| 21 এপ্রিল 2024
Categories
ঈদ সংখ্যা ২০২১

স্মৃতিকথা: শঙ্খ ঘোষকে যেমন দেখেছি । বাসুদেব দাস

আনুমানিক পঠনকাল: 6 মিনিট

সময়টা ১৯৮১-৮২ সাল। অসম আন্দোলন পুরোদমে চলছে। আমি তখন গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র। মাস্টারমশাই বীরেন্দ্রনাথ রক্ষিতের কাছে প্রথম কবি শঙ্খ ঘোষের নামটা  শুনি। সাহিত্যের প্রতি আমার নিষ্ঠা এবং ভালোবাসা দেখে মাস্টারমশাই আমাকে প্রায়ই বলতেন, এখানে পড়তে না এসে তুমি শান্তিনিকেতন বা যাদবপুর কেন চলে গেলে না। শান্তিনিকেতনে মাস্টারমশাইয়েরও মাস্টারমশাই প্রবোধচন্দ্র সেন পড়াতেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন স্যারের একদার সহপাঠী কবি শঙ্খ ঘোষ। কিন্তু আমার তখন আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিদিনের আসা যাওয়ার বাস ভাড়া পঞ্চাশ পয়সার জোগাড় করাই কঠিন। শান্তিনিকেতন বা যাদবপুরে পড়াশোনা করাটা দিল্লি দূর অস্ত। তবে মানুষ কথায় বলে না বিড়ালের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়া। আমার ক্ষেত্রেও অনেকটা তাই হল। না, শান্তিনিকেতন বা যাদবপুরে পড়াশোনা করার মতো অভিজাত কপাল নিয়ে তো আসিনি। তবে শান্তিনিকেতন বা যাদবপুর দেখার একটা সুযোগ হাতের কাছে এসে গেল।

আই এফ সি আই থেকে একটা ইন্টারভিউয়ের ডাক পেলাম। লিখিত পরীক্ষাটা গুয়াহাটিতেই হয়ে গিয়েছিল। এবার ইন্টারভিউয়ের জন্য কলকাতা থেকে ডাক এসেছে। এর ওর কাছ থেকে জামা কাপড় এবং একটা পুরোনো ভিআইপি স্যুটকেস ধার করে কলকাতার উদ্দেশ্যে ট্রেনে চড়ে বসলাম। আমার তখন চাকরির জন্য যত না উৎসাহ তারচেয়ে অনেক বেশি উৎসাহ আমার আজীবনের স্বপ্নের শহর কলকাতা দেখা, মাস্টারমশাইয়ের কাছে বারবার শোনা কবি অধ্যাপক শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে একবার অন্তত দেখা করা। যদিও চাকরিটা আমার তখন ভীষণ, ভীষণ প্রয়োজন। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, চাকরিটা পাওয়া নিয়ে আমার মনে তখন কোনোরকম উত্তেজনা ছিল না। আমি তখন কলকাতার মাটিতে পা দিয়ে আমার স্বপ্নের শহরটাকে দেখছি, এক অদ্ভুত ভালোলাগায় মন ভরে উঠছে।

পরের দিন যাদবপুরে ছুটে গেলাম। এবার মনের মধ্যে ভীষণ উত্তেজনা। যাদের কখনও দেখিনি, যাদের কখনও ধরা ছোঁয়া যায় বলে ভাবিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই তুলনামূলক বিভাগের স্বর্ণোজ্জ্বল দিনগুলির কথা মনে পড়তে লাগল। এখানকার তুলনামূলক বিভাগে বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমিয় দেব, নবনীতা দেবসেন পড়াতেন ভাবতেই কেমন যেন শিহরণ বোধ করলাম। কিন্তু বাংলা বিভাগে গিয়েই মনটা হতাশায় ভেঙ্গে পড়ল। আমার পৌছাতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল।আগে থেকে কোনো রকম যোগাযোগও করতে পারিনি। শুনতে পেলাম শঙ্খ ঘোষ বিভাগে নেই।

এই আশা ভঙ্গের বেদনা নিয়ে আমাকে ১৯৯২ সন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হল। ১৯৯২ সনে শঙ্খ ঘোষ অসমের কমলকুমারী ফাউন্ডেশন থেকে থেকে ‘সাহিত্য সংস্কৃতি’র জন্য কমলকুমারী ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড ফর কালচার পুরস্কারে সম্মানিত হলেন।

সোমবারের সকাল। রোজকার মতো খবরের কাগজে চোখ রাখতে গিয়েই চমকে উঠলাম। রবীন্দ্রোত্তর যুগের প্রখ্যাত কবি শঙ্খ ঘোষ এবং জীব বিজ্ঞানী ত্যাগরাজন কমলকুমারী পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। গতকাল বিজ্ঞানী ত্যাগরাজন এবং শঙ্খ ঘোষকে রবীন্দ্র ভবনে যে সম্বর্ধনা দেওয়া হয়েছে তাতে শত চেষ্টা করেও উপস্থিত  থাকতে পারিনি। কাজেই মনে মনে ছটফট করছিলাম। শুনলাম দুজনেই হোটেল ব্রহ্মপুত্র অশোকে রয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে উঠলাম, এই সুযোগ কোনোমতেই হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না। বাড়ির পাশেই থাকত সাংবাদিক বন্ধু তুষার সাহা। তুষারের আর একটি পরিচয় সে শঙ্খ ঘোষের ছাত্র। ব্যাস! আমাকে আর পায় কে? দুজনেই ছুটলাম হোটেল ব্রহ্মপুত্রের উদ্দেশ্যে। রাস্তা যেন আর ফুরোতে চায় না। কেবলই মনে হচ্ছে কখন দেখা হবে।ইতিমধ্যে আমি শঙ্খ ঘোষের প্রায় প্রতিটি বই-ই পড়ে ফেলেছি। রবীন্দ্র গবেষনার আশ্চর্য ফসল ‘এ আমির আবরণ’, ‘নির্মাণ আর সৃষ্টি’,’উর্বশীর হাসি’, ‘কালের মাত্রা ও রবীন্দ্র নাটক’,’ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ’, ‘বাবরের প্রার্থনা’, ‘মূর্খ বড়ো সামাজিক নয়’, ‘শঙ্খ ঘোষের শ্রেষ্ঠ কবিতা’আমার নিত্য সঙ্গী হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বন্ধু কিশোর ভট্টাচার্যের কাছ থেকে এনে পড়া ‘ঐতিহ্যের বিস্তার’ গ্রন্থের শীর্ষক প্রবন্ধটি আমাকে অনুবাদ সম্পর্কে আগ্রহী করে তোলে। শঙ্খ ঘোষ দুঃখ করে তাঁর প্রবন্ধে বলেছিলেন, ‘আমরা বর্তমান অসম বা উড়িষ্যাতে সাহিত্যের ক্ষেত্রে কী ধরনের পরিবর্তন হয়েছে সেই বিষয়ে জানি না, সেইভাবে কেরালা বা অন্ধ্রপ্রদেশের সাহিত্যেও কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে সেই বিষয়ে অবগত নই। ফ্যাসি বিরোধী আন্দোলনের সময়ে অথবা প্রগতি আন্দোলনের সম্পর্কিত কোনো চিন্তা-চর্চা করা পরিলক্ষিত হয় না। ’শঙ্খ ঘোষের আলোচ্য প্রবন্ধ আমাকে অসমিয়া সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায় অনেকটাই অনুপ্রাণিত করেছিল। বন্ধু তুষার এবং আমি যথাসময়ে হোটেল ব্রহ্মপুত্রে পৌছে গেলাম। অলোক সোম আমাদের দেরি দেখে আগেই চলে গেছেন। তুষার কাছারির দিকে খানিকটা এগিয়ে গেল সেদিনের খবরের কাগজটা কেনার জন্য। তাড়াহুড়োতে সেটা নিতেই ভুলে গেছি। কিছুক্ষণ পরে সামনের দিকে তাকিয়ে দেখি যার জন্য এতদিন শবরীর প্রতীক্ষা নিয়ে অপেক্ষা করে চলেছি , শুভ্র বেশ পরিহিত সেই শঙ্খ ঘোষ তুষারের সঙ্গে এগিয়ে আসছেন। আমাকে দেখে মৃদু হাসলেন। আমার মনে হল এই বিশাল ব্যক্তিত্বের সামনে প্রগলভ হওয়া মানায় না। মনে মনেই প্রণামটা সেরে নিলাম।

হোটেলের ঘরে ততক্ষণে একে একে অনেকেই এসে পড়েছেন। মুক্তিদি এবং রবিজিৎদাকেও আসতে দেখলাম। দিদিকে দেখে অনেকটাই উৎসাহ পেলাম। মুক্তিদি আমাকে শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। অবশ্য এর আগেই পরিচয় হয়ে গিয়েছিল। মুক্তিদির সঙ্গে কবির বেশ ঘনিষ্ঠতা রয়েছে দেখলাম। দিদি কবিকে কিছু শারীরিক ও পারিবারিক প্রশ্ন করলেন। মুক্তিদি এবং রবিজিৎদার সঙ্গে আমরাও কবিকে দুই একদিন থেকে যাবার জন্য অনুরোধ করলাম। আমরা সবাই কবিকে আরও দুই একদিন নিবিড় করে পেতে চেয়েছিলাম। শঙ্খ ঘোষ তাঁর নিরুপায়তার কথা জানালেন। শেষপর্যন্ত সবার বিশেষ করে মুক্তিদি এবং রবিজিৎদার অনুরোধে আগামী বিহুতে আমাদের উষ্ণ আমন্ত্রণে সাড়া দিতে রাজি হলেন। আলোচনা মৃদু মন্থর গতিতে এগিয়ে চলল। পাক্ষিক বসুমতীতে সেইসময় শান্তিনিকেতনের প্রবোধচন্দ্র সেন সম্পর্কে শঙ্খ ঘোষের একটি স্মৃতিচারণ মূলক লেখা বেরিয়েছিল। লেখাটি খুব ভালো লেগেছিল কারণ পত্রিকার স্বল্প পরিসরেও শঙ্খ ঘোষ সুন্দরভাবে ছাত্রবৎসল প্রবোধচন্দ্রের রূপটিকে স্পর্শ করেছিলেন। প্রবোধচন্দ্রের এই মহানুভবতার সংস্পর্শে আসার সৌভাগ্য আমার ও হয়েছিল। হঠাৎ সেই প্রসঙ্গ মনে পড়ে যাওয়ায় শঙ্খ ঘোষকে জানালাম। উনি স্নেহের হাসি হাসলেন।তুষারের এক প্রশ্নের উত্তরে শঙ্খ ঘোষ জানালেন যে, সাহিত্য চর্চা অর্থাৎ লেখালেখির ক্ষেত্রে ধৈর্য একটা বড় জিনিস। পাঠকের উপেক্ষাকে মূল্য না দিয়ে নিজের সৃষ্টিতে সমাহিত থাকার প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন। এই প্রসঙ্গে তিনি আমেরিকান কবি ডিকিনসনের কথা বলেন। জীবিতাবস্থায় তাঁর একটি কবিতাও ছাপা হয়নি। তাই কোনোরকম প্রতিকূল অবস্থাতেই হৈ চৈ করা চলবে না। কবিকে প্রণাম জানিয়ে হোটেল থেকে যখন বেরিয়ে এলাম তখন মনে হল কিছুক্ষণের জন্য যেন ‘সব পেয়েছির দেশে’চলে গিয়েছিলাম।

এর পর কেটে গেছে কয়েকবছর। আমি চাকরিসূত্রে কলকাতা বদলি হয়ে এসেছি। সল্ট লেকের স্টাফ  কোয়ার্টারে সপরিবারে থাকি। খবর নিয়ে জেনেছি সল্ট লেকে ঢোকার মুখে ঈশ্বরচন্দ্র নিবাসে থাকেন কবি শঙ্খ ঘোষ। এত কাছে অথচ কেন জানি দেখা করার সাহস হয়নি। আসলে আগেই বলেছি যে শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে আর যাই হোক প্রগলভ হওয়া যায় না। কোথায় যেন একটা নীরব দূরত্ব রয়েছে। তাই বিভিন্ন সভা সমিতিতে দূর থেকে প্রণাম জানালেও বাড়ি যাবার সাহস কখনও হয় নি। এবার সে সুযোগও এসে গেল। খুব সম্ভব ২০০০ সনই হবে। আজ এতদিন পরে স্পষ্টভাবে আর মনে নেই। গুয়াহাটি থেকে যুবক কবি হেমাঙ্গ দত্ত সাহিত্য আকাদেমির ফেলোশিপ নিয়ে কলকাতা এল। আমার মাস্টারমশাই, গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উষা রঞ্জন ভট্টাচার্যের পরামর্শক্রমে হেমাঙ্গ একদিন আমার সঙ্গে দেখা করতে এল। সাহিত্য আকাদেমির কার্যসূচি অনুসারে হেমাঙ্গকে কলকাতার বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের সঙ্গে দেখা করতে হবে। বলা বাহুল্য,  কবি শঙ্খ ঘোষ তাদের মধ্যে অন্যতম। আমাকে বলতেই আমি সানন্দে রাজি হয়ে গেলাম। টেলিফোনে সাক্ষাৎকারটা ঠিক করে নিয়ে নির্দিষ্ট দিনে হেমাঙ্গকে নিয়ে শঙ্খ ঘোষের বাড়ি চলে গেলাম। হেমাঙ্গ সেই সময়ের অসমে তরুণ কবিদের মধ্যে অন্যতম।

এখানে বলে রাখি যে কবি হেমাঙ্গ দত্ত আজ থেকে বেশ কয়েকবছর আগে হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। এভাবে এমন একটি তরতাজা যুবক যে রাতারাতি উবে যেতে পারে তা অসমের অনেকের মতো আমারও বিশ্বাস করতে খুব কষ্ট হয়েছে। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও হেমাঙ্গর আজ পর্যন্ত কোনো খোঁজ পাওয়া যায় নি। যাক এবার আগের প্রসঙ্গে ফিরে যাই। শঙ্খ ঘোষের বাড়িতে আমরা অনেকক্ষণ ছিলাম। হেমাঙ্গ কবিকে নানান প্রশ্ন করলেন। সাহিত্য থেকে রাজনীতি কোনো কিছুই বাদ গেল না। মিতভাষী শঙ্খ ঘোষ প্রতিটি প্রশ্নেরই জবাব আন্তরিকভাবে দিলেন।পুরো সময়টুকু আমি নিজেও খুব উপভোগ করলাম। মনে পড়ে,যখন দুজনেই উঠব বলে ভাবছি তখন শঙ্খঘোষ হেমাঙ্গকে উদ্দেশ্য করে বললেন-‘কলকাতা শহরের প্রাণকে স্পর্শ করতে হলে শুধুমাত্র সাহিত্য আকাদেমি, রবীন্দ্র সদন বা বাংলা আকাদেমিতে ঘুরে বেড়ালেই হবে না। কলকাতাকে জানতে হলে বা বুঝতে হলে কলকাতার অলি গলি ঘুরে বেড়াতে হবে, থিয়েটার দেখতে হবে, নাটক দেখতে হবে। তাহলেই কলকাতার হৃদস্পন্দনকে স্পর্শ করতে পারবে। আজ কত বছর পার হয়ে গেল কিন্তু আজও মনে হয় কান পাতলে আমি আজও যেন সেই মৃদু কণ্ঠস্বর শুনতে পাব।

২০১৮ সনের ১২ সেপ্টেম্বর। উত্তর পূর্বাঞ্চলের বিশিষ্ট লেখিকা অঞ্জলি লাহিড়ির দ্বিবার্ষিক স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছে কলকাতা বাংলা আকাদেমি সভাঘরে।গুয়াহাটি থাকাকালীন সময়ে ব্রাহ্মসমাজে আয়োজিত সাংস্কৃতিক চক্রের সদস্য হিসেবে অঞ্জলিদির স্নেহ ভালোবাসায় স্নাত হয়েছিলাম। গুয়াহাটি থেকে বন্ধু পরিতোষ তালুকদার এই অনুষ্ঠানে অন্যান্য বক্তাদের সঙ্গে বক্তব্য রাখার কথা ছিল।কিন্তু বিশেষ কারণে পরিতোষ আসতে না পারায় আমাকে ফোন করে তার জায়গায় বক্তব্য রাখার জন্য অনুরোধ করে। আমি সানন্দে রাজি হয়ে যাই। স্থির করি অঞ্জলিদির উপন্যাসগুলি নিয়ে বক্তব্য রাখব। অন্যান্য বক্তাদের মধ্যে ছিলেন গুয়াহাটি থেকে প্রকাশিত ‘সময় প্রবাহ’পত্রিকার একদা সম্পাদক,কবি এবং আবৃত্তিশিল্পী সুকুমার বাগচী মহাশয়,গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান উষারঞ্জন ভট্টাচার্য,কবি শঙ্কর চক্রবর্তী এবং দিল্লি থেকে আগত একজন ভদ্রলোক ( নামটা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না বলে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি )। আলোচনা সভায় অনেক বিশিষ্ট জনের মধ্যে সকলের মধ্যমণি হয়ে ছিলেন কবি শঙ্খ ঘোষ। এটা আমার কাছে এক বিরাট প্রাপ্তি। তবে এত বড় এক ব্যক্তিত্বের কাছে দাঁড়িয়ে মঞ্চে বক্তব্য রাখতে হবে ভাবতেই আমার হাত পা অবশ হয়ে এসেছিল। অন্যান্য দিনের মতো এদিনও কবি কোনো বক্তব্য রাখলেন না। তবে পুরো অনুষ্ঠানটা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। এমনিতেই মৃদুভাষী কবি শঙ্খ ঘোষ বেশ কয়েকবছর ধরে সভাসমিতিতে গেলেও খুব একটা কথা বলতেন না। তার নীরব উপস্থিতিটাই  সভার আয়োজক এবং দর্শক শ্রোতাদের মন ভরিয়ে রাখত।

কিছুদিন আগে সাহিত্য অকাদেমির গ্রন্থাগার থেকে শঙ্খ ঘোষের প্রবন্ধগুলি আবার নতুন করে পড়তে শুরু করি। ‘ঘুমিয়ে পড়া অ্যালবাম’তারই অন্যতম একটি। ১৯৬৭ সনের অক্টোবর থেকে ১৯৬৮ সনের জুন পর্যন্ত আমেরিকার আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পৃথিবীর নানা দেশ থেকে আগত এক অভিনব লেখক সমবায়ের মধ্যে কাটিয়েছিলেন ।বিনিময় করেছিলেন চিন্তা ভাবনার।সেদিন যাদের সঙ্গে মিশেছিলেন তাদের প্রায় প্রত্যেকেরই কথা রয়েছে এই ডায়েরিধর্মী রচনায়। বইটা পড়তে পড়তে এক অদ্ভুত ভালোলাগায় ভরে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল কবি শঙ্খ ঘোষ যেন দূরের কেউ নন,আমি যেন তাকে এই লেখার মধ্য দিয়ে স্পর্শ করতে পারছি।

রচনাবলীর অষ্টমখণ্ডের ‘ইছামতীর মশা’প্রবন্ধটি পড়ে চমকে উঠেছিলাম। ভূপেন হাজরিকার আমন্ত্রণে অসম সাহিত্য সভার অনুষ্ঠান উপলক্ষে আয়োজিত শিবসাগরে যাওয়া এবং সাহিত্যসভার অনুষ্ঠান শেষে কাজিরাঙা ভ্রমণ আলোচ্য প্রবন্ধের বিষয়। সেই বছর ভূপেন হাজরিকা অসম সাহিত্য সভার সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি নিজে এসে প্রায় জোর করে শঙ্খ ঘোষকে সাহিত্য সভায় নিয়ে গিয়েছিলেন। শঙ্খ ঘোষ তাঁর স্বভাব অনুসারে সাহিত্য সভায় না যাওয়ার  নানা অজুহাত দেখিয়েছিলেন। কিন্তু ভূপেন হাজরিকার নাছোড়বান্দা মনোভাবের কাছে তাকে শেষ পর্যন্ত হার স্বীকার করতে হয়েছিল। সমগ্র প্রবন্ধটিতে ভূপেন হাজরিকার প্রতি, সাহিত্য অনুরাগী অসমের জনগণের প্রতি কবির যে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ পেয়েছে তা এক কথায় অতুলনীয়। অথচ প্রবন্ধের কোথাও অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস নেই। এ যেন নীরব পুষ্পাঞ্জলি। এ লেখা শঙ্খ ঘোষকেই মানায়। প্রবন্ধের শেষ দুটি লাইন এখানে উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারলাম না-

‘প্লেনে উঠে বসেছি। মস্ত সেই সরাইখানা রাখবার মতো কোনো জায়গা নেই আর,কোলেই নিয়ে বসেছি তাকে। আকাশে উড়তে শুরু করবার সঙ্গে সঙ্গে ভূপেন হাজরিকা সেটা টেনে নিলেন আমার কাছ থেকে। আঁকড়ে রইলেন নিজের কোলে।

‘এটা কী হলো?’

‘আপনি এটা বইবেন নাকি? আপনি না আমার অতিথি? ওটাকে আপনার বাড়ি পর্যন্ত পৌছে দিয়ে তারপর আমার ছুটি।‘

এরপর আর কিছু লেখা মানায় না। সব কথার শেষ কথা কবি শঙ্খ ঘোষ আমাদের হয়ে বলে দিয়েছেন। তাই তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে এখানেই শেষ করছি।

 

 

 

One thought on “স্মৃতিকথা: শঙ্খ ঘোষকে যেমন দেখেছি । বাসুদেব দাস

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত