোক ব্যবস্থা কর।”
গর্বে পল্লবীর বুক ভরে ওঠে।এই মেয়ে তো তারই আবিষ্কার। তার ছাত্রী। সেই তো প্রথম চিনেছিল ওর প্রতিভাকে।

পল্লবী অন্তরাকে নিয়ে ওর বাড়ি যায়।ওর বাবা মাকে সব কথা জানায়।কিন্তু তাঁরা যতটা খুশি হবে বলে ভেবেছিল পল্লবী, সেরকম কিছু দেখা গেলনা তাদের অভিব্যক্তিতে।ওর মা তো বলেই দিল,
“অনু না থাকলে ভাইবোনগুলারে কে সামলাবে,ঘরের কাজ কে করবে?আমি তো মাঠে যাই।অর বিয়াও দিতে লাগবে।বড় হইছে মেয়ে।এখন ব্যাটাছেলের মত দৌড়ঝাপ করলে কে অরে বিয়া করবে?”

পল্লবী ওদের সময় নিয়ে বোঝায়।মেয়ে ওদের ঘরকন্না করার জন্য জন্মায় নি।দেশের মুখ উজ্জ্বল করার মত প্রতিভা নিয়ে জন্মেছে তাদের মেয়ে।ওকে বেঁধে রাখলে চলবে না।অনেক বোঝানোর পর ওর বাবা মা নিমরাজি হয়েছে।এর মধ্যে একদিন দিদি জামাইবাবু দুজনে এসে দেখে গেছে অন্তরাকে।জামাইবাবু ওকে সাইতে নিয়ে যেতে চান।ওর বাবা মাএর সাথেও কথা বলেছে ওরা।সবকিছু ঠিক থাকলে মাসখানেকের মধ্যে কলকাতা পাড়ি দেবে অন্তরা।উৎসাহে টগবগ করে ফুঁটছে মেয়েটা।

যাবার দিন এগিয়ে আসছে।আর মাত্র পাঁচ দিন বাকি।সাইয়ে অন্তরার ভর্তির সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে।আপাতত দিদির বাড়িতে থাকবে কিছুদিন।হস্টেলের ব্যবস্থা হয়ে গেলে হস্টেলে চলে যাবে।পল্লবী আজ একটু সকাল সকাল স্কুলে এসেছে।অন্তরার বাড়ি যাবে একবার।ওর কয়েকটা সই নিতে হবে।অন্তরার বাড়ি গিয়ে দেখলো অন্তরা নেই।ওর মা বললো,পাশের গ্রামে মাসির বাড়ি গেছে দেখা করতে।কলকাতায় যাবার আগের দিন ফিরবে।সইগুলো নেওয়া দরকার ছিল।যাক গে। দু’দিন পরে নিলেও চলবে।পল্লবী ফিরে এল স্কুলে।পরের দুটো দিনও কেটে গেল।চতুর্থ দিন স্কুলে এসে পল্লবী ছুটলো অন্তরার বাড়ি। এখনো ফেরেনি ও।ওর মা বললো,রাত্রে ফিরবে হয়তো।হয়তো?হয়তো মানে?কাল ওর কলকাতায় যাবার দিন,আজ এখনো ও মাসির বাড়ি বসে আছে?পল্লবীকে জানিয়ে যাওয়ারও প্রয়োজন বোধ করেনি ও।এত দায়িত্বজ্ঞানহীন কি করে হতে পারে কেউ?পল্লবী ওর জন্য ছুটে মরছে,আর ও মাসির আদর খাচ্ছে।রাগে মাথা দপদপ করতে থাকে পল্লবীর।স্কুলে ফিরে যায়।সারাদিন একটা ক্লাসেও মন বসাতে পারেনা সে।ছুটির পর স্কুল থেকে বেরোতে যাবে,দেখে গেটের সামনে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে সাইকেল নিয়ে।এগিয়ে এসে বলে,”দিদিমনি,আমি বল্টু,অনুর পাড়ায় থাকি।কাল ওর বিয়ে।ওর মাসির বাড়ি থেকে বিয়ে দিচ্ছে ওর বাবা মা।ওকে আটকে রেখেছে।ও আমায় পাঠালো আপনাকে খবর দিতে।”

পল্লবীর পা দুটো মাটিতে আঁটকে গেছে যেন।সারা শরীর কাঁপছে থরথর করে।এভাবে ঠকে গেল সে?বড়দির কথাগুলো মনে পড়ে গেলো।ভাবার জন্য বেশি সময় নেই হাতে।বল্টুর হাত ধরে টান দিল সে,”এসো”।ছুটে গেল বড়দির ঘরে।বড়দি ঠান্ডা মাথার মানুষ। বললেন,”পুলিস নিয়ে গিয়ে বিয়ে বন্ধ করা যায়।কিন্তু ওর বাবা মায়ের মর্জি ছাড়া ওকে কলকাতায় নিয়ে যেতে পারবে না।এখানে থাকলে দুদিন পর আবার বিয়ে দিয়ে দেবে।”
“তাহলে?”
বড়দি একটু চুপ করে রইলেন।তারপর বললেন,”আমি তোমাকে আগেই বলেছিলাম পল্লবী।আমি বারবার আঘাত পেয়েছি এদের থেকে।তুমি শুনলে না।এখন একটাই উপায় আছে।কিন্তু সেটা তোমার জন্য বিপদজনক হতে পারে।হয়তো তুমি আর এই গ্রামে চাকরি করতে পারবে না এরপর।”
পল্লবী ধৈর্য্য হারাচ্ছে।
“আপনি,আমায় বলুন,প্লিজ। যা করতে হয় করবো।আমি এর শেষ দেখে ছাড়বো।”
এরপর বড়দি,পল্লবী ও বল্টুর মধ্যে আরো ঘন্টাখানেক কথা হল।

রাত প্রায় দু’টো।চারিদিকে ঘুঁটঘুঁটে অন্ধকার।গ্রামের রাত যে এত কালো হয়,কোন অভিজ্ঞতা ছিলনা পল্লবীর।কলকাতা শহরে দিনই বা কি, রাতই বা কি।অন্ধকার সেখানে বড় দুর্বল; আলোর কাছে সাত গোলে হেরে বসে আছে।কিন্তু গ্রামের রাত আলাদা।এরকম পরিস্থিতি না হলে হয়তো পল্লবী গ্রামের রাতের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারতো।কিন্তু এখন সেই রকম মনের অবস্থা নেই।কি হবে যদি বল্টু ঠিকমতো অন্তরাকে বার করে নিয়ে আসতে না পারে?আর ভাবতে পারছে না পল্লবী।কান্না পাচ্ছে।ভীষণ কান্না পাচ্ছে।অতীশ পাশে এসে পল্লবীর হাতটা ধরে।ভেবোনা।সব ঠিক হবে।পল্লবী অতীশের কাঁধে মাথা রেখে ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফ্যালে।

ঠিক রাত পৌনে তিনটেতে দূর থেকে সাইকেলের আলো দেখা যায়।অতীশ আর পল্লবী গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ায়।সাইকেলটা কাছে আসতে পল্লবীর বুক থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।বল্টু পেরেছে তার বন্ধুত্বের মান রাখতে।অতীশ চটপট গাড়ির পেছনের দরজা খুলে দেয়।
“দেরী করা যাবে না।তাড়াতাড়ি উঠে পরো।সময় নেই বেশী।বল্টু তুমি চলে যাও তাড়াতাড়ি, কেউ টের পাওয়ার আগে।নইলে তুমি বিপদে পড়বে।”

বল্টু একবার শুধু থামে।অন্তরার মাথায় হাত রাখে।বলে,”ভাল থাকিস”।তারপর সাইকেল ঘুরিয়ে দ্রুত অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।অতীশ গাড়িতে স্টার্ট দেয়।অন্তরা হঠাৎই কেঁদে ওঠে।পল্লবী ওকে বুকে টেনে নেয়।মনে মনে বলে,”কেঁদে নে আজ যত খুশি। কাল থেকে তোর নতুন দিন শুরু।তোর নতুন জীবন।অনেক বড় হতে হবে তোকে।অনেক উঁচুতে উড়তে হবে।ডানাটা তোরই ছিলো।আমি শুধু বাতাস দিয়েছি।তুই ওর।অনেক উঁচুতে।অনেক অনেক উঁচুতে।”

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত