সম্পাদকীয়

মাড়ি ও মড়কের মহাতান্ডবে গোটা পৃথিবী যখন বিপর্যস্ত। মৃত্যু আতঙ্ক গ্রাস করে ফেলছে ‌মানুষের হৃদয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, মানবিক ক্ষয় যখন চরম হতাশার সৃষ্টি করেছে অমাবস্যা, পূর্ণিমায় চন্দ্রভূক মানুষের যাপন ঠিক তখন কচি পাতার মতো আনন্দে দোলাতে  ইরাবতীর আয়োজন “দুই বাংলার গল্প সংখ্যা ২০২০”
ইরাবতী পথ চলার শুরু থেকেই ভালোবেসে, যত্নের সঙ্গে নানান ধারার ছোটগল্পের চর্চা করে আসছে।  এ সংখ্যায় আমরা বাংলা ছোটগল্পের দীর্ঘযাত্রা, পথের সমৃদ্ধি ও সম্ভাবনাকেই ধরে রাখতে চেয়েছি। নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমরা চেয়েছি সংখ্যাটিকে বহুমাত্রিক পাঠ-ব্যঞ্জনায়  সমৃদ্ধ করতে। এতে দুইদেশ ও প্রবাসী বাঙালিদের বাংলা ছোটগল্পের নানা আঙ্গিক  নানান ভঙ্গিমায় গল্প হয়ে ধরা দিয়েছে।
এতসব গল্প হয়তো গল্প বলবে, সেই সেদিনের নর-নারীর সম্পর্কের নতুন দর্শন, ফ্রয়েডীয় বিশ্লেষণে মানব মনের অন্ধকার দিক সম্পর্কে নবীন আলোকপাত ও মার্কসবাদী সাহিত্য-আন্দোলনের ভেতর দিয়ে মানবিক চেতনার বিকাশ, বাংলা ছোটগল্পের অন্তঃপুরে যে নতুন চেতনার সৃষ্টি হয়েছিল যখন এবং একই সঙ্গে শিল্প ও সাহিত্যের সৃজনভূমিতে নব চৈতন্যের উন্মেষ ঘটেছিলো তারই ক্রমবর্ধমান আখ্যান কিংবা  গতানুগতিকতামুক্ত নব্য জীবনবাদী ধারার সূচনা বাংলা ছোটগল্পকে পরিণতমনস্ক করে  লেখা হয়েছিল দ্যুতিময় এমনসব ছোটগল্প যা জীবনের নানাদিকের উন্মোচনে ঋদ্ধ এবং বাংলা ছোটগল্পের ধারায় লেখনীর সমৃদ্ধি এবং গল্পকারদের জীবনের বহুকৌণিক দিকের চিত্রায়ণ, গতানুগতিক ধারায় নতুন অভিঘাত সৃষ্টি করেছিল তারই পারস্পরিক বন্ধুত্বের।
একটা সময় পর্যন্ত অন্ত্যজ ও প্রান্তিক মানুষের বড় কোনো স্থান ছিল না সাহিত্যের আঙিনায়। কোমল ভাবাবেশ গল্পের অন্তঃশরীরে বৃহত্তর কোনো জীবন-চেতনা তুলে ধরতে পারেনি। নিচুতলার মানুষেরা সেদিন ক্ষোভ, যন্ত্রণা, দুঃখ নিয়ে, কখনোবা এই দুঃখ-বেদনাকে জয় করার প্রত্যয় নিয়ে সাহিত্যে উপজীব্য হয়ে উঠল। রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছের অবিস্মরণীয় সব গল্পে জীবনের মানবিক দিকের প্রতিফলন বাংলা ছোটগল্পের দিগন্তে প্রসারিত চেতনার জন্ম দিয়েছিল। পরবর্তীকালের ছোটগল্পকাররা এই ধারায় অবগাহন করে বিচিত্রমুখী, নিরীক্ষাপ্রবণ ও জীবনের নানাদিক প্রতিফলনে বিশ্বস্ত হয়ে উঠেছিলেন। বাংলা ছোটগল্প রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টি করেছিলেন জীবনের বহুবিচিত্র অনুষঙ্গকে প্রতিফলিত করে। রবীন্দ্রনাথের কাছে সেজন্য আমাদের ঋণের শেষ নেই। বিশ্বজগৎ এবং জীবনকে সম্পূর্ণভাবে দেখার চোখ তিনি খুলে দিয়েছিলেন।
এই দীর্ঘ যাত্রা! এই যাত্রায় বাংলা ছোটগল্প এখন কোথায় দাঁড়িয়ে? কী লেখা হচ্ছে? কারা লিখছেন? বৈরী রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলার নদী, মাটি ও মানুষের সঙ্গে ছোট গল্পকারদের নিবিড় সংযোগ, আত্মসচেতনতা,  বোধ ও বুদ্ধির প্রয়োগে ছোটগল্প তার বৈশিষ্ট্য নিয়ে কতটা উজ্জ্বল? 
ইরাবতীর দুই বাংলার গল্প সংখ্যার আয়োজন এইসব ভাবনাকে শ্রেয় করেই এবং বলে নেয়া ভালো, সংখ্যাটি সেজেছে প্রবীণ ও নবীন লেখকদের চমৎকার সব গল্প নিয়ে।
কৃতজ্ঞতায় বলতে চাই, এই সংখ্যায় ইরাবতী পরিবারের সবার সহযোগিতা ও শ্রম না থাকলে এই বিরাট কর্মযজ্ঞ করা কঠিন হতো। বিশেষ কৃতজ্ঞতা অমর মিত্র, তপন বন্দ্যোপাধ্যায়, বিপুল দাস, বিশ্বদীপ চক্রবর্তী, ফারুক মঈনউদ্দীন, মঈনুল আহসান সাবের, নাসরীন জাহান, লুতফুন নাহার লতা ও পাপড়ি রহমান, জিললুর রহমানসহ  ইরাবতী পরিবারের সকল অভিভাবকে। যথার্থ অভিভাবকের মতো তাঁরা সাহস জুগিয়েছেন। খেয়াল রেখেছেন। যেখানেই সমস্যায় পড়েছি সেখানেই তাঁরা এগিয়ে এসে মুশকিল আসান করেছেন। হামিরউদ্দিন মিদ্যা, সকাল রয়, মির্জা মাহমুদ আহমেদ, শ্যামলী আচার্য, স্মৃতি ভদ্র, শাপলা সপর্যিতা, ইশরাত তানিয়া, সৈকত দে, ফাহমিদা বারী সহ পরিবারের অন্য সদস্যরা এই বিশাল সংখ্যার পরিকল্পনা ও নিরলস শ্রম না দিলে আজ এই গল্পযজ্ঞ করা সম্ভবই হতো না।
এই সংখ্যায়  আমরা ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সবার লেখা সংগ্রহ করতে পারিনি। যাদের লেখা সময় ও সংখ্যার বিশালতার জন্য সংগ্রহ করতে পারলাম না তাদেরকে করজোড়ে বলছি, আমরা অত্যন্ত দুঃখিত, আমাদের ক্ষমা করবেন। আপনারা ইরাবতী পরিবারের বন্ধুজন, স্বজন। তাই বিশ্বাস করি আমাদের অপারগতাকে ক্ষমা করে হাসি মুখে,  দু’হাত বাড়িয়ে ইরাবতীকে কাছে টানবেন, একান্নবর্তী পরিবারের মতো ভালোবাসায় বাঁধবেন।
সেই আশাতেই ইরাবতীর আগামী সংখ্যাটি করতে চাই “প্রবন্ধ” নিয়ে। প্রত্যাশা আপনাদের সবাইকে পাশেই পাবো বরাবরের মতো মমতায়, ভালোবাসায়।
       ইরাবতী
৩০ অক্টোবর ২০২০

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত