আনিসুজ্জামানঃ বাঙালি জাতিসত্তার এক অগ্রপথিকের নাম
মহৎ প্রাণ মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে খুব বেশি একটা নেই। বিপুলা এই পৃথিবীতে তাঁদের সংখ্যা খুবই কম। এত কম যে বলা যায় সেটি একেবারে শূন্যের কোটায় এসে নেমেছে। বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান তাঁদেরই একজন। আনিসুজ্জামান একজন শিক্ষক, একজন প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ, একজন সংগঠক, বাংলা সংস্কৃতি এবং চেতনা বিকাশের অন্যতম বাতিঘর।অসাধারণ বিনয়ী এবং মার্জিত এই বিরল ব্যাক্তিত্বের অধিকারী মানুষটির মৃত্যুতে গোটা বাঙালি জাতি এক প্রাণের সারথিকে হারাল।
আনিসুজ্জামান খান ছিলেন বাঙালি জাতিসত্তার অন্যতম অভিভাবকও। বাংলা সংস্কৃতি, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসহ প্রতিটা গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনের সঙ্গে আমরা আনিসুসজ্জামানকে যুক্ত হতে দেখি। মনে রাখতে হবে পূর্ব পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমাদের যে আন্দোলনটি ছিল তা ছিল মূলত সাংস্কৃতিক এবং একই সঙ্গে অস্তিত্বের আন্দোলন। এই আন্দোলনকে বেগবান করতে বাঙালির রক্ত কম ঝড়াতে হয়নি। সেই পাকিস্তান সরকারের আমল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত আমাদের এই আন্দোলনকে থামিয়ে দিতেও কম ষড়যন্ত্র হয়নি। কিন্তু আমরা জানি এই কুটিল ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বাঙালি বার বার রুখে দাঁড়িয়েছে। বারবার তারা ষড়যন্ত্রের বিষ দাঁত ভেঙে দিয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না বাঙালির এই আন্দোলনগুলোর পয়লা কাতারের সৈনিক ছিলেন আনিসুজ্জামান। এই মহান মানুষটির মৃত্যুতে বাঙালি হারাল একজন শিক্ষাবীদকে, একজন লেখককে, একজন উদারচিন্তার মানুষকে এবং একজন খাঁটি বাঙালি সংস্কৃতিসেবককে। বাংলা ভাষা এবং বাঙালির রাজনৈতিক চেতনায় তিনি যে বীজটি রোপন করে গেছেন সেই অমূল্য কাজকে সযত্নে আগলে ধরে রাখাই হবে এখন বাঙালির একমাত্র ধ্যান এবং জ্ঞান।
আগেই উল্লেখ করেছি বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রের গঠন, বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বাংলা সংস্কৃতিকে বেগবান করার প্রতিটি গতিপ্রবাহের সঙ্গেই ছিল তাঁর আত্বিক সংযোগ। আমাদের বাঙালি সত্তার এমন কোন বাঁক নেই যেখানে আনিসুজ্জামানকে খুজে পাওয়া যাবে না। ৫২ বলুন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান বলুন, ৭১ বলুন এবং ৭১ পরবর্তী বাংলা সংস্কৃতি বিরোধী অপশক্তির কথাই বলুন সর্বত্রই ছিল আনিসুজ্জামানের সরব উপস্থিতি। ছাত্র জীবন থেকেই আনিসুজ্জামান প্রগিতিশীল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাংলা ভাষা এবং সংস্কৃতি ভিত্তিক জাতিয়তাবোধকে বিকশিত করতে তিনি ছাত্রজীবনেই তৎকালীন সময়ে বিভিন্ন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রাজপথে বিভিন্ন দাবী আদাযের জন্যে তিনি তৎকালীন পূব পাকিস্তান যুবলীগে যোগ দিয়েছিলেন এবং ১৯৫১ সালে সংগঠনটির দপ্তর সম্পাদক হিসেবে যুক্ত হয়েছিলেন। ১৯৫২ সালে ২৭ জানুয়ারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষনা করার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব বাংলার ছাত্র সমাজ বিক্ষভে ফেটে পরেছিল। তারা রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই শ্লোগানে শ্লোগানে রাজপথে নেমে পরেছিল। আনিসুজ্জামানও ছিলেন সেই মিছিলের একজন। ১৯৫২ সালে যুবলীগের উদ্যোগে প্রচারিত পুস্তিকা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন কি ও কেন? সেটির রচিয়াতাও ছিলেন আনিসুজ্জামান। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রয়ারীর ১৪৪ ধারা ভঙ্গের স্মৃতিচারণ করতে যেয়ে তিনি লিখেন,
এবার পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়া শুরু করল আমাদের দিকে। আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাই, দৌড়ে যাই কলাভবনের পুকুরের দিকে। ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক, কেউ কেউ পুকুরেই ঝাঁপ দেয়; আমি গেঞ্জি ভিজিয়ে নিয়ে চোখে পানি দিই, শুধু শার্ট পরে থাকি, আর অধিকাংশের সঙ্গে ফিরে আসি রণক্ষেত্রে।’ হাসান হাফিজুর রহমান লিখিত একুশে ফেব্রুয়ারি সংকলন (১৯৫৩) প্রকাশের সঙ্গে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন।
ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী অবস্থা আরো ভয়াবহ হয়ে উঠে। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার পরপরই শুরু হতে থাকে একটি জাতির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তানি স্বৈর সরকার বুঝতে পেরেছিল যে বাঙালি জাতিকে চিরতরে ধ্বংস করতে হলে প্রয়োজন তাদের সাংস্কৃতিক মেরুদন্ডকে ভেঙে দেওয়া। পাকিস্তানের সেই ষড়যন্ত্রে যোগ দিয়েছিল কিছু দিকভ্রান্ত কথিত বাঙালি বুদ্বিজীবী সমাজও। সেই পাকিস্তান আমলে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়েও শুরু হয়েছিল আরেক নোংরা ষড়যন্ত্র। পাকিস্তানের মাটিতে তাঁকে নিষিদ্ধ করার জন্যে একটি গোষ্ঠী উঠে পরে নেমে পরে। সেই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধেও বাঙালি একাট্টা হয়ে প্রতিবাদে নেমে পরেছিল। ১৯৬১ সালের রবীন্দ্র জন্ম-শতবর্ষ অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে আনিসুজ্জামানও সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। আমরা জানি ১৯৬৭ সালে রবীন্দ্র সংগীতকে নিষিদ্ধ করতেও সেই একই চক্র আবার সক্রিয় হয়। একটি খবর ছাপা হয়- রবীন্দ্রনাথের গান পাকিস্তানের জাতীয় ভাবাদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে বেতার ও টেলিভিশন কর্তৃপক্ষকে রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রচার হ্রাস করতে বলা হয়। পূর্ব বাংলার বুদ্বিজীবী মহল এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। বলার অপেক্ষা রাখে না আনিসুজ্জামান ছিলেন সেই আন্দোলনকারীদের মধ্যে পয়লা কাতারের যোদ্ধা।
১৯৭১ সালে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর জন্ম নেয় স্বাধীন একটি দেশ নাম বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধার সঙ্গেও আনিসুজ্জামান প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি ১৯৭১ সালে মুজিব নগর সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ছিলেন। ১৯৭১-এ তিনি বাংলাদেশের জন্য বিশ্বজনমত সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত শরণার্থী শিক্ষকদের সংগঠন বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীন বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।
দেখতে পাই যুদ্ধের পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে বাঙলা সংস্কৃতির বিরুদ্ধে নানা রকম ষড়যন্ত্র হয়েছে। আনিসুজ্জামান বাঙালির বিরুদ্ধে প্রতিটা ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধেই রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। বাঙালি সংস্কৃতি অধিকারের দাবী আদায়ে তিনি ছিলেন অন্যতম অগ্রগামী যোদ্ধা।
বাঙালির আত্মপরিচয় এবং বাঙালিত্ব অনুসন্ধানে আনিসুজ্জামান প্রচুর গ্রন্থ লিখে গেছেন তিনি। মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য (১৯৬৪), মুসলিম বাংলার সাময়িকপত্র (১৯৬৯), মুনীর চৌধুরী (১৯৭৫), স্বরূপের সন্ধানে (১৯৭৬), আঠারো শতকের বাংলা চিঠি (১৯৮৩), মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ (১৯৮৩), পুরনো বাংলা গদ্য (১৯৮৪), আমার একাত্তর (১৯৯৭), মুক্তিযুদ্ধ এবং তারপর (১৯৯৮), কাল নিরবধি (২০০৩), আত্মপরিচয় ভাষা-আন্দোলন স্বাধীনতা (২০১৫), বিপুলা পৃথিবী (২০১৫); অনুবাদ : আদর্শ স্বামী (১৯৮২), পুরনো পালা (১৯৮৮) প্রভৃতি। এ ছাড়া সম্পাদনা করেছেন অনেক গ্রন্থ।
জাতীয়ভাবে সাহিত্য সাধনা ও কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। পুরস্কারগুলো হল দাউদ পুরস্কার (১৯৬৫), বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭০), একুশে পদক (১৯৮৪), আলাওল সাহিত্য পুরস্কার ও বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ পুরস্কার (১৯৮৬), আবুল মনসুর আহমদ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৯), আনন্দ পুরস্কার (১৯৯৩), পদ্মভূষণ (২০০৫) প্রভৃতি। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট ডিগ্রি প্রদান করেছে। ২০১৯ সালে লাভ করেন সার্ক সাহিত্য পুরস্কার। বাঙালিত্বের অহংকারে দীপ্যমান এই অক্লান্ত কর্মী এখনো দেশ এবং জাতির হিতসাধনে নিরন্তর কাজ করে গেছেন।
তিনি ২০১২ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাংলা একাডেমির সভাপতি ছিলেন।
উল্লেখ্য ড. আনিসুজ্জামান ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ই ফেব্রুয়ারি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। ৪৭-এর দেশভাগের পর তাঁর পরিবার বাংলাদেশে চলে আসেন। ২০২০ সালের ১৪মে তাঁর মৃত্যু।
তাঁর মৃত্যুতে বাঙালি জাতি সত্যিকার অর্থেই অভিবাবকহীন হয়ে পরল। এই শূণ্যতা কোনভাবেই পুরণ হবার নয়।তাঁর আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা।
লেখক এবং প্রাবন্ধিক। জন্ম ঢাকা, বাংলাদেশ। পড়াশুনা করেছেন বাংলাদেশ এবং উত্তর আমেরিকায়। উত্তর আমেরিকা থেকে ফাইনান্স এর উপর এমবিএ করেছেন। নিউইয়র্ক মুক্তধারা বইমেলা, নিউইয়র্ক ফিল্ম সেন্টার, নিউইয়র্ক সাহিত্য একাডেমিসহ নিউইয়র্ক ভিত্তিক বিভিন্ন শিল্প-সাহিত্য সংগঠনের সঙ্গে তিনি জড়িত। পেশায় আর্থনৈতিক বিশ্লেষক এবং আইটি পরামর্শক হিসেবে কাজ করলেও নেশা তাঁর লেখালেখি। ইতিহাস তাঁর প্রিয় এবং প্রধান একটি বিষয়। ভারত উপমহাদেশতো বটেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের বৈচিত্রপূর্ণ জীবন, ঐতিহাসিক রাজনৈতিক এবং সামাজিক ঘটনাবলীর উপর তাঁর রয়েছে গভীর আগ্রহ। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রš’গুলো গ্রন্থগুলো হল্: শিপ জাম্পারঃ বাঙালির আমেরিকা যাত্রা(মুক্তধারা, নিউইয়র্ক, ২০২০), অ্যাকুরিয়ামের মাছ ও হলুদ প্রজাপতির গল্প(মাওলা ব্রাদার্স, ২০১৯), চেনা অচেনা শহীদ কাদরী (মাওলা ব্রাদার্স, ২০১৮), ঔপনিবেশিক ভারতে বিলাতি নারীরা (ইত্যাদি গ্রš’প্রকাশ, ২০১৭), পূর্ব-পশ্চিমের আলো (প্রিয়মুখ, ২০১৬),আমেরিকানামা (সূচীপত্র, ২০১৫), জানা-অজানা রবার্ট ক্লাইভ (সূচীপত্র, ২০১৪) । নেশা ভ্রমণ, সিনেমা দেখা এবং বই পড়া। মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতা ও মানবতায় তিনি বিশ্বাসী।