দুই দেবী

স্কুলে যেতে গত কয়েকদিন হয় কেমন ভয় ভয় করছে মিলির। স্কুল এমনিতে বাসা থেকে খুব দূরে নয়। বাসার সামনের গলিটা পার হলেই স্কুল। কাজেই রিক্সা-গাড়ি-স্কুটার কিছুই দরকার পড়ে না এতটুকু রাস্তা যেতে। এতদিন মিলি একা একাই যেত। এখনো তাই। তবু ইদানীং সে যেই না একটু বড় হচ্ছে, জামার ধরন বদলাতে হচ্ছে, গলির সামনে ফেন্সিডিল খোর কয়েকটি ছেলের কাজই হলো মিলির আসা-যাওয়ার সময় দাঁড়িয়ে থাকা। যেই না মিলি গলির বাঁক পার হবে, ওরা খিক খিক করে হাসি দিয়ে বললে, ‘…সাইজ কত? এই মেয়ে- তোমার বুকের সাইজ কত? দেখাও- আমাদের দেখাও!’

মিলির খুব কষ্ট হয় তখন। দু’হাতে কান চেপে ধরতে ইচ্ছে করে। মনে হয় মা’কে বলে। তবে সেটা বলতেও কেমন অস্বস্তি হয়। বাবা ত’ ব্যবসার কাজে প্রায়ই এই শহর ওই শহর। মিলির ভাইটি মিলির দশ বছরের ছোট। সে এখনো স্কুলেই যায় না। তাকে দিয়ে কি কাজ হবে?

দু’বার রাতে জ্বর এলো মিলির। ঘুমের ভেতর সে স্বপ্নে দেখলো একটা কানা গলির ভেতর সে আটকে আছে আর চারপাশে তাকে গোল হয়ে ঘিরে হাততালি দিচ্ছে কয়েকটি ছেলে আর থেকে থেকে জন্তুর মত হেসে বলছে, ‘এই মেয়ে- তুমি ব্রা পরা শুরু করছো? সাইজ কত? তোমার বুকের সাইজ কত?’

দু’বার জ্বরে তিন দিন করে প্রায় ছয়দিন পড়া-শোনা নষ্ট হলো মিলির।
‘তোর এত জ্বর হচ্ছে কেন? মানুষটা আসলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব। আজ স্কুলে যেতে পারবি?’
সকালবেলায় মা সেদ্ধ সাবু দানায় লেবু চিপে মিলিকে খাওয়াতে খাওয়াতে বললেন।
‘যাব। অনেকগুলো ক্লাস মিস হয়েছে।’
মিলির কেমন মনে হলো আবার তার জ্বর আসতো! ঐটুকু গলি সে কি করে পার হবে? অথচ মা’কে কিছু বলাও গেল না।
মা মিলির স্কুল ড্রেস আয়রন করেন। গোলাপি-সাদা স্কুল ড্রেসে নবম শ্রেণির মিলিকে ফুটফুটে পরীর মত দেখায়।আট ক্লাসের স্কুল বইয়ের সাথে সাথে ব্যাগের ভেতর লুকিয়ে শামসুর রাহমানের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ আর নীরেন্দ্রনাথ চক্রবত্তীর ‘কবিতার ক্লাস’-ও সে নিয়েছে।
যথারীতি গলির বাঁকের সামনে যেই না এসেছে মিলি তার গা ঘামতে শুরু করেছে, সেই তিন/চারটি ছেলে এলো আবার।
‘এ্যাই মেয়ে- সাইজ কতো তোমার?’ বলতে না বলতেই তারও চেয়ে তীক্ষ্ম  একটি মেয়েলী গলায় আরো ভয়ানক সংলাপ ধাঁ করে বাজলো মিলির কানে, ‘তোদের নুনুর সাইজ যত ততটা- তোদের জাইঙ্গার যতটা মাপ, ওর ব্রার ততটাই মাপ! দেখা- তোদের নুনু দেখা!’

এই গলির পরই মিলিদের স্কুল ছাড়িয়ে একটি বস্তি। এই মেয়েটি কি বস্তির? কাঁধে একটি চটের ব্যাগে কুড়িয়ে তোলা বেশ কিছু ভাঙা শিশি-বোতলের টুকরো, ময়লা কাগজ। মেয়েটার পরনে একটা ময়লা ত্যানা ত্যানা হয়ে যাওয়া সালোয়ার-কামিজ। কালচে শ্যামলা মুখে চোখ দু’টো জ্বলজ্বল করছে আশ্চর্য প্রভায়। রুক্ষ চুলগুলো উড়ছে বাতাসে। ডান হাতে ধরা একটি রাম দা কাঁধে রাখা।

থমকে গেল তিন ছেলে। বিহ্বল হয়ে মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগলো এ ওর দিকে। মিলির যে কি হলো সে এক ছুটে বস্তির মেয়েটির দিকে দৌড়ে গিয়ে তার কাঁধের উপর কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো।
‘বড়লোকের আহ্লাদের পুতুল তুই- তাই খারাপ কথা বলতে পারিস না, না? এরপর কেউ কিছু বলতে এলে আমি আছি। স্কুলে যাবি?’
মেয়েটি তাকে ‘তুই’ করে বলছে।
মিলি ফোঁপাতে ফোঁপাতে মাথা নাড়ে।
‘চল্- তোকে এগিয়ে দিয়ে আসি।’
মিলি অবাক মানে। ছোট মামা বিদেশ যাবার আগে মিলিদের বাসায় থেকে পড়তো। ছোট মামাই এটুকু রাস্তা মিলিকে আনা-নেওয়া করতো। এই মেয়েটা যেন ছোট মামার থেকেও সাহসী।
‘শোন্- ওদের ভয় করার কিছু নেই। ওদের ভয় পেলেই ওরা পেয়ে বসবে। ওদের গালির পাল্টা গালি দিলে দেখবি কেমন চুপ খেয়ে যায়। আমি ক’দিন ধরেই এই গলির মোড়ের ডাস্টবিনটায় শিশি-বোতল কুড়াতে এসে বদমাশগুলোর কান্ড-কারখানা দেখছিলাম। তারপর মনে মনে ঠিক করছিলাম ওদের গালির পাল্টা কি গালি দেব?’

‘তোমার নাম কি? তুমি কোথায় থাক?’ মাথায় মিলির চেয়ে ইঞ্চি দুয়েক লম্বা আর বয়সেও খানিকটা বড় মেয়েটিকে জলভরা চোখে জিজ্ঞাসা করে মিলি।
‘ঐ বস্তিতে থাকি। পাঁচ ভাইকে ওলাওঠায় খাবার পর আমি হই কিনা তাই মা-বাপে ডাকে ‘আশা।’
‘স্কুলে যাও?’
‘ছয় ক্লাস পড়েছি। বাপের হাঁপানি, মা মানুষের বাসায় কাম করে, আমি বিড়ি বটি।’
‘বিড়ি বটো?’
‘হ্যাঁ- একদিনে পাঁচশ বিড়ি বটলে পনেরো টাকা। ’
‘এ ত’ খুবই কম টাকা।’
‘ যাবি আমাদের বাসায়?’
মিলি বুঝে উঠতে পারে না কি বলবে। এই মেয়েটার জোরে আজ সে দিব্যি গটগটিয়ে স্কুলের সামনে চলে এসেছে, তবে এর সাথে এর বাসায় গেলে মা বকবে।
‘তুমি যে একা ঘুরে বেড়াও, তোমার মা কিছু বলে না?’
‘কি বলবে? আমি শিশি-বোতল টোকাই, বিড়ি বটি, মা বিকাল বেলা রাস্তার পাশে চা ব্যাচে, পিঠা ব্যাচে- সেই কাজে হাত লাগাই, রান্নায় হাত লাগাই, ঘর সাফ করি- বাপের দেখভাল করি।’
‘ওহ্-’
‘আজ যাই রে! তোর স্কুলে আসা-যাওয়ার সময়টা কি?’
‘দশটা-পাঁচটা।’
‘ঠিক আছে- এখন থেকে আমিই দেখব।’

স্কুল গেটের ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে স্কুলের ডান দিকে চলে যাওয়া বস্তি আর বাঁদিকে কালী মন্দিরের ভেতর অপার তমসায় জমতে থাকা এক শোক-অঙ্গার উত্তীর্ণ কালো, নগ্ন দেবীর হাতের খড়গ আর খোলা চুল…তার দু’বাহুতে ছিটকে পড়া যত পুরুষের মুন্ডু আর পদতলেও শায়িত এক পুরুষ…যেন বা আশার জিহ্বার ধারে চুপ করে যাওয়া, বোকা বনে ভ্যাবলা হয়ে যাওয়া ঐ শয়তান ছেলেগুলো! শ্যামলা আশার চুলগুলো অমন রুক্ষ উড়ছে আর চোখ দু’টো জ্বলজ্বল করছে।

স্কুল শেষে আজ গিটার ক্লাস। বাসাতেই গিটারের শিক্ষক আসবে। আজই যেন প্রথম স্কুলের বাঁদিকে কালী মন্দিরের কালীকে ভয়ের বদলে খুব আপন আপন লাগতে থাকে আর দু’দিন আগে শেষ হওয়া সরস্বতী পূজার সরস্বতী যেন তারই মত সদা ভয়ে ফ্যাকাশে, পান্ডুর এক মেয়ে! তার হাতের বীণা আর পুস্তক রক্ষায় লাগবে ঐ আশার মতই ছেলেদের সাথে সমানে খিস্তি করা কোন দেবী!

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত