| 20 এপ্রিল 2024
Categories
ভাসাবো দোঁহারে

মাধবীলতায় জড়ানো কংক্রিটের দেয়াল । মোহিত কামাল

আনুমানিক পঠনকাল: 16 মিনিট

শিফনের অনন্য ডিজাইনের শাড়িতে অপূর্ব লাগছে স্নেহাকে।
ঢেউ খেলানো চুল ঝুলে আছে ওর মুখের ডান পাশ জড়িয়ে বুকের ওপর। সাদা শিফনের পাড়ে সোনালি জরির ঠাসা কাজ। সাদা শাড়ির পুরো জমিনে শৈল্পিক ঢঙে ফোটানো আছে সিক্যুইন বা অলংকার হিসেবে সেলাই করা চুমকির কারুকাজ। শাড়িটাকে আর কেবল সাদামাটা মনে হচ্ছে না, অপূর্ব সুন্দর লাগছে। ভারী জরির কাজ করা আছে ব্লাউজেও। জমকালো লুক ফেটে বের হচ্ছে স্নেহার দেহভঙ্গি থেকেও। সব মিলিয়ে অনিন্দ্য সুন্দরী স্নেহাকে দেখতে দেখতে তার সৌন্দর্যের চুম্বক-টান খেতে লাগল রাহুলের চোখ।

দেশের সেরা বিউটি পারলার পারসোনা থেকে সেজে পার্টিতে এসেছে স্নেহা। দারুণ স্মার্ট দেখালেও লজ্জাবতী পাতার মতোই লাগছে তাকে। সাধারণত ছেলেদের সামনে চুপসে থাকে, কুঁচকে থাকে, কথা বলতে পারে না মুখ ফুটে। আজকের অনুষ্ঠানে এসেও ওর একই অবস্থা হচ্ছে। কুসুম, মানে ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর প্রথম ‘ম্যারেজ ডে’ উপলক্ষে বেড়াতে এসেছে স্নেহা। সাজটাও তাই নিয়েছে ভালো পারলার থেকে। উজ্জ্বল ঝলমলে রঙের ট্র্যাডিশনাল লুকের ভেতর থেকে ফুটে আছে ভাসা ভাসা নজরকাড়া চোখ, টিকালো নাক। ওর ন্যাচারাল লুক জীবন্ত-ক্রিয়েটিভ মেকআপের কারণে মার্জিত হাল-ফ্যাসনের দুর্দান্ত ছোঁয়া ছড়িয়ে যাচ্ছে। তা দেখে অনুষ্ঠানে উপস্থিত রাহুলের মন জুড়িয়ে গেল। অপলক তাকিয়ে আছে সে। স্নেহা যেদিকে যাচ্ছে সেই দিকে ছুটছে রাহুলের মুগ্ধ চোখ। কারও সঙ্গে কথা বলছে না রাহুল, কেবলই দেখছে স্নেহাকে। বুকের ভেতর ঝড় ওঠায় কুসুমের কাছে গিয়ে বলল, তোমার ওই বান্ধবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে?
বিদেশ ফেরত একমাত্র দেবরের আবদার ফেলতে পারল না কুসুম। স্নেহাকে টেনে নিয়ে এল রাহুলের সামনে। বলল, শোন্ স্নেহা, ও হচ্ছে আমার দেবর …
কথা কেড়ে নিল স্নেহা। লজ্জা ঝেড়ে শুদ্ধ গলায় বলল, আপনার নাম রাহুল, রাইট?
স্নেহার মুখে নিজের নাম শুনে হকচকিয়ে গেল রাহুল। বিমূঢ় হয়ে তাকাল কুসুমের দিকে। স্নেহার প্রশ্নের জবাব দিতে পারল না।
বেঙ্গালুরুতে পড়াশোনা করছেন? স্নেহা আবার প্রশ্ন করল।
জি। নিমহ্যান্স-‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্স’। এখন এটির নামকরণ হয়েছে ‘ডিম ইউনিভার্সিটি’।
আমিও গিয়েছিলাম সেখানে। হাসপাতালের ভেতর অনিন্দ্যসুন্দর একটা ফুলবাগান আছে, দেখে বিমূঢ় হয়ে গিয়েছিলাম!
কেন? বিমূঢ় হয়ে গিয়েছিলেন কেন?
অসহ্য সুন্দর বাগানটার সৌন্দর্য গ্রাস করেছিল আমাকে। কেড়ে নিয়েছিল মুখের ভাষা।
রাহুল মনে মনে বলল, অনিন্দ্যসুন্দর এ মেয়েটিকে দেখে এখন আক্রান্ত হয়েছি আমিও, বিমূঢ় হয়ে গেছি। মুখে বলল, হ্যাঁ। বাগানটা খুব সুন্দর! সেখানে চলচ্চিত্রের বিভিন্ন ছবির শুটিংও হয়ে থাকে।
স্নেহার সংকোচ কেটে গেছে। হড়বড়িয়ে কথা বলতে বলতে প্রশ্ন করল, কতদিন থাকবেন দেশে?
দুই সপ্তাহ থাকব।
ওহ্। বলে থেমে গেল স্নেহা।
রাহুল কথা খুঁজে পেল না। হঠাৎ বলে ফেলল, কী কারণে গিয়েছিলেন নিমহ্যান্স?
মার ব্রেন টিউমার হয়েছিল। চেক করাতে গিয়েছিলাম।
কেমন আছেন মা এখন?
ভালো। পুরোপুরি সুস্থ। চিকিৎসকেরা বলেছেন, বিনাইন টিউমার। নিরাপদ। ভয়ের কিছু নেই। মা এখন ভালো।
হ্যাঁ। বিনাইন টিউমারের প্রোগনোসিস ভালো।
প্রোগনোসিস মানে কী?
মানে রোগের পূর্বাভাস, ফলাফল। অপারেশন-পরবর্তী অবস্থা কেমন হতে পারে তার ধারণা। এটাকে প্রোগনোসিস বলে।
কঠিন শব্দ। স্নেহা বলল।
আবারও হোঁচট খেল রাহুল। কী বলবে বুঝতে পারল না।
এ সময় বেজে উঠল স্নেহার মুঠোফোন। কল এসেছে। হাতে ফোনসেট নিয়ে বলল, এক্সকিউজ মি, প্লিজ! বলে আড়ালে সরে গেল। রাহুল বোকার মতো দাঁড়িয়ে দূর থেকে দেখতে লাগল স্নেহার কথোপকথনের ভঙ্গি। শুনতে পেল না কথার বিষয়বস্তু। কেবল বুঝতে পারল খুশিতে আছে সে।
কথা শেষ করে ফিরে এল স্নেহা। রাহুলকে উদ্দেশ করে বলল, আপনার হাতে ওটা কী বই?
বইটি সামনে তুলে ধরে রাহুল বলল, নোবেলজয়ী লা ক্লেজিওর একটি ইংরেজি অনুবাদগ্রন্থ। একজন অতিথি বইটি গিফট করেছেন ভাইয়া-ভাবির ম্যারেজ ডেতে আজ। মোড়ক খুলে গিয়েছিল-লাগাতে গিয়ে দেখে ফেলেছি বইটা। লোভ সামলাতে পারিনি। হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলাম। এমন সময় দেখি আপনাকে। ভাবী পরিচয় করিয়ে দিল আপনার সঙ্গে। তার আগে থেকে বইটা হাতে ছিল। রাখতে ভুলে গেছি।
বইটা খুব ভালো লেগেছে আপনার? জানতে চায় স্নেহা।
এখনও পড়িনি। দেখে লোভ হয়েছে। তুলে নিয়েছি হাতে। পড়লে বুঝতে পারব ভালো কি মন্দ।
উত্তর দিয়ে রাহুল পাল্টা প্রশ্ন করল, সাহিত্য পড়েন, আপনি?
হুঁম।
লা ক্লেজিওর নাম শুনেছেন?
স্নেহা হাসল। মৃদুস্বরে বলল, শুনেছি।
এই নোবেলজয়ী লেখকের বিষয়ে জেনেছেন কিছু?
হুঁ। আবারও ছোট্ট জবাব স্নেহার।
রাহুল বলল, কিছু কথা পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। এখনও আমার ভালো করে পড়ার সুযোগ হয়নি তাঁর লেখা। তবে বিভিন্ন পত্রিকায় অনুবাদ-গল্প ছাপা হয়েছে। সাক্ষাৎকারের অনুবাদ ছাপা হয়েছে। পড়েছি সে-সব অনুবাদ।
বাহ্ ! আপনার সঙ্গে দেখছি মিল আছে আমার। বলল, স্নেহা।
কী মিল? প্রশ্ন করল রাহুল।
আমিও পড়েছি পত্রিকায় প্রকাশিত লেখাগুলো।
কী বিষয় দাগ কেটেছে আপনার মনে?
সাক্ষাৎকারের কিছু কথা দাগ কেটেছে। উত্তর দিয়ে স্নেহা জিগ্যেস করল, কী বিষয় আপনার মনে দাগ কেটেছে?
রাহুল হুবহু মুখস্থ বলে গেল-‘সাহিত্য তখনই গভীরতর হয় যখন তা প্রথম অনুভূতি, প্রথম অভিজ্ঞতা, প্রথম ধারণা, প্রথম অসন্তুষ্টিগুলো উপস্থাপন করতে পারে।’
উত্তর শুনে লাফিয়ে উঠল স্নেহা। প্রায় চিৎকার করে বলল, আমার মনেও দাগ কেটেছে পত্রিকার পাতায় বোল্ড করে ছাপানো কথাগুলো।
রাহুল ভাবল, দারুণ মিল তো দুজনার! মুখ ফুটে বলল, ভালো লাগছে আপনার এক্সপ্রেশন দেখে!
স্নেহা হাসতে হাসতে বলল, ভালো লাগার কারণে বইটি হাতে তুলে নিয়েছিলেন, না পড়ে রেখে দেবেন?
না, না। পড়ার ইচ্ছা জাগলে না পড়ে ছাড়ি না আমি। ছাড়তে পারি না।
আমার এক্সপ্রেশন দেখেও তো ভালো লাগছে আপনার। বইটির মতো আমাকেও আবার হাতে তুলে নেবেন না তো? বলে হাসিতে গড়াগড়ি খেল স্নেহা।
আপনার সঙ্গ পেয়ে প্রথম ধারণাটি অসাধারণ, ইতিবাচক। প্রথম অনুভূতিটাও আনন্দময় আর প্রথম অভিজ্ঞতা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না!
বাহ্! সাহিত্য এখানেই রচিত হয়ে গেল, কী বলেন!
না। রচিত হয়নি। তবে রচনা করার ইচ্ছা তৈরি হয়েছে। লোভ হচ্ছে বইয়ের মতো ধরে রাখার।
বই আর মানুষ কি এক হলো?
হ্যাঁ, একই। বই হচ্ছে চির-যৌবনা। আমার-আপনার এ মুহূর্তটা স্থির হয়ে বসে থাকবে। অথচ আমরা বুড়ো হয়ে যাব। বই বুড়ো হয় না। যৌবন হারায় না। কিছু কিছু মুহূর্তও যৌবন হারায় না। ম্লান হয় না।
‘যৌবনা’ শব্দটা নারীত্বের কোমল অনুভবে ছুঁয়ে গেল। উচ্ছ্বল আনন্দধারা থেকে লজ্জার খোলসে ঢুকে যেতে লাগল স্নেহা। তারপর লাল হয়ে বলল, ইচ্ছা করলে বইয়ের মতো তারুণ্যময় জোশটাও ধরে রাখা যায়। বড়োরা বলেছেন, দেহ বুড়ো হলেও, মন বুড়ো হয় না। মনের তারুণ্য বুড়ো বয়সেও সজীব রাখা যায়।
তাহলে তো বর্তমানের গিঁট শক্ত হতে হয়। বুনিয়াদটা মজবুত হতে হয়। মজবুত প্ল্যাটফর্ম আছে আপনার?
সরাসরি নয়, পরোক্ষ প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হাসতে লাগল স্নেহা। জবাব না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল, আপনার বুনিয়াদ কেমন? শক্ত, না নরম?
রাহুল হাসতে হাসতে বলল, তৈরি হয়নি।
বলেন কি! এ বয়সেও তারুণ্যের গাঁথুনি গড়ে ওঠেনি? বেঙ্গালুরুর মতো সুন্দর জায়গায় থাকেন, কেউ ডাক পাঠায়নি?
বেঙ্গালুরুর দিন কাটে রোবটের মতো। আমরা নিজেদের যন্ত্রমানব নাম দিয়েছি। পড়া, ঘুম আর পড়া। এটা হচ্ছে মূল বিষয়।
এটাই তো গড়ে দেয় বাস্তবতার ভিত। বাস্তব ভিত তৈরি হলে আবেগের ভিতও গড়ে ওঠার কথা, অনুভ‚তিগুলো সযত্নে রাখার তাক তৈরি হয়ে যাওয়ার কথা।
রাহুল বলল, তৈরি হয়নি। অনিন্দ্য সুন্দরী, যে সামনে আছে, খালি থাকলে জায়গা তৈরি করে নিতে পারি।
বাবা! এ যে দেখছি সরাসরি প্রপোজাল। ডাইরেক্ট অ্যাকশন।
এ ছাড়া উপায় নেই। সরাসরি কথা বলাই ভালো, দেখে ভালো লেগেছে। সুযোগটা কাজে লাগাতে চাচ্ছি।
দেখে ভালো লাগলে হবে না। পড়ে নিতে হবে আগাগোড়া। পড়ার পর যদি ভালো না লাগে? যেমন বইটি দেখে লোভ হয়েছে, পড়েননি বলে এখনও কমেন্ট করতে পারছেন না এর বিষয়ে, তাই না?
নিজের কথা বুমেরাং হয়ে আঘাত করল। আঘাত প্রতিহত করে রাহুল বলল, টেলিফোন নম্বরটা পেলে পড়াশোনার সুযোগ পেতে পারি। নম্বরটা দেওয়া যাবে?
নিজের লোভ হয়েছে বিধায় পেতে চাচ্ছেন? অন্যের মতামত নিতে হবে না?
অন্যের মতামত নেওয়ার জন্যই তো চাচ্ছি সেল নম্বর। দেওয়া যাবে?
স্নেহা নরম গলায় বলল, না।
দপ করে নিভে গেল রাহুলের মুখ। কালো ছায়ায় ঢেকে গেল মুখের উজ্জ্বল রং।
না, কেন? বিধ্বস্ত গলায় জানতে চায় রাহুল।
না, মানে না। কারণ জানতে চাওয়া অনধিকার চর্চা। অধিকার না পেয়ে অধিকারের চেষ্টা করা মানে চাপ দেওয়া, প্ররোচনা করাও। প্ররোচিত করে রিয়েল কিছু কি পাওয়া যায়?
কাটকাট কথা মুষড়ে দিল রাহুলকে। কোনো মেয়েকে এই প্রথম ভালো লেগেছে, তা নয়। তবে এ ধরনের ভালো কাউকে লাগেনি আগে। এমন সরাসরি কথাও বলা হয়নি কাউকে। ধাক্কা খেয়ে সামলে নিল নিজেকে। কী বলবে বুঝতে পারল না নিউরো-ফিজিশিয়ান রাহুল।
স্নেহা বলল, আপনার নম্বরটি দিন আমাকে।
শোনার সঙ্গে সঙ্গে পানি ফিরে এল পরানে। নম্বরটা মুখে উচ্চারণ করল রাহুল।
নিজের ফোনসেটে স্টোর করে নিয়ে স্নেহা বলল, ধন্যবাদ আপনাকে।
রাহুল বলল, নম্বরটা নেওয়ার জন্য আপনাকেও ধন্যবাদ।
অন্যদিকে এগিয়ে গেল স্নেহা। খাবার টেবিলে গিয়ে বসল। কেমন যেন লাগছে নিজেকে। মনে হচ্ছে খাবার টেবিলে রাহুল পাশে থাকলে ভালো লাগত। ভালো লাগছে না এখন। তবু খেতে বসেছে। অনেক গেস্ট। কেউ কেউ খাচ্ছে, কেউ আড্ডা দিচ্ছে। চুপচাপ খাচ্ছে স্নেহা। উচ্ছ্বাস সময় অতিথিদের মধ্যে থেকেও একা হয়ে গেল।
আচমকা পিঠে একটা থাপ্পড় এসে পড়ল। পেছন ফিরে দেখল কুসুমকে। কী রে? একা বসে গেলি কেন? আমার সঙ্গে বসতি!
মাঝে মাঝে নিজেকে একা উপভোগ করা ভালো। এখন একা উপভোগ করছি। ভালো লাগছে।
বাহ্! এ যে দেখছি দার্শনিকের মতো কথা? নিউরো-ফিজিশিয়ান কি স্নায়ুর ঘরে দর্শন জাগিয়ে দিয়েছে?
প্রশ্নের জবাব না দিয়ে কুসুমের মুখের দিকে তাকাল স্নেহা।

দুই
ছেলেরা মুগ্ধ চোখে তাকায়-বিষয়টা বেশ এনজয় করে স্নেহা। আবার ভুলেও যায় সহজে। প্রপোজাল পায় পথেঘাটে, এসএমএস আসে মুহুর্মুহু। ফোনসেট খোলা রাখা দায়। সুন্দরীদের এ এক জ্বালা। কাকে গুরুত্ব দেবে? বাছাই করা দুঃসাধ্য। দু-চারজন যে দাগ কাটেনি মনে, তা নয়। দাগ কেটেছে। নানা কারণে কারও সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া হয়নি। ইচ্ছা হলেও আর জড়াতে চায় না কারও সঙ্গে। অথচ গতকাল রাতের পার্টিতে দেখা রাহুলের মুখ বারবার ভেসে উঠছে চোখের সামনে-সরল একটা যুবক, নিষ্পাপ চাউনি, হ্যান্ডসাম অ্যান্ড টল-সব মিলিয়ে রাহুলের জন্য মনে আলোড়ন উঠেছে। ইচ্ছা করছে ফোন করতে। ফোন না করে শুয়ে রইল স্নেহা।
কী মিরাকল! ভাবছে রাহুলের কথা। আর ফোন এসেছে রাহুলের ভাবি কুসুমের!
ফোন ধরে স্নেহা প্রশ্ন করল, রাহুলের ভাবি সাহেবান, কী খবর?
খবর তো খারাপ। কুসুম গম্ভীর হয়ে জবাব দিল।
খারাপ মানে?
খারাপ, বিছানায় পড়ে গেছে রাহুল। অসুস্থ হয়ে পড়েছে। গত রাতে ফুড পয়জনিং হয়েছিল। হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হয়েছিল, স্যালাইনও দেওয়া লেগেছে।
বলিস কি! এখন কেমন?
দেখে যা। ঘুরে যা আমার শ্বশুরবাড়ি থেকে।
যাওয়াটা কি ঠিক হবে আমার? কী পরিচয়ে যাব?
আমার পরিচয়ে আসবি। আমার বান্ধবী তুই।
ভেবে দেখ, ঠিক হবে কি না আমার যাওয়াটা।
আরে, গত রাতে তোকে দেখার পর থেকে মন-পয়জনিংও হয়েছে রাহুলের। তুই এলে মনটা ভালো হবে, সঙ্গে সঙ্গে শরীরেরও উন্নতি হবে। চলে আয়। ভাবনার কিছু নেই।
হাসল স্নেহা। মন-পয়জনিং! সেটা আবার কী?
বিষ! বিষ! মনে বিষের ছোবল খেয়েছে!
কে দিয়েছে ছোবল?
স্নেহা। আমার ফ্রেন্ড স্নেহা ছোবল দিয়েছে দেবর রাহুলকে।
সেকি রে! কালনাগিনী নাকি আমি?
না। তার চেয়েও ভয়ংকর কিছু। হাসতে হাসতে বলল কুসুম।
কুসুমের মুখে হাসি থাকলেও নিভে গেল স্নেহার চঞ্চলতা। চারপাশে দেখছে সে অন্ধকার। অন্ধকারে টিমটিম করে জ্বলছে নিভু-নিভু বাতি। এ বাতি আলো জ্বালাতে পারবে না মনঘরে, জানে স্নেহা।
চুপ করে আছিস কেন? কথা বল। আসবি কি না?
আসব। ছোট্ট করে জবাব দিল স্নেহা।
কখন আসবি?
এখনই আসব। তোর দেবরকে বেশি লাই দিস না। কষ্ট পাবে তাহলে।
লাই দেব কেন আমি? দিলে তুই-ই দিবি।
না। সেই সুযোগ আমি দেব না।
কেন? সে কি অযোগ্য?
ছিঃ! সে অযোগ্য হবে কেন? অযোগ্য হচ্ছি আমি। তোর ফ্রেন্ড স্নেহা।
নো। নেভার। মাই ফ্রেন্ড স্নেহা কান্ট বি আনফিট ফর রাহুল।
দুই ভাইয়ের গলায় সমবয়সী ঝোলাতে চাস নাকি?
দুই ভাই মানে? আমারটার গলায় ঝুলতে চাস তুই?
না। আমি যদি ঝুলি ছোটোটার গলায়, দুই ভাই সমবয়সী বউ পেয়ে গেল না? সমস্যা হবে না?
হোঁচট খেল কুসুম। রাহুল ওর বড় ভাই থেকে পাঁচ বছরের ছোটো। অথচ বউ দুটা হবে সমান বয়সী। না। মানায় না। দেবরের বউ পাঁচ বছরের ছোটো হলেই ভালো।
কিছুক্ষণ ভেবে কুসুম জবাব দিল, ঠিক বলেছিস। তোর যুক্তি মেনে নিলাম।
মানলে তো হবে না। যে বিষের ছোবল খেয়েছে তাকে মানাতে হবে।
সে যুক্তি মানবে না।
বিষের ছোবল যে খায়, তার মাথায় যুক্তি থাকে না। থাকে জলোচ্ছ্বাসের ঢেউয়ের মতো আবেগ। ওই আবেগ সামাল দেওয়া কঠিন। কাছে গেলে ঢেউয়ের তোড়ে ভেসে যাই কি না, ভয় পাচ্ছি।
আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি থাকলে ভয় পাবি। ভয়ের কী আছে? তুই শক্ত থাকলে সে-ও সামলে উঠবে।
আচ্ছা। শক্ত থাকব। আসছি আমি।
থ্যাংকস সুইট ফ্রেন্ড। আয়, অপেক্ষা করছি তোর জন্য।

তিন

এগোনোর পর পেছানো কঠিন!
এগোবে, না পেছাবে-সংকটে পড়ে গেল স্নেহা। কুসুমকে কথা দিয়েছে। যেতেও ইচ্ছা করছে। তবে যাওয়াটা ঠিক হবে না ভেবে অ্যাপ্রোচ-অ্যাভয়ডেন্স বা আকর্ষণ-বিকর্ষণ দ্বন্দ্বে আটকে গেল স্নেহা।
অবশেষে জয় হলো কুসুমের। জয় হলো নিজের ইচ্ছার। বাস্তবতার দেয়াল টপকে সাধারণ সাজে বাসা থেকে বের হলো স্নেহা। ভাবল, যাওয়ার আগে টেলিফোন করলে কেমন হয়! টেলিফোন নম্বর দিয়েছিল রাহুল। এখনকার একটা কল ওষুধের মতো কাজ করবে। ওষুধ খাইয়ে শক্ত করে তোলা যেতে পারে ভেবে কল দিল স্নেহা। নাহ্! মোবাইলে ঢোকা যাচ্ছে না। সেট বন্ধ। ফুঁসে ওঠা উত্তেজনার পারদ হঠাৎ দপ করে নেমে এল নিচে। খারাপ লাগা তৈরি হয়ে গেল মনে। বড় করে শ্বাস ছেড়ে এগিয়ে গেল সামনে। কাছেই বাসা। রিকশার পথ। রিকশায় উঠে বসল স্নেহা।
এগিয়ে যাচ্ছে রিকশা। মুঠোসমান হ্যান্ডবাগে রয়েছে মোবাইল ফোনসেট। অল্প কিছু টাকাও। ডান হাতে মুঠিতে ধরে রেখেছে ব্যাগটা। রিং হচ্ছে ফোনসেটে। চেইন খুলে সেটটা বের করে কানে ধরল ও।
স্নেহা, তুমি কোথায়? কল করেছেন স্নেহার মামা।
বাসা থেকে বের হয়েছি? এক ফ্রেন্ডের বাসায় যাচ্ছি।
আমি এসেছিলাম তোমার কাছে। সিঙ্গাপুর থেকে তোমার রিপোর্টগুলোর কমেন্ট আনিয়েছি। সবার সঙ্গে আলাপ করার আগে কথা বলতে চাই তোমার সঙ্গে।
তুমি বাসায় যাও, মামা। আমি এক ঘণ্টার মধ্যে আসছি।
আমি এখন তোমার পেছনে। রিকশা ছেড়ে দাও। আমার গাড়িতে ওঠো। তোমার গন্তব্যে নামিয়ে দিয়ে আসি।
ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল স্নেহা। দেখল, কালো রঙের টয়োটা জি অনুসরণ করছে তার রিকশা। ড্রাইভিং সিটে বসে হাসছেন মামা।
তোমাকে গোয়েন্দার মতো লাগছে মামা।
হ্যাঁ। গোয়েন্দাগিরিই করছিলাম!
তুমি ব্যাক করো। আমার পেছনে লেগো না। বাসায় যাও। আসছি আমি।
বাসায় যাব কেন? নেমে এসো রিকশা থেকে।
তোমার অত্যাচারে বাঁচা যাবে না।
উপকার করতে চাচ্ছি আমি, আর তুমি সেটাকে ভাবছ অত্যাচার? নেমে এসো, বলছি। মরতে দেবে কে তোমাকে?
মরতে দেবে না মানে? মরা কি ঠেকাতে পারবে তুমি?
যে কারণে সবাই ভয় পেয়েছে সে কারণে মরবে না। কনফার্ম রিপোর্ট। কী কারণে মারা যাব আমরা কেউ জানি না। তবে জেনে এসেছি, ‘বিনাইন টিউমারের’ কারণে মারা যায় না কেউ। নেমে এসো, স্নেহা।
বিরক্ত হলো না স্নেহা। মামার এ আদর ভালো লাগে ওর। ভাগ্নির জন্য এত করেন! কেন এত টান মামার জানে না ও।
রিকশা থামিয়ে নেমে এল স্নেহা। গাড়িতে সামনের সিটে বসে, বলল কোথায় যেতে হবে?
জিগাতলা চলো।
জিগাতলা অনেক বড়ো এলাকা। স্পেসিফিক বলো।
জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হসপিটালের দুটো বাড়ির পর। রোড-৩-এ, ধানমন্ডি।
কার বাসা?
আমার বান্ধবী কুসুমের বাসা।
কুসুমের বাসা তো এলিফ্যান্ট রোডে।
কুসুমের শ্বশুরবাড়ি।
ওহ্। তাই বলো।
তুমি যাবে না শ্বশুরবাড়ি?
না।
না কেন?
কেন আবার কী? যাব না, ব্যস যাব না। দিস ইজ মাই ডিসিশন।
কেন যাবে না?
বিনাইন টিউমার বলো আর যা-ই বলো, ব্রেন টিউমার নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যাওয়া উচিত নয়। অন্যকে ঠকানো হবে।
ঠকানোর কী আছে? রোগ আছে, চিকিৎসাও আছে রোগের। এ চিকিৎসায় রয়েছে শতভাগ সাফল্য। ঠকানোর প্রসঙ্গ আসছে কেন?
বারবার ‘ঠকানো’ শব্দটা বলার সময় রাহুলের কথা মনে পড়তে লাগল স্নেহার। রাহুলকে বলেছে ডাহা মিথ্যা কথা। বলেছে মায়ের টিউমারের চিকিৎসার জন্য গিয়েছিল বেঙ্গালুরু। কেন এ মিথ্যা বলেছিল স্নেহা? জানা নেই উত্তর। অথচ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভেতর থেকে ধেয়ে এসেছিল মাকে জড়িয়ে বানানো গল্প। সে-সময় কোনো অনুশোচনা হয়নি। এখন অনুতাপ হচ্ছে। কেন এ ভুলটা করল? তখন বলে দিলে হতো। সাবধান হয়ে যেত রাহুল। বিষের ছোবল খেতে হতো না তাকে। কুসুমও জানে না স্নেহার ব্রেন টিউমারের কথা। জানে কেবল মামা, আর বাবা। মা ও ভাইয়াও জানে না ভালো করে। এখন যাওয়া উচিত হবে না রাহুলের কাছে। গেলে আরও আসক্তি বাড়বে। আরও ক্ষতি বাড়বে রাহুলের। যে-ই দেখে সেই পছন্দ করে স্নেহাকে। বিষয়টা নতুন নয়। নির্লিপ্ত থাকতে পারে স্নেহা। এখন নির্লিপ্ত থাকতে পারছে না। গুরুত্ব দিচ্ছে রাহুলকে। গুরুত্ব ইচ্ছা করে দিচ্ছে, তাও না। একদম গভীর থেকে চলে আসছে অদ্ভুত একটা টান। আগে কখনও কোনো ছেলের ব্যাপারে এমন হয়নি। কিসের টান এটি? কেন টানে মন? না যাওয়ার ইচ্ছা জাগল না কেন মনে?
এসব ভাবনা চুপ করিয়ে রাখল স্নেহাকে।
গাড়ি টার্ন নিল ডানে। হাসপাতালের উত্তর পাশের গলি দিয়ে এগিয়ে গিয়ে মামা বলল, বলো, কোন বাড়িটা?
ওই তো বাঁয়ে।
বাড়ির সামনে দাঁড়াল গাড়ি।
মামা বললেন, দেরি হবে? দাঁড়াব আমি?
না। চলে যাও তুমি। কতক্ষণ থাকব বুঝতে পারছি না। নিজে ফিরব, অথবা কুসুম নামিয়ে দেবে।
চারদিকে মলমপার্টি জোরালো হয়েছে। প্রতিদিন একজন-দুজনের মৃত্যু সংবাদ আসছে পত্রিকায়। সাবধানে এসো।
বড়দের নিয়ে এ এক জ্বালা! কথায় কথায় একেবারে আকাশ ছুঁয়ে ফেলে তোমাদের ডায়ালগ! আর শব্দ পেলে না? একদম ‘মৃত্যু’ পর্যন্ত টেনে নিলে?
যা বলেছি-তোমার ভালোর জন্য বলেছি। সরি। এমন বলা ঠিক হয়নি।
যাও। ঘ্যানর-ঘ্যানর করতে হবে না আর! বাসায় যাও। আমি আসছি।

সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এল স্নেহা। ডোরবেল টেপার সঙ্গে সঙ্গে খুলে গেল দরজা!
ছোটো একটা মেয়ে দরজা খুলে দিয়েছে। সে কি দাঁড়িয়েছিল দরজার পাশে? এত দ্রুত দরজা খুলল কীভাবে?
ঘরে ঢুকে স্নেহা বলল, কুসুম নেই?
মেয়েটি জবাব দিল, আছে।
কোথায়? ডাকো।
ভাবীজান বাথরুমে।
কৌতুহলী হয়ে স্নেহা প্রশ্ন করল, দরজার পাশেই দাঁড়িয়েছিলে তুমি?
হ।
কেন?
ছোটো ভাইজান কইল, একজন মেহমান আইছে। দরজা খুইলা রাখ্।
ছোটো ভাইজানটা কে?
রাহুল ভাইজান।
ওহ্! চমকে ওঠল স্নেহা। রাহুল জানল কীভাবে আমার আসার সংবাদ? মনে প্রশ্ন জেগে ওঠায় ভাবল নিশ্চয় কুসুম আগেই বলে রেখেছে।
বসার ঘরে একটা সোফায় বসল স্নেহা।
মেয়েটি বলল, ভাইজানের কাছে আহেন।
কোথায়?
ব্যালকনিতে বইসা আছেন।
অসুস্থ মানুষ থাকবে বিছানায়, ব্যালকনিতে কেন? নিজেকেই প্রশ্ন করল স্নেহা। প্রশ্ন নিয়ে উঠে দাঁড়াল। মেয়েটি তাকে নিয়ে গেল ব্যালকনিতে।
একটা ইজি চেয়ারে বসে আছে রাহুল। পাশে রয়েছে আর একটা চেয়ার।
খুব সহজ ভাষায় রাহুল বলল, বসুন।
কোনো প্রশ্ন না করে খালি চেয়ারটায় বসল স্নেহা। ব্যালকনির কোনায় রয়েছে একটা টব। টব থেকে উঠে গেছে মানিপ্ল্যান্টের লতা-জড়িয়ে রেখেছে ব্যালকনির গ্রিল। পুরো গ্রিলে শৈল্পিক ঢঙে সেজেছে বাহারি পাতার পেঁচানো খেলা। বাইর থেকে দেখা যায় পাতার সাজ। ভেতরে কেউ দাঁড়িয়ে থাকলে বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই। ভেতর থেকে রাস্তার অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। তবে কি ব্যালকনিতে বসে গাড়ি থেকে তাকে নামতে দেখেছে রাহুল? হতে পারে। এ কারণে দরজা খোলার জন্য পাঠিয়েছে মেয়েটিকে নিজ থেকে। ভাবতে ভাবতে সহজ উত্তর পেয়ে স্বাভাবিক হয়ে গেল স্নেহা।
এখন কেমন আছেন ?
এ মুহূর্ত থেকে ভালো লাগছে।
ও? আর কী বলবে বুঝতে পারল না স্নেহা।
ভাবী বলেছিল, আসবেন আপনি। এজন্য অপেক্ষা করছিলাম ব্যালকনিতে বসে। বলল রাহুল।
শুনলাম হসপিটালে যেতে হয়েছিল আপনাকে?
হ্যাঁ। বমি হয়েছিল অনেকবার। কাহিল হয়ে পড়েছিলাম। পাশেই হসপিটাল। ওখানে নিয়ে গিয়েছিল। ইমার্জেন্সির ডাক্তাররা ওষুধ দিল, সেলাইন দিল। কিছুটা ভালো বোধ করাতে সকালের দিকে বাসায় চলে এসেছি।
স্নেহা ভাবল, একটু আগে বলেছে ‘এই মুহূর্ত থেকে ভালো লাগছে’, এখন বলছে সকালের দিকে ভালো বোধ করেছে। মানুষ অযথা বাড়িয়ে বলতে চায়, অবচেতন থেকে মিথ্যা বলে ফেলে, চেতন মনে ধরা দেয় না তা। রাহুলেরও এখন সেই দশা। ইমপ্রেস করার জন্য এমন মিথ্যা বলার প্রয়োজন কী? এমনিতেই ইমপ্রেসড হয়ে বসে আছে।
মুগ্ধ চোখে স্নেহা তাকাল সামনে। মানিপ্ল্যান্ট পাতার ফাঁক-ফোকর দিয়ে দেখা যাচ্ছে সামনের একটা চমৎকার বাড়ি। বাড়ির লন সবুজ ঘাসে ভরা, দূর্বাদল নরম পাপোশের মতো দখল করে আছে পুরো প্রাঙ্গণ। মাধবীলতা জড়িয়ে রেখেছে বাড়ির উঁচু দেয়াল।
স্নেহার চোখ অনুসরণ করে রাহুলও তাকাল সামনে। ওর বিমুগ্ধ চোখের ভাষা পড়ে নিল রাহুল। ঠান্ডা গলায় বলল, এটা আওয়ামী লীগের নিহত নেতা গোলাম কিবরিয়া সাহেবের বাড়ি। কিছুদিনের মধ্যে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ এখানে অ্যাপার্টমেন্ট গড়ে তুলবে।
এমন সুন্দর বাড়িতে অ্যাপার্টমেন্ট! ধানমন্ডির একক বাড়িগুলো শেষ হয়ে গেল! এ সুন্দর বাড়িটাতে অ্যাপার্টমেন্টের প্রয়োজন কী? এখানে একটা মিউজিয়াম গড়ে তুললেই তো হয়। বাড়িটা এমনই থাকুক। বলল স্নেহা।
যখন শুনেছি এখানে অ্যাপার্টমেন্ট হবে, আমার মনেও এমন কষ্ট লেগেছে। ডেভেলপারদের কাছে আমাদের কষ্টের দাম নেই, বুঝলেন।
রাহুলের কথা শুনছে না স্নেহা। উচ্ছ্বল গলায় বলল, মাধবীলতা মায়ায় জড়িয়ে রেখেছে বাড়ির উঁচু দেয়াল, দেখেছেন?
হুঁ। প্রকৃতির অনেক মায়া! সবুজ গাছগাছালি জড়িয়ে রেখেছে কংক্রিটের দেয়াল-কংক্রিটের ভেতরও মনে হচ্ছে জাগিয়ে তুলেছে প্রাণ!
হ্যাঁ। মায়ার বাঁধন এমনই শক্ত। একবার এ বাঁধনে জড়ালে ছাড়ানো কঠিন।
ছাড়ানোর প্রয়োজন কী?
বাস্তবতা। বাস্তবতা ছাড়তে বাধ্য করে সব বাঁধন। আপনিই তো বললেন, ডেভেলপাররা ওই বাড়িটিকে অ্যাপার্টমেন্ট বানিয়ে ফেলবে। এটাই বাস্তবতা। নিষ্ঠুর বাস্তবতা গুঁড়িয়ে দেবে সুন্দর বাড়িটা।
গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথাটা এমন জোরালোভাবে বলল কেন স্নেহা? প্রশ্ন এল রাহুলের মনে। উত্তর খোঁজার জন্য শূন্য চোখে তাকাল স্নেহার মুখের দিকে। মায়ায় পূর্ণ হয়ে উঠল না, শূন্য হতে লাগল চোখ, এমন কঠিন অভিব্যক্তি দেখে হোঁচট খেল রাহুল।
হঠাৎ ব্যালকনিতে এল কুসুম।
কি রে, কখন এলি, চুপিচুপি ব্যালকনিতে? এমন স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছিস কেন? স্নেহাকে উদ্দেশ করে প্রশ্ন করল কুসুম।
জবাব দিল না স্নেহা। বাইরের দিকে তাকিয়ে থেকে কুসুমের উচ্ছ্বাসের সঙ্গে তাল না মিলিয়ে বলল, আজ ভোর থেকে ভালো বোধ করছেন উনি।
কথাটা লুফে নিয়ে রাহুল বলল, সকাল থেকে ভালো বোধ করছিলাম। উনি আসার পর আরও বেশি ভালো লাগছে। এখন জ্বর-জ্বর লাগছে।
বলো কি! বলেই কপালে হাত দিল কুসুম। হ্যাঁ। তাই তো! জ্বর-জ্বর লাগছে! ডাক্তারকে জানাতে হবে। জ্বর আসলে জানাতে বলেছেন।
ভেতরের অনিয়ন্ত্রিত তাড়না সামাল দিতে না পেরে স্নেহাও চট করে হাত রাখল রাহুলের কপালে।
চোখ বুজে ফেলল রাহুল। অসাধারণ অনুরণন জেগে উঠল দেহে। ওর পুরো সত্তায় কাঁপন উঠল। কাঁপনে নড়ে উঠল বুকের ঘরে জমে ওঠা মায়ার পাহাড়।
স্নেহা বলল, কই জ্বর তো নেই!
কুসুম বলল, তোর হাতের ছোঁয়া লাগলে কি জ্বর থাকবে? পালাবে না? পালিয়েছে বোধ হয়। বলতে বলতে আবার কপালে হাত দিয়ে চমকে উঠল। তাই তো! শরীর এমন ঠান্ডা হয়ে গেল কেন? জ্বর উধাও হয়ে গেল কেন? কুসুমের বিস্ময় কাটে না।
রাহুল কথা বলছে না। চোখ খুলছে না। অভ‚তপূর্ব অনুভ‚তি নিয়ে বসে থাকে চুপচাপ। মায়ার জালে জড়াতে থাকে দেহের অণু-পরমাণু, মায়ার ডিএনএর ঘরে ঝড় ওঠে। এই ঝড়ের খবর টের পেয়ে যায় স্নেহা।
নিজেকে সামলে স্নেহা বলল, চোখ খুলুন।
চোখ খোলে রাহুল। দেখল কুসুম চলে গেছে ভেতরের ঘরে।
শুনুন, আমাকে মুগ্ধ করার প্রয়োজন নেই। সহজে মুগ্ধ হই না আমি।
ধারালো কথা শুনে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে রাহুল। বোঝে, ‘মুগ্ধ হই না’ বললেও মোহিত হয়ে বসে আছে স্নেহা। ভেতরের অনুভ‚তি আর বাইরের প্রকাশভঙ্গির সঙ্গে পার্থক্যটা ধরতে পারল ও। কথার জবাব না দিয়ে অপলক তাকিয়ে থাকে স্নেহার দিকে।
অমন করে তাকাবেন না তো!
কেন? তাকালে কী হয়?
মনে হচ্ছে আপনার চোখ লেগে যাচ্ছে দেহে।
লাগুক না। ক্ষতি কী?
ক্ষতি আছে!
কী ক্ষতি? প্রশ্ন করল রাহুল।
এখন ক্ষতি টের পাবেন না। পরে পাবেন।
কখন টের পাব?
বেঙ্গালুরু যাব আমি। সেখানে দেখা হলে টের পাবেন।
বেঙ্গালুরু যাবেন আপনি?
হুঁ। যাওয়া লাগবে। নিমহ্যান্সে যাব চেক করাতে।
অবশ্যই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। আমার ইন্ডিয়ার সিমের ফোন নম্বরটা লিখে নিন, প্লিজ।
এটাই চাচ্ছিল স্নেহা। রাহুল বলতে থাকে ফোন নম্বর। নিজের ফোনসেটে নম্বরটা স্টোর করে নেয় স্নেহা।
মাকে নিয়ে বেঙ্গালুরু যাবে স্নেহা, সত্য। চেক করানোর কথাও সত্য। রাহুল বুঝতে পারল না স্নেহা নিজেকে চেক করানোর কথা বলে দিয়েছে। সত্যটা বলেছে। ঘোরের মধ্যে থাকার কারণে সূত্রটা টের পায়নি ও। তার অন্তর আকাশে উড়তে শুরু করল লাল ঘুড়ি, নীল ঘুড়ি। রাহুলের মনে হলো অসীম আকাশটা এখন হাতের মুঠোয় বন্দি।


আরো পড়ুন: স্পর্শ । মোহিত কামাল


চার

বাংলাদেশ বিমানে ঢাকা থেকে কলকাতা নেতাজি সুভাষচন্দ্র ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে নামল স্নেহা, স্নেহার মা ও ছোটো মামা। বাবা আসবেন দুদিন পর। এটাই স্বস্তি। বাবার আতঙ্কিত চোখ সইতে পারে না স্নেহা। শক্ত আছেন মা। ছোটো মামার কথার জোরে শক্তি ফিরে পেয়েছেন মা।
এক ট্রলিতে তিনটা লাগেজ নিয়ে বেরিয়ে আসছে সবাই। ছোটো মামা ট্রলি ঠেলছে। স্নেহা ও স্নেহার মা হাঁটছেন সঙ্গে।
একটি ছেলে ছুটে এসে শুদ্ধ বাংলায় বলল, আমি বাংলাদেশের। এখানে এসে কষ্টে আছি। বাংলাদেশি দশ টাকার একটা নোট পেলে খুশি হব। ট্রলি ঠেলে নিচ্ছি আমি। ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে ডোমেস্টিক এয়ারপোর্ট। পূর্ব দিকে আসতে হয় বেশ খানিকটা পথ। মনে হচ্ছে ওই তো ওখানে …পথ ফুরোয় না। ছেলেটিকে উদ্দেশ করে স্নেহা বললে, বাংলাদেশি ছেলে এখানে ভিক্ষা করছ? দেশের সম্মান ডুবে যায়, বোঝ না?
ভিক্ষা করছি না, আপু। কাজ করে পয়সা চাচ্ছি।
ওই হলো। এটাই ভিক্ষা। ট্রলি ঠেলাটা এয়ারপোর্টের যাত্রীদের কাজ। শ্রমিক লাগে না এখানে। দেশের কথা বলে ভিক্ষা করছ তুমি। ভিক্ষা করবে করো। ভবিষ্যতে দেশের নাম উচ্চারণ কোরো না। নাও। দশ টাকা নাও। পথ ছাড়ো এখন।
টাকা পাওয়ার পর উধাও হয়ে গেল ছেলেটি। আরেকজন যাত্রী ধরার জন্য ছুটতে থাকে। মন খারাপ হয়ে গেল স্নেহার। ছেলেটিকে বকা দিতে হয়েছে, এজন্য বেশি খারাপ লেগেছে। বকা না দিয়েও উপায় নেই। এভাবে দেশের নাম বিকোয় কেউ পরদেশে?
কিছুক্ষণের মধ্যে অভ্যন্তরীণ এয়ারপোর্টে চলে এল তারা। জেট এয়ারওয়েজের টিকিট কাটা আছে। দুই ঘণ্টারও বেশি দেরি আছে এখনও, ইন্টারকানেকটিং টিকিট কাটা। এয়ারপোর্টের লবিতে বসে চারপাশ দেখতে লাগল স্নেহা। কলকাতার ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে অভ্যন্তরীণ এয়ারপোর্ট অনেক বড়ো, অনেক বেশি সুন্দর-জমজমাট। বেশি ব্যস্ততা অভ্যন্তরীণ রুটে।
লবিতে বসে অপেক্ষা করছে স্নেহা, আর ভাবছে কত উন্নত হয়েছে অভ্যন্তরীণ এয়ারপোর্ট। কিছুক্ষণ ঘুরল এদিক-ওদিক। মামা বসে আছেন ট্রলি নিয়ে।
নির্দিষ্ট সময় চেক ইন সেরে ওরা ওঠে জেট এয়ারওয়েজের এয়ারবাসে। কী বিশাল বিমান! বাংলাদেশ বিমানের মুড়ির টিনের চেয়ে হাজার গুণ ভালো। এয়ারহোস্টেজ ঘোষণা দিচ্ছেন। একি! কলকাতা এয়ারপোর্ট থেকে ছাড়ছে অথচ বাংলায় কোনো ঘোষণা নেই। হিন্দি ও ইংরেজি ঘোষণা দিয়ে শেষ। বাংলায় বলবে না ওরা?
পাশে বসে আছে একটি বাঙালি ছেলে। সেও যাচ্ছে বেঙ্গালুরু। বলল, দিদি বাংলা বলবে না ওরা।
প্রতিবাদ করেন না?
প্রতিবাদ করে কী হবে, দিদি? বাংলা নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে কলকাতাবাসীদের? এ দেশে অসংখ্য ভাষাভাষীর মানুষ রয়েছে। বাংলার ভ‚ত চেপে থাকলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকব না আমরা।
তাই বলে বাংলাকে বিসর্জন দেবেন?
বিসর্জন দিচ্ছি না, দিদি। ঘরে বাংলা বলি আমরা। কলকাতা থেকে বেরোলে আর বাংলা বলা হয় না।
শুনে মন খারাপ হয়ে গেল স্নেহার। ভিক্ষুক ছেলেটির কারণে মন খারাপ হয়েছিল দেশের জন্য, বিমানে উঠে মন খারাপ হয়েছে ভাষার জন্য। হায় আমার বাংলা ভাষা! এটাই কি আন্তর্জাতিক ভাষার সম্মান?
দেশের জন্য মায়া লাগছে, ভাষার জন্য মায়া লাগছে, বাবার জন্য মায়া লাগছে! মা সঙ্গে আছেন। মার জন্য আলাদা মায়া টের পাচ্ছে না স্নেহা। চুপ হয়ে গেল মন। নিঝুম মনের অচেনা খোপ থেকে আরেক ধরনের মায়া জাগছে। মাধবীলতার মতো সে মায়া জড়িয়ে আছে পুরো দেহ। মন ভরে আছে গোপন এক ঐশ্বর্যে। কী সে ঐশ্বর্য? জানে না স্নেহা। এটুকু বোঝে-ওই ঐশ্বর্য টানছে তাকে, টানছে রাহুলের দিকে। রাহুলের মায়াবী মুখটা ভেসে উঠছে চোখের পর্দায়। ওকে দেখতে ইচ্ছা করছে। কেন এমন ইচ্ছা জাগে, জানে না স্নেহা।

পাঁচ

ছোটো মামার মুখ গম্ভীর। নিমহ্যান্সে নিউরোসার্জারি বিভাগে চেকআপ করানোর পর মুখের ওপর চেপে বসেছে কালো পর্দা। টের পায়নি স্নেহার মা। তিনি স্বাভাবিক আছেন। স্বাভাবিকভাবে চলছেন। কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসেছেন বারান্দায়। বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছেন নিমহ্যান্সের রূপ।
বুদ্ধিমতী স্নেহা চুপচাপ তাকিয়ে থাকে মামার মুখের দিকে। মামা তাকাতে পারছেন না তার চোখের দিকে।
স্নেহা ডাকে, ছোটো মামা!
মামা অন্য জগৎ থেকে যেন ফিরলেন এইমাত্র!
কথা বলছ না কেন তুমি? মুখ এমন কালো কেন? সব কি শেষ?
উচ্ছ¡ল মামা বিকৃত একটা হাসি দিয়ে বললেন, এই তো কথা বলছি।
হাসতেও ভুলে গেছ তুমি। ভেড়ার মতো হাসলে? ভালো করে হাসো। ধমক দেয় স্নেহা।
মামা স্বীকার করলেন, হাসতে পারছি না।
আমি জানি, কেন হাসতে পারছ না তুমি।
কী জানো?
আমি তো বাঁচব না, তাই না? অবস্থা খারাপ, তাই না?
না। খারাপ না। কে বলেছে তোমাক। আজই অপারেশন করতে যাচ্ছে ওরা। মেডিকেল বোর্ড এ ডিসিশন দিয়েছে। তোর বাবা কাল আসবে।
অপারেশন করে লাভ হবে না, তাই না, মামা?
চিৎকার করে বলল, বাজে বকো না। লাভ হবে না মানে? অবশ্যই হবে। ভালো হয়ে উঠবে তুমি। বলতে বলতে প্রায় কেঁদে ফেলেন ছোটো মামা।
শোনো, তুমি কেঁদো না। তুমি কাঁদলে মা-ও কাঁদবে। আমিও কাঁদব। মায়ের কান্না দেখতে চাই না আমি। বাবার কান্নাও দেখতে চাই না। অপারেশন করার জন্য রাজি হয়ে যাও আজই।
বলো কি! তোমার বাবার জন্য অপেক্ষা করব না?
না। বাবার কষ্ট সইতে পারব না আমি।
কী করব এখন?
রাজি হয়ে যাও। মাকে দিয়ে কনসেন্ট ফর্ম সই করিয়ে নাও।
ছোটো মামা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন সামনে।
এভাবে তাকিয়ো না, মামা। নাও। এই নম্বরটা নাও। নিমহ্যান্সে আমার এক বন্ধু থাকে। রাহুল ওর নাম। ওকে একটু কল করব আমি। ব্যবস্থা করো।
বেঙ্গালুরু এসে মামা একটা সিম কিনেছিলেন। সেই সিম থেকে রাহুলকে কল করে স্নেহা। মোবাইল ফোন বন্ধ। সংযোগ দেওয়া যচ্ছে না।
পাহাড়সমান কষ্ট এসে চেপে বসল স্নেহার বুকে। আবার চেষ্টা করে। মোবাইল বন্ধ।
একটা এসএমএস লিখল স্নেহা : আমি নিমহ্যান্সে। রুম নং-৩০৮। নিউরোসার্জারি বিভাগ। আজ বিকেল দুটায় অপারেশন। আপনি আসবেন? কাছে থাকলে সাহস পেতাম-স্নেহা।

ছয়

ক্লাসে ছিল রাহুল। ক্লাসে থাকলে অফ রাখতে হয় মোবাইল।
মোবাইল অন করার সঙ্গে সঙ্গে এসএমএসটি ভেসে উঠল মনিটরে।
দ্রিম করে কেঁপে উঠল বুক। এত কাছে স্নেহা! অপারেশন দুপুর দুটোয়। এখন বাজে দেড়টা। কিছুই ভাবার সুযোগ পেল না রাহুল। নিউরোমেডিসিন থেকে নিউরোসার্জারি বিভাগ। দূরত্ব খুব কম। একছুটে চলে এল তিনতলায় ৩০৮ নম্বর কেবিনের সামনে। কেবিন বন্ধ! মাথায় বাজ পড়ল। সিস্টারদের কক্ষে ছুটে গিয়ে জিগ্যেস করল, সিস্টার, হোয়ার ইজ পেশেন্ট অব রুম নম্বর থ্রি জিরো এইট?
অপারেশন থিয়েটারে। ছোট্ট করে জবাব দিল নার্স।
ছুটে গেল সে ও.টি.তে। বাইরের লবিতে অপেক্ষা করছেন অনেক অভিভাবক।
রাহুল একজনকে প্রশ্ন করল, ইজ দেয়ার এনি বডি ফ্রম বাংলাদেশ?
ছোটো মামা এগিয়ে এসে বললেন, আমি। স্নেহার ছোটো মামা। আপনার নাম কি রাহুল?
জি। আমি রাহুল। খালাম্মা কোথায়? স্নেহা কোথায়?
এই যে আপনার খালাম্মা। পাশে বসা স্নেহার মাকে দেখিয়ে দিলেন ছোটো মামা।
ও.টি.তে থাকার কথা না আপনার? স্নেহা কোথায়? রাহুল চিৎকার করে প্রশ্ন করল।
অপারেশন স্নেহার। আমার তো কোনো অসুখ নেই, বাবা।
ভূ-কম্পনের মতো কেঁপে উঠল রাহুল। আবারও বিস্ময় নিয়ে চিৎকার করে প্রশ্ন করল, স্নেহার অপারেশন?
হ্যাঁ বাবা। স্নেহার অপারেশন।
দুহাতের মুঠি শক্ত করে ধরে নিজেকে সামলালো রাহুল। তারপর ছুটে গেল ও.টি. ইনচার্জের কক্ষে।
আই অ্যাম এ স্টুডেন্ট অব নিউরোমেডিসিন, এমডি-ফাইনাল ইয়ার। মাই কাজিন ইজ ইনসাইড ও.টি.। আই ওয়ান্ট টু স্টে ইউথ পেশেন্ট।
প্লিজ ইউ টেক পারমিশন ফ্রম কনসালট্যান্ট। পেশেন্ট ইজ নাউ অন প্রি-অপারেটিভ প্রসিডিউর।
হাউ ক্যান আই গেট পারমিশন?
ওয়েট। বলে সিস্টার ইনচার্জ কল করলেন ইন্টারকমে। কিছুক্ষণ কথা বলার পর রাহুলকে উদ্দেশ করে বললেন, প্লিজ গো টু ড্রেসিং রুম। টেক ড্রেসিং অ্যান্ড গো ইনসাইড।
যাওয়ার আগে ৩০৮ কেবিনের রোগীর ফাইলটা হাতে তুলে নিল রাহুল। ব্রেন ইমেজিং-এমআরআই রিপোর্ট পড়ার পর বুকের ভেতরটায় গগনবিদারী এক চিৎকার ভেসে এল। বাইরে শোনা গেল না সেই চিৎকার। কেবল তা ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে দিল রাহুলকে। জীবনবিধ্বংসী ম্যালিগনেন্ট টিউমার! রেপিডলি গ্রোয়িং!
শক্ত হয়ে ড্রেসিং রুমে গিয়ে ও.টি.তে ঢোকার পোশাক পরে নিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল রাহুল। মাস্কটি রাখল হাতে।
টেবিলে শুয়ে আছে স্নেহা। প্রি-অ্যানেসথেটিক প্রসিডিউর প্রস্তুত। এখনও ইনজেকশন পুশ করা হয়নি। চোখ খোলা স্নেহার। নিজেকে শক্ত করে রাহুল দাঁড়াল সামনে। কেঁপে উঠল স্নেহার চোখ। রাহুলকে দেখে শান্তিতে চোখ বুজে কিছুক্ষণ পর আবার চোখ খুলে তাকাল। চোখ হেসে উঠল। হাত বাঁধা। ডান হাতের আঙুলগুলো নাড়িয়ে ইশারা করল রাহুলকে। একটু এগিয়ে এসে রাহুল ধরল স্নেহার হাতের আঙুল। শান্তিতে আবার চোখ বুজল স্নেহা। রাহুল মনে মনে বলল, ফিরে তোমাকে আসতেই হবে, স্নেহা। তোমাকে কোথাও যেতে দেব না আমি। চোখ বেয়ে নেমে এল অশ্রুধারা! হাতের উল্টো পিঠে রাহুল মুছে নিল লোনাজল। ওই চোখ থেকে বেরোচ্ছে আলো। আলো ছুঁয়ে যাচ্ছে স্নেহার মন। সেই আলোয় স্নেহা দেখছে… কেবল রাহুলকেই দেখছে। মনে হচ্ছে যেভাবে মাধবীলতা জড়িয়ে রাখে কংক্রিটের দেয়াল, রাহুলও একই রকম মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে রেখেছে তাকে… অনন্তকাল জড়িয়ে রাখবে এভাবে।

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত