Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,eid 2021 bangla golpo swaralipi

ঈদ সংখ্যার গল্প: বাইশ গজ দূরে । স্বরলিপি

Reading Time: 3 minutes 

ছেলের বার্ষিক পরীক্ষা আর কয়েক দিন পরেই। তাই তাকে মামার বাড়িতে যেতে দিতে রাজি হচ্ছিলো না মেরিনা কিন্তু নানা নিতে এসেছে। তাকে ফেরত পাঠানো সম্ভব না। দুই দিন পরেই দিয়ে যাবে এই শর্তে যেতে দিলো সে।

একটা মাঠ পার হলেই মেরিনার বাবার বাড়ি। মাঝে-মধ্যেই মাঠ বরাবর হেঁটে মেয়েকে দেখতে চলে আসেন মাজেদ। তার হাতে মিষ্টি থাকলে মেরিনা বুঝে নেয়, তিনি রাস্তা দিয়ে এসেছেন, আর না থাকলেই বোঝে মাঠের ভেতর দিয়ে জমির আইল দিয়ে হেঁটে এসেছেন। রাস্তা দিয়ে আসলে আগে খাবার পানি দেয়, মাঠের ভেতর দিয়ে আসলে দেয় হাত পা ধোবার পানি। তবে যে পাশ দিয়েই আসুন না কেনো, মাজেদের হাতে একটা ব্যাগ থাকে আর তার মধ্যে থাকে একটা লাল দস্তরখানা। মেয়ের বাড়িতে এসে এক-দু ঘন্টার বেশি সময় থাকেন না মাজেদ। তাই ঘরে যা থাকে বেশিরভাগ দিন তাই দিয়েই খেতে দেয় মেরিনা। মাজেদ এসেই জানিয়ে দেন, কত সময় থাকবেন।

তো, মেরিনার ছেলেকে নিয়ে যাবার দুই দিনপর মাজেদ আসেন। পায়ের জুতায় কোন ধুলা-কাদা দেখা গেল না। বেশ পরিস্কার। বোঝা গেল রাস্তা দিয়ে ভ্যানে বা গাড়িতে এসেছেন মাজেদ। কিন্তু তার হাতে মিষ্টি নেই। মেরিনার ছেলেকে নিয়ে আসার কথা ছিলো তাকেও নিয়ে আসেন নি। মেরিনা তার বাবার হাতের দিকে একবার তাকায়, আবার পায়ের দিকে একবার তাকায়। সে ভেবে নেয়, ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে আসেনি বলেই হয়তো বাবা এমন চুপচাপ আছেন। পরে, হাত-পা ধোবার পানি আর খাবার পানি দুই’ই বাবার সামনে এনে রাখে মেরিনা। একটু হাসে। তারপর বলে, বাবা সজল আরেকদিন আপনাদের ওখানে থাকবে, তো থাকুক। আজ যাবার সময় ওর একটা বই নিয়ে যাবেন আর একটু কষ্ট করে কাল সকালে দিয়ে যাবেন। মাজেদ কোন উত্তর দেয় না। কয়েক প্রকার রান্নার জোগাড় করে মেরিনা। মুরগির মাংস চুলায় বসিয়ে দিয়ে বাবাকে এসে বলে, বাবা তরকারিতে অনেক ঝাল দিয়েছি। আপনি ঝাল পছন্দ করেন তো তাই। মাজেদ বলেন, রান্না শেষ হলে তুমি আগে গোসল করে আসো। তারপর খেয়ে নাও।  : কেনো আমাকে নিতে এসেছেন? মাথা নাড়ে মাজেদ। : সজলের আব্বা থানায় গেছে হাজিরা দিতে। সে না আসলেতো আমি যেতে পারবো না। আপনি তো জানেন, কত টাকা দিয়ে মাঠের একটু জমি কিনলাম। রেজিস্ট্রি হলো এক রকম, মেপে দেখা গেলো জমি কিছু কম আছে। এদিকে বাজারের জমি বাইনা হইছে। আরো কিছু টাকা দরকার। তাই মাঠের জমিটা বেচে দিতে হলো।  কিন্তু আগের মালিক মামলা করেছে। এ জমি সেই কিনতে চায়। এদিকে জমিতে ঠকিয়েছে বলে আপনার জামাই একটু ক্ষেপে ছিলো। এখন যে কত টাকা মাসে মাসে থানায় দিতে হচ্ছে! মাজেদ জানতে চায়, জমি কতটুকু কম দিয়েছিলো। : শতাংশ -গন্ডা কোন কিছু এতো বুঝি না। সজলের আব্বা বললো বাইশ গজের মতো হবে। কিন্তু বাবা এই জমির আগের মালিক, তার ছেলেকে বিদেশ পাঠানোর সময় আমাদের কাছে জমিটি বিক্রি করেছিলো। আমরা বাজারের জমি কিনবো বলে মাঠের জমি কিনতে রাজি হচ্ছিলাম না। পরে ভাবলাম তার যদি একটু উপকার হয় তো মন্দ কি। আমাদের হাতে সময় আছে। দেখে শুনে এই জমি বিক্রি করে টাকাটা আবার তুলে নিতে পারবো, এই ভেবে কিনলাম। তাদের কাজ ঠিকই হলো কিন্তু আমাদের সঙ্গে সারা জনমের শত্রুতা তৈরি হয়ে গেলো।

এতক্ষণে মাংসের ঘ্রাণ ছড়াতে শুরু করেছে। মেরিনা গরম মসলা বেটে তরকারিতে ছড়িয়ে দিলো। কোন ফাঁকে ওর কাপড়ের আঁচলে আগুন লেগেছে খেয়াল করেনি । মাজেদ ঘরের বারান্দা থেকে বলে উঠলেন, পোড়া গন্ধ বের হচ্ছে। মেরিনার খেয়াল হয়। সে তাড়াতাড়ি আগুন নিভিয়ে, ঘরে গিয়ে শাড়িটি খুলে নতুন একটা শাড়ি পরে নেয়। বাবার পাশে গিয়ে বলে, ‌‌‌‘বাবা আপনি না বললেতো আজ আমি পুড়েই যেতাম।’ এ কথা বলতে বলতে বাবার ব্যাগ থেকে দস্তরখানাটা বের করে। দেখে দস্তরখানার একপাশ পুড়ে গেছে। : এটা কি করে হলো।  : আজ সকালে দস্তরখানাটা পুড়ে গেছে। তুমি কি এতক্ষণে গন্ধ পাওনি? : বাবা আপনি আমার বাড়ির উঠানে পা রাখলেই আমি এক ধরণের গন্ধ পাই। আজ সেটা পাইনি। আপনাকে বলবো ভাবছিলাম, কিন্তু সাহস হচ্ছিলো না। বাতাসা-কদমা-পুরি এগুলোর গন্ধ পেতাম আগে। শ্বশুর বাড়িতে আসার পর আপনি কাছাকাছি এসে দাঁড়ালে কাঁচা মাটির ঘ্রাণ পেতাম। এই ঘ্রাণের সঙ্গে আতুর ঘরের খাবাবের ঘ্রাণ মিলে যায়। বিশ্বাস করুন আজ পাইনি। এতক্ষণ পরে মনে হলো, আমি পোড়া ঘ্রাণ পাচ্ছিলাম। কিন্তু ওই ঘ্রাণটা নিতে চাইছিলাম না। শাড়ির আঁচলে আগুন ধরলেও তাই গন্ধটা পৃথক করতে পারিনি। এখন বলেন তো, সজলকে আনেন নাই কেনো?

: সজলকে নিয়ে ওর মামারা একটু পরেই এসে যাবে। যে জন্য সজলকে নিয়ে গেলেন, সেই মোরগ লড়াইয়ের কি হলো? এরপর মাজেদ বলতে শুরু করে, মোরগ লড়াই হয়েছে। আমাদের গ্রাম জিতেছে। ওই লড়াইয়ের পর ছেলেরা-ছেলেরা শুরু করলো মোরগ লড়াই। তোমার ছেলেও  যোগ দিলো। ও একজনের পর এক জনকে হারিয়ে যাচ্ছিলো। চারপাশ থেকে সে কি হাতে তালি! মানুষগুলোকে পৃথক করা যাচ্ছিলো না। একজনের পাশে আরেক জন মিলে দাঁড়িয়ে দেখছিলো লড়াই। কয়েকজনকে হারানোর পর সজল আর পেরে উঠছিলো না। লোকজনের মধ্যে গ্রাম নিয়ে শুরু হলো বাক্ যুদ্ধ। সজলের শরীরের বিভিন্ন জায়গা থেকে রক্ত পড়তে শুরু করলো। মানুষের মুখে সজল সজল রব। চারপাশে মানুষ ওকে ঘিরে রেখেছে। আমি ভেতরের দিকে যেতে চাইলাম। কাঁধের দস্তরখানাটা নিয়ে একজন আগুন ধরিয়ে দিলো। শুনলাম, কে যেনো সজলের গায়ে ইট ছুঁড়ে দিয়েছে। ওর মাথা ফেটে রক্ত বের হয়েছে। মুহূর্তে মানুষগুলো সরে যায়। সবাই জেনে গেছে, সজল আর বাঁচবে না।

তারপর মেয়ের কাছে আত্মসমর্পনের ঢংয়ে বলে, বাজারে ক্লাবঘর করেছিলাম। ভেবেছিলাম সেখানে গ্রামের ছেলে-মেয়ারা পড়াশোনা-আলাপ-আলোচনা চালাবে। কিন্তু সেই ঘরটা একটি রাজনৈতিক দল, তাদের কার্যালয় করে ফেলেছে। আর আমি ঘরের সামনে তাবুর একচালা করেছি। সেখানেই হচ্ছিলো মোরগ লড়াই। যাই হোক, মেরিনার বর বাড়িতে ফেরে, হাতে মিষ্টি। কারণ, মামলায় জিতে গেছে সে। এদিকে সজলকে নিয়ে এসেছে ওর মামারা। বারান্দার শুইয়ে দেয়া হলো সজলকে। মাথায় সেলাই দেয়া। সজলের মাথায় হাত দেয় মেরিনা। আস্তে চোখ খোলে সজল। একটু হেসে দিয়ে বলে মা, আমার সমাপণী পরীক্ষা কবে? কপালের চামড়া ঘুচিয়ে কথা বলতে কষ্ট হলো সজলের। মেরিনা জানালো, তুমি সুস্থ হলে। মেরিনা ছাড়া আর কেউ সজলের কথা শুনতে পেলো না।

     

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>