| 3 মার্চ 2024
Categories
ঈদ সংখ্যা ২০২১

তারপর? প্রেম। তারপর? যৌতুক। তারপর? অনন্ত আঁধার অথবা…

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

আমাদের দুজনের মধ্যে গভীর প্রেম…

কবে থেকে? 

বিয়ের পর থেকে… ধীরে ধীরে দুজন অনুভব করেছি। 

বিয়ের আগে?

হ্যা! তখন তো আমাদের পরিচয়ই ছিলো। মা – বাবাকে কনভিন্স করে যৌতুকহীন বিয়ে করেছি, বুঝতে শেখার আগ পর্যন্ত যৌতুককে ঘৃণা…

তারপর? 

ফুড়ুৎ… 

রক্তাক্ত দেহটা পুরনো টিউবের সবুজ শ্যাওলায় ঘোলানো হলুদাভ আলোতে দুর্ধর্ষ- রঙিন পেইন্টিংয়ের মতো লাগছে। জানালার পর্দা খোলা। চারদিক  আঁধার করে পাগলের মতো বৃষ্টি নামছে যেন কোন রাক্ষুসীর বিছানো চুল থেকে ছিটকে ছিটকে সেই পেইন্টিংয়ের ওপর পড়ছে বৃষ্টির দলা। 

বিদ্যুচ্চমকের ঝাপতে আচমকা সশব্দে আমার হাত থেকে ছুরিটা লাফিয়ে পড়ে। চারদিকে এত বৃষ্টির শব্দ অথচ আমার ঘরে এত নৈঃশব্দের প্রগাঢ়তা, মেলে না…! বর্ষা চারপাশ মাতিয়ে সব ভুলে চিৎকার করছেনা কেন? যুবায়ের, আসো আসো জানালায়… ওমা! শিলাবৃষ্টি! চলো ছাদে যাই বাড়িওয়ালা তের পাবেনা।। আহ! থাকতাম যদি দেশের বাড়ি, প্রান্তর দাবিয়ে বেড়াতাম। তুমি ভিজতে না বৃষ্টিতে? 

ভিজতাম প্রথম প্রথম, বর্ষাকে খুশি করতে।

কেন তোমার ভালো লাগত না? 

আসলে অভ্যাস ছিলো না। বাবা-মা জ্বরের ভয়ে কখনো ভিজতে দেননি। তাই, অস্বস্তি হতো, ভয়ও, কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর জড়তা কাটাতে কাটাতেই স্থিত শান্ত জড়তাময় বর্ষা একটু একটু করে অসম্ভব ভালোবাসতে শুরু করলো আমাকে। ওর উদ্দাম পা মল পরে চারদিকে এমন শব্দায়িত হতো, আমার প্রথম দিকে বিরক্ত লাগতো। পরে যা হয়, মধুর অভ্যাস, ওই শব্দ ছাড়াই ঘরটাকে মৃত লাগত। তো তোমার হাতে রক্ত না রঙ? কি করে পড়ল, ছুরি, না তুলি? তুমি কি কারও ছবি আঁকছিলে? ছবি? কী জানি! আমি তো আগে কোনদিন আঁকিনি। না না! ছুরিও না, রক্তও না। জীবনে কোনদিন মুরগি জবাই করিনি বলে কেউ আমাকে মরদ বলত না। কেবল মা আগলে রাখত। মা’র ভয়ে কেউ আগাত না। ভার্সিটিতে যখন ভর্তি হই তখন প্রথম মা-শূন্য হই। কলেজতাতেও মফস্বলে পড়েছি। কাউকে বলতে পারতাম না, আমি যে মার জন্য ছোট্ট শিশুর মত কাঁদছি। মার প্রতি এই অন্ধ ভালোবাসা আজও যায়নি। না না! আমি অন্ধ বলিনি, বর্ষা বলত। মার প্রতি প্রেমে অন্ধত্বের কি আছে? আমি যে জীবনের প্রথম ভার্সিটির একজন পরম গুরুর দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে মার সামনে যৌতুকের বিরুদ্ধে দাঁড়ালাম, তাতে আমার সমাজে মা’র অনেক অসম্মান হলেও মা আমাকে সাপোর্ট করেনি? বর্ষাও যৌতুকের বিরুদ্ধে অনড় নারী ছিল। ফলে আমার প্রতি প্রেমের, শ্রদ্ধার মাখামাখির মিশেল ছিল ওর। 

ছেলে হলে কী নাম রাখবে গো? চমকে উঠতাম নিজ পরিবারের জন্ম-ইতিহাস ভেবে, বর্ষা শুনলে টেনশন করবে, কথা কাটাতে বলতাম, আগে পাশ করো, পরে চাকরি, তারপর গড়িয়ে হাসতো বর্ষা, ধুর অতো হিসাব ভালো লাগে না। ছেলে হলে কী নাম, মেয়ে হলে কী নাম গল্পেও তো মজা। বাচ্চা আমার এত পছন্দের প্রায়  রাতেই স্বপ্নে দেখি এক স্বর্ণগাছে বসে এক নাইটিঙ্গেল শিশু আমাকে মা-মা করে ডাকছে। 

সব ঠিক যাচ্ছিল, জীবন রুটিনে বিবর্তন শুরু হলো বাবা-মা কয়েকমাসের জন্য এখানে এসে ওঠায়, না না! বর্ষার কোন সমস্যা হয়নি, বর্ষা ভার্সিটিতে যাওয়া শুরু করল, না না মা-বাবারও কোন আপত্তি ছিল না। আমার মাথার মধ্যে কোত্থেকে যেন একটা ঘুণপোকা ঢুকে গেল। আমি আসমানে উঁড়ি, মৃত্তিকায় পতন, ফের শূন্যতায় উড্ডয়ন, আমার শাদা চোখে নারকেলের কাঁচা শাঁসের মতো কী একটা এঁটে গেছে, অনুভব করতাম, কিন্তু তাতে কোন অস্বস্তি হতো না আমার, ভার্সিটি-ফেরত বর্ষা আমার মতনই এক দীক্ষাগুরু পেয়েছিল, যে তাঁদের জীবনের সুন্দর দর্শন শিখাত। 

ও যখন সেই গুরুর গল্প করত, আমি শাঁস – চোখে দেখতাম কেমন কমলার মত টসটস করছে ওর মুখ…যত কোয়া খুলত…বলত, স্যার বলেছেন  পাপকে ঘৃনা করতে, পাপীকে নয়, কেন আমরা চোর, খুনি, ধর্ষক, লম্পটকে ঘৃণা করি? তাঁর আগে কেন আমরা শেকড়ে যাই না? এরা যদি শৈশব-কৈশোরেই ভালো শিক্ষা পেত, এসব করত? 

বর্ষা, অনেক ধর্ষকও পন্ডিত হয়। 

হ্যাঁ হয়, পুরুষদের সেক্সটা মেয়েদের মত অত অত স্থিত থাকেনা। তারা সভ্যতা দিয়ে তা স্থিত সংহত রাখে, সবসময় রাখতে পারলে পুরুষদের জন্য বেশ্যালয় থাকত না, কাজের মেয়েদের সঙ্গে অঘটন ঘটিয়ে পস্তাত না কোন পুরুষ, যা মেয়েদের ক্ষেত্রে হয় না বললেই চলে। 

তাই বলে তুমি সাপোর্ট করবে এটাকে? একজন খুনিকেও তোমার দার্শনিক যুক্তিতে স্নান করিয়ে শুদ্ধ বানাবে? 

না না… এ তোমার সঙ্গে আমার কথোপকথন। এ নিয়ে থোড়াই না আমি কোন কলাম লিখতে যাব। বলছি, এই যে এসব হচ্ছে, এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কি? কী করে একজন আচমকা কাউকে খুন করবে না? ধর্ষণ করবে না? ডাকাতি করবে না? ঠান্দা মাথায় যারা করে, তাদের তো শৈশব-কৈশোরটাই মূলত ভালো যায় না। এই তাদেরই তো স্ত্রী-সন্তান থাকে। সেখান থেকে কেন তারা মায়ামমতা সুন্দর মনুষ্যত্বের পাঠটা গ্রহণ করতে শেখে না? এই যে তুমি, শৈশব- কৈশোরেই দেখেছো তোমাদের চারপাশে যৌতুক বিহীন বিয়েতেই যত বদনাম। তুমি তোমার মার বিরুদ্ধে গিয়ে কী করে ঠান্ডা মাথায় এত সুন্দর একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারলে? একটা সুন্দর শিক্ষা তোমার ভেতরের আঁধারকে জাগিয়ে দিয়েছে। 

‘মার বিরুদ্ধে’ শব্দটা খপ করে ঘুণপোকা গিলে ফেললো। কদিন ধরেই ধানিজমি বন্যায় ভেসে গেছে বলে মা আফসোস করছিল। আমি নিজেও যে চাকরি করি তার বেতনে ছোট দু’রুমের সঙ্গে এক্কেবারে মিনি ড্রয়িংরুমের কক্ষে আজকাল হাঁসফাঁস লাগে। এখানে হেঁটে মা’র জুত নেই, চলে বাবার আরাম নেই। যা বাজার আনি, কী-খাওয়াতে পারি আমার প্রিয় মাকে? মা’র জন্য ভার্সিটির মতোই আমার শিশু হয়ে যাওয়া আত্মাটা একা একা কাঁদে, আমি বর্ষার মল দেখি, শব্দ দেখি, বৃষ্টি দেখি, বর্ষা যেন আমার কান্না দেখে না। মা বলেছে, বর্ষাদের ধান নষ্ট হয়নি। তার বড়ভাই বিদেশ গেছে, টাকা পাঠায়। বর্ষার দর্শন কি বলে? আমার কামাই ও খাবে, আমার বাবা-মা কষ্ট পাবে, স্বামী নিয়ে তার সুখী দাম্পত্যের আর্থিক অভাবে টাকা আসা পরিবার থেকে আমার মাকে কিছু এনে দেওয়ার নাম যৌতুক? বর্ষার কাছে খুনি, ডাকাত, ধর্ষক মাফ…আর কেবল যৌতুকের দাবি যে করে সেই…? বসতে হবে বর্ষার সঙ্গে, এক্ষেত্রে তার গুরু আর তাঁর যুক্তি কি বলে শুনব।

বসেছ? শুনেছ?

একাধিকবার।

কী বলে বর্ষা? 

বলার চাইতে বেশি তাকায় অসহ্য চোখে। তার স্বপ্ন নষ্ট করেছি, অহংকার নষ্ট করেছি। আমার যুক্তিতে নত হয়ে একবার এক লাখ টাকা বাড়ি থেকে আনার পর বর্ষা ছাড়েনি আমাকে, বলেছে, তোমার মা-বাবাকে বাজার থেকে যখন যা এনেছ তা থেকে আমি ভালোটা না খেয়ে খাইয়েছি। ক’দিন পর পাস করে আমিও তো চাকরিতে ঢুকব। অতো ডাঁট করে বিয়ে করে এনে ওখানে আমার মাথাটা হেঁট না করালে চলত না? গুরুর দীক্ষা ভুলে তুমি ফের স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছেলের মতো মা’র ভালোবাসায় অন্ধ হয়েছ, তিনি যা বলছেন…

কী হলো? থামলে কেন? 

বলার কিছু নেই, এরপর চুলের মুঠি ধরে বর্ষাকে কষে মেরেছি। মার খেয়ে বর্ষা স্তব্ধ বিস্ময়ে আমার দিকে এমন চোখে তাকিয়েছে যেন কোনো নপুংসককে দেখছে। যেন আমি কোনো সমর্থ মানুষ নই বলে তাকে অসভ্য শিক্ষায় বড় হতে থাকা কোনো কিশোর অথবা নষ্ট শিশু হয়ে তাকে আঘাত করেছি, মা বলছিল, এক লাখ টাকার ভিক্ষা এনে বদনাম না- করলেই পারতি। ঘুণপোকাটা সশব্দে ভোঁ-ভোঁ করে মাথায় ঘুরতে থাকলে, বলতে বলতেই আমি চিল্লাচ্ছি, থাম বলছি, ওই টাকা ফেরত দিয়ে দশ লাখ নিয়ে আয়, মাথা যা হেঁট হওয়ার হয়েছে। মা- বাবাকে আমাদের মফস্বলে সেট করে দিয়ে আসি। 

ফের সেই চাহনি… এইবার যেন তার মাথার দুলুনিতে সাপের ফনা ভর করছিল, হিসহিস করছিল, অযোগ্য…অসমর্থ…বলতে বলতে…কী? অসমর্থ আমি? দেখিসনি আমার সামর্থ্য? বলতে বলতে কষে বিছানায় ফেলতে ফেলতে অনুভব করি, বিয়ের পরে লাজুক বর্ষার শয্যাসঙ্গী হতে গিয়ে আমার পুরো শরীরে যৌবনে যে আগুনের শিহরনের হলকা বইছিল, পরে তা আর তেমন থাকে নি স্বভাবতই…তার চেয়েও তীব্র হিংস্রভাবে বর্ষার চুল খামচে তার দু’হাত চেপে ধাবিত হওয়ার পৈশাচিক আনন্দ। সবশেষে যখন আমি নেতিয়ে পড়েছি, আমাকে ধাক্কা দিয়ে বর্ষা চিৎকার করতে করতে ছুটছিল, কুৎসিত জন্তুটাকে নিজের মাঝে লুকিয়ে বিয়ে করেছ আমাকে, কুতসিত…তোর মধ্যে ধর্ষকও বাস করে, শৈ-কৈশোরে তুই এই শিক্ষা পেয়ে বড় হয়েছিস… বলতে বলতে বাথরুমে অনর্গল বমি করতে থাকে সে। 

তোমার বাবা-মা টের পায় নি?

কোনো ভদ্র বাবা-মা সন্তানের দাম্পত্য কলহে নাক গলায় না। আমাদের স্বস্তি দিতেই হয়তো তারা দরজা বন্ধ করে চড়া শব্দে টিভি দেখছিল। 

তারপর? ফুড়ুৎ।

বৃষ্টিটা থেমে গেছে। একটু একটু করে রদ বাড়তে থাকায় তারই ফালি আলোতে দেখি টেবিলে তরমুজ কাটা। ওহ, তারই লাল রঙ আমার আঙ্গুল শুকিয়ে কী করেছে আমার হাতের, শরীরের। প্রায়ই রাগ করে মেঝেতে ঘুমায় বর্ষা। তখন তার দিকে আমি তাকাই না। কিছু আগে কীসব পেইন্টিং দেখছিলাম…ঘুণপোকাটা মগজ কামড়াচ্ছে, আজ রাগ ক্ষোভ কিছু নেই, তা-ও বর্ষার দিকে তাকাতে ইচ্ছা করছে না। আইনশাস্ত্রে পড়া আমার দীক্ষাগুরুকে আমি আজ বন্ধের দুপুরে খেতে ডেকেছিলাম। দশ লাখ টাকা না-পেয়ে রাগ করে আজ ভোরে মা-বাবা বাড়ি চলে যাওয়ার আগেই। কিন্তু আমি নড়তে পারছি না যে? 

বাথরুমে হাত ধোব…কী হয়েছে তা অনুধাবন করব, সেই শক্তিও আমার নেই, এক জগদ্দল পাথর আমার পুরো অস্তিত্বকে দাবিয়ে রেখেছে- এতক্ষন দু’হাত ভেবে যে, আঙ্গুলগুলোর সঞ্চালন দেখছিলাম, আচমকা চোখে পরে সেটা আমার একটা হাত, আরেকটা হাত কোথায়? ভয়ে আমার কৈশোর-উত্তীর্ণ সময় আচমকা টিভিতে কীসব দেখতে দেখতে আমার প্যান্ট স্ফীত ভিজিয়ে শাদা শাদা স্রাবের অবস্থার কথা স্মরন হয়। তখনই এমনই ভয় পেয়েছিলাম, এসব কী হচ্ছে? না না ঋতুবতী তো মেয়েরা হয়, আমরা তো ঋতুর শিকার না, মাঝে মাঝেই নিজের দেহের আগুন নেভাতে হস্তকে নারী বানাই আর…। বর্ষা তারপর কী করল?  

ঝিম মেরে বসে থাকল কিছুক্ষণ। 

আমি বললাম, এখন তোমার দর্শন কই? এখন কেন ধর্ষককে ঘৃণা? যা করেছি, প্ল্যান করে তো করিনি। 

একজন স্বামী স্ত্রীকে তীব্র ঘৃণায় চুলের মুঠো ধরে বেদম মারে, তারপর ধর্ষন করে, সে কে? সে কী? মনুষ্য পশুত্ব ইতিহাসে এই বর্বরতার কোন নাম নেই, এ নিয়ে দর্শন কোথাও পৌঁছালেও আমি সেই গুয়ে গা মাখাব না। 

তোমার দীক্ষাগুরুকে জিজ্ঞেস করো, যার শরিরের গন্ধ তোমার শরীরে পেয়েছি।   

এটাই বাকি ছিল, উঠে দাঁড়িয়ে শ্লেষ কণ্ঠে হেসেছিল বর্ষা। এখন এটাকে নিয়ে নতুন খেলা শুরু হবে তোমার। বলতে বলতে সে পাশের ঘরে গিয়ে তার বড়বোনকে ফোন করছিল। তার মোবাইলটা দুদিন ধরে নষ্ট ছিল। এপাশে রিসিভার উঠিয়ে শুনেছি, তার বোন বোঝাচ্ছে সব সংসারেই এসব হয়, ও যেন সাবধানে থাকে। একবার ঘর থেকে বেরোলে, এরপর আর ফিরলে স্বামীর কাছে মুখ থাকবে না। বান্ধবীকে ফোন করার সময় টের পেয়ে যায়, রিসিভার ধরে আছ কেন, কী শোনার বাকি আছে? 

তারপর?

রাত গড়াল। সকালে বাবা-মা যখন ভার্সিটি-পড়ুয়া আমার চাচাত ভাইকে দিয়ে টিকেট কাটিয়ে এক লাখ টাকা আমার হাতে ঠেসে বলল, তোমার ভিক্ষা তুমি রাখ, তখন আমি বাবা-মার জন্য বাইরে থেকে নাস্তা আনিয়ে সবে তরমুজ কাটা শেষ করেছি। রান্নাঘর বন্ধ করে বসে-থাকা বর্ষাকে অনুরধ করেছি, দশ লাখ টাকা আনবেই এটাতে রাজি হয়ে বাবা-মাকে আটকাতে, সে দরজা খোলে নি। আমার অসহায় দশা দেখে হাজার হলেও আমার প্রিয় মা, এক লাখ নিয়েই চলে যায়। এরপর অনেক্ষণ পর ওর দরজা খুলল, ছুরিটা নিয়ে তো আমি তরমুজ ফালা করছিলাম… যেভাবে সেদিন তাকে ধর্ষণ করেছিলাম, আজ তো মা’র অপমানে, বর্ষার স্পর্ধায় অর ওপর তেমনই ঝাঁপ দিয়েছিলাম…না…না ফোন এসেছিল, কাকে যেন বলছিলাম বর্ষার গলায় তরমুজ ভেবে আমিই ছুরি চালিয়েছি…কাকে বলেছি? কাকে? মাথাটায় আকাশ ঢুকে যায়। কিছু শকুন উড়ে চলে যায়, হ্যাঁ শিক্ষাগুরু, দুপুরে কোথায় কাজ পড়েছে, রাতে আসবেন, তখনই তো আমার এত আপন একজন, তাকে না বলে কাকে বলা যেত, এই হিজিবিজি রক্তাক্ত অবস্থার কথা? 

রিং বেজে উঠে ভূমন্ডল কাঁপিয়ে…কাঁপতে কাঁপতে ভারী দেহে রিসিভারে কান পাতি, বর্ষার বান্ধবী, শরীরের এই কন্ডিশনে ওকে কোন…আপনি কোনো পেইন দেবেন না।

এই কন্ডিশন মানে? 

কী আশ্চর্য! আপনাকে বলেনি? ও তো তিনমাস আগে প্রেগন্যান্ট হয়েছে। এদ্দিনেও আপনি-

মাথায় ভূমিবর্ষণ নামে। আমাদের পরিবারে সব চাচারই কয়েকজন সন্তান মৃত্যুর পর প্রত্যেকেই এক-দেড় মাসের মাথায় গর্ভনষ্ট হয়েছে। এরপরে সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েই মারা যেতে যেতে পরে কারও এক সন্তানও টেকেনি, কারও এক-দুজন টিকেছে। আমি মা-বাবার প্রথম সন্তান। গর্ভে আসার পর থেকে বর হওয়া পর্যন্ত মা আমাকে নিয়ে দিশেহারা থাকত। আমিই আমার বাবা-মা’র একমাত্র সন্তান, যে টিকেছি। আর কেউ টেকেনি। এখনো প্রায়শ আমি মা’র ওমের শিশু গোপনে গোপনে। 

কারওটা শেষে টিকেছে, না টিকলে চাচা আরেকটা বিয়ে করেছে। আমাদের বংশের এই জেনেটিক দুঃসহতার জন্য বাবা-মা আমাকে নিয়েও ভয় পেত। 

মাথায় আউলি-ঝাউলি লেগে যায়। ওই তো পরে আছে আমার সন্তানের মা’র মাথা…না, মাকে কে মেরেছে জানি না, আমার সন্তানকে আমি মারি নি… এসব থেকে দূরে চলে যাব…অনন্ত জোরে সোফা থেকে নিজেকে টান দিতেই দেখি আমার এক হাত লোহার মতো কষে ধরে আছে বর্ষা…বর্ষা ছাড়ো আমাকে…এত রক্ত সহ্য করতে পারছি না… না না! এইবার ঘুণপোকা না, সমস্ত মাথায় ক্রন্দন করে উড়ছে শিশুর কান্না…যত পালাতে চাই, তত বর্ষার হাত কষে চেপে ধরে। কী করে আমি এই রক্তাক্ত প্রান্তর থেকে এক ফালি তাজা নিঃশ্বাস নিতে নিজেকে উপরে সরাই? নিজেকে টেনে ধারালো দা দিয়ে কী করে নিজের হাতের কবজি কাটা যায়, যখন উথাল-পাথাল ভাবছি, প্রাণে আকুল বাতাসের হিমেল বইয়ে দরজার ওপাশে আমার দীক্ষাগুরুর কণ্ঠ শোনা যায়, যুবায়ের দরজা খোলো। 

আমাকে বাঁচান স্যার, একটা চাবির ব্যবস্থা করে দরজা খোলার ব্যবস্থা করুন।    

আচমকা লাথির শব্দ। পুলিশ এসে লাশটাকে কি করতে থাকে জানি না। হুলুস্থুল করতে করতে আমাকে পুলিশ  বাঁধছে কেন?  বাবা-মা এসেছিল চারমাস আগে, তিন মাস ধরে আমার স্ত্রী গর্ভবতী, এর মধ্যে ক্রোধ ঘৃণা ঝগড়ার ভাঁজে ভাঁজে রোমান্টিক, ভালো সময়ও গেছে। এর মাঝে বর্ষা আমাকে একবারও বলল না- এই রহস্যময়ী বর্ষাকে আমি চিনি না। আমার বিয়ে করা বউ বর্ষাকে আমি ভালোবাসি, আমার ওপর ভর করে চলে যাওয়া দৈত্যের শাস্তি আমাকে দিচ্ছেন কেন? 

তারপর?

তারপর…অনন্ত এক অসীম গহবর…।

তারপর?

ফুড়ুৎ

তারপর…?

.

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত