| 1 মার্চ 2024
Categories
ঈদ সংখ্যা ২০২০

রবীন্দ্রনাথের গান কি মিউজিক থেরাপি  হতে পারে

আনুমানিক পঠনকাল: 9 মিনিট

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.comপ্রথমত বলি মিউজিক থেরাপি বলে সত্যি একটা জিনিস ক্লিনিকাল নিরাময়ের জগতে চালু আছে সত্তর বছরের বেশি সময় ধরে। মোটা দাগে মানুষ যখন ক্ষতি বা ক্ষত থেকে নিরাময় চায়, তখন থেরাপি হিসেবে মিউজিক কাজে আসে, সেটা হয়ত আমরা যুগ যুগ ধরে এক প্রকার জানি। এখন যেহেতু ব্রেন স্ক্যান করা যায়, সুতরাং সত্যিকার ব্রেন স্ক্যান দিয়ে মানুষের মনে সংগীতের নিরাময়ী প্রভাব, সুস্থ ও অসুস্থ সব ধরণের মানুষের মধ্যেই লক্ষ করা গেছে। স্কুলে, হাসপাতালে, ক্যান্সার রোগীদের মধ্যে, নেশাখোরদের মধ্যে ও মানসিক সংকটে যারা আছে, তাদের মধ্যে এমন কি সম্প্রতি কোভিড-১৯ সংক্রমিত রোগীদের জন্যও সংগীতকে থেরাপি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

সক্রেটিসের আমল থেকে মানে আড়াই হাজার বছর আগে থেকে ইউরোপে, চীনে আর আমাদের উপমহাদেশে যে বোধি অথবা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা হচ্ছে, সেখানে বলা হচ্ছে মন থেকে মানুষের প্রত্যক্ষ বাস্তবতা তৈরি হয়, তাই মনের প্রকৃতি না বুঝলে, প্রত্যক্ষ বাস্তবকে বোঝা যাবে না। বোঝা না গেলে বাস্তবকে পাল্টানোও যায় না।

মনোবিজ্ঞানের ওপরের স্তর হল চেতনার স্তর বা স্পিরিচুয়ালিটি। অর্থাৎ একটিকে পার হয়ে অপরটিকে বোঝার কথা।এখনকার যুগের স্পিরিচুয়ালদের মধ্যে যারা আছেন, তাঁদের মধ্যে দালাই লামার কথা সকলেই জানেন। তিনি বলেন, পৃথিবীতে চালাক চতুর মানুষ, জাগতিক অর্থে সফল মানুষ অনেক আছে, তবে এখন দুনিয়ায় যাদের বেশি প্রয়োজন, তারা হলো সংবেদনশীল, মমতাময়, নিরাময়ী মানুষ।

করোনার সমসাময়িক বাস্তবতা আমাদের বলে দিয়েছে যে নতুন পৃথিবীতে মানিয়ে নিতে হলে পদে পদে অনিশ্চয়তা, জরা, মৃত্যু ইত্যাদির সঙ্গে নতুন করে বসবাস শিখতে হবে। এই বাস্তবে ঘোর দুর্যোগ আর কালান্তরের মধ্যে মানসিক স্থিতি, একটি নিরাময়ী দর্শন ও নিরাময়ী চেতনার দরকার, সেটা আমরা বুঝতে পারছি। নাহলে আমরা কেউই মানসিক ভাবে এতো বড়ো একটা ধাক্কাকে নিতে পারব না। নেওয়া সম্ভব নয়।

মনের ওপর সংগীতের প্রত্যক্ষ প্রভাবকে তাহলে আমরা মিউজিক থেরাপি বলতে পারি, যে থেরাপি মনকে নিরাময় দিয়ে বাস্তব জগতকেও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহ-নির্মাণ করে।

আলাদা করে বলে রাখি, মানুষ জগতে শুধু না, মিউজিক থেরাপি উদ্ভিদ আর প্রাণী জগতের জন্যও যে সম্ভবত ভালো সে কথা কিছু কিছু গবেষণাপত্র থেকে আমরা জানতে পারি।

মিউজিক থেরাপি নিয়ে বাংলাদেশে ও বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক কালে কাজ শুরু হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে সব থেরাপির মতো থেরাপিস্টদের এই ব্যাপারে সচেতন প্রশিক্ষণ, দীর্ঘ প্রস্তুতি আর পূর্ণ আত্মনিবেদনের প্রয়োজন আছে।

আমরা বড়ো হতে হতে দুই প্রজন্ম ধরে খুব কাছে থেকে রবীন্দ্রনাথের গান শুনছি আর প্রভাব দেখছি, তাই এই ব্যাপারে সাহস করে আলোচনা করতে পারছি হয়তবা।

আমাদের একজন নিকট ব্যক্তি খুব প্রত্যয়ের সঙ্গে অনেক দিন ধরে ছোটো, বড়ো, শাদা, কালো, ছেলে, মেয়ে সকলকে রবীন্দ্রনাথের গান শিখিয়েছেন, অনেকে তাঁর প্রতিবেশকে শান্তিনিকেতনের সঙ্গে তুলনা করত। হাতেনাতে শিখিয়েই ছেড়ে দেননি। সেই গানের আবহে তাদের মানুষ করছেন। গ্রামের আনপড় ছেলেমেয়ে যেমন অনেক ছিল, তেমন ছিল শহরের ছেলেমেয়েরা ও নামডাকওলা শিল্পীরাও। তিনি এক সমুদ্র মানুষের কাতারেও রবীন্দ্রনাথের গান নাটককে নিয়ে গেছেন বারবার। খুব সাধারণ মানুষের জনসমুদ্রে রবি ঠাকুরকে এভাবে নিয়ে যাওয়া খুব বেশি দেখা যায় না। সামগ্রিকভাবে দেখেছি যে এই সমস্ত কাজের প্রভাব বরাবরই অসাধারণ প্রাণময় আর ইতিবাচক হয়েছিল। একটি একটি করে যেন জীবন  পাল্টে গিয়েছিল। আর সেই কারণেই এই ব্যক্তির সান্নিধ্যে যারা আসত, তারা থেরাপির কথা হয়ত জানত না, কিন্তু তাঁর জন্য এদের সবার আলাদা একটা প্রত্যয়, আস্থা আর ভালোবাসা ছিল। তিনিও কখনো থেরাপির প্রসঙ্গ আনেননি।

আমার ধারণা রবীন্দ্রনাথের গানকে কোনো রকম লেবেল না দিয়েও একটা কথা বলা যায়। আস্তিক নাস্তিক সকলের কাছে রবীন্দ্রনাথের গান প্রিয় আর থেরাপেটিক হয় বলে দেখে এসেছি। হতে পারার একটা কারণ, তা অন্তরের সব রকম ক্ষতকে সারাতেপারে। সেটা জনসমুদ্রেও হতে পারে, আবার ঘরের নিভৃতকোণেও হতে পারে।

রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে দুইটি সংখ্যাতাত্ত্বিক ও কোয়ালিটিগত সার্ভে করেছিলাম। প্রশ্নের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের গান কেন করি? – এ কথা বুঝতে চেয়েছিলাম। প্রশ্ন করতে করতে সত্যের দিকে যাওয়া যাবে মনে করেই অনেক প্রশ্ন করা হয়েছিল। প্রায় ষাট জনের মতো রবীন্দ্রগানের শিল্পী ও শ্রোতা ছিলেন সেই সার্ভেতে। তাদের উত্তর থেকে যে ফলাফল দাঁড়ায় তা মোটামুটি এ রকম, রবীন্দ্রগান আমাদের প্রায়শ এমন কিছু অনুভূতির জন্ম দেয় যা প্রভূত ও অসাধারণ, কিন্তু তার মধ্যে আঁশ ছাড়িয়ে দেখলে, প্রায়শ পাওয়া যায় – আনন্দ, মুক্তি, সংযোগ, সাহস, আলো, এই রকম কিছু বিমূর্ত সাধারণ (কমোন) মানবিক আকুতি বা অনুভূতি।

রবীন্দ্রনাথের গান কি তাহলে স্পিরিচুয়াল? এমন একটা প্রশ্ন আমার এসেছিল, স্বভাবত। সেই সব প্রশ্নকে আরেকটু তলিয়ে দেখার জন্য পরের লেখাটুকু রইল।

রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিকতা নিয়ে আমার নিজের দুই-পয়সা কিছু কথা আছে। আমি তাঁকে প্র্যাক্টিসিং স্পিরিচুয়াল মানুষ হিসেবে দেখেছি। হয়ত আপনারাও দেখেছেন।

স্পিরিচুয়াল বলতে আমাদের কাছে কী বোঝায় সেটা একটু দেখার চেষ্টা করি।

বাজারে চলতি একটা সংজ্ঞা পেয়েছি, সারমর্ম হচ্ছে, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’ মানুষে মানুষে যে হিংসা, বৈষম্য আর বিভেদ সেটার প্রেক্ষিতে মধ্যযুগের কবি চণ্ডীদাস এই কথাটা বলেছিলেন।

আধুনিক জলবায়ু সংকটের দিনে আমরা জানি মানুষ হিসেবে এই নীল গ্রহের উপর আমাদের অবিমিশ্র অত্যাচারের কারণে প্রতি বছর নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে ২০০- ২০০০ প্রজাতির প্রাণী।কীটনাশকের ব্যবহারে মৌমাছিরা বিপন্ন। মৌমাছি না থাকলে পরাগায়ন বন্ধ হয়ে যাবে। মানুষ বাঁচবে না। দুনিয়ার জন্য মানুষের চেয়ে এখন মৌমাছির বেঁচে থাকার প্রয়োজন বেশি।

এইসব ভারসাম্যের অভাবে তাপমাত্রা বাড়ছে, প্রাকৃতিক বিপর্যয় বাড়ছে, উদ্বাস্তু হচ্ছে মানুষ আর প্রাণীকুল।

নর্থ পোলের শ্বেত ভালুকরা বিপর্যস্ত। খাবারের অভাবে তারা আসতে শুরু করেছে লোকালয়ে।

এই উপমহাদেশের একজন বড়ো ঔপন্যাসিক অমিতাভ ঘোষ তাঁর ‘Gun Island’ বইতে এই বিপর্যয়ের আলামত নিয়ে আলোচনা করেছেন।

আমরা জানি পরিবেশবিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের কারণে পৃথিবীর জলবায়ু এমনভাবে পরিবর্তিত হয়েছে যে আর ফিরিয়ে আনার উপায় দেখা যাচ্ছে না। আমাদের অতি সম্প্রতি আম্ফান বা উম্পুন ঝড় অথবা করোনা ভাইরাসও সেই প্রকার এক একটি মানুষ-সৃষ্ট দুর্যোগ বলে বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন।

তাই এই মুহূর্তে এই বৈজ্ঞানিক সত্য কথাগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’, এইসব আপ্ত কথা শুনতে ফাঁকা ফাঁকা লাগে।

‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ এই কথা রবীন্দ্রনাথ মনে করেছিলেন কিনা জানি না। রবীন্দ্রনাথ প্রায় এক শ বছর আগেই ‘বনবাণী’ লিখেছিলেন, ‘বলাই’ ছোটোগল্প লিখেছিলেন। উদ্ভিদ বা প্রাণীকূলের অস্তিত্ব আর মানুষের অস্তিত্বকে ওতপ্রোত দেখেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা প্রসঙ্গে লেখায় আমরা পড়ছি তিনি মানুষের সঙ্গে মানবিক আর প্রকৃতির সঙ্গে প্রাকৃতিক হতে বলছেন।

শ্রীনিকেতনে একটা পল্লীগ্রামের মডেল করেছিলেন যেখানে মানুষ প্রকৃতি অঙ্গাঙ্গী থাকতে পারে। প্রকৃতি বা জীবজগৎ বাদ দিয়ে মানুষকে তিনি সবার উপরে মনে করবেন, এমন না।

মানুষের সঙ্গে প্রাণীকুল আর অরণ্য পাহাড় সমুদ্রের সব জীব-উদ্ভিদের ভবিষ্যৎ এক সুতোয় বাঁধা সেটা তিনি জানতেন।

বিশ্বভারতীকে তিনি যে দর্শনের ওপর দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন, সেটা হল, এক নীড়ে সমস্ত বিশ্ব। বিশ্ব বলতে কি শুধু মানুষের সমষ্টি বোঝায়?

একালের সমাজবিজ্ঞানী ব্রেনে ব্রাউন ‘আধ্যাত্মিকতা’ বলতে বুঝিয়েছেন, মানুষের সঙ্গে মানুষের এমন এক বন্ধন যা চাইলেও ছেদ করা যায় না (‘আমিই সেই অরণ্য’ – ব্রেনে ব্রাউন)।

বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ তথ্য ঘাঁটলে জানে, মানুষের অন্তর্গত যে অদৃশ্য জেনেটিক মেকাপ, সেখানে এক মানুষের সঙ্গে আরেক মানুষের মিলটা ৯৯% বা তার বেশি। তাহলে বিভেদের চেয়ে মিলটাই কি প্রাকৃতিক নৈর্ব্যক্তিক সত্য হলো না?

সেই বন্ধন যখন এক ঝলকের জন্য আমরা বুঝতে পারি তখন আমরা আধ্যাত্মিক। শোক-অনুষ্ঠানে, সকলকে এক মঞ্চে নিয়ে আসা উৎসবে, নাটক বা গানের অনুষ্ঠানে, ফুটবল বা ক্রিকেটের ময়দানে মানুষের সম্মিলিত আবেগ ধারণ করার সময় আমরা এরকম আধ্যাত্মিক হয়ে উঠি।

রবীন্দ্রনাথ হয়ত এই উদ্দেশ্যে প্রাকৃতিক উৎসবের অবতারণা করেছিলেন। বসন্তোৎসব, শারদোৎসব, বর্ষামঙ্গল, বৃক্ষরোপন ইত্যাদি। এছাড়া গান, নাচ আর নাটককে ব্যবহার করে উৎসবের মঞ্চ সকলের জন্য খুলে দিয়েছিলেন। সকালে ‘উপাসনা’-র সময় সকলকে একত্র করতেন। এই ‘উপাসনা’র সময় তিনি একটা ইচ্ছে বা ভাবের ওপর দাঁড়িয়ে কথা বলতেন।

‘শান্তিনিকেতন’ দুই খন্ডে তাঁর এই সকালবেলার সরল কথাগুলো আছে।

তাহলে দেখা যাচ্ছে আধ্যাত্মিকতা ঠিক তত্ত্ব না, বিশ্বাস না, একটা বৈজ্ঞানিক অভিজ্ঞান। নিজে নিজে পেতে হয়। কেউ হুবহু শেখাতে পারবে না। সবার পথ আবার আলাদা।

এমন একটা বোধ যাকে আমরা অল্পআধটু ছুঁতে পারি। আর ছোঁয়ার স্মৃতি যত্নে রেখে দিতে পারলে পরেও ছুঁতে পেরেছি কিনা, মিলিয়ে নিতে পারি।

অনুশীলন ছাড়া কোনো খেলোয়াড় খেলতে পারেন না। কোনো শিল্পী গাইতে পারেন না। কোনো লেখক লিখতে পারেন না। সহজ কথা, নিউরোপ্লাস্টিসিটির ভাষায় মগজের পেশিগুলোকে ব্যবহার না করলে সেই পেশিগুলো অনভ্যস্ত আর শিথিল হয়ে যায়।

তাহলে স্পিরিচুয়ালিটির অনুশীলন কী?

ব্রেনে ব্রাউনের ভাষায় এবং আধুনিকা শিক্ষায় আমরা দেখছি আধ্যাত্মিকতার অনিবার্য অনুশীলন হলো কৃতজ্ঞতা বোধ।

ওপর ওপর কৃতজ্ঞতা দেখানো বা অভ্যস্ত তোতাপাখির ‘ধন্যবাদ’ না।

একদম হৃদয়ের শিকড় ছুঁয়ে কৃতজ্ঞতা। বারেবারে ফিরে ফিরে পড়ে গিয়ে, ঝলসে গিয়ে, রক্তাক্ত হয়ে, উঠে দাঁড়িয়ে, কৃতজ্ঞতা।

আমরা ব্যক্তিগতভাবে কৃতজ্ঞতা দিয়ে সকাল শুরু করি আর রা্তে ঘুমাতে যেতে শিশুদের শেখাই। ‘আজকে ৫টা জিনিস মনে করে দেখো যা খুব ভালো।’

কোনো কোনো দিন তার মধ্যে পড়ে,
‘আজকে আমি টেবিলে খাবার পেয়েছি।’
‘আজকে আমি আরেকদিন শ্বাস নিতে পেরেছি।’
‘আজকে একটা প্রিয় মানুষের চোখের দিকে তাকানোর সুযোগ পেয়েছি।’

কৃতজ্ঞতার চর্চা আমাদের মগজের সুখের হরমোন serotonin উন্মুক্ত করে।

রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলা সবচেয়ে সহজ। স্ত্রী, পুত্র, কন্যা আর পিতার মৃত্যুর পর সম্ভবত সবচেয়ে বিপন্ন দিনে গীতাঞ্জলি গীতিমাল্য নৈবেদ্য কবিতার সময় এই গান তিনি লিখছেন, ‘আমি বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই/ বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে।’

তিনি কিছু চাইছেন না। শুধু মনে করছেন, যে একটা মহাদানের উৎসবে তিনি জন্মানো মাত্র শামিল হয়েছেন।

‘না চাহিতে মোরে যা করেছ দান/ আকাশ আলোক তনু মন প্রাণ/ দিনে দিনে তুমি নিতেছ আমায়/ সে মহা দানেরই যোগ্য করে।’

আধুনিক মনোবিজ্ঞান আর শিক্ষা গবেষকরা বলছেন, শিশুদের খুব সকাল সকাল এই কৃতজ্ঞতার অভ্যেস করাতে পারলে তারা রবার বলের মতো যে কোনো সংকটে পড়ে, ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। মানে কৃতজ্ঞতার একটা বাস্তব প্রয়োজন আছে আমাদের।

যার মধ্যে কৃতজ্ঞতার পেশি যত জোরালো তারা তত সুখী।

এবার কৃতজ্ঞতার লাইনগুলো তাঁর পরিচিত গানের লাইনে একটু মনে করি দেখি:

ক) ‘হাতের কাছে কোলের কাছে/ যা আছে তা অনেক আছে।’ (গান: আমার নাইবা হলো পারে যাওয়া)

খ) ‘এই যে ধরণী চেয়ে বসে আছে/ ইহার মাধুরী বাড়াও হে।’ (গান: দাঁড়াও আমার আঁখির আগে)

গ) ‘সোনালি রুপালি সবুজে সুনীলে/ সে এমন মায়া কেমনে গাঁথিলে’ (গান: কে গো অন্তরতর সে)

ঘ) ‘তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে’ (গান:আছে দুঃখ আছে মৃত্যু)

ঙ) ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে’ (পুরো গান)

চ) ‘বাজায় ঊষা নিশীথকূলে যে গীতভাষা’ (গান: যে ধ্রুবপদ দিয়েছ বাঁধি)

ছ) ‘কোথা বিচ্ছেদ নাই’ (গান: তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে)

জ) ‘অনেক দিন ছিলাম প্রতিবেশী, দিয়েছি যত নিয়েছি তার বেশি।’ (গান: পেয়েছি ছুটি বিদায় দেহ ভাই সবারে আমি প্রণাম করে যাই)

ঝ) ‘জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ/ ধন্য হল ধন্য হল মানবজীবন’ (গান:জগতে আনন্দযজ্ঞে)

ঞ) ‘ভূবন জুড়ে রইল লেগে আনন্দ-আবেশ’ (গান: মধুর, তোমার শেষ যে না পাই)

স্পিরিচুয়াল  প্র্যাক্টিসে  ‘দুই আমি’

রবীন্দ্রনাথের এই গানটা একটু দেখতে চাই,

যে আমি ওই ভেসে চলে কালের ঢেউয়ে আকাশতলে
ওরই পানে দেখছি আমি চেয়ে।
.
একটু ক্ষয়ে ক্ষতি লাগে, একটু ঘায়ে ক্ষত জাগে –
ওরই পানে দেখছি আমি চেয়ে।।
.
ও যে সচল ছবির মতো, আমি নীরব কবির মতো –
ওরই পানে দেখছি আমি চেয়ে।
.
এই-যে আমি ঐ আমি নই, আপন-মাঝে আপনি যে রই,
যাই নে ভেসে মরণধারা বেয়ে –
মুক্ত আমি তৃপ্ত আমি, শান্ত আমি, দীপ্ত আমি,
ওরই পানে দেখছি আমি চেয়ে॥

এই গানে ‘দুই আমি’-র কথা আছে। নিজের চিন্তা, ভাবনা, কর্ম, সাফল্য, ব্যর্থতা, কোনোটাই ‘মুক্ত আমি তৃপ্ত আমি শান্ত আমি দীপ্ত আমি’-কে জড়ায় না। সেই আমি ‘দ্রষ্টা’ শুধু। তার কাজ বিচার করা না। শুধু ‘ভেসে চলা’ আমিকে বাইরে থেকে দেখা।

আধুনিক যুগের স্পিরিচুয়াল জগতের একজন বিশ্বাখ্যাত লেখক Eckhart Tolle রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচিত নাহয়েও অবিকল এমন কথাই বলেন। নিৎশে বলেন, মানুষ এক সেতুর মতো। অতিমানব আর অবমানবের মাঝখানের এক সেতু সে। ‘এ আমির আবরণ’ বইতে বেশ স্পষ্টত এই দুই আমির প্রসঙ্গ উঠিয়েছেন। আবার সেই কথা আমরা পাই বাউল সাধকদের কথায়। অচিনপাখি কি সেই মুক্ত-আমি, যাকে লালন সাঁইয়ের গানে ‘মনবেড়ী’ দিয়ে বাঁধা যাচ্ছে না?

এই প্রসঙ্গে আরেকটু এগিয়ে আর কয়েকটা গান দেখতে ইচ্ছে করে।

রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন ‘তোমারি ইচ্ছা করো হে পূর্ণ আমার জীবনমাঝে’ (গান – আমার মাথা নত করে দাও হে) কথাটা আমি ঘুরে ফিরে ভাবি। এই ‘তুমি’ যদি ‘মুক্ত আমি’ হয়, তাহলে সেই মুক্ত আমি-র ইচ্ছা আর ইগোর ইচ্ছা এক নাও হতে পারে। ‘মুক্ত আমি’র ‘গভীর আশা’ তাহলে কী?

রবীন্দ্রনাথের আরেকটা গানে পাই,

তোমার দ্বারে কেন আসি ভুলেই যে যাই, কতই কী চাই
দিনের শেষে ঘরে এসে লজ্জা যে পাই ॥


বাসনা সব বাঁধন যেন কুঁড়ির গায়ে
ফেটে যাবে, ঝরে যাবে দখিন-বায়ে।
একটি চাওয়া ভিতর হতে ফুটবে তোমার ভোর-আলোতে
প্রাণের স্রোতে –
অন্তরে সেই গভীর আশা বয়ে বেড়াই ॥

তাহলে ‘বাসনা’ ফেটে যাবে, কারণ সেটা ইগো-আমির অস্থির চাওয়া, আর গভীর আশা (ডিজায়ার) হল সেই মুক্ত আমি-র স্থির চাওয়া, যা পাল্টাবে না।

গীতাঞ্জলি গীতিমাল্য নৈবেদ্যর কবিতায় আমরা অহংকার বা ইগো-আমি থেকে মুক্ত-আমিকে আলাদা করা অনেক গান পাই।

এই সময় তিনি ক্ষয়ক্ষতি সরিয়ে শান্তিনিকেতনের ধ্যানকে স্বপ্ন থেকে বাস্তবে পরিণত করছিলেন।এই বাস্তবায়নের ইচ্ছা ছিল মুক্ত-আমির ইচ্ছা। স্পিরিচুয়াল ইচ্ছা। কিন্তু এই স্পিরিচুয়াল ইচ্ছার মধ্যে অহংকার বা ইগো-আমির উপস্থিতি স্বপ্নকে চুরমার করে দিতে পারত। তাই এসময় অহংকার বা ইগো-আমির ব্যাপারে তাঁর বিশেষ সচেতনতা দেখতে পাই। আমাদের মনে হয় কাব্যের প্রয়োজনে এই মুক্ত-আমিকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করাই যায়। যেমন তাঁর গানে করা হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথের যেসব গানে অহংকার বা ইগো-আমি থেকে মুক্ত-আমিকে আলাদা করতে চেয়েছেন সেই ধরণের আরো গান কিছু দিলাম। এবার আপনারা ভেবে বলুন–

ক) আমি বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই/ বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে।
খ) আমারে আড়াল করিয়া দাঁড়াও/ হৃদয় পদ্মদলে (গান: আমার মাথা নত করে দাও হে)
গ) আপনি কবে তোমারি নাম ধ্বনিবে সব কাজে (গান: জগত জুড়ে উদার সুরে আনন্দগান বাজে)
ঘ) বিকাশে মাধুরী হৃদয়ে বাহিরে/ তব সংগীতছন্দে (গান: তোমারি রাগিনী জীবনকুঞ্জে বাজে যেন সদা)
ঙ) যদি কোনদিন এ বীণার তারে/ তব প্রিয়নাম নাহি ঝংকারে (গান: যদি এ আমারও হৃদয়-দুয়ার বন্ধ রহে)
চ) আশা করি প্রাণপণে/ নিবিড় প্রেমের সরস বরষা/ যদি নেমে আসে মনে। (গান: সংসার যবে মন কেড়ে লয়/ জাগে না যখন প্রাণ)

রবীন্দ্রনাথ সংসার-বিবাগী হয়ে এই মুক্ত-আমির সাধনা করতে চাননি সেটা দেখা যাচ্ছে।

আনন্দবাজারে বিশ্বজিৎ রায়ের একটা লেখা থেকে (১০/২০১৮),

“তাঁর নাটকে মাঝে মাঝে ফিরে আসত রাজাদের কথা। তারা ঠিক কোন দেশের রাজা তা অনেক সময় জানা যেত না, জানা গেলেও সে দেশ কোথায় বোঝা যেত না। ভূগোলের মানচিত্রে তাদের নাম নেই। ফলে, সেই রাজাদের কাহিনি পড়তে গিয়ে অনেকে ভাবতেন রবীন্দ্রনাথ বুঝি পুরনো দিনের কথা লিখছেন। রবীন্দ্রনাথ তা কিন্তু আদপে লিখতেন না। তাঁর এই রাজা-রাজড়াদের কাহিনিতে সমকালের সমস্যাই ধরা পড়ত, আকারে-ইঙ্গিতে। সে সঙ্কট শুধু সমকালের নয়, আসলে চিরকালের। রবীন্দ্রনাথ তাই খানিক রূপকথার আদলে লিখতেন তাঁর নাটকের কাহিনি। নানা-কালের মানুষের মৌলিক কিছু সমস্যার ধারক সেই নাটকগুলি।

রবীন্দ্রনাথের ‘শারদোৎসব’ নাটকের রাজা বলেছিলেন, তিনি লোভ বাড়ানোর জন্য রাজত্ব করেন না, লোভ তৃপ্ত করার জন্য রাজ্য চালান। কথাটা কেন বলেছিলেন তিনি? খেয়াল করলে দেখা যাবে, রবীন্দ্রনাথের লেখায় মাঝেমাঝেই লোভী মানুষের দেখা মেলে। এই লোভের পেছনে কাজ করে আকাশছোঁয়া চাহিদা। রবীন্দ্রনাথ খেয়াল করছিলেন বিশ শতকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ও তার পরে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তোলার জন্য মাঝেমাঝেই মানুষের চাহিদাকে আকাশ প্রমাণ করে তোলা হত। সেই চাহিদা পূর্ণ করার জন্য উৎপাদনের পালে হাওয়া লাগে। কিছু মানুষের চাহিদা তাতে খানিকটা পূর্ণ হয়, বাকিদের প্রয়োজনের সামান্য জিনিসও কিন্তু মেলে না। তৈরি হয় বৈষম্য, অসামঞ্জস্য।”

এই রাজা বা রাজর্ষির পরিচয় আমরা তাঁর উপন্যাস রাজর্ষি (১৮৮৭) তে প্রথম পেলেও কনসেপ্টকে তিনি ‘শারোদোৎসব’ নাটকে (১৯১১) আবার এনেছেন। যেখানে তিনি বলছেন ‘রাজা হতে গেলে সন্ন্যাসী হওয়া চাই।’

নির্মোহ ইচ্ছা আর সেই পথে সাধনার একাগ্রতা রাজাকে ‘ঋষি’ বা ‘সন্ন্যাসী’ করে। এখানে ‘সন্ন্যাসী’ বা ‘ঋষি’ কথাটা আক্ষরিক না, এটা স্পিরিচুয়াল মানুষ বোঝাতে ব্যবহার হয়েছে বলে আমাদের ধারণা।

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত