| 3 মার্চ 2024
Categories
সময়ের ডায়েরি

অযোধ্যায় রাম মন্দির ও সবার দ্বিচারিতা

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

সম্বিত পাল

অযোধ্যায় রাম মন্দির তৈরির কাজ শুরু হয়ে গেল ৫ অগস্ট থেকে। এতে প্রায় সবাই বিজেপি ও সংঘ পরিবারের জয় দেখছেন। সেই আশির দশক থেকে যে রাম মন্দির আন্দোলনে ভর করে বিজেপি আজ দেশে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছে এবং এই যে তারা অযোধ্যায় রাম মন্দির তৈরির ভিত পুজোয় সেরে ফেলল, তাতে বিজেপি ও বৃহত্তর সংঘ পরিবারের জয় দেখা অস্বাভাবিক নয়।

কিন্তু বিজেপির কৃতিত্ব অযোধ্যায় রাম মন্দির বানানোয় নয়, তাদের কৃতিত্ব পুরো বিরোধী শিবিরকে ‘রামনামের কীর্তন’ গাইতে নামানোয়। কংগ্রেস থেকে শুরু করে তৃণমূল, সমাজবাদী থেকে শুরু করে কমিউনিস্ট — সবার দ্বিচারিতা বা অসহয়তাকে সর্বসমক্ষে উন্মুক্ত করে দেওয়াতেই সংঘ পরিবারের আসল জয়।

পরিস্থিতি এমনই যে, কেউই ‘রাম’কে জোর গলায় অস্বীকার করতে পারছে না। ক্রমশ সংঘ পরিবারের হিন্দু জাতীয়তাবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হচ্ছে দেশের রাজনৈতিক দলগুলি। সংবিধান নয়, রামের মধ্যেই ভারতের জাতীয় ঐক্যের সন্ধান করতে বাধ্য হচ্ছে তারা।

কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বঢরা তো একটি বৃত্তই সম্পূর্ণ করলেন। শাহ বানু মামলায় মুসলমান মহিলাদের খোরপোষের ব্যাপারে যে রায় আদালত দিয়েছিল, তা উল্টে দিয়ে ১৯৮৫ সালে সংখ্যালঘুদের মন রাখতে আইন এনে ফেলেছিলেন প্রিয়াঙ্কার বাবা, প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী। হিন্দুত্ববাদীদের রোষের মুখে পড়ে তাদের মন রাখতে অযোধ্যায় বিশ্ব হিন্দু পরিষদকে শিলান্যাসের অনুমতিও দিয়েছিলেন রাজীব। এমন কী ১৯৮৯-এর সাধারণ নির্বাচনের প্রচারও তিনি অযোধ্যা থেকেই শুরু করেছিলেন। ‘রাম রাজ্য’ প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে।

২০২০-তে এসে নরেন্দ্র মোদী যখন সুপ্রিম কোর্টের রায়কে হাতিয়ার করে অযোধ্যায় রাম মন্দিরের ভূমিপুজো করছেন, তখন রাজীব-কন্যা রামলালার সাহস, সংযম, ত্যাগের গুনগানে ব্যস্ত। রামলালার মন্দিরের ভূমিপুজোর অনুষ্ঠানকে জাতীয় ঐক্য, বন্ধুত্ব ও সাংস্কৃতিক সমাগমের প্রতীক হিসেবে দেখছেন। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরে ভারতের রাজনৈতিক-সামাজিক পরিবর্তন ও সর্বস্তরে তার প্রভাবের ব্যাপারে তাঁর বিশেষ ধারণা রয়েছে বলে তো মনে হয় না।

মধ্যপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও কংগ্রেস নেতা কমলনাথ রাম মন্দিরের নির্মানের পিছনে রাজীব গান্ধীর কৃতিত্বই দেখছেন। হনুমানের ছবি দিয়ে টুইটার প্রোফাইলও পাল্টে দিয়েছেন। বাড়িতে বসে ৫ অগস্ট হনুমান চালিশাও পাঠ করেছেন। এমনকী রাম মন্দির তৈরির জন্য রূপোর ইঁটও পাঠাবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাম মন্দিরের নাম উচ্চারণ করেননি। ভূমি পুজোর দিন টুইট করেছেন সব ধর্মের ঐক্যের কথা বলে। চিরায়ত বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য়ের ঐতিহ্যের স্মরণ করেছেন। অযোধ্যা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরে পরেও সরাসরি কোনও সরকারি প্রতিক্রিয়া দিতে পারেননি তৃণমূল নেত্রী। সে নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। আজও করোনা-আবহে রাম মন্দির নিয়ে এত জাঁকজমকের ব্য়াপারে তিনি ‘নীরব’।

বাম নেতারা সুপ্রিম কোর্টের রায়কে শিরোধার্য করে বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনা নিয়ে শীর্ষ আদালতের রায়কে হাতিয়ার করার ক্ষীণ চেষ্টা করেছেন। রায়ে সেই কথার উল্লেখ রয়েছে বলে দোষীদের শাস্তি দাবি করেছেন ঠিকই, কিন্তু পুরোপুরি ‘রাম বিরোধিতা’ করে উঠতে পারেননি। সেই কবেকার লিবেরহান কমিশনকে দেওয়া প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর বয়ানের প্রচার চালিয়েছেন। কিন্তু সংবিধান-প্রদত্ত ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে মন্দির বিরোধী স্বর থাকলেও, তার নেতৃত্ব দিতে পারেননি বাম নেতারা।

বামেদের দ্বিচারিতার একটি ছোট্ট উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ২০০৭ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভাঙার ১৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে কলকাতার রবীন্দ্র সদনে একটি সরকারি অনুষ্ঠানে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বলেছিলেন, রাম কবির কল্পনামাত্র। রামের জন্মের কোনও প্রমাণ আছে কিনা ও রামায়ণ একটি ঐতিহাসিক নথি কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন তিনি।

দু’দিন পরে যখন সেই ভিডিও ফুটেজ জাতীয় সংবাদমাধ্যমে আসে, স্বাভাবিক ভাবেই তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। তখন কোনও রকম লিখিত বা প্রকাশ্য বিবৃতি ছাড়াই, সিপিআইএমের মুখপত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ কর্তার মাধ্য়মে সংবাদসংস্থা পিটিআইকে দিয়ে খবর করা হয়, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সেই উক্তি সংবাদমাধ্যম অপ্রাসঙ্গিক ভাবে ব্য়বহার করেছে। তিনি তো শুধু রবীন্দ্রনাথের কবিতাকে উল্লেখ করে এই কথা বলেছিলেন। অর্থাৎ রামের অস্তিত্ব নিয়ে যে প্রশ্ন তিনি তুলেছিলেন, তা থেকে পিছিয়ে আসেন। কবির ঘাড়ে ঠেলে দেন সেই উক্তি।

তখনই পারেননি, এখন তো আর প্রকাশ্যে জোর গলায় রাম-বিরোধিতা কেউ করেই উঠতে পারছেন না। ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় কিন্তু ২০১৮ সালের জুন মাসে আরএসএস-এর ডেরায় গিয়ে জাতি, জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেম নিয়ে ভাষণ দিতে গিয়ে স্মরণ করিয়ে এসেছিলেন, ভারতের জাতীয়তাবাদ হল ‘সাংবিধানিক দেশপ্রেম’। ভারতের প্রাচীন উন্নত সভ্যতার কথা উল্লেখ করলেও তিনি আধুনিক গণতান্ত্রিক ভারতের সংবিধানকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বলেছিলেন যে ভারতের আত্মা তার বহুত্ববাদ ও সহিষ্ণুতায় বাস করে।

সেই সাংবিধানিক জাতীয়বাদের সঙ্গে রাম-কেন্দ্রিক হিন্দু সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের লড়াইয়ে কিন্তু বিরোধীরা হেরেই বসে আছেন। সংবিধান ছেড়ে রামে আশ্রয় খুঁজছেন তাঁরা। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পিছনেই লুকোতে হচ্ছে তাঁদের। রাহুল-মমতাদের মন্দিরে মন্দিরে ঘুরতে হচ্ছে। রামনবমীর বিকল্প হিসেবে হনুমান জয়ন্তী পালন করতে হচ্ছে। সংখ্যালঘু তোষণের অভিযোগ খণ্ডন করতে পুরোহিত সম্মেলন করতে হচ্ছে। এরকম আরও হাজারো উদাহরণ চোখের সামনেই রয়েছে।

আর এখানেই আরএসএস-বিজেপির জয়। সংবিধানের ৩৭০ ধারা তুলে দিয়ে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা লোপ, অযোধ্যায় রামমন্দির তৈরি করা আর অভিন্ন দেওয়ানি বিধি লাগু করা (যেটা এখনও বাকি রয়েছে) — এসব তো সংঘ পরিবারের ঘোষিত কর্মসূচি। নরেন্দ্র মোদী নির্বাচনে জিতে এসে একে একে তা রূপায়ন করছেন।

কিন্তু বিরোধীরা তাদের ঘোষিত রাজনৈতিক আদর্শকে রক্ষাই করতে পারল না। দেশের রাম-বিরোধী স্বরকে একত্রিত করে পাল্টা কোনও রাজনৈতিক আলেখ্য তৈরি করতেই ব্যর্থ তারা। উল্টে মৃদু স্বরে হলেও সেই হিন্দু জাতীয়তাবাদের গানই গাইতে শুরু করেছে।

২০২৫-এ তৈরি হওয়া আরএসএস যখন শতবর্ষের দোরগোরায় তখন ভারতীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক এই দৃশ্য দেখে সংঘের প্রতিষ্ঠাতা কেশব বলিরাম হেগড়েওয়ার নিশ্চয়ই হাসছেন। এ বিজয়ীর হাসি শুধু রাম মন্দির তৈরির জন্য নয়, বিরোধীদের ‘রামনাম’ করা দেখে।

কৃতজ্ঞতা: এইসময়

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত