| 15 এপ্রিল 2024
Categories
জীবন যাপন দেহ স্বাস্থ্য

খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক স্থূলতা

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

 

আমরা কেনো ডায়েট করি? ডায়েট করার কারন কি শুধুই নিজেকে আকর্ষনীয় রাখা বা ওজন কমানো ? নাকি ডায়েটের সত্যিকার তাৎপর্য নিজেকে সুস্থ রাখা? সঠিক উপায়ে ডায়েট না করে আমরা না জেনেই আমরা শরীরের ক্ষতি করছি না তো? 

এই একবিংশ শতাব্দীতে বেশিরভাগ মানুষের মাঝেই নিজেদের স্বাস্থ্য পরিচর্যার ব্যাপারে বেশ সচেতনতা পরিলক্ষিত হয়। পরিবেশ দূষণ, ফরমালিনযুক্ত খাবার, প্রচন্ড মানসিক চাপের ভীড়ে নিজেদের শরীরকে একটু যত্ন করার বা নিজের বাড়তি মেদ ঝরিয়ে দেহকে আকর্ষনীয় করার নিমিত্তেই ডায়েটের প্রতি মানুষের আগ্রহ এখন প্রবল। সাধারণ মানুষ এবং পুষ্টিবিদদের এই প্রবল আগ্রহের কারনে বিভিন্ন ধরনের ডায়েট প্যাটার্ন এখন আবিষ্কৃত হচ্ছে। আমরা অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ার বা ইউটিউবের বিভিন্ন ভিডিও অনুসরণ করে বা  নিজেদের মতো করেই খাওয়া কমিয়ে দিয়ে ডায়েট করার চেষ্টা করি। কিন্তু আপনি কি জানেন, আপনি যেই ডায়েট চার্ট মেনে চাহিদার তুলনায় আপনার ক্যালরি কমিয়ে আনছেন, তা আপনার শারীরিক গঠনের জন্য উপযোগী কিনা?

একজন মানুষের ওজন কমানোর ডায়েট নির্ভর করে তার মানসিক অবস্থা, খাবার গ্রহন প্যাটার্ন, মেটাবলিজম এবং সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তা হল শারীরিক গঠনের উপর। দুজন ভিন্ন ওজনের মানুষ একই ডায়েট চার্ট মেনে চললেও তাদের ওজন একহারে কখনোই কমবে না। এমনকি একই ওজনের দুজন মানুষ একই ডায়েট মেনে চললেও তাদের ওজন একহারে নাও কমতে পারে। এজন্যই ডায়েট করার সর্বপ্রথম শর্ত নিজের BMI,  BMR, PAF সম্পর্কে জানা। কারন আপনার দেহের জন্য সর্বনিম্ন যতটুকু ক্যালরি দরকার তা না জেনে যদি আপনি হঠাৎ করেই ক্যালরি কম খাওয়া শুরু করেন তা আপনার জন্য বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারে। এরমধ্যে ব্রণের সমস্যা, অস্বাভাবিক চুল পড়া, মাথা ঝিমঝিম করা,  চোখে ঝাপসা দেখা বা শরীর দুর্বল লাগা অন্যতম। কিন্তু এর দীর্ঘস্থায়ী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আরো ভয়াবহ৷ আপনি আপনার প্রয়োজনীয়  ক্যালরি নেয়া কমিয়ে দিলেন যার কারনে আপনার দেহের স্বাভাবিক মেটাবলিজম শক্তি ধীরে ধীরে কমে যাবে যা আপনার মেদ ২৩% বেশি ঝরাতে সাহায্য করবে । কিন্তু আপনি এই ডায়েট ছেড়ে দেবার সাথে সাথে আপনার ওজন আরো দ্রুত হারে বৃদ্ধি পাবে, কারন এই মেটাবলিজম শক্তি হ্রাসের প্রবনতা তখনও আপনার শরীরে থেকে যাবে। একই সাথে বিভিন্ন গবেষণায় প্রমানিত হয়েছে; দুর্বল হাড়, প্রজনন ক্ষমতা হ্রাসেও এর ভূমিকা আছে ।

তাই নিজের BMI এবং BMR সম্পর্কে জেনে তার সাথে স্বাভাবিক মাত্রার তুলনা করেই আপনি বুঝতে পারবেন ওজন স্বাভাবিক কিনা বা আপনার ডায়েট কতটুকু করা উচিত। চলুন দেখে নেই নিজ BMI, BMR এবং PAF  মাপার পদ্ধতি।

 BMI : Body Mass Index

মানুষের দেহের ওজনের মাত্রা নির্ধারনের জন্য উচ্চতা ও ওজনের যে আনুপাতিক হার উপস্থাপন করা হয় তাকে Body Mass Index বা BMI বলে।

ফর্মুলা :

BMI = (Wight)  kg ÷ ( Height)2 m

অর্থাৎ আপনার ওজনকে আপনার মিটারে প্রকাশ করা উচ্চতার2    বা উচ্চতার  বর্গ দিয়ে ভাগ করবেন।

ধরি,  আপনার ওজন ৫০ কেজি এবং উচ্চতা ১.৬৩ মিটার।

আপনার BMI = { 50 ÷ (1.63× 1.63) }

                    = 18. 797 বা ১৮.৭৯৭

সূচক

আপনার শারীরিক অবস্থ BMI
ওজনহীনতা <১৮.৫
স্বাভাবিক ওজন ১৮.৫-২৪.৯৯
গ্রেড ১ ( অধিক ওজন ) ২৫-২৯.৯৯
গ্রেড ২ (স্থূলতা) ৩০-৩৯.৯৯
গ্রেড ৩ (রোগগ্রস্ত স্থূলতা) >৪০.০০

এখন আপনার BMI যদি ১৮.৭৯৭ হয় তাহলে বুঝতে হবে আপনার ওজন স্বাভাবিক আছে।

 এভাবে খুব সহজেই আমরা BMI বের করতে পারি।

BMR ( Basal Metabolic Rate) 

পূর্ণ বিশ্রাম অবস্থায় একদিনে আপনার সর্বনিম্ন ক্যালরি গ্রহনের পরিমাপ নির্দেশ করে BMR।

ফর্মূলা :

মেয়েদের BMR = ৬৫৫ +(৯.৬ xওজন কেজি) + (১.৮ x উচ্চতা সে.মি ) -(৪.৭ x বয়স বছর )

ছেলেদের BMR = ৬৬ +(১৩.৭ xওজন কেজি) + (৫ x উচ্চতা সে.মি ) -(৬.৮ x বয়স বছর )

ধরি,

আপনার বয়স ২২ বছরের যুবতী , উচ্চতা ৫’৪” বা ৬৪ সেমি, ওজন ৫০ কেজি।

আপনার BMR – ৬৫৫+ (৯.৬×৫০) + (১.৮×৬৪) – (৪.৭× ২২)

 = ১১ ৪৬.৮ ক্যালরি।

তারমানে আপনার বর্তমান ওজন অনুযায়ী প্রত্যেকদিন নূন্যতম ১১৪৬ ক্যালরি খাবার গ্রহন করা উচিত।

এতো বড়বড় অংক দেখে ভয় পাবার কোনই কারন নেই। বর্তমানে বেশ কিছু অ্যাপের মাধ্যমে BMI BMR মাপা যায় খুব সহজেই।

  • BMI calculator
  • BMR Calculator
  • BMI, BMR and Fat % Calculator

এদের মধ্যে অন্যতম।     

PAF ( Physical Activity Factor)

আপনার নিত্যদিনের শারীরিক পরিশ্রমের কথা মাথায় রেখে আপনার দৈনন্দিন ক্যালরি গ্রহন করতে হবে। এরজন্য PAF এর কিছু মান নির্ধারিত হয়েছে।

  • শারীরিক পরিশ্রমহীন ব্যাক্তি : BMR × ১.২
  • হালকা শারীরিক পরিশ্রমী : BMR × ১.৩৭৫
  • মোটামুটি পরিশ্রমী : BMR × ১.৫৫
  • অত্যধিক পরিশ্রমী : BMR × 1.725

অর্থাৎ আপনার কাজের ধরন অনুযায়ী আপনার BMR এর সাথে উপরিউক্ত যেকোন একটা Factor  গুন করলেই আপনি আপনার কাঙ্খিত দৈনিক ক্যালরি এর পরিমাপ পাবেন। যদি এর বেশি খান, আপনার ওজন বাড়বে। কিন্তু আপনি ডায়েট করতে চাইলে পুষ্টিবিদের পরামর্শ মতে আপুনার BMI অনুযায়ী কত কম ক্যালরি গ্রহন করতে হবে তা জেনে নিন।

সাধারণত আপনি যদি BMI অনুযায়ী ওজনহীনতায় ভুগেন কিংবা স্বাভাবিক ওজন হয়, তবে BMR এর সমান ক্যালরি গ্রহন করা উচিত৷ কিন্তু বিভিন্ন মাত্রার স্থূলতার ক্ষেত্রে আপনি আপনার খাদ্যাভ্যাসে  দিনে সর্বোচ্চ ৪০০ ক্যালরি পর্যন্ত কমাতে পারেন। এর বেশি কমানো অবশ্যই আপনার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।  

মনে রাখবেন ওজন নিয়ন্ত্রণ যেনো হয় নিজের সুস্থতার জন্য। আর জীবনযাত্রাই ওজন কমানোর চাবিকাঠি। আপনার খাদ্যাভ্যাসের স্বাস্হ্যকর এবং বিজ্ঞানসম্মত পরিবর্তন, মানসিক প্রশান্তি, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ব্যায়াম এনে দিতে পারে আপনাকে আপনার সেই কাঙ্খিত শরীর । 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত