Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,eid 2021 bangla golpo Mahbub Ali

ঈদ সংখ্যার গল্প: জলছাপ জলদাগ । মাহবুব আলী

Reading Time: 30 minutes 

নমিতা বারকয়েক মৃদু ধাক্কা দিয়ে ঘরময় অস্থিরতা ছড়িয়ে দিলে, আবিদুর একটি দম ছেড়ে আলগোছে কাঁধ ঝুঁকে বদ্ধ দরজার দিকে দৃষ্টি ফেরায়। বউ অধৈর্য হয়ে উঠেছে। হওয়ারই কথা। অনেকক্ষণ হয়ে গেল, আবিদুরের শেষ হচ্ছে না। সে অপাঙ্গে আবার দক্ষিণে তাকায়। নীল প্লাস্টিকের দরজা, সবটুকু জুড়ে রং বাহারি বিমূর্ত নকশা। সেই ছবি বা জ্যামিতিক ডিজাইনের কী অর্থ কে জানে! সে নিজের মধ্যে ডুবে ভেবে নিল, না এবার ওঠা দরকার; এতক্ষণ থাকা উচিত হচ্ছে না। ঠিক সে-সময় নমিতা আবার ধীর অথচ দৃঢ় গলায় হিস হিস করে ওঠে।

‘আর কতক্ষণ থাকবে? আমাকেও তো স্কুল যেতে হবে নাকি? পরীক্ষা চলছে।’

‘আর একটু…দু-মিনিট রানি।’

‘দুশ্‌শালা!’

বউয়ের এই কপট রাগ বেশ ভালো লাগে আবিদুরের। সে হেসে হেসে হালকাস্বরে জবাব দিয়ে এবার ট্যাপ ছেড়ে দেয়। জলতরঙ্গের ঢেউ ভেসে আসে তখন। চোখের সামনে দেয়াল। সিমেন্টের সঙ্গে ব্লাক-অক্সাইড আর পাডলু মিশিয়ে তেল কুচকুচে কালো রং এখন ফ্যাকাশে ধূসর। সাদা আলোয় ঝকঝক করে। সেই দেয়ালে ছড়িয়ে আছে জলের নানারকম বিন্দু আর রেখার এলোমেলো দাগ। পৃথিবীর নাম না জানা চেনা-অচেনা ভূমির ম্যাপ। কোনোটি গোল-ডিম্বাকৃতি কিংবা লম্বা। এলোমেলো। বিমূর্ত। সে বসে বসে এসবই দেখে। প্রায়শ ভেবে নেয় ওদিকে তাকাবে না, কিন্তু আনমনে দৃষ্টি লটকে যায়। আসল কাজ ঠিকমতো হয় না। ইদানীং এই আঁকাজোকা দেখা আর বিন্দু থেকে বিন্দুর মধ্যে কল্পিত রেখা টেনে কোনো চেহারা-ছবি এঁকে নেওয়ার রোগ ধরে গেছে। ওই যে দুটো চোখ, লম্বা দাগ হলো নাক; স্পষ্ট মানুষের মুখ। অনেকটা গোবিন্দের মতো। তখন কিছুকথা কিছু স্মৃতি জেগে ওঠে। একাত্তরের উত্তপ্ত দিনে ছাদের উপর ঘুড়ি ওড়ায় গোবিন্দ। শহরের পরিস্থিতি থমথমে। কেউ কারও মুখের দিকে তাকাতে ভরসা পায় না। মনে আশঙ্কা কখন কি জানি কী হয়। কারও বুক ধড়পড় করে তো কেউ নিশ্চুপ-নীরব। তেরোই এপ্রিল, মঙ্গলবার; পাকিস্তান আর্মি রামডুবি আর চেহেলগাজির মেঠো পথ দিয়ে শহরে প্রবেশ করছে। মানুষজন যে যেমন পারে উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিমে দৌড়। গোবিন্দের হুশ নেই। প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস। সে ছাদের উপর ঘুড়ি ওড়ায়। চাররঙা ঘুড়ি আকাশের প্রান্ত স্পর্শ করতে করতে কালো বিন্দু। তারপর ‘ঠুস্‌’ করে একটি শব্দ। গোবিন্দ ঘুড়ির সঙ্গে সঙ্গে সাত আসমানের উপরে উঠে গেল।

আবুল হাশিমের রেশন দোকানের কর্মচারী গোবিন্দ। দোকানে ক্যাশবাক্সের পেছনে টেবিলফ্যান ঘোরে। বনবন শব্দ উদ্দাম বাতাস। আবুল হাশিম খালিগায়ে পুবিয়া কি দখিনা বাতাস মেখে নেয়। আঙুলের ফাঁকে ক্যাপস্টান-ব্রিস্টল সিগারেট। চারপাশে ভাসে নীলচে-ধূসর ধোঁয়া। মনমোহিনী সুবাস। গোবিন্দ মোটর-গ্যারেজের মতো লম্বা দোকানের শেষ-কোনায় দেয়াল ঘেঁষে প্রায় বসে থাকে। ঘেমে-নেয়ে একশা। কাস্টমার এলে দ্রুত ব্যস্ত হয়। অথবা নির্দিষ্ট টুলে বসে ঝিমোতে থাকে। কখনো চোখ পিটপিট সামনে কিছু খোঁজে। মালিকের ছোট মেয়ে, পাঁচ নম্বর; কখন বের হয়ে আসে কে জানে? অনেকক্ষণ থেকে অপেক্ষা। তিন সাড়ে তিন কি বাজেনি? রুবি ক্লাস এইটে পড়ে। অথচ দেখেশুনে কে বলে কলেজের থার্ড ইয়ারে পড়ে না কেন? তাকে প্রাইভেট মাস্টারের বাড়ি পৌঁছে দিতে হয়। দিনকাল ভালো না। কে জানে তার স্বভাব কেমন। রুবি পড়ে কি পড়ে না, কোনো কোনোদিন যখন ফিরে আনতে হয়, চোখ-মুখ আবেশি লাল; সোহাগি ঘুম ঘুম চোখ তুলে ধরে বলে, –

‘সুরঞ্জন স্যার বেশ ভালো মানুষ তাই না গোবিন্দদা?’

‘মানুষ তো ভালোই।’

গোবিন্দ অনেককিছু বোঝে, অথবা কোনোকিছু বোঝে না, বুঝে কাজ নেই, সে কাজের লোক, মাস শেষে দুই শত টাকা পায়; এই যথেষ্ট। মালিকের বেটি কোথায় কী করে, পড়ে না গল্প, নাকি শুয়ে থাকে; দেখার কী দরকার? তবে বিয়েশাদি কিছু হবে বলে মনে হয় না। সুরঞ্জন হিন্দু মানুষ, যেমন লম্বু-হাড়গিলে-ঢ্যাঙা, প্রতিটি শব্দ উচ্চারণে খসখসে ঢেউয়ের সঙ্গে কণ্ঠার গুটি ওঠে আর নামে, কোথাও কাউকে নাগরদোলায় ঝোলায় কি না কে জানে। কে বলে? গোবিন্দ কিছু জানে না। সে কখনো বলে না যে, সুরঞ্জন বড় ঘাগু সেয়ানা মাল, কী বলে, চান্স-মহম্মদ-ক্লিকবাজ । রুবি সাবধানে থাকিস। গোবিন্দ বরং চান্সে থাকে। তারপর সেই রূপকথার গল্পে একদিন রুবি রাতদুপুরে হাওয়া। কোইনসিডেন্স আর কাকে বলে! গোবিন্দ আগেরদিন ছুটি নিয়েছে। রানিরবন্দর যাবে। বুড়ো মায়ের অসুখ বেড়েছে। হাঁপের ব্যামো। গোবিন্দ দু-একদিন আগে থেকে একমাসের অগ্রিম বেতন আবদার করে। আবুল হাশিম দয়ালু মানুষ, না বলে কী করে? কিন্তু ঘটনা যে অন্যরকম। এ প্লাস বি ইকোয়ালটু টোয়াইস এবি। আদার ব্যাপারী। তিন-চারদিন পর মধ্যবেলায় রুবি হাজির। সন্ধের সময় গোবিন্দ। এরপর যা হয়, অন্দরমহলের নিরিবিলিতে বহুমুখী জেরা, জোরজার কথকথা শোরগোল; শেষে উত্তমমধ্যম। গোবিন্দকে রাত দশটায় হাসপাতালে শুইয়ে কাহিনির উপসংহার। রুবি তার বড়ভাইকে নিয়ে গোপন একটু অবসর পায়। পাউরুটি দুধ কিনে দেয় চুপি চুপি। থানা-পুলিশ হলে বড় ঝামেলা। মানুষের রাগ সামলানো মুশকিল। অতঃপর গোবিন্দ যথারীতি কিছু জানে না। জানা থাকলেও সব কথা বলা যায় না। বলতে নেই।

আবিদুর আরেকবার এপাশ-ওপাশ তাকায়। ডানদিকে আরও অনেক জলছাপ। কতগুলো অদ্ভুত বিকট চেহারা ধরে রাখে। তারা কেউ কেউ অসম্ভব রেগে আছে। ভয়ংকর দৃষ্টি। এ রকম চেহারা কোথায় দেখেছে? কোথায়? আকস্মিক মনে পড়ে, একটি ইংরেজি হরর ফিলমে। আঁকিবুকি চিকন নকশি রেখা। এলোমেলো দাগ। একটি ম্যাপ বা মানচিত্র মনে হয়। কোন্‌ দেশের? আচ্ছা এমন হয় কেন? সে আর তাকাবে না। এটা কি স্তাঁদাল সিনড্রোম? ওই যে কোনো ছবি দেখে দর্শকের মাথা গুলিয়ে ওঠে…মন আর চিন্তন অলীক কল্পনায় ভেসে যায়? কিংবা প্রাচীন জ্যোতির্বিদ্যা? তারকাবিন্দু একটির সঙ্গে অন্য একটির রেখা টেনে নেয়। সেই রেখার উপর অন্য রেখা টেনে রাশিচক্র কিংবা গ্রহ নক্ষত্র ভাগ্যগণনা ইত্যাদি জটিল অঙ্কের হিসাব? সে-সময় আবার দরজায় ধাক্কা মারে নমিতা।

‘আর কতক্ষণ বসে থাকবে তুমি?

অবশেষে দরজা খুলে বেরোয় আবিদুর। চার-বাই-চারের ছোটঘর ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। ভেন্টিলেটরের ছোট খোপ দিয়ে সেই ধোঁয়া কখন বেরিয়ে মুক্ত হবে বলা মুশকিল। নমিতা নাকে ওড়না চেপে বলে ওঠে, –

‘ল্যাক্সাটিভ নিতে পারো। শাকসবজি তো পছন্দ করো না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কমোডে বসে থেকে কিছু হবে?…আর সিগারেট ছাড়ো।’

‘এবার ছেড়ে দেব মাইরি!’

‘যাও সরো…কখন থেকে পেটে চাপ ধরে আছি।’

‘সরি গিন্নি।’ আবিদুরের কণ্ঠে ভালবাসা দরদ।

‘যাও সরো তো!…টয়লেটে বসে ফেসবুকের কথা চিন্তা…যতসব পাগল মানুষ।’

‘ঘুরে এসো, চমৎকার এক থিম এসেছে মাথায়। অফিসে গিয়ে পোস্ট মারব।’

‘হুম্‌! সরকার তো ফ্রি ব্যবস্থা করে দিয়েছে।’

আসলে কিছুই না। কথা বলার সময় কোথায়? দু-জনেরই বাইরে যাওয়ার তাড়া আছে। নমিতা খুব সকালে বিছানা ছাড়ে। আবিদুর তখনো শুয়ে। আলস্য ভাঙতে ভাঙতে বুঝতে পারে সঙ্গী মানুষটি রাইসকুকারে এক-দেড় কাপ চাউল ছেড়ে দিয়েছে। অ্যানিকে রেডি করে স্কুলে রেখে দিতে যায়। এই তো কয়েক মাস হলো বাড়ির কাছে মিশন স্কুলে ভর্তি করে দিল। অ্যানি আনন্দে স্কুল যায়। নমিতা গলি পেরিয়ে রেখে ফিরে এসে টেবিলে নাশতা সাজায়। কোনো কোনোদিন আবিদুরকে দায়িত্ব নিতে হয়। সেদিন খুব সকালে ঘুম ত্যাগ। অবশেষে একসঙ্গে বসে খেতে খেতে দুটো কথা। আবিদুর জানে, পেটে গরম চা না পড়লে ওই কাজের বেগ আসে না। কনস্টিপেশন। চাপ থাকলেও হালকা হতে পারে না। ইদানীং সিগারেটের কুণ্ডলী তৈরি করতে করতে দেয়ালের জলছাপ জলদাগ দেখে। আকস্মিক কেমন করে একদিন মনে হয়, ওগুলো শুধু ছাপ বা দাগ নয়, কোনো মানুষের মুখ। ছায়া-ছায়া কোনো চেহারা-অবয়ব আকৃতি। কখনো দুটো চোখ। নাক-মুখ-ঠোঁট। ঠোঁটের কোনায় কী? শ্লেষ…বিদ্রুপ হাসি। ভাবলেশহীন দু-চোখের দৃষ্টি কখনো তীব্র ভয়ংকর। কেন এমন হয়? সকলের কি এমন হয়? ভিজুয়াল হ্যালুসিনেশন? কোনো মানসিক রোগের লক্ষণ নাকি সবটুকু অস্থির মনের কল্পনা? যা হোক তবু এই পাগলামির কথা কাউকে বলা উচিত নয়। তারপর যানজটের ব্যস্ত রাস্তায় নিজেকে নিরাপদ রেখে সময়মতো অফিসে পৌঁছতে পৌঁছতে কোনোকিছু আর মনে থাকে না। কর্মচঞ্চল দিনে কত শত কথা মনে থাকে? সে তো হায় আজগুবি ঘটনা। অসুস্থ মনের কল্পনা। কেউ লঘু মজা পেয়ে দমফাটা হাসি দিতে পারে। পরিশেষে টুকিটাকি মন্তব্য নিয়ে মাথা গরম করার অর্থ নেই। তার দু-একটি যে তিক্ত বা কটু হবে না, এ কথা কে বলতে পারে? হাজী সাহেব হয়তো সেদিনের মতো চোখ-মুখ বিকৃত করে কোনো মন্তব্য দিয়ে বসবেন।

‘সাবধান হয়ে যান ছোটভাই। বেশি কাদাপানি খাবেন না।’

‘না ভাই তেমন হচ্ছে কোথায়? পার্টি আজকাল মোটা মাল দেয় না।’

‘ডিজিটাল হলে তো আর খাওয়া নাই।’

‘কী যে বলেন মুরুব্বি…যেমন রাস্তা তেমন উপায়। ফাইল ওকে করার পাওয়ার তো হাতেই থাকছে নাকি? কিছু মাল জমিয়ে ফেলে আপনার মতো মক্কা ঘুরে আসব। ধুয়ে মুছে সাফ, একেবারে নিষ্পাপ নিষ্কলঙ্ক।’

‘এখনই এই বয়সে? একটু ভারী হোন।’

এই মন্তব্য শেষে হাজী রুহুল আমিন আর একটিও কথা বলেন না। জোঁকের মুখে লবণ। আবিদুর জানে, এখন নিশ্চুপ কাজের সময়। চোখ-মুখ গম্ভীর দার্শনিক রেখে শুধু অফিসের বাক্যালাপ। প্রত্যেক মানুষের দুর্বলতম জায়গা আছে। মনের গভীরে নিজস্ব কোনো কোমল আঙিনা। অফিসে কখনো যেমন রিউমার ভেসে বেড়ায়, এইসব অবৈধ উপার্জনে প্রায় শেষবয়সি রুহুল আমিন হজ্ব করে দাঁড়ি রেখেছেন, মাথায় টুপি, পোশাক থেকে জান্নাতুল ফেরদৈাসের সুগন্ধি, প্রেয়ার রুমে কয়েকবার হাজিরা; সেই গল্প পুনরায় আওড়াতে মন সায় দেয় না। রুহুল আমিন সার্টিফিকেটে কত বছর বয়স চুরি করেছেন? একবারে গুলগুলা-ঝুরঝুরা নারিকেল, অথচ এখনো আটচল্লিশ-পঞ্চাশ, অবসরের অনেক দেরি; বয়স বাড়ে না। জগৎ এখন এমনই। চোর-লুচ্চারাই ভালোভাবে বেঁচে থাকে। তারা ফ্যাল্‌ তক্‌তা মার পেরেক, যে পারল না; সে সুযোগের অভাবে চরিত্রবান। হা হা হা! আবিদুর মনে মনে একগাল হেসে নেয়। তার ভাবনা বা কল্পনার দৌড় আসলেই অনেক। সে টেবিলের উপর বিবিধ ফাইল থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ডেক্সটপ মনিটরে রাখে। আকাশ-নীল স্ক্রিনের কোনায় দু-চারটি লাল বিন্দু সংখ্যা। নোটিফিকেশন। কেউ একজন কমেন্ট করেছে। বেশ বড় লেখা। শেষে জিফ ইমো। ওয়াও! সে এবার থাবা মেরে মাউস ধরে অন্য ট্যাব ক্লিক করে। ঠিক তখনই চোখে পড়ে অনুসূয়া মিত্তির নামের আইডি। নায়িকা পোজে তোলা প্রোফাইল পিক। ঝাঁপসা। এ কি কোনো ছদ্মবেশী পুরুষ? আজকাল এমনই হয়। পুরুষ মানুষ, অথচ মেয়েদের নাম নিয়ে আইডি খোলে, সুন্দরী মুখছবি প্রোপিক; এরা সম্ভবত ক্লীব বা হিজড়া। কী করি আর কী না করি? আবিদুরের মনমেজাজ বেশ ভালো আজ। তাই এক ক্লিক মেরে দেয়। বন্ধু হতে চাই অনুরোধ। তারপর ইনবক্স। ‘হাই! আপনি কি বটতলির অনুসূয়া মিত্তির? সরকারি কলেজ এইচএসসি উনিশ শ সাতানব্বইয়ের ব্যাচ?’ আশ্চর্য! ঠিক দু-মিনিট পর রিকোয়েস্ট অনুমোদন। ইনবক্সে জবাব উপস্থিত। আবিদুর কী করে? ফ্লোরে একটু নেচে নেয় ইচ্ছে করে। তার সেই আদি-অনাদি অনুসূয়া। তার স্বপ্ন…স্বপ্নের রানি।

‘হাই! আবিদ? কেমন আছিস? কোথায় আছিস?’

‘নিজ জেলায়। তুই?’

‘আমিও তো! এই তো দেড় মাস হলো এখানে। আ রে পৃথিবী নাকি ছোট হয়ে গেছে, অথচ তোর সাথে দেখা হয় না।’

এরপর কত কথা। সে-সবের দু-একটি পুরোনো দু-চাটি নতুন। ওল্ড ইজ গোল্ড। গোল্ড অলওয়েজ প্রিসিয়াস। নতুন প্রচ্ছদ রাঙা কবিতার পুরোনো বই। তার আদরের ডায়রি। অনুসূয়া মিত্তির…তার অনুসূয়া। এখন কি আর তার আছে? তখন একটি মেয়ে চোখ-উজ্জ্বল দুষ্টু-হাসির স্ফুলিঙ্গ ছুড়ে টেবিলের ওপাশে নেমে আসে। চেয়ার টেনে বসে পড়ে। বাতাসের মৃদু ঢেউয়ে জবার মতো নেচে যায় খোলা চুল। আবিদুর কী করে? নিষ্পলক তাকিয়ে থাকা ছাড়া কিছু করার নেই। অস্থির চঞ্চল মনের আকাশ হতবিহ্বল। এ যে একেবারে আকস্মিক অভাবিত সময়কাল। সেই আকাশে মন ভেসে যায় মনপবনের নৌকোয়। অনুসূয়া ইনবক্সে টাইপ করে। সুরের মৃদু ঝংকার টুক-টুক-টুক।

‘বল কখন সময় হবে তোর?’

‘সন্ধেয়। কোথায়? তোর বর কী করে?’

‘ও শালা মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ, দু-দিন ধরে বাসায় নেই। আজ আসার কথা।’

‘যাই বলিস তোর মানুষটা বেশ মাকু মাকু…খুব সাদাসিধে।’

‘হুম্‌ম! পানসে দোস্ত। তোর বউ কী করে? বাচ্চা কয়টি?’

‘একটি মেয়ে। মিশনে নার্সারিতে ভর্তি হলো। তোর?’

‘এখনো হয়নি। হচ্ছে না।…ইস্‌! তোকে দেখতে ইচ্ছে করছে রে। ইমো-ডুয়ো যা আছে চালু কর।’

‘আমি তো ডেক্সটপে। ওয়েব ক্যাম নেই। আজ সন্ধেয় দেখা হোক? কোথায় যাব?’

‘তোর বউ কী করে বললি না তো! এখন থাকিস কোথায়?’

‘সে স্কুলের টিচার। আমাদের বাড়িটা বিক্রি হয়ে গেছে। আমি ঈদগাহ্ বস্তি থাকি। ভাড়া বাসা। তুই?’

‘বটতলি। আগের ঠিকানায়। দাদা-বউদি ভারত চলে গেছে। সেখানেই সেটেল্‌ড।’

‘এখন তা হলে তোর বাড়ি। ইস কত দিন তোর হাতে তৈরী চা খাই না।’

‘হুম!…হ্যাঁ রে দুপুরে খেয়েছিস?’

‘উহ্‌! তোর মতো করে কেউ কোনোদিন খোঁজ নিল না। মাইরি!’

‘কেন তোর বউ জিজ্ঞেস করে না?’

‘তার সময় কোথায়? ছোট ছোট ছেলেমেয়ে পড়াতে মাথা নষ্ট।’

‘হি হি হি!’

প্রচণ্ড হাসির ইমো। আবিদুর কী লেখে? বাতাসে ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ভেসে যায়। অপেক্ষা আর অপেক্ষা। কোনো কোনো অপেক্ষার অর্থ নেই। কেননা সেটি শেষ হয় না। কোনো প্রতীক্ষা অর্থহীন আজ। সব তার দোষ অথবা সময়ের। মনিটরে নতুন কিছু লেখা ঝাপসা লাগে।

‘এখনই আসবি? আচ্ছা আয়। শালা এখনো সেই কিউপিড থেকে গেছিস।’

‘কি যে বলিস তুই! দিনে দিনে কত বেলা হলো সখী খেয়াল আছে? প্রোপিক দেখে ভুল করো না…ভুল তো মনের আয়না। হা হা হা! যাব অবশ্যই, তবে এখন নয়…সন্ধের আগে।’

‘তা হলে ঠিক ছটায় বটতলি।’

‘ওকে ডিয়ার।’

একটি নীল লাইক দীর্ঘ হতে হতে দীর্ঘাকার আকৃতি নিলে মন খুশিতে নেচে ওঠে আবিদুরের। আহা কতদিন পর সেই অনুসূয়া! এতদিন চলে গেল, কতবার মনে পড়েছে তার কথা, মনের দেয়ালে কতবার মুখছবি ভেসে উঠল; চোখের আড়ালে মেঘজল। এখন কেমন হয়েছে দেখতে? চেহারা-সুরত? আবিদুর খুব দ্রুত বুড়ো হয়ে গেল। সাঁইত্রিশ ছুঁই-ছুই এসে দেখে গোঁফের দুই প্রান্তে সাদা রং ঝুলে থাকে। চোখে দুই শত পঁচাত্তর প্লাস চশমা। বুকে মাঝে মধ্যে চিনচিনে ব্যথা। একান্ত গোপন। কখনো সন্দেহ হয় হার্ট গেছে। কখনো ভেবে নেয় তার আবার হার্ট। নমিতা বলে অ্যাসিডিটি…গ্যাস। অ্যান্টাসিড খাও। তার যে কোথায় ব্যথা কে জানে।

সেদিন নমিতা বাথরুম থেকে বের হয়ে অন্য কথা বলে বসল। প্রয়োজনীয় অথবা তেমনকিছু নয়, আবিদুরের মনে হয়, ভেবে দেখা যায়। নিজের প্রতি বড় অবহেলা হয়ে গেল। অবহেলা না আলসেমি? সে সত্যি বড় অলস মানুষ।

‘কদিন ধরে লক্ষ্য করছি, তুমি বাথরুমে দীর্ঘ সময় বসে থাকো; বিষয় কী? কনস্টিপেশন? তেমন হলে ওষুধ নাও না কেন? আজ দোকানে যেয়ে মহাত্রিফলাদ্যঘৃত নেবে। রাতে গরম দুধের সাথে এক চামচ মিশিয়ে খেলে সমস্যা থাকবে না। অথবা ইছবগুলের ভুষি খেতে পারো।’

‘কী…ভুষি? ওসব কবরেজি খেতে পারব না। মিল্‌ক অব ম্যাগনেশিয়া নেব।’

‘ও। আর দেয়ালে পানি দিয়ে ছবি আঁকো কেন? ছাত্রজীবনে এসবই করতে না? স্কুলের চক নষ্ট করার অভ্যেস? ট্রেনের টয়লেটেও আজেবাজে লিখতে নাকি?’

‘মানে?’

‘এই যেমন প্রেম চাই, তুমি কত সুন্দর, আবিদুর যোগ…’

‘নমিতা…হা হা হা! তুমি পারো বটে! তুমি লিখতে?’

‘মাথা খারাপ!’

‘মাথা খারাপ মানুষেরা লেখে? মেয়েদের টয়লেটেও তো অনেককিছু থাকে। আচ্ছা তোমার স্কুলবেলায় মেয়েরা কী লিখত?’

‘তুমি লেডিজ টয়লেটেও ঢুকেছ নাকি? ভারি বদলোক!’

‘আ রে না না…তুমি কিন্তু ক্ষেপেছ। হা হা হা! এমনি বললাম। মেয়েরাও কম যায় না।’

‘আমি দেখিনি, তবে মেয়েরা অত খারাপ না; ছেলেরা তো নোংরা ছবি পর্যন্ত এঁকে রাখে। মানসিক বিকৃতি আর কি।’

‘কোথায় দেখলে তুমি?’

‘ট্রেনে…কি বিচ্ছিরি!’

আবিদুর হকচকিয়ে গেল। তখন কলেজে পড়ে, সেকেন্ড ইয়ার, প্রকৃতি আর মনমেজাজ কৃষ্ণচূড়া লালে লাল; সে অনুসূয়ার পেছনে পেছনে ঘোরে। অনুসূয়ার বাবা অমিত মিত্তির চমৎকার গিটার বাজান। মাউথঅর্গান। অ্যাকর্ডিয়ান। আবিদুরের সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেল। তারপর শ্রদ্ধা-ভক্তি-ভালবাসা। একসময় অমিত আঙ্কেল। বাড়িতে অবাধ যাতায়াত। সরস্বতী-দূর্গা আর বোশেখের প্রথম দিন গণেশ পূজোয় বিশেষ নিমন্ত্রণ। শালপাতায় নারিকেল নাড়ু-পায়েস-সন্দেশ-কলা-আপেল-কমলা কত কী? কাঁসার গ্লাসে শীতল জল। এপ্রিলের খররোদে গাছপাকা বেল শরবত। আবিদুরের মন জুড়োয়। চোখ জুড়োয় অনুসূয়ার রূপ জাদুমায়ায়। উজ্জ্বল ফরসা পানপাতা মুখছবি। মাথাভরতি ঝাঁকড়া চুল। সেই চুলে কখনো অচেনা কখনো চামেলির হালকা সুবাস। অনসূয়া যে অমিত আঙ্কেলের একমাত্র মেয়ে কে জানত? প্রথমদিন বাসায় গিয়ে আবিষ্কার হয় অনুসূয়া ক্লাসমেট। এরপর তো কথাই নেই। আবিদুর লাজুক-মুখচোরা মানুষ কত আপন হয়ে গেল। আপন করে নিল। কলেজের নির্জন নিরিবিলি লনটেনিসের গ্রাউন্ডে বসে দু-জনে গল্প করে! কত কথা। মনে-প্রাণে দুর্বল হয়ে পড়েনি এমন মিথ্যেও সত্য নয়। নিজের কাছে এই কথা বারবার শুনিয়ে শুধু সাহস হলো না তাকে বলবার। সবকিছু বুকের তলায় গোপন গদ্য-কাহিনি। মোহাচ্ছন্ন একতরফা কাল বটে! সময়-দিন-সপ্তাহ আর মাস যেতে যেতে, বলি বলি ভাবতে-ভাবতে, একদিন সকালে অনুসূয়ার সিঁথিতে সিদুর দেখে চমকে উঠল। আবিদুর তখন রাজশাহি থেকে ফিরেছে। কোনো কাজে যাওয়া। সময় খুব ব্যস্ত। টেবিলের উপর এলোমেলো ছাড়ানো বইয়ের ফাঁকে সোনালি নিমন্ত্রণপত্র দেখা হয়নি। সে কী করে? সবকিছু যে অভাবনীয়। সে স্থির হতভম্ব বিমুঢ়। অনুসূয়াকে তিন-চারদিন দেখা যায়নি! কলেজ ক্যাম্পাস শূন্য শূন্য লাগে। বটতলি যাব যাব করে যাওয়াও হলো না তার। না, একদিন গিয়েছিল। উজ্জ্বল চনমনে দুপুর। কলেজ ফেরা উৎসুক দুটো চোখ। পাগল মন আর কি সকাল-দুপুর-সন্ধে মানে…না বোঝে? অনেক সাহস আবেগ আর ভাবনা ধরে রাখে। বটগাছের নিচে দু-একটি চা-স্টল। তারই কোনো একটির নিরালায় বসে নানখাতাই বিস্কুটে কামড় দিয়ে বলে ফেলবে সব। মনে সাহস জমে ওঠে। অনুসূয়ার দু-চোখে দুষ্টুমি অবজ্ঞার হাসি থাক না কেন, সে বলে দেবে; কী হয় হোক। আবিদুরের রাতে ঘুম হয় না। হিসাববিজ্ঞানের সহজ অঙ্ক ভুল হয়ে যায়। ইংরেজি টেক্সট বের করে পড়তে পড়তে লাইন হারিয়ে ফেলে। সেগুলো বুঝি বই থেকে হেঁটে হেঁটে লেফ্‌ট-রাইট মিছিলে নেমে যায়। অনুসূয়ার মুখছবি। চারিদিক শুধু অনুসূয়া আর অনুসূয়া। তার দুষ্টুমি হাসি। কখনো মায়াময়…কত জনমের সাথি। ঝাঁকড়া বন্য চুলে ভিজে থাকা চামেলি সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়ায়। আবিদুর তাই এসেছে। আজ যা হোক কোনো অপমান-তিরস্কার কিংবা আদর-সোহাগ, বলে বসবে; কিন্তু টিনের দরজায় বড় এক তালা। মনের সকল বাতি ভরদুপুরে ফিউজ। ওরা গেল কোথায়? কয়েকদিন আরও কেটে গেলে, পুনরায় আরেকদিন যাব-যাব মন টাটায়, কলেজ শেষে যেতে হবে চুপচাপ মন-ভাবনা; অনুসূয়া কলেজে হাজির। ওর পরনে টকটকে লাল শাড়ি। আধখোলা পিঠ। হালকা হলুদ ব্লাউজ। সোনার চুড়ির সঙ্গে শাঁখার বালা হাতে চকচক করে। আবিদুর একপলক দেখেই মিইয়ে যায়। মন ভেঙে মনের গহিনে কালবোশেখি ঝড়। তারপর যেভাবে সবকিছু সহজ করে নেওয়া যায়…স্বাভাবিক হওয়ার খুব চেষ্টা। তার মুগ্ধ চোখ, বুকে গোপন ঈর্ষার তাণ্ডব ঝড়, কোথায় কী ছিল, আজ আর নেই, শূন্য খাঁ-খাঁ হাহাকার; তবু যেন খুব সহজ। এমনই হবে, হতে পারে, আর কী চাই, আফশোস; খুব সহজ একলা সে। সে বুঝি এক দাঁড়কাক, মাযারের লালশালু আচ্ছাদন পাশে আমগাছের মগডালে বসে থাকে। অসম্ভব তৃষ্ণার্ত দৃষ্টিতে কী খুঁজে যায়?

‘হয়ে গেল?’

‘তোর জন্যে বসে থাকব?’

‘সত্যি রে আমার সাহস হলো না। আজ কিন্তু তোকে মাইরি আগুন দেখাচ্ছে।’

‘শালা দূরে থাক…পুড়ে যাবি।’

‘পুড়ে পুড়ে তো অঙ্গার হয়ে গেছি ডিয়ার।’

‘আহা রে আমার দেবদাস!’

আকস্মিক কোরাস হাসির মিছিল বুঝি শেষ-সকালের বাতাস আন্দোলিত কেঁপে যায়। তারপর অনুসূয়া অতগুলো ছেলেমেয়ের সামনে কী ভেবে তার ডানহাত চেপে ধরে উচ্চস্বরে বলে উঠে, –

‘এই আবিদ একটা চুমু খেয়ে দেখ তো?’

‘মানে?’

‘হি হি হি…দেখলি তোরা? ব্যাটা আস্ত মাকাল!’

অনুসূয়া তার বান্ধবীদের দিকে তাকিয়ে রিনঝিন হাসে। তার ঠোঁট-মুখ থেকে জ্বলে উঠে খলবল হাসির দ্বিতীয় কোরাস। মিছিলের শ্লোগান। আবিদুর নিজের মধ্যে গুটিয়ে যেতে যেতে বুঝে নেয়, কখনো কখনো পুরুষকে অন্যরকম সাহসী হতে হয়। সে পারল না। তার লজ্জা লাগে। যদি পাছে ভুল হয়ে যায়। সে মৃদু হেসে ধীরপায়ে পালিয়ে কাফেটেরিয়ায় বসে। মাথানিচু চুপচাপ কিছু একলা বিষাদ প্রহর। কফির কাপে নিশ্চুপ ছোট ছোট চুমুক দেয়। কুণ্ডলিত সময়। নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া শম্বুক। আশপাশে বসে থাকা মানুষের সকল চোখ বুঝি তার দিকে কৌতুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কখনো কল্পিত শ্লেষ কখনো আত্মশ্লাঘায় শেষ ফাল্গুনের হিমোষ্ণ দুপুর ঘেমে নেয়ে একশা। একসময় বিকেলের ছায়া গাছের শিখর থেকে মাঠে নেমে আসে। ক্যাম্পাসে সহপাঠীদের অনেকে চলে যায়। বিস্তীর্ণ সবুজ-ধূসর চত্বরে নতুন নতুন মানুষের আনাগোনা। সন্ধেয় নাইট শিফটে আইন ক্লাস। এরমধ্যে যারা কাফেটেরিয়ায় এসে বসে, মনে হয় তাদের দৃষ্টিতেও কৌতুকরেখা। অবশেষে সবকিছু এড়িয়ে বের হয় আবিদুর। কলাভবনের কয়েকটি রুম খোলা। সে সিঁড়ির পেছনে রিফ্রেসার্সে গিয়ে দাঁড়ায়। বাতাসে ফিনাইল আর প্রস্রাবের গন্ধ মিলেমিশে একাকার। নীলচে-ধূসর রঙের দরজা। রুম নম্বর দুই শত তিন। দরজার মাথার উপর ছোট একটি বালব একাকী জ্বলে জ্বলে নিষ্প্রভ আলো ছড়িয়ে রাখে। আবিদুরের মাথায় দুপুরের আগুন। এই আগুনের কোনো আলো নেই। অসূয়াকাতর তাণ্ডব। সে ছোটঘরে নিজেকে হালকা করতে করতে ফ্যাকাশে-নীল বর্ণ দেয়ালে চক ঘষে। লেখে ‘অনুসূয়া ফাক ইউ ড্রাই বেবি’। এই হলো প্রথম অপরাধ। অবশেষে নিজেকে ভারমুক্ত ভেবে নেওয়ার বদলে পাথর ভারী হয়ে যায়। ঠিক কাজ হয়নি। বিবেক খোঁচাতে থাকে। সেই তার গোপন পাপ।

আবিদুর বাসায় ফিরে কারও সঙ্গে কথা বলতে পারে না। সকলেই হয়তো দুপুরের ওই ঘটনা জেনে গেছে। অথবা দেয়ালে অসম্ভব খারাপ একটি কথা লিখে এলো, কারও অজানা নেই। রাতে খেতে পারে না। কোথাও গুমোট কান্নার সুর। সারারাত তন্দ্রা ঘোর ঘোর মাথাব্যথা। আধোঘুম-জাগরণে আদিম কল্পনার খাপছাড়া স্বপ্ন মিছিল। অনুসূয়ার শরীর থেকে একটি একটি করে কাপড় খোলে সে। বেরিয়ে পড়ে অচেনা ধবধবে ফরসা আশ্চর্য-বিস্ময়। কিন্তু কোত্থেকে নতুন পোশাক এসে জড়িয়ে রাখে তাকে? আবিদুর খোলে…খুলতে থাকে। একেবারে নিরাবরণ করে ছাড়ে। তরুণীর মায়াবী শরীর-কাঠামো। আবার পোশাক। আবিদুর পোশাক খসিয়ে ফেলতে থাকে। পুনরায় পোশাক এসে যায়। অনুসূয়া খিলখিল হাসে। সেই হাসির রিনঝিন ঝরনা-তরঙ্গ বাতাসে ভেসে ভেসে বাইরে রাতের দেয়ালে ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলে যায়। অথবা বুক কাঁপে তার? আবিদুরের মাথা খারাপ। চোখ-মুখ দিয়ে গরম ভাঁপ বেরোয়। এ কোন্‌ দ্রৌপদী খেলা? কোনোমতেই কোনোকিছু সামলানো যায় না। আচমকা তার চোখ খুলে যায়। মাথার উপর ফ্যানের শব্দ মিছিল। তখনো বাতাসে নাকি শ্রুতির ধারায় হাসির ঢেউ ভেসে যায়। উচ্চশব্দ রিনঝিন রেশ। কখনো নিশ্চুপ শ্লোগান প্রতিধ্বনি-নিনাদ। ‘এই আবিদ একটা চুমু খেয়ে দেখ তো?’ আবিদুর নিজের প্রতি অভিমান কিংবা দোষারোপে ম্লান করে দেয় রাতের আকাশ। মনে গহিনে এদিক-ওদিক বারবার অচেনা ধাক্কা লাগে। বেডসাইড টেবিলে পানির গ্লাস থিরথির কাঁপে। মন তড়পায়। রিফ্রেসার্স রুমের দেয়ালে তেমন কথা লেখা ঠিক হয়নি। কেন এত হীন কাজ করল? লিখতে পারল? তারপর নিশ্চুপ অন্ধকারে তাকিয়ে সকালের অপেক্ষা। প্রলম্বিত দীর্ঘ রাত নিষ্পলক পার করে দেয়। একটুও ঘুমোতে পারে না।

পরদিন সকালে অনেক আগে কলেজ পৌঁছোয়। ক্যাম্পাসের মাঠে দু-চারজন মানুষ ইতস্তত ঘুরে বেড়ায়। কলা ভবনের রুমগুলো ঝাড়ু দেয় লখিন্দর। আবিদুর সকল অপরাধের কুশলী। নিজেকে হাজার সতর্ক দৃষ্টি বাঁচিয়ে রিফ্রেসার্স রুমে নিয়ে চলে। মুছে ফেলা দরকার। ভয়ানক অপরাধ। পকেট থেকে রুমাল বের করে চমকে ওঠে। তার উৎকীর্ণ বাণীর নিচে ‘চমৎকার’ একটি ড্রইং। কুৎসিত হোক কিংবা পর্ণো…চিত্রকরের হাত মন্দ না। প্রতিভার বিনষ্ট প্রয়োগ। মন্দ-খারাপ অথবা কী জানে না সে। সেই কথা আর মোছা হয় না। হায়রোগ্লাইফিক্‌স (hieroglyphics) জেগে থাকে। সেই জেগে থাকা জ্বলজ্বল ছবি স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি আজও। প্রশ্নবোধক দাগ হয়ে জ্বলতে থাকে। অপরাধ কখনো নিভে যায় না। কবরে শায়িত মৃতের মতো জেগে ওঠে। কখনো বিকট দুর্গন্ধ বাতাসে ভেসে ভেসে নাকে লাগে।

আজ অনেকদিন পর সেই কথা মনে পড়ে যায়। আবিদুরের কী হলো? সে সেকেন্ড ফ্লোরের জানালা দিয়ে আকাশ দেখতে-দেখতে কাজ করে। একবার টেবিলের ফাইলে, বিভিন্ন ফরম আর ভাউচার স্লিপে মনোযোগ; কখনো ডানপাশের মনিটরে। এরমধ্যে ক্ষণে ক্ষণে জেগে ওঠে অনুসূয়ার মুখছবি। এখন কেমন দেখতে হয়েছে? নমিতার মতো একটু কি নাদুসনুদুস? অথবা বাঁশের কঞ্চির মতো সহজ সুন্দর স্লিম তেমনই আছে? সেই তো, দিনে দিনে অনেক দিন, না না মাস, আ রে দূর…কত বছর পেরিয়ে গেল; আজ তাকে দেখতে মন কেন অকারণ ব্যাকুল হয়? অস্থির ছটফট করে? চোখে ভেসে ওঠে কপালের সেই ছোট্ট লালটিপ। আফশাঁনের উপর সূর্যের ঝলক রশ্মি। আগুন রং লাল শাড়ি। কোনোদিন সেই টিপ কামিজ কিংবা শাড়ির সঙ্গে মিলেমিশে আকাশ-নীল কিংবা হলুদ-সবুজ। আবিদুরের বুকে মেঘভেজা রংধনু খেলা। অনুসূয়া হেসে হেসে কথা বলে, ভালবেসে জবাব দেয়; মুখছবিতে দুষ্টু হাসির অচেনা আবাহন। আবিদুরের লাজুক দু-চোখ অনুসূয়ার নাকে চুনি পাথর চকচকে নোজপিনে আঁটকে থাকে। আহ্‌ কোথায় হারালো সেইসব দিন! এত বছর পর কেন জানতে সাধ হয়? কেমন আছে অনুসূয়া? মনের গহিনে কিশোরকাল। সেও কি ভালবাসত? কে জানে। আবিদুরের মন যে সত্যি সত্যি হারালো হারালো ভালবাসা দিনকাল। তেমন করে নয়…অথবা কে বলে তেমনভাবে নয়; খুব ভালবেসেছিল। ওই বয়সের প্রথম প্রেম। অবশ্য প্রেম নাকি একতরফা মোহ? কতবার ভেবেছে, নতুন করে ভাবতে হয়; ভাবতে হবে। লাভ-অলাভ? সবকিছু তো লাভের অঙ্কে বিচার করা যায় না। সেই সুযোগ ধৈর্য আর যৌক্তিকতাও জিজ্ঞাসা রেখে যায় আজ। সময় আর দিনকাল মন্দ ছিল না। সেদিন শেষ-সকাল, সূচনা দুপুর, মানুষজন ব্যস্ত ক্যাম্পাস; কী বলেছিল অনুসূয়া? আবিদুর কেন চোরের মতো পালিয়ে গেল? কেন সাহস হলো না? আবিদুরের মনোযোগ নষ্ট হয়। অচেনা অস্থিরতা বুক পোড়ায়? সে তবে তাকে ভুলতে পারেনি। নমিতা তো অনেক ভালো। সে আর নিষিদ্ধ কোনোকিছু ভাববে না। নমিতার কথা ভাববে। মন কি তবু মনের কথা শোনে? কোন্‌ ফাঁকে অতীতের অন্ধকার ক্যানভাসে কারও মুখছবি ভেসে ওঠে আর লাল ক্রস দাগ রেখে যায়। ভুল স্বপ্ন ভুল দিনকালের জলছাপ।

আবিদুর সময় বের করতে পারে না। বিকেলের আগে আগে আচমকা মিটিং। সে অডিট রিপোর্টের খসড়া কাগজগুলো জড়িয়ে সাজাতে সাজাতে ঘড়ি দেখে। বিকেল সাড়ে পাঁচ। মিটিং তো অফিসটাইমে করা যেত। কেন এমন হয় না? তার অস্থির চঞ্চল মন। আকাশের দৃষ্টিসীমায় কোনো মাথাউঁচু ঝাঁকড়া বটগাছ দেখা যায়। তার পুবে সরু রাস্তার মুখে নিরালা টিনশেড বাড়ি। পুব-উত্তর কোনায় বাতাসে লুকোচুরি খেলে পেয়ারার শাখাপ্রশাখা। কোনো ডালে দুটো বুলবুলি নাচে। আবিদুর দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে। টিনের নীল দরজা। তার শিখরদেশে কে যে লিখে রেখেছে ‘সুখে থেকো’। বাড়ির নাম। সে যখন ওইদিন ব্যর্থ ফিরে আসে, মন বলে বন্ধু তুমি সুখে থেকো। অনুসূয়া আজ নিশ্চয়ই সুখে আছে। আবিদুরের দিনকাল কেমন কেটে যায়? সুখে তো? সে জানে না।

আবিদুর অন্য কথা ভেবে নেয়। অনেকদিন বটতলি যাওয়া হয় না। কেমন আছে সেখানের পরিবেশ? বাড়িঘর আর মানুষজন? এতদিনে শহর অনেক বদলে গেল। অব্যবহৃত পরিত্যক্ত ফাঁকা জায়গা বিবিধ মাঠ-গলি-পুকুর-ডোবা নেই। সেখানে নতুন নতুন বাড়িঘর। পুরোনো বাড়িঘর ভেঙে মাল্টি-স্টোরিড বিল্ডিং। সে-সব অনেক উঁচু আকাশ স্পর্শ করে যায়। মানুষের কথাবার্তা হাঁটাচলা অচেনা লাগে। রাস্তাঘাটও বদলে গেল। যেখানে-সেখানে বিশাল শপিংমল-সুপার মার্কেট। সন্ধেয় নিয়নের আলোয় চকচকে ঝলমল। একসময়ের নিরিবিলি রাস্তায় নিত্য যানজট। আশপাশে সবকিছুই নতুন। মানুষজনের নতুন চেহারা। আবিদুর শুধু সেই পুরোনো মানুষ। সে অতীতের বালিয়াড়িতে হেঁটে যায়। কখনো সেই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোয় ফিরে যেতে মন আনচান করে। কীভাবে যায়? তখন শেষ-বিকেলের মোলায়েম বাতাস জানালা গড়িয়ে স্পর্শ দিতে থাকে। মিটিং শুরু হতে দেরি নেই। অনুসূয়ার কথা আবার মনে পড়ে। এখনো কি তেমন আছে? কত দিন চলে গেল, এরপর পুনরায় দেখা, কত কথা জমে আছে; তার মনে কী? আজ যে আকস্মিক, একেবারে অভাবিত কথা হলো চেনা পথরেখায়। আজ দেখা হতে পারত, কিন্তু…হলো না। আহা! আবিদুর কেন মোবাইল নম্বর নিল না? আজও মনভোলা সব ভুলে দিগন্তরেখায় কী খুঁজে ফেরে?

বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত আট সাড়ে আট। আবিদুর বড় ক্লান্ত। মিটিং-এ ক্রস চেকিং হয়েছে অনেক। টিমলিডার আনস্পেন্ট ফান্ডের ব্যাখ্যা দিতে পারে না। তার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। আবিদুর কি সকল কাজের দায় কাঁধে নিয়েছে? এসব অযোগ্য-অপদার্থ মানুষজন বড় বড় পদে বসে থাকে কেন? সরকারি দল করার ক্ষমতা। এখন তাকে রি-প্লানিং-এর জন্য সময় দাও, বকবক শোনো; মেজাজ খিঁচড়ে উঠে তার। পৃথিবী এমনই, একজন খেটে মরে…আরেকজন সুখ করে। একজন মজা মারে, পাপ জমায়; অন্যজন সাফ করে। গোবিন্দ যেমন শেষমেশ রুবির সকল দায় কাঁধে তুলে নেয়। সে কি মারধর! আবিদুর দূরে দাঁড়িয়ে থাকে। মানুষের নির্দয় নিষ্ঠুরতা আর প্রতারণার গল্প কম দেখা হয়নি। তার মনমেজাজ খারাপ হতে থাকে। কখন মিটিং থেকে বেরোতে পারবে? চঞ্চল অস্থিরতা চারপাশ। সরকার কেন যে এসব প্রকল্প প্রাইভেট সেকটরে দেয় বোঝা মুশকিল। বড় ঝামেলার কাজ। ইত্যাদি হাজার ভাবনার মধ্যে মোবাইলে ডাটা কানেকশন অন করে সে। কোনো বার্তা নেই। কোনো নোটিফিকেশন। অনুসূয়া অফলাইন। আবিদুর ইনবক্স লেখে, ‘যেতে পারলাম না রে। আকস্মিক মিটিং। কাল যাব, যদি তুই বলিস। আর মোবাইল নম্বর দে।’

নমিতা চোখের পলক না ফেলে স্টার জলসা দেখছে। কে আপন কে পর। জবার বুদ্ধি আর তন্দ্রা সেনের শয়তানি কূটকচাল জমজমাট। আজ আবিদুর প্রায়শ যেমন দু-একটি মন্তব্য করে বসে, কিছু বলে না। নমিতার পছন্দ-অপছন্দ তার নিজস্ব। আনন্দ নিক সে। সারাদিন স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়ে সামলানো বড্ড ভেজাল। জটিল কাজ। অ্যানি ঘুমিয়ে পড়েছে। সে বিছানার মধ্যখানে শুয়ে থাকে। আবিদুর আর নমিতার মধ্যে সংযোগ অথবা দূরত্ব। কোনো কোনো রাত নমিতাকে বুকের মধ্যে টেনে নেওয়ার সুযোগ আসে। আজ সবকিছুতে ক্লান্তি ধড়ফড় করে যায়। কোথায় যে কী হারিয়ে গেল অথবা পেয়েও অপ্রাপ্তির লেশ, কোনো কাজ শেষ হয়নি, কিছুতেই হয় না; জটিল ভাবনায় অস্থির মন-চঞ্চল। নমিতার সবদিকে দৃষ্টি।

‘কি ব্যাপার শুয়ে পড়লে যে! যাও ফ্রেশ হয়ে নাও। তোমার জন্য পুডিং করেছি।’

‘আবার! সেদিনই তো করলে। ওসব খেতে ভালো লাগে না। কেমন ডিম ডিম আঁশটে।’

‘আ রে বাবা আজ চকোলেট পুডিং। আঙুল চাটতে থাকবে বাছাধন।’

‘সে তো বটেই! আমি তো চাটারই দলে কি না।’

‘হি হি হি! যাও তো হাত-মুখ ধুয়ে এসো। আর শোনো এখন আর চা খেয়ে দরকার নেই। চা খাওয়ার সময় নয়।’

নমিতার মনমেজাজ ভালো। এমনিতেই সবসময় শান্ত চুপচাপ। তার স্বভাব। জীবনকে সহজভাবে নেওয়ার ক্ষমতা থাকলে কোনো হতাশা-দুঃখ-কষ্ট থাকে না। আজ নাটকে জবার দিন। তন্দ্রা সেনের গালে থাপ্পড়। নমিতা এনজয় করে বলা যায়। সে কেন যে এসব দেখে কে জানে। মানুষের মন-মানসিকতা কুটিল করে ছাড়ে। আবিদুর আজ সবকিছুতে উদাসীন। কোনো ক্লান্তির রাজ্যে এগিয়ে যায়। মনের কোনায় কোনো অতীত দেশের আবাহন।

রাতে ভালো ঘুম হয় না আবিদুরের। এপাশ-ওপাশ করে সময় কাটে। তারপর রাতের কোন্‌ সময়, হয়তোবা মধ্যরাত, কোথাও কোন্‌ দূরে লাউডস্পিকারে বাঁশির ধ্বুন ভেসে আসে। তন্দ্রাঘোর দু-চোখ দূরাগত সুরে অকারণ বিষাদ ডেকে নেয়। আবছায়া আলোয় নমিতার পাশে অ্যানি ঘুমিয়ে থাকে। নমিতার আলতো ঘুম। পাশ ফিরে আবার মিহি ছন্দ ছড়িয়ে দেয়। আজও দুটো পা কুণ্ডলিত ছোট শিশুর মতো ঘুমোয়। মেয়েকে জড়িয়ে রাখে। আবিদুরের ভালো লাগে। নমিতা তাকে খুব ভালবাসে। আবিদুর ভাগ্যবান। তবু কোন্‌ অস্থিরতার বাতাস রাতের কানাগলি হাতড়ে বেড়ায়? সেই রাত কেন অতীত-দিনকাল আর চেনা-অচেনা স্মৃতি পথরেখায় গোলকধাঁধা হয়ে যায়? গতকালও তো এমন ছিল না। আবিদুর মোবাইল হাতে নেয়। ডাটা কানেকশন অন করে। মোবাইল টুং টুং শব্দে জানিয়ে দেয় প্রত্যাশিত বার্তার জবাব। অনুসূয়ার অভিযোগ না কি অভিমান?

‘তুই আসবি না জানতাম। অথচ দেখ্‌ তোকে দেখতে খুব ইচ্ছে করে। নম্বর দিলাম। দুপুরে কল দিস।’

এই একটি কথায় কী স্মৃতিকাতর মন-কাঙাল আবেগ, কী গভীর আকাঙ্ক্ষা লুকিয়ে থাকে; নিজেকে সামলাতে পারে না আবিদুর। মন বিবশ স্মৃতির গহিনে আরও একবার হেঁটে যেতে চায়। চোখের সামনে কলেজ ক্যাম্পাসের কৃষ্ণচূড়া লালে লাল দুপুর, নিরিবিলি লন-টেনিস গ্রাউন্ড, কাফেটারিয়ার জেসমিনের ঝাড় আর বাতাসের মৃদু দোলায় মন স্পর্শ করে যাওয়া সময়কাল লাফিয়ে নেমে আসে। বটতলির সেই টিনশেড বাড়ি। সে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। সেখান থেকে আঙিনার ঈশান কোনে পেয়ারা গাছ দেখে। তার শাখাপ্রশাখা সবুজ পাতা বাতাসের ঢেউয়ে দুলে দুলে স্বাগত জানায়। কয়েকটি চড়ুই কিংবা শালিক ডালে ডালে নাচে। আবিদুরের দৃষ্টিসীমায় অনুসূয়া। ফরসা উজ্জ্বল এক মেয়ে, কপালে লাল কিংবা নীল রং ছোট্ট টিপ, নোজপিনে চুনিপাথর চকচকে বর্ণিল আলোর ছটা; সেদিনের সেই বিকেলবেলা। দরজার ওপাশে। সে খুব আস্তে করে বলে, –

‘আয়।’

‘স্যার কি রেওয়াজে?’

‘বাবা ব্যস্ত। আবিদ চা খাবি?’

‘খাব।’

আবিদুর তার পেছন পেছন হেঁটে দক্ষিণের ঘরে গিয়ে বসে। পশ্চিম জানালা গলিয়ে আলোর লুকোচুরি। বেডের একপাশে হারমোনিয়াম। লতা-ফুল-নকশি আঁকা বিছানার চাদর। টেবিলের উপর বইখাতা। এলোমেলো সুন্দর। কুলঙ্গিতে সরস্বতীর ছোট বিগ্রহ। পদ্মফুলের উপর যেন অনেকদিনের চেনা কেউ বসে থাকে। সে-সব থেকে দৃষ্টি ঘুরে আঙিনায় নেমে যায়। পুবে সীমানা প্রাচীর ঘেঁষে কতগুলো দোপাটি গাছ। মাথাউঁচু উঁকি মারে আকাশে। বাতাসে দোল খায় ডালপালা পাতা। এখনো ফুল ফোটেনি। একদিন মেলে দেবে লাল-গোলাপি বাহার। এরমধ্যে অনুসূয়া এসে দাঁড়ায়। ট্রেতে চিনেমাটির কাপ, তার মধ্যে স্বচ্ছ চা, একটি লবঙ্গ আর আদাকুচি তলায় ডুবে চোখ মেলে তাকিয়ে আছে। কী কথা তার সাথে? আবিদুর চোখ রাখে অনুসূয়ার গভীর চোখে। কী কথা হয়? সেই কথা হয় না। কলেজের বিবিধ পাঠ শেষে অন্যান্য সাধারণ গল্প-আলাপ। হারমমোনিয়ামের কোন্‌ রিডে সা শুরু হয়ে কোথায় নি শেষ? উদারা-মুদারা। রাগ-অনুরাগের শব্দরেখা। আবিদুরের আবেশ-মুগ্ধ হৃদয়। কবিতার ভাবাবেগে ভারাক্রান্ত দু-চোখের মণি। মন থেকে দুটো চরণ ঠোঁটে আসে না। অনুসূয়া কি বোঝে? আবিদুর কিছু বলতে আসে। তার কথা ফুরিয়ে যায়।

‘অনুসূয়া আজ তবে উঠি?’

‘এখনই যাবি? আচ্ছা আয়।’

আবিদুর রাস্তায় নেমে পুনরায় আরেকবার ছোট দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দেয়। আজও বলতে পারল না। আজও সাহস হলো না তার। অনুসূয়া কি কিছু বোঝে না? সে ছোট ছোট দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কোথায় ফিরে যায়? আবার কোনো একদিন। সেদিন ঠিক বলে বসবে। সেই কথা আর বলা হলো না। দিন চলে যায় দিনের ভেতর, খুব গভীরে; ফিরে আর এলো না।

আজ আকাশ মেঘজল থই থই। উত্তর-পশ্চিম কোনের উপর-নিচ ধূসর-কালো-সাদা মেঘে ছেয়ে আছে। সেই সঙ্গে হালকা বাতাসে মিশে আছে অদ্ভুত হিম হিম ঢেউ। আকস্মিক দুপুর থেকে চলে সাজ সাজ খেলা। মেঘের সঙ্গে কয়েকটি চাতক ঘুড়ির মতো ডানা ঝাপটে নেচে বেড়ায়। শিস দিয়ে ডেকে ওঠে, ‘ফুটুক জল’। আবিদুর রিকশা থেকে এসবই দেখে নেয়। এমন মেঘে বৃষ্টি কখনো হয়, কখনো হয় না; কে জানে কী হয়। এই কয়েকদিন অফিস ফাঁকি দিয়ে বেলা চারটেয় বের হয়ে আসছে। এই নিয়ে পঞ্চমবার। অথবা কতবার মনে নেই। কে যে মনের অন্তরালে ডেকে যায়, হায় কতদিন দেখা হয় না! দেখা হলে কত কথা, কতটুকু না বলা কথা, শেষ হতে হতে শেষ হয় না, এসে পড়ে ওঠার সময়, তবু মনে হয় আর একটু থাকা হোক; সে আর হয় না। যতক্ষণ মন আবেগের কিশোরবেলা, বেভুল পথে হেঁটে যায়, কুড়িয়ে রাখে আনন্দ-বেদনা-সুখ, কিছু ভুল দীর্ঘশ্বাস, জীবনের ইতিকথা। সেদিন বিকেলের অস্তরাগে যখন আরও একবার প্রথম মুখোমুখি হয়, সময় থমকে দাঁড়ায়; অতীত আর বর্তমান বুঝি কবিতার ছন্দের মতো মুখোমুখি আরও একবার, একে অপরকে দেখে নেয়, অবিশ্বাস্য কেউ কাউকে কোনোদিন বুঝি দেখেনি, স্বপ্ন বা পুরাতন গল্পবইয়ের চেনা-অচেনা গন্ধে হারিয়ে যাওয়া; কোনো কবিতার মায়াময় আবেশ চোখের পাতায় ভর করে। আবিদুরের বুকের গহিনে কেউ ডেকে ওঠে ‘অনুসূয়া…অনুসূয়া’। নদীর ওপার থেকেও কি প্রত্নতাত্ত্বিক কোনো সংগীত ভেসে আসে? আবিদুর জানে না। সে বুঝতে পারে না। কোনো বোধহীন সত্তা উজ্জ্বল দিনকালে হারাতে হারাতে, খুব চেনা সুরে মত্ত হতে হতে পুনরায় নিজেকে খুঁজে নেয়। অনুসূয়া যেন কলেজের সেই করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে। আবিদুর লন টেনিস গ্রাউন্ড থেকে মৃদু পায়ে হাঁটতে হাঁটতে বারান্দায় ওঠে। আর খুব মোলায়েম জিজ্ঞেস করে বসে, –

‘অনুসূয়া কেমন আছিস?’

অনুসূয়ার পরনে আকাশনীল শাড়ি আজ। সেই রং টিপ। চকচকে নোজপিন। তাকে কি সামান্য ভারী দেখায়? সেইসঙ্গে সোনালি ফ্রেমে জলরং গ্লাস। একটু অন্যরকমই বোধহয়, অথচ মুখছবিতে কত দিনের চেনা পরিচিত হাসিরেখা মনে করে দেয়, সে তেমনই আছে; মাঝখানে যোগাযোগহীন কেটে গেছে কতগুলো বছর। আবিদুর রিকশা থেকে নেমে আগের মতোই কি মন্ত্রমুগ্ধ এগিয়ে যায়? কে জানে, তার বোধ নেই; মনে হয় আজও কলেজের চত্বর কৃষ্ণচুড়া লালে লাল। এপ্রিলের কড়া রোদ মাথার উপর। দম নিয়ে থেকে থেকে বাউরি বাতাস। হায় দিন চলে গেছে দিনের গহ্বরে! আর এতদিন পর আবার দেখা হয়ে গেল। তখন বটতলি মোড়ে নমিতা প্রগাঢ় হয়ে আসে। সারাদিন তাপবাহের পর মেঘজল হালকা বাতাস ছেড়ে দিয়েছে। সময় হয় দু-জনে কাছাকাছি আসবার। অনুসূয়া বলে, –

‘সেই কতদিন পর বল তো? আবার যে দেখা হবে কল্পনাও ছিল না।’

‘কেন? এমন করে বলছিস কেন?’

‘দুষ্টুমি করলাম। তারপর বল তুই কেমন আছিস?’

‘যেমন দেখছিস।’

‘বাব্বাহ্‌! এমন করে বলছিস কেন? এতদিন পর তোর অনেক পরিবর্তন হয়েছে রে।’

‘সময় তো বসে থাকে না অনুসূয়া। সময়ের সাথে সাথে আমরাও বসে নেই।

‘ঠিক। কত বছর পার হয়ে গেল। মনে হয় এই যেন দু-চারদিন আগের ঘটনা।’

অনুসূয়া কি বাতাসে ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দেয়? কোনো কোনো নিশ্বাস পতনের নেপথ্যে কাহিনি লেখা থাকে। আনন্দ-বিষাদ কিংবা স্বপ্নদোলার অচেনা গল্প। যে গল্প কেউ জানে না। কোনো মলাটের মধ্যে থাকে না। মানুষের চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যায়। আবিদুরের নিজের একান্ত গল্প ছিল। সেই গল্প কি হারিয়ে গেছে? তখন কত দৃশ্যছবি ভেসে ওঠে। অনুসূয়ার বিয়ে হয়ে গেল। আবিদুরের কলেজ উদাস চত্বর। একটি মুখছবি দেখার জন্য কত সকালে আসে। সেখানে আর কোনো তাড়া নেই, প্রতীক্ষা নেই; অবুঝ কেউ তবু মনের গহিনে ভেবে নেয় একদিন দিন ফিরে আসবে। কোনো কোনো ফেরা আনন্দের। কোথাও বিষাদ বেদনা জাগে। তার বুকে কী? আবিদুর কিছু বোঝে না। অনুধাবনের শক্ত বা কোমল কাঠামোয় মন নিবিষ্ট নেই। আজ অচেনা-অদ্ভুত স্মৃতিকাতর সময় বুঝি হারিয়ে যাওয়া এক সময়কে খুঁজে পেতে অকারণ কিছু বোঝে না, বুঝতে চায় না; আবদার করে বসে। বোধকরি তাই আনমনা এদিক-ওদিক তাকিয়ে কিছু দেখে যায়। নিজেকে এড়িয়ে যাওয়া ছাড়া আর কী পারে? পুবে কোনো ক্ষেত, টলটলের জলের উপর সবুজ ধানচারা জেগে থাকে, তার পেছনে ঝোপঝাড়; সেখানে শত শত জোনাকি আলো জ্বেলে কোন্‌ স্বপ্নে মাতোয়ারা হয়। প্রিয় কারও পথের দিশা দেখাতে একে একে আলো ছড়িয়ে রাখে। সেই আবছায়া আলোয় বুঝি পরস্পরের দিকে তাকানো যায়। আবিদুর স্বপ্নের ঘোরে ভেসে চলে। তার হাতে জেটব্লাক ক্লিপফাইল। একটি ডায়েরি। সেখানে প্রতিদিন ক্লাস লেকচার অনুসরণের নোট, ভাবনার নকশিআঁকা; কখনো শরতের আকাশে ভেসে বেড়ানো মেঘের কিছু কাব্যকথা। একটি কবিতার বই। স্বপ্নময় রাত অনুষূয়া। এই তার হারানো সময়। ফেলে আসা দিনকাল।

‘তোকে কিন্তু খুব সুন্দর লাগছে।’

‘বলিস কী? আমি তো ইয়ে হয়ে গেছি। আর তুই…সেই কিউপিড। হি হি হি!’

‘চল কোথাও বসি।’

‘কোথাও কি? চল ফ্ল্যাটে চল।’

‘তোর কৃষ্ণ আবার কী মনে করবে?’

‘আ রে সে শালা নেই। সৈয়দপুর গেছে। মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ। আজ এখানে তো দু-দিন ওখানে।’

‘তাই।…এখনো গান করিস?’

‘সে কবে হারিয়ে গেছে।’

‘আহা! তোর সেই গাওয়া রবীন্দ্র সংগীত, সখী ভাবনা কাহারে বলে; আজও কানে বাজে।’

‘আবিদ তুই আগের মতোই আছিস। এবার তোর কথা বল। চল এই তো সামনেই বাসা।’

‘আজ বরং এদিকে চায়ের দোকানে বসি। চা খাই।’

‘তোর বাড়ির রাস্তা মনে আছে?’

‘কেন থাকবে না? নীল দরজা। সুখে থেকো।’

‘সেই তো। তোর সব মনে আছে দেখি। এখন কিন্তু ওসব নেই। ফ্ল্যাট হয়েছে। নিচ আর উপরের স্পেস ভাড়া। সেকেন্ড ফ্লোর আমার।’

‘স্যার কেমন আছেন?’

‘বাবা তো দু-বছর হয়…।’

‘দুঃখিত। স্যারের কথা কখনো মনে পড়ে। অমন গুণী মানুষ।’

‘আমার কথা মনে পড়ে না?’

‘মনে পড়ে খুব।’

‘শালা মনে পড়ে! কোনোদিন খোঁজ নিয়েছিস?’

‘তুই খোঁজ নিয়েছিস?’

‘আমি তো কলকাতায় ছিলাম ক বছর। দাদা-বউদি সেখানে থেকে গেল। এখানের বাড়ি-জমি সে অনেক ঝামেলা।’

‘তাই এলাকায় কেউ কিছু বলতে পারে না।’

‘সত্যি রে তুই খোঁজ করেছিস।’

তারপর চায়ের দোকানে টুং টাং শব্দের সঙ্গে মান-অভিমান থেমে গেলে, কখনো অতীত কখনো বর্তমান কথামালা মিলেমিশে একাকার। বদ্ধ ঘরের গুমোট গরমের সঙ্গে এলোমেলো ভাবনা। আবিদুরের বুকে জমানো হাজার কথা, কী কী বলে অথবা শোনার জন্য উন্মুখ, মন বুঝি খেই হারাতে থাকে। সে এমন কেন? কখনো ঘুলঘুলি জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। ওপাশে জোনাকির সংখ্যা বাড়তে থাকে। তারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যায়। আবিদুর স্বপ্নদোলায় জাদু কার্পেটে আকাশে ভাসে। সব ঠিক আছে, কিছু ঠিক নেই; সময়ের শুধু হেরফের। অনুসূয়া তেমন চঞ্চল ছটফটে নেই। সেই ধারালো চোখ। কখনো কোমল দৃষ্টি। কী কথা ওই চোখে? আবিদুর বলি বলি করে বলার কথা হারিয়ে ফেলে। আর বলার সময়। একসময় কথায় কথায় সময় আসে ফিরে যাওয়ার। তারা চা দোকানের বাইরে নেমে আসে। আবিদুর আকস্মিক লক্ষ্য করে অনুসূয়ার নাকের ডগায় হালকা স্বেদবিন্দু। একদা কলেজের বারান্দায় সুর্যের আলোয় চকমকি পাথর। সে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে। পুড়ে পুড়ে যায়। আজও কি তেমন আগুন জ্বলে ওঠে? উন্মাতাল হলকা বুকে ধেয়ে আসে? কে জানে। ফেরার পথে হয়তোবা কোনো পরিণতি অথবা শূন্যতার দোলাচল স্মৃতি টেনে নেয়।

‘চলি রে।’

‘আবার আসবি তো আবিদ? আসিস। আজ খুব ভালো লাগল।’

‘আসব।’

‘মোবাইল করে জানাবি।’

‘আচ্ছা। ভালো থাকিস।’

‘ওকে।’

আকাশের পশ্চিমে মেঘ স্থির হয়ে আছে। পুবে ধুপছায়া বিকেল। বাতাসে হালকা সবুজ-স্পর্শ। আবিদুর রিকশায় সামনে-ডানে-বায়ে অলস তাকিয়ে থাকে। অনেকক্ষণ আড্ডা দেওয়ার মনমেজাজ। অফিস থেকে আগে বের হয়ে আসবার সুযোগ পেয়ে গেল। সেদিন ছুটির দিন ‘সুখে থেকো’ দেখে এসেছে। মোড়ের মধ্যখানে প্রাচীন বটগাছ। নিজেকে ছাতার মতো ছড়িয়ে রাখে। আশপাশে দু-চারটি চা-স্টল। মুদি দোকান। দক্ষিণমুখী টিকিট কাউন্টার এক। দিনাজপুর-পার্বতীপুর বাস সার্ভিস। পুবে কোনো সীমানা প্রাচীর ঘেরা জায়গা। তার পশ্চিম দেয়াল ঘেঁষে কয়েকটি পান-সিগারেটের টং দোকান। এসব চেনা-অচেনা বা পরিবর্তিত নতুন দেখতে-দেখতে পায়ে হাঁটা পথ। আবিদুর হেঁটে যায়। ফ্ল্যাটের সামনে একটুকরো ফাঁকা স্পেস। সবুজ ঘাসের কার্পেট। অনুসূয়া সেখানে দাঁড়িয়ে। সেই টিন দরজা নেই। দেয়ালের একপাশে ‘সুখে থেকো’ হারিয়ে গেছে। সেখানে এখন মেরুন রঙের চারতলা ফ্ল্যাট। বেশ বড় পরিসর। ইট-পাথরের নিরিবিলি আবাস। উত্তর দেয়ালে অনেক যত্নে আঁকা ‘সুখে থেকো’। সামনে দু-পাশে টব পাতাবাহার। সেদিন এইসব দেখতে দেখতে কত কথা কত দৃশ্যছবি মনে পড়ে যায়। তারপর অনুসূয়ার পেছন পেছন সিঁড়ি ভেঙে উপরে ওঠা। অনুসূয়া ভারী দরজার লক খুলে রুমের আলো জ্বেলে দেয়। আবিদুরের বিস্ময়। শৌখিন আর দামি আসবাব চমৎকার সাজানো-গোছানো। আবিদুর এইসব দেখতে দেখতে কেন জানি দোপাটির গাছ খূঁজে চলে। অন্তত লাল মাটির টবে নৃত্যরত একটি। সে কি আর আছে? একদা সেগুলো ঘরের বাহির দেয়াল ঘেঁষে মাটির বুকে পাশাপাশি ছিল। কখনো বৃষ্টিধোয়া পাতা আর লাল-নীল-গোলাপি ফুল বাতাসে আন্দোলিত হয়। কারও মনে দোলা দেয়। সেই কথা জানে না কেউ। অথবা যে জানার কোনো কথা বলে না। এখন রেলিং-এর ধারে বিশাল টবে ফণিমনশা-ক্যাকটাস। ঘরের কোনায় পাম আর পাতাবাহার। ড্রইংরুমের পশ্চিম দেয়াল জুড়ে দুই শত পনেরো দশমিক নয় সেন্টিমিটার সনি ব্রাভিয়া এলইডি। সিলিং থেকে বেশ নিচে ওয়াল-মাউন্টেড এসি। ঘরের মধ্যে হালকা হিম হিম বাতাসে সৌরভ ভাসে। অনুসূয়া রিমোট হাতে নেয়। টিভিতে ক্রিকেট খেলা। আবিদুর বলে, –

‘ওটা বন্ধ কর।’

‘কেন রে তুই তো খেলা ভালো বুঝিস।’

‘একসময় ছক্কা-চার মারার নেশা ছিল, এখন নেই।’

‘চা না কফি? অথবা হট কিছু?’

‘হট? তুই এসব খাস না কি?’

‘কখনো কখনো।’

‘শালা!’

‘যবে থেকে তুই চলে গেলি। হি হি হি! বোস চা করে আনি। দু-মিনিট।’

অনুসূয়া পাশের রুমে চলে গেলে এই অবসরে একটু তাকাবার সময় আসে। আবিদুর দেখে নেয় প্রাচুর্য। বিলাসি জীবন। ইতিহাস আর প্রত্নতাত্ত্বিক উপসংহার। ঘর পেরিয়ে পরদার ফাঁকে দক্ষিণে দৃষ্টি চলে যায়। সেখানে দুটো বুকশেলফ। বই। অনুসূয়ার বই পড়ার অভ্যেস তবে এখনো আছে। লিভিং রুম। বিশাল খাটের এক কোণ বাতাসে উঁকি মেরে যায়। অনেক দামি কাঠ। চকচকে লালচে-খয়েরি আলোর প্রতিফলন। আবিদুর কী করল জীবনে? বিশে বিদ্যা ত্রিশে ধন…না হলে ঠনঠন। ছত্রিশ পেরিয়ে সাঁইত্রিশে পা রাখবে আর দেড়-দুই মাস পর। কিছুই হলো না তার। বিয়েও করল দেরিতে। অ্যানির বয়স সবে পাঁচ। সেই মেয়ে বড় হতে হতে বুড়ো হয়ে যাবে আবিদুর। তখন হয়তো রিটায়ার লাইফ। কীভাবে কাটবে জীবন? চলতে-ফিরতে পারবে তো?

‘কী রে অত কী ভাবছিস?’

আবিদুর কি উদাস নিশ্বাস ছেড়ে দেয়? সময় আর দিনগুলো দেখতে-দেখতে চলে গেল। নিজের কথা আর কেন? নমিতা এখন কী করে? নিশ্চয়ই তার প্রতীক্ষায়। এই কয়েকদিন যতদিন অনুসূয়ার সঙ্গে হারানো আর বর্তমান এইসব দিনকাল-সময় কেটে যায় কিছু মনে থাকে না। কেন এমন হয়? মন কেন হারানো অতীতে হেঁটে বেড়াতে ভালবাসে? পুরোনো দিন যে কিছু দেয় না, শুধু অস্থির বাতাসে বিষাদ ঢেউ; মনের সুখ কেড়ে নেয়। সে তো অসুখী নয়। নমিতা তাকে খুব ভালবাসে। সেও।

‘কী হলো চা দিয়েছি। কী ভাবছিস?’

‘হারানো দিনের কথা মনে পড়ে।’

‘এখনো কি কবিতা লিখিস?’

‘সময় কোথায়? Inside everyone there is Poet who died young হা হা হা!’

‘সেই তো কত দ্রুত সময় চলে যায়। তুই তো তবু জীবনকে সাজিয়ে নিয়েছিস। আমার চারিদিকে অন্ধকার।’

‘মানে? তোর তো প্রাচুর্যময় জীবন। এত চমৎকার ফ্ল্যাট। শৌখিন আসবাব। ডিটিটাল লাইফ। কৃষ্ণের মতো হাজব্যান্ড। হতাশা কিসের?’

‘বাইরের চাকচিক্য দেখে কারও সুখ-অসুখ বোঝা যায় না রে।’

‘বেশ ডায়লগ দিলি।’

‘তুই তো আগে সিরিয়াস ছিলি। এখন খুব সোলো রে।’

‘না রে সিরিয়াস হলাম। বল তোর সাবিত্রি-সত্যবান কাহিনি।’

‘ঠাট্টা নয় আবিদ।…মেয়েদের পূর্ণতা কোথায় জানিস?’

আবিদুর সত্যি এবার সিরিয়াস হলো। আজ চায়ের কাপে আদা-লবঙ্গ নেই। গ্রিন টি-ব্যাগ। কমলার হালকা রং। অনুসূয়া আর আগের মতো নেই। সোনালি ফ্রেমের ওপাশে চকচকে দু-চোখের ওপারে কোনো বিষাদ খেলা লাফিয়ে নেমে যেতে চায়। আজ এত বছর পর, যে মেয়েটি একদা আহার-নিদ্রা-স্বস্তি কেড়ে নিয়ে অদ্ভুত স্বপ্নমায়া বাউন্ডেলে করে রেখেছিল, তার চোখে-মুখে আর দৃষ্টির প্রান্তসীমায় বুঝি অন্য কেউ অন্য একজন, আবিদুর হয়তো তাকে চেনে অথবা চেনে না। অনুসূয়া…অনুসূয়া। সে যেন আজ মায়াভ্রম।

‘আমি দুঃখিত অনুসূয়া। তোদের বিয়ে হয়েছে অনেক আগে। কম করেও পনেরো-ষোলো বছর তাই না? এতদিনে কয়েক জোড়া সন্তান হওয়া দরকার ছিল। কমপক্ষে দুটো। একটি ছেলে একটি মেয়ে।’

‘হচ্ছে না…হচ্ছে না। আর ক বছর পর তো, তুই তো জানিস, পিরিয়ড বন্ধ হয়ে গেলে মেনোপোজ জীবন।’

‘চিকিৎসা করাতে পারলি না? কেন কী কারণে এমন হচ্ছে? আমি খুব ব্যক্তিগত কথা বলে ফেললাম রে…সরি।’

‘আ রে রাখ, আমরা তো বন্ধু নাকি?’

‘বন্ধুর চেয়েও।’

‘আহ আবিদ! কোলকাতা-মাদ্রাজ পর্যন্ত যাওয়া হলো। এখন সব ভগবান।’

আবিদুর এরপর কী বলে? মানুষের অদ্ভুত জীবন, কেউই শতভাগ সুখী নয়; কোনো না কোনো উদাস বাতাস জীবনে ঢেউ খেলে যায়। তার মনেও তো কখনো শ্যাওড়ার শনশন বাতাসের অস্বস্তি জেগে ওঠে। নমিতা এত শান্ত কেন? নিরিবিলি মৌন উদাস। একটু চপলতা একটু চাঞ্চল্য একটু খুনসুটি কিছু নেই। জীবন যেন সবকিছু নিবেদনের বেদিতে ছড়িয়ে রাখে। আবিদুর কখন কী চায় কী ভাবে কিছু বুঝতে পারে না। অথবা কে জানে কী। সে কি অনুসূয়ার মতো একটু কঠিন একটু চপল হতে পারে না? একটু অন্যরকম। আবিদুরের বড় পানসে জীবন। একদিন প্রখর রোদের মধ্যে ক্লাস শেষে অতগুলো ছেলেমেয়ের সামনে কী বলেছিল অনুসূয়া? আবিদুর ভুলে যায়নি। সে কি ভোলা যায়? আকস্মিক তার চোখ-মুখ লাল হতে শুরু করে। সে ঘরের উদাস হাহাকারের মধ্যে কিছু বলতে পারে না। কী বলবে? এখানে তো কোনো ভাষা নেই। অনুসূয়া বলে, –

‘একদিন তোর বউকে নিয়ে আয়। দেখতে ইচ্ছে করে।’

‘আচ্ছা। তুই যাবি না? আজ তবে উঠি রে।’

‘এখনি যাবি?’

‘তোর মন খারাপ করে দিলাম।’

‘কখন? দূর এসব নিয়ে মন খারাপ করতে নেই।’

আবিদুর রাস্তায় তাকিয়ে থাকে। আকাশের মেঘ। আকস্মিক দু-একটি বড় ফোঁটা নেমে আসে। বাতাস ছেড়েছে খুব জোর। বিশ্বরোড পেরিয়ে যেতে যেতে আকাশের মধ্যভাগে কোনো মেঘ নেই। উজ্জ্বল সূর্যের আলোয় ভেসে যায় চারপাশ। আজ মোবাইল করেনি। এই নিয়ে চার-পাঁচদিন যে কয়েকদিন এলো, খোঁজ নিয়েছে, মোবাইল কিংবা ফেসবুকের ইনবক্সে কতগুলো বারতা। সময়ের কথা ফুরোয় না। হাজী রুহুল আমিন কখনো পুবের টেবিল থেকে তাকিয়ে থাকে। কী ভেবে নেয় সন্দিগ্ধ দৃষ্টি? এইসব ভাবনার মধ্যে কখনো এই প্রশ্ন দোলা দেয়, যার জন্য বেরিয়ে এলো, সে কি ঘরে আছে? সেই যেমন কতবার ‘সুখে থেকো’-র নীল দরজা থেকে ফিরে চলে যাওয়া। সে-সময় বাইরে এপ্রিলের রোদ। গাছে গাছে হাজার ফুল। মনের ফুল ফোটে না। হাজার কবিতা ভাষাহীন কুঁড়ি থেকে যায়।

আবিদুর রিকশা ছেড়ে দেয়। এরপর হাঁটা রাস্তা। অনুসূয়া ফ্ল্যাটে ছিল। কারও প্রতীক্ষায় হয়তো ছিল না। সে খুব খুশি হয়। আবিদুর যেন অনেকদিন পর আটপৌর বেশে অচেনা কোনো জলপরি দেখে যায়। সে বাকহীন স্তম্ভিত। বুকের গহিনে বুঝি কলেজ চত্বরে হেঁটে যাওয়া কোনো দীর্ঘশ্বাস, কোন ছলনায় প্রতিধ্বনি তুলতে থাকে; আবিদুর বোঝে না। বিশাল ভারী দরজায় কলিং বেল চেপে ধরে প্রথম বিস্ময়। অনুসূয়ার নিরাভরণ চোখ। বিস্ময়ে উপচেপড়া হাসিমাখা মুখছবি।

‘তুই? বলিসনি তো।’

‘তোকে কি আগে থেকে বলে আসতে হবে? দেখতে ইচ্ছে করল, চলে এলাম।’

‘সকাল থেকে চোখ নাচছিল জানিস। কেউ আসবে যে আমার খুব প্রিয়।’

‘অনুসূয়া।’

‘আয় ভেতরে আয়। লাঞ্চ করেছিস?’

‘হ্যাঁ। তুই?’

‘এখন করলাম।’

‘কী রেধেছিস আজ?’

‘তুই খাবি?’

‘না রে।’

‘খাবি না যখন।…ঠান্ডা চলবে?’

‘সে চলে।’

তারপর বুকসেলফের বই দেখতে-দেখতে কিছু এটা-ওটা কথা বলতে বলতে সময় চলে যায়। কোথাও দূরে আশা ভোঁসলের গান বাজে। বটতলির কোনো চায়ের দোকান। আবিদুরের মন পড়ে থাকে অন্য কোথাও। সে বাড়ি থেকে বের হয়। অনেক দীর্ঘ গলি। সামনের বাড়িতে রেডিওগ্রামে গান বাজে। ওই বাড়ির দ্বিতীয় মেয়ে গান শোনে। কোনোদিন রাস্তায় দেখা হলে থমকে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ। কী কথা বলতে চায়? কী কথা তার সাথে? আবিদুর সবই বোঝে। মন বোঝে না। নিমনগর-বালুবাড়ি হয়ে হেঁটে হেঁটে অনেকখানি পথ চলে আসে। মহারাজের মোড় হয়ে বটতলি। অমিত স্যারের বাড়ি। তিনি বাসায় আছেন কি নেই কে জানে, আবিদুরের বুক জুড়ে এক মায়াবী মুখছবি। অনুসূয়া কি দরজা খুলে বের হবে না? কোনোদিন হয়। তার উজ্জ্বল চোখে দুষ্টুমি হাসি। সোনার চিকন চুড়িতে শেষ-দুপুরের রোদ সেতারের ঝংকার তোলে। আবিদুর এগিয়ে যায়। তারপর কী কী গল্প? তার কিছু সাজানো কিছু অগোছালো, যদি সবটুকু দুপুরের রোদ কিংবা শেষ-বিকেলের আলো হয়, মন কেন আলোকিত হয় না? অবশেষে সে বুকপকেটে জমানো সব কথা নিয়ে ফিরে যায়। এই তো ফিরে ফিরে আসা আর যাওয়া। কোনো কথা বলা হলো না। আজ যেন সেই প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিকথা উঠে আসে। বড় অসময়ে বড় ভুল সময়। মনের বুকশেলফে সেই গল্প-কাহিনি নেই। আজ মন বড় পাগল। গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে একেবারে খুব কাছে এগিয়ে যেতে ইচ্ছে হয়। অনুসূয়ার স্পর্শ পেয়ে যায় যায়।

‘তোর বরের সাথে দেখা হয় না। যেদিন আসি কোনোদিনই না। কোথায় তিনি?’

‘কেন দেখিসনি?’

‘সেই একবার এলি বিয়ের পর। আমরা রেশমি জিলেপি আর চা খেলাম। বৈশাখি মেলা।’

‘তোর বেশ মনে আছে দেখি।’

‘আমার মেমরি খুব শার্প জানিস তো।’

‘হুম! শুধু সাহস কম।’

‘মানে?’

‘চিন্তা কর। তুই আমাদের বাসায় আসতি। বলি বলি করেও কিছু বলতে পারলি না।’

অনুসূয়া এবার সরাসরি চোখে তাকায়। সোনালি ফ্রেমের ওপার থেকে রহস্যভেদী দৃষ্টি নিশ্চুপ কোনো ইতিহাস পড়ে নিতে থাকে। আবিদুর কী করে? সে কেন ভুল করে বসল? মন যে তার বেভুল পথে হেঁটে যেতে যেতে সবকিছু খুইয়ে ফেলে। তাকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। যাবে না…যাবে না হায়! কেন যাবে না? সেই কারণ আর কৈফিয়ত হয়তো জানা কিংবা অজানা, এড়িয়ে যায় কী করে? নিজেকে বড় নিঃস্ব লাগে তার। বুকের জমিন খাঁ-খাঁ শূন্য।

‘অনুসূয়া।’

‘হুম…আমাদের ভুল হয়ে গেল আবিদ।’

‘সত্যি আমার ভয় হতো, যদি প্রত্যাখান করিস।’

‘এখন এসব বলে আর কী হবে? তোর বউ তো খুব ভালো মেয়ে। তোকে নিশ্চয়ই খুব ভালবাসে।’

‘হ্যাঁ। নমিতা বড় ভালো।’

‘তুই ভাগ্যবান রে। আর আমার লাইফ দেখ…না থাক, তোর এসব না শোনাই ভালো।’

আবিদুর নিষ্পলক তাকিয়ে কোনো অতীত কোনো বর্তমান খনন করে যেতে চায়। অনুসূয়ার মনের গভীরে কোথায় কোন্‌ বিষণ্নতা, কোন্‌ দুঃখকথা, কী সেই কাহিনি জানতে ইচ্ছে হয়। এই কয়েকদিন কতবার দেখা, কত আলাপ, কোনোদিন তেমন করে, কে জানে তেমনভাবে নয়, আবিদুর কখনো তার দু-চোখে ডুব দেয়নি। আজ যখন একটু অবসর আর হারানো দিনের সেই বাতাস দোলা দেয়, অনুসূয়া থেমে গেল কেন? হোক না পুরাতন তবুও তো নতুন লাগে।

‘বল থামলি কেন?’

‘নারীর ঈর্ষা আর পুরুষের সন্দেহ।’

‘মানে?’

‘তুই একটু বোকাও রে।…এখনো গল্পের বই পড়িস?’

‘নাহ্‌। সময় পাই না। অবসর পেলেও বই টানে না। কখনো সোস্যাল মিডিয়াতে আড্ডা দিই। গল্পগুজব এইসব আর কি!’

বাইরের উজ্জ্বল আলো ম্লান হতে শুরু করেছে। জানালা দিয়ে যতটুকু দেখা যায় গোধূলিবেলা। আকাশপ্রান্তে কোনো রংধনু আলো ঝুলে থাকে। আবিদুরের মনের আকাশে সাতরং খেলা। এত কাছে নিবিড় কোনোদিন কি দাঁড়াতে পেরেছিল? কেন এত কথা মনে আসে? অনেক দূর মেঘের কাছাকাছি কয়েকটি চাতক চঞ্চল উড়ে বেড়ায়। তারা মেঘজলের স্পর্শ নিতে নিতে শিস দেয়। ফুটুক জল… ফুটুক জল। আবিদুরের বুক জুড়ে শূন্য পিপাসা। তার যে কী হয়, আচমকা ঘুরে দাঁড়িয়ে অনুসূয়ার ডানহাত হাতে টেনে নেয়। এমনই একদিন তার হাত চেপে ধরেছিল অনুসূয়া। তখন উজ্জ্বল রোদ। আশপাশে সহপাঠী কয়েকজন। অনুসূয়া সেদিন আগুনের মতো সেজেছে। মুখছবিতে দুষ্টুমি হাসি। তার নোজপিনে আকাশের সূর্য আছড়ে পড়ে। সে কী বলে যায়? আবিদুর সেদিন পারেনি। আজ খুব ত্রস্ত বুকে জড়িয়ে নেয়। তারপর মুখের কাছে মুখ, তৃষ্ণার্ত মন খুঁজে নেয় ভেজা ঠোঁট; অনুসূয়া নিজেকে গড়িয়ে দেয়। আলগোছে দু-হাতে ঢেকে নেয় চোখ। আজ লজ্জা নাকি নিবেদনের দিন? তখন খোলা থাই জানালার একপ্রান্ত বেয়ে একঝলক বাতাস ধেয়ে আসে। তার গহিনে মিলেমিশে একাকার প্রগাঢ় কণ্ঠের ফিসফিস গুঞ্জন।

‘আবিদ…অনেক দেরি করে ফেললি রে।’

‘অনু।’

আলোছায়া মৃদু অন্ধকারে দু-জন মানুষ পরস্পরকে বুঝে নেয়। চোখের উপর চোখ রেখে হারানো দিন, হারানো সময়, সময়ের এই ক্ষণ। বাইরের আকাশে পুনরায় ঝড়ো বাতাস। হালকা বৃষ্টি নেমে আসে। আবিদুর এতদিন পর কী পেয়ে যায়, যা ভুল পথে হেঁটে হেঁটে হারিয়ে ফেলেছিল, অথবা কিছু নয়, সময়কে মর্মে মর্মে গেঁথে নেওয়া; জীবন বুঝি জীবনের খেলা খেলতে থাকে। অনুসূয়া নিজেকে সামলাতে পারে না। কোনো প্রাচীন প্রাসাদের কোল ঘেঁষে পদ্ম দিঘি, বাতাসে আন্দোলিত গোলাপি ফুল, গোধূলির আলোয় মৃদু সুবাস ছড়াতে ছড়াতে রেখে যায় কবিতার ফিসফিস।

‘বড় দেরি করে ফেললি আবিদ। আমি যে তোকে খুব চাইতাম।’

‘আমাকে ক্ষমা করে দিস অনুসূয়া। আমার সাহস হয়নি।’

‘আমারও।’

অনুসূয়ার দু-ফোঁটা অশ্রুজল হাতে এসে পড়ে, সে বুঝি নোজপিনের সোনালি আভা, আলোছায়ায় চকচক করতে থাকে। আবিদুর হাজার বছরের কোনো স্বপ্ন বুকে গেঁথে নিতে নিতে কোন্‌ ভাবনায় ভেসে যায়। অনুসূয়া তাকে এত ভালবাসত কোনোদিন বুঝতে পারেনি। কেন পারেনি? সে বড় হতভাগা মানুষ। চোখের পাতায় বুঝি নেমে আসে মেঘজল।

তারপর সন্ধে শেষের আলোছায়া, তখন রাত গভীর হয়নি, বৃষ্টিধোয়া রাস্তায় মানুষজন নিজেদের হাজার কাজে ব্যস্ত থাকে; আবিদুর ঘরে ফেরে। নমিতা যথারীতি চা তৈরি করে রাখে। টেবিলের উপর ড্রাই কেক। আবিুদর কিছু বলে না। মন বুঝি মনের কথা শোনে না। তার এমন লাগে কেন? পৃথিবীর সকল বিষাদ গান বুকে বেজে যায়। মা-বাবার পছন্দে বিয়ে করেছিল। নমিতার মধ্যে কোনো শূন্যতা দেখেনি। ঝিনুক চোখের মধ্যে সবসময় অনুরাগ আর আস্থার পরিসর। আবিদুরের মন তবু পোড়ে। বছর-দু-বছর যেতে না যেতে অ্যানি এলো। আবিদুরের বেঁচে থাকার অনন্ত সাধ। কোন ত্যাগী মানুষ বুকের গহিনে বসেছিল কে জানে, অ্যানি তার সব। নমিতা ভোর সকালে ওঠে। একটি সংসারে হাজার কাজ। সবকিছু গুছিয়ে স্কুলে যায়। ফিরে এসে ক্লান্ত শরীর, একটু ফ্রেস হয়ে চা-নাশতা তৈরি করে। কোনো ক্লান্তি নেই। কোনো অবসাদ। তারপর টিভি অন করে বসে। সিরিয়াল কাহিনির গভীরে মিশে যায়। কখনো দু-চোখে আনন্দ কখনো বিষাদ। যেভাবে টিভি রংধনু ছড়িয়ে রাখে। আবিদুর এমন এক সন্ধে বা রাত পেল না যেখানে খুব আদরে বুকে গড়িয়ে পড়ে নমিতা। এমন এক সকাল নেই যে কিনা নিজেদের মধ্যে একটু খুনসুটি বাতাসে ছটফট ঢেউ তুলে যায়। নমিতা খুব সাধারণ বড় পানসে করে রেখে দিল জীবন আর বেঁচে থাকা। আজও তার হাতে রিমোট। শোকেসের উপর একুশ ইঞ্চি সিআরটি টিভি। আবিদুরের দিকে একপলক তাকিয়ে টিভি অফ করে উঠে যায় কিচেনে।

‘চা খাবে তো? অন্যকিছু?’

‘অনলি টি ডিয়ার।’

আবিদুর বাথরুমে গিয়ে শাওয়ার ছেড়ে দেয়। দেয়ালে হাজার জলছবি জলদাগ হামলে পড়ে। প্রমাণ সাইজ আয়নায় নিজেকে বড় শয়তান লাগে। আবিদুর এসব আর দেখবে না। মানুষের আসলে হাজার চেহারা। একক কোনো স্বরূপ নেই। এইসব নিয়েই জীবন-অস্তিত্ব-বেঁচে থাকা। হাজার চেহারার মধ্যে একটি চেহারা কোনোদিন কেউ দেখতে পায় না। সেই তার আসল রূপ। সে যখন আয়নায় দাঁড়ায়, সেটি কোনো শীতল প্রতিবিম্ব অথবা অন্ধকার মনের আয়না। আসল চেহারা ভেসে ওঠে। সে হাসে সে কাঁদে সে ভয় পায়। আজ যতটুকু আকাঙ্ক্ষা, পাওয়া না পাওয়ার সাধ, যাকে কিশোরবেলায় কত অবিশ্বাস কিংবা নিজের ভীরুতার হারিয়ে ফেলে, যে যখন ফিরে আসে, আর স্পর্শ করতে বড় সাধ হয়, সে পারে কি পারে না; বুক জুড়ে রেখে যায় শূন্য প্রলাপ। কেউ পেয়ে যায় অকারণ অভাবিত। এই পাওয়া না পাওয়ার মধ্যে তবু সে জেগে থাকে, স্বপ্নের মতো, যেন ঘুম থেকে জেগে কিছু আর মনে পড়ে না, সবকিছু জাদুমায়া, নিশ্বাসে বোঝা যায় স্পর্শ করা যায় না। এ কোন খেলা জীবন রেখে যায়? হায় অনুসূয়া! তুমি যে অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছ, একান্ত আপন; জীবনের স্বপ্নদোলা।

তারপর আবার একদিন কথা হয়। আবিদুর অনেকদিন বটতলি যায় না। পাঁচ দিন নিশ্চয় অনেকদিন নয়, তবুও মনে হয় কত বছর কত যুগ। অনুসূয়া ফেসবুকে কথা বলে। আবিদুর সেই আবাহন কী করে এড়িয়ে যায়? কোনোদিন শেষ-দুপুরের রোদে রিকশায় বটতলি নামে। প্রায় নির্জন-নিরিবিলি মোড়। সেই চায়ের দোকানে গান বাজে। নস্টালজিক বাতাস। আবিদুরের মনে অচেনা আকুতি জাগিয়ে চোখ ভেসে যায়। সে মোবাইল স্ক্রিনে প্রিয় নম্বর বের করে। প্রিয় একজন দূরে দাঁড়িয়ে কখনো ধীরপায়ে হেঁটে আসে। সোনালি ফ্রেমের ওপার থেকে চকচকে দৃষ্টি কিছু দেখে যায়। তার দু-চোখে প্রত্নতাত্ত্বিক হাসি। ঠোঁটের কোনায় রহস্যরেখা। অনুসূয়াও কেমন বদলে যেতে থাকে। আবিদুর এগিয়ে গিয়ে বলে, –

‘কেমন আছিস?’

‘ভালো। আয়।’

আবিদুর কোনোদিন ফ্ল্যাটের রুমে বসে। কখনো রাস্তায় কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে মনের সঙ্গে যত কথা। আজ দেখা না করলেই কি নয়? ভাবনাবিধুর মেঘমল্লার। পুবে দূরের ক্ষেতে শ্যালো মেশিনের জলঢেউ সংগীত। বাতাসের ভাঁজে ভাঁজে দুলতে দুলতে ভেসে আসে। বটতলির মোড়ে চায়ের দোকান। হারানো দিনের গান। মনে অদ্ভুত উন্মন ঢেউ। আবিদুর সব পেরিয়ে চিকন গলিতে নেমে যায়। সব যেন তন্দ্রাঘোর নিশ্চুপ সময়। মানুষ দু-জন দু-জনকে দেখতে থাকে। দেখার বুঝি শেষ নেই। চোখের আলোয় কখনো খুশি কখনো বিষাদের জলছবি খেলা। প্রকৃতির মতো চুপচাপ উপলব্ধির পল-অনুক্ষণ। একসময় আবিদুর বলে উঠে, –

‘যাই রে অনুসূয়া।’

‘বসবি না? চা?’

‘আজ থাক।’

‘আমার সঙ্গে দেখা হয়ে কষ্ট বাড়ল না?’

‘কে বলল?’

‘বুঝতে পারি।’

‘তুই কিছু বুঝিস না।’

‘মিথ্যে বলিস না আবিদ।’

আবিদুর কি নিজের সঙ্গে ছল করে? কে জানে। আজকাল নিজেকে বড় দুর্বোধ্য মনে হয়। নিজের ছায়াও বুঝি গোলকধাঁধা। পশ্চিমের আকাশে কয়েকটি ঘুড়ি ওড়ে। একদা মন ঘুড়ি হতে চেয়েছিল। গোবিন্দ ঘুড়ি ওড়ায়। আকাশের বুকে ঘুড়ি ভেসে থাকে। নাটাই ধরে ডানেবাঁয়ে গোত্তা। একদিন সে ওপরে উঠে গেল। চোখ কল্পনায় কত ছবি আঁকে। দেয়ালের স্যাঁতসেঁতে ভেজায় জলের দাগ। সেই আঁকিবুকিতে ঝুলে থাকে হাজার চেহারা। সেখানে কি গোবিন্দ থাকে? কোনো মৃত মানুষের দীর্ঘশ্বাস? আবিদুর জলফোঁটা ধরে জ্যামিতি কষে। রেখা ধরে একটির সঙ্গে আরেকটির নক্ষত্র যোগাযোগ। এই বুঝি অ্যাপোলো তার সূর্যরথ নিয়ে আকাশে হেঁটে যায়। নমিতা নাশতা তৈরি করে। প্রেশারে সবজি-মাটন। শিস দিয়ে ডেকে তোলে সময়ের ঘড়ি। আবিদুর অফিসে এসে বসে। লাঞ্চ আওয়ার। কে যেন দূর-অতিদূর থেকে মোবাইলে ডেকে যায়। এই লাঞ্চ করেছিস? অনুসূয়া। আবিদুরের দৃষ্টি কি ঝাপসা হতে থাকে? অফিস শেষ শেষ মুহূর্ত। মোবাইল বেজে ওঠে। নমিতার সুস্থির কণ্ঠ।

‘শোনো, বলতে ভুলে গেছি। চা-পাতা শেষ হয়ে গেছে। ফেরার পথে নিয়ে এসো। অ্যানির জন্য দুধ।’

‘আচ্ছা।’

এই তো জীবন। সকালে ঘুম থেকে ওঠা। অফিস। কাজের লোড। শেষ-বিকেলে ঘরে ফেরা। ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত। জীবনের ছোট ছোট স্বপ্ন-ভালবাসা কবিতা সময় কোথায়? আকাশে ঘুড়ি ওড়ে। মনে আকাশে কেউ দোলা দেয়। সেদিন ভোর ভোর সকালে অনেকক্ষণ মোবাইল স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকে আবিদুর। দেয়ালে ঝুলে থাকা ডিজিটাল ঘড়ি এক-দুই-তিন করে সময় গুনে যায়। জীবন আর অস্তিত্ব এ রকমই…ছোট ছোট চাওয়া আর না পাওয়ার খেরোখাতা। সেদিন কেন সাহসী হতে পারল না সে? সময়ের কাজ সময়ে না হলে পস্তাতে হয়। সে কি অসুখী? আবিদুর নিজেকে জিজ্ঞাসা করে কোনো উত্তর পায় না। তার কী যে হয়, আস্তে আস্তে লেখে, কী কথামালা, মন জানে না অথবা জানে, কে জানে কত জানার মধ্যে অজানা কত কথা লুকিয়ে থাকে। কত জনমের সাথি। তার বুকে কোত্থেকে হাহাকার নেমে আসে?

‘যার নামটি আমার কৈশোর হতে এ সময় পর্যন্ত বুকের মধ্যে গোলাপের মতো গেঁথে আছে, তার পাপড়িগুলো কোন্‌ সময়ে শুকিয়ে গেছে, তবু তার সৌরভ স্বপ্নের মতো প্রাণ ব্যাকুল করে তোলে, কখনো আনমনে স্মৃতির তেপান্তর ডাক দিয়ে যায়, হায় যাকে পেলাম না, আনমনে অবুঝ, অবহেলা করে নিজেকে বঞ্চিত করলাম, আজ সেই নাম সম্বল হয়ে রইল, তোমাকে কেন বারবার মনে পড়ে যায়, দেখতে সাধ জাগে, ইচ্ছে হয় কানে কানে বলি, কী বলব? অনুসূয়া তুমি ভালো থেকো।’

এরপর একদিন, সপ্তাহ দুই শেষে বটতলি এসে দাঁড়ায় আবিদুর। কয়েকদিন মোবাইল কল দিলে ভেসে আসে যান্ত্রিক বাণী। the number you dialled is switched off। ফেসবুকেও নেই। পুরোনো বটগাছের নিচে আবছায়া বিকেল। কোথাও দূরে বাজে হারানো দিনের গান। সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে পুবে হেঁটে যায়। পায়ে পায়ে মেরুন রঙের ফ্ল্যাট। সুখে থেকো। সিঁড়ি ভেঙে সেকেন্ড ফ্লোর। বিশাল গেটে ঝুলে থাকা ব্যানার ‘আউট অব হোম’। অনুসূয়া কোথায় গেল? তাকে কি একটু বলে যেতে পারে না? কোনোদিন বিকেলে যখন গোধূলির আলো তির্যক ছড়িয়ে যায়, সূর্য অস্তরাগে মায়া হয়ে জেগে থাকে; বিদায়ের সময়। মোবাইল বেজে ওঠে। অনুসূয়া অনেকদিন পর মনে করে। আবিদুর রাস্তার একপাশে বন্ধ দোকানের বারান্দায় ওঠে। কত দিন যাওয়া হয়নি। কাজের চাপ। কত দিন দেখা হয় না। কেমন আছে অনুসূয়া?

‘হ্যাঁ বল অনুসূয়া কেমন আছিস?’

‘ভালো, খুব ভালো। তুই এলি না। গতকাল ফিরেছি। কোলকাতা গিয়েছিলাম।’

‘হঠাৎ? তুই ভালো আছিস তো? কিছু হয়নি তো তোর?’

‘অনেককিছু হয়েছে। তুই আসতে পারবি আজ অথবা কাল?’

‘তুই বললে এখনি যাব। কেমন আছিস কে জানে।’

‘আমি ভালো আছি রে। খুশির খবর দিই তোকে।’

‘খুশির খবর? কী?’

‘আমি কনসিভ করেছি।’

‘কনগ্রাচুলেশন।’

‘আবিদ তুই এলে ভালো লাগত। কালকে আয়।’

‘আচ্ছা। তুই নিজের প্রতি যত্ন নিস অনু। অবহেলা করিস না।’

অনুসূয়া কোনো কথা বলে না। তার দুই ঠোঁট যেন পাখি হয়ে শিস দেয়। আবিদুর জানে এ কোন্‌ ভালবাসা। আদরের সম্ভাষণ। সেদিন সন্ধেয় ঘরে ফিরে বাথরুমের আয়নায় নিজেকে আরেকবার দেখা। স্বচ্ছ কাঁচের বুকে হাজারও দাগ। জলের মতো তরল অথচ কঠিন। সেই জলদাগের উপর জলছবি হয়ে যে ছায়া কেঁপে ওঠে সে তার মুখছবি। কখনো কি অন্যরকম লাগে, যাকে সে চেনে না, জানে না, অন্য কেউ অন্য একজন? তার চোখদুটো ঝিমোতে ঝিমোতে কারও প্রতীক্ষায় জেগে থাকা বিকেল। তার বুকের কোনায় কে জেগে থাকে? তাকে চেনে, জানে কিংবা জানে না। আবিদুর একটি রাতের অপেক্ষায় ঘুমোতে পারে না। নমিতা দূর-অনেক দূর গুটিসুটি শুয়ে থাকে। তার মিহি নিশ্বাস। আবিদুর নাগাল পায় না, অথবা ইচ্ছে জাগে না; অ্যানি দু-জনের মধ্যখানে সংযোগ সেতু হয়ে কি গভীর ঘুমোয়! বড় শান্ত আর মায়াময় লাগে। আবিদুর মুগ্ধ চোখ। ভালবাসা বুকভরা। মেয়ে যেন ঠিক তার প্রতিবিম্ব ছায়া।

আবিদুর আরও একদিন বটতলি যাবে। সেখানে হারিয়ে যাওয়া কোনো জলপরি প্রতীক্ষায় থাকে।

                 

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>